শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত বাঙ্গালী জাতির অভ্যুত্থানের ইতিহাস-পার্ট ১

বাঙ্গালী জাতির অভ্যুত্থানের ইতিহাস-পার্ট ১

বীর মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট ফজলুর রহমান :

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার সর্বাত্মক গণবিস্ফোরণ—যা কেবল একটি আন্দোলন নয়, বরং বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্রিক স্বাধিকারের সংগ্রামের নির্ণায়ক অধ্যায়।

পটভূমি
১৯৫৮ সালে মোহাম্মদ আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক কাঠামো স্থগিত করেন। তথাকথিত “বেসিক ডেমোক্রেসি” পদ্ধতির আড়ালে কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা কায়েম করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানে অর্থনৈতিক বৈষম্য, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বণ্টনে অসমতা এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে বঞ্চনা তীব্র আকার ধারণ করে।

১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষণা করেন—যা ছিল প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের সুস্পষ্ট রূপরেখা। কেন্দ্রীয় সরকার এটিকে বিচ্ছিন্নতাবাদ আখ্যা দিয়ে দমননীতি গ্রহণ করে।

আগরতলা মামলা ও গণঅসন্তোষ
১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে তথাকথিত “রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য” (জনপ্রিয়ভাবে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা) দায়ের করা হয়। এতে ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এই মামলা পূর্ব বাংলায় ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি করে। ছাত্রসমাজ ১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে ১১ দফা দাবি উত্থাপন করে, যা ছয় দফাকে বিস্তৃত সামাজিক-অর্থনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ দেয়।

২০ জানুয়ারি ১৯৬৯ ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান আসাদ পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। তাঁর রক্তে আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ২৪ জানুয়ারি ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক বিক্ষোভে বহু হতাহত হয়। আন্দোলন শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে—এটি আর কেবল ছাত্রআন্দোলন ছিল না, হয়ে ওঠে সর্বজনীন গণপ্রতিরোধ।

অবশেষে ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সরকার আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে এবং শেখ মুজিবসহ সকল আসামিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে এক গণসমাবেশে শেখ মুজিবকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করা হয়—যা ছিল জনতার রাজনৈতিক আস্থার ঐতিহাসিক স্বীকৃতি।

২৫ মার্চ ১৯৬৯ আইয়ুব খান ক্ষমতা ত্যাগে বাধ্য হন এবং ক্ষমতা হস্তান্তর করেন সেনাপ্রধান ইয়াহিয়া খান-এর কাছে। যদিও সামরিক শাসন অব্যাহত থাকে, তবুও ১৯৬৯ গণঅভ্যুত্থান পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি ভেঙে দেয়।

১৯৬৯ ছিল ১৯৭০-এর নির্বাচন এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক প্রস্তাবনা। এটি প্রমাণ করে—বাঙালির গণআন্দোলন কেবল প্রতিবাদের ভাষা নয়, বরং রাষ্ট্রিক বৈধতাকে পুনঃসংজ্ঞায়িত করার শক্তি।

অতএব, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল স্বাধীনতার পূর্বসূচনা—স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগঠিত জনশক্তির সুস্পষ্ট ঘোষণা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের চূড়ান্ত বিকাশের ঐতিহাসিক মাইলফলক।

খুঁজুন