শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত ঈদে আত্মকেন্দ্রিকতা ও বৈষম্যের ছাপ

ঈদে আত্মকেন্দ্রিকতা ও বৈষম্যের ছাপ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী :

ঈদ মানে যে খুশি সে তো আমরা জেনে ফেলি বাল্যকালেই। রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ- এই গান এখন কতটা গাওয়া হয় জানি না, আমাদের বাল্যকালে খুবই শোনা যেত। তখন টেলিভিশন ছিল না, রেডিও ছিল, তাতেই সন্ধ্যা থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত নানা সুরে ও বাণীতে অবিরাম এই খবর আসত কানে। দৈনিকের ঈদ সংখ্যাগুলো (বইয়ের আকারে নয়, পত্রিকার সাইজেই) কিছুটা রঙিন

হতো সবুজ ও সাদায় এবং এর সবকটিতেই অনেক অনেক কবিতা থাকত ঈদের ওপর।

এখন টেলিভিশন এসেছে নানা রকমের, দৈনিকগুলো রঙিন হয়েছে অনেক অধিক পরিমাণে, এখন আর খুশির ঈদের কথা গান গেয়ে না বললেও চলে। পণ্যের বিজ্ঞাপনই জানিয়ে দেয় উৎসব আসছে, বলে দেয় প্রস্তুত হতে, ক্রয়ের জন্য। ঈদ এখন খুবই বাণিজ্যকবলিত। হতেই হবে। আমরা কি উন্নত হচ্ছি না? প্রবেশ করছি না মুক্তবাজারে?

ঈদের প্রধান দিকটা বাণিজ্যের নয়, উৎসবেরই এবং সেই উৎসবটা সামাজিক। মানুষ একে অপরের সঙ্গে মেলে, নিজের ব্যক্তিগত, এমনকি পারিবারিক গণ্ডি থেকেও বের হয়ে যায়। আমাদের বাল্যকালে এই সামাজিকতাটাই ছিল প্রধান। আমরা নতুন জামাকাপড় পেতাম, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যেতাম। খাওয়া-দাওয়ার

আকর্ষণ অবশ্যই ছিল, থাকতেই হবে, কিন্তু বুঝি আর না বুঝি আসল টানটা ছিল আত্মীয়তার। এখন সেটা যে কমেছে তাতে সন্দেহ প্রকাশের সুযোগটা কোথায়? মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতা বেড়েছে। লোকে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। প্রতিযোগিতা আগেও ছিল, কিন্তু এখন সেটা গগনস্পর্শী। পরিবারের সঙ্গে পরিবারের, একই পরিবারের একাংশের সঙ্গে অপরাংশের দ্বন্দ্ব, বিরোধ, প্রতিযোগিতা প্রায়ই উৎকট হয়ে ওঠে। যাতায়াতও কষ্টকর বৈকি। যানবাহনের সুযোগ সংক্ষিপ্ত, যানজট ভয়ংকর। ইচ্ছা থাকলেও যাওয়া হয় না।

একটা বৃত্তের মধ্যেই ঘোরাফেরা করছি। বয়সকালে আমি নিজে থাকতাম বিশ্ববিদ্যালয়পাড়ায়। আব্বা-আম্মা থাকতেন পুরান ঢাকায়। ঈদের দিন বিকালের দিকে আমার স্ত্রী ও আমি যেতাম যখন আব্বা-আম্মার সঙ্গে দেখা করতে তখন টের পেতাম ঈদ আসলে এসেছে ওইসব পুরনো রাস্তা ও আবাসভূমিতে, যেখানে দুপাশ থেকে গান বাজছে, ছেলেমেয়েরা সবাই রঙিন হয়ে চলাফেরা করছে, বয়স্করা জড়িয়ে ধরছে একে অপরকে, সর্বত্রই প্রাণ, সবার মধ্যেই টগবগে জীবন। আমরা বুঝতাম এবং নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতাম, ঈদ দেখতে হলে এখানে আসতে হয়। এখন আমার পিতা-মাতা জীবিত নেই। মায়ের সঙ্গে যখন দেখা করতে যেতাম তখন দেখতাম আগের সেই প্রাণ আর নেই। আমার নিজের দেখার চোখ বদলেছে, এটা তো অবশ্যই সত্য, কিন্তু এত বেশি ভিড় বেড়েছে পুরান ঢাকায়, এতই জনাকীর্ণ পথঘাট যে আগের সেই সামাজিকতাটা অনেকটা চাপা ও ঢাকা পড়ে গেছে। রুদ্ধশ্বাস দশা।

সামাজিকতা এখন বিপদের মুখে পড়েছে। ঈদের উৎসব যখন সামাজিক ও সর্বজনীন হতে চায় তখন সামাজিকতার ওই বিপদগ্রস্ত দিকটা বেশ পরিষ্কার হয়ে ওঠে। উৎসবের আলো অন্ধকারটাকে ধরিয়ে দেয়। দুই কারণে ঘটেছে এই বিপদ। একটি আত্মকেন্দ্রিকতা, অপরটি বৈষম্য। এরা যে পরস্পরবিচ্ছিন্ন তা নয়, একেবারেই সংলগ্ন বটে।

আত্মকেন্দ্রিকতাটা যখন-তখন এবং অতি অনায়াসে চোখে পড়ে। প্রকাশটা খুবই পীড়াদায়ক হয়ে ওঠে যখন কারও মৃত্যু উপলক্ষে সমবেত হই। সেখানে খাবার-দাবারের একটা আয়োজন থাকে তো বটেই, কেন থাকে তার ব্যাখ্যা নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু সেই ব্যাখ্যাতে যাওয়ার দরকার নেই। তার চেয়েও ব্যাপক হারে যা ঘটে সেটা হলো মৃত মানুষটিকে ভুলে গিয়ে নিজেদের নিয়ে আলোচনা। কী মহিলা মহলে, কী পুরুষদের ভেতরে কথাবার্তা চলে নিজেদের চিন্তা, দুশ্চিন্তা, অর্জন, সন্তান-সন্ততির উন্নতি, এমনকি কার কী অসুখ-বিসুখ ও কোথায় চিকিৎসা তা নিয়েও। রাজনীতিও চলে আসে। তা নিয়ে তর্কবিতর্কের উপক্রমও ঘটে। কিন্তু যিনি মারা গেছেন তিনি থাকেন উপেক্ষিত, পরিণত হন উপলক্ষে।

এর চেয়েও বড় সত্য হলো বৈষম্য। ঈদ উপলক্ষে এই বৈষম্য যেভাবে উন্মোচিত হয়ে যায় তেমনভাবে বোধ করি আর কখনই ঘটে না। বিশেষ করে অভিজাত এলাকাগুলোতে যে দৃশ্য চোখে পড়ে তা মর্মবিদারক। বিত্তবানরা গাড়িতে করে আসেন, তাদের ড্রাইভাররা নামাজে কীভাবে যোগ দেবে তা ড্রাইভারদের নিজ নিজ দুশ্চিন্তা, মালিকদের নয়। ড্রাইভাররা তবু ভাগ্যবান, মসজিদের চারপাশে যে অসংখ্য হতদরিদ্র মানুষ জড়ো হয়, ফিতরা বা এমনি কিছু পয়সা পাবে এই আশায় হাত পেতে থাকে, পরস্পরের ভেতর ঠেলাধাক্কা বাধায়, তাদের জন্য মসজিদের ভেতরে ঢোকাটা অপ্রাসঙ্গিক, তাদের আশার কেন্দ্রবিন্দু একটাই, সহৃদয়তার সম্ভাবনা। কেবল ঈদের দিনে কি? রোজার শুরু থেকেই এই ভিড় শুরু হয়। গ্রাম থেকে চলে আসে অসহায় মানুষ। থাকে রাস্তায়। তারা কী খায়, কেমন করে থাকে খোঁজ রাখার অবকাশ কোথায় ব্যস্ত ও বিচ্ছিন্ন মানুষদের? না, কেউ খোঁজ করে না। ইসলাম ধর্মের ঘোষিত একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য যে সাম্য তা কার্যকর থাকে না।

বিচ্ছিন্নতা ও বৈষম্য দুটোই এসেছে পুঁজিবাদ থেকে। দেশে উন্নতি যে একেবারেই হয়নি তা নয়, কিছুটা অবশ্যই হয়েছে। অস্বীকার করবে কোন অন্ধ? কিন্তু এই উন্নতির চরিত্রটা হচ্ছে পুঁজিবাদী, যা একদিকে মানুষকে পরস্পরবিচ্ছিন্ন এমনকি আত্মবিচ্ছিন্ন করে, অন্যদিকে নির্মম হাতে বৃদ্ধি করে চলে বৈষম্য। ওই উন্নতির ফাঁদে আমরা পড়েছি। ফলে সামাজিকতা বিপদগ্রস্ত হচ্ছে। ঈদের উৎসব এসে এই সত্যটাকে সবলে এবং নতুনভাবে আচ্ছাদনমুক্ত করে দেয়। কিন্তু সামাজিকতা তো অত্যাবশ্যক। মানুষ তো মানুষ থাকবে না, যদি সে সামাজিক না হয়, পরিণত হয় যন্ত্রে, নয়তো পশুতে। কোনোটাই তার মনুষ্যত্বের জন্য সংরক্ষক হতে পারে না। হচ্ছেও না।

আমরা সামাজিকতা চাই। খুব বেশি করেই চাই, কেননা তার ভয়াবহ অভাব দেখা দিয়েছে। এই সামাজিকতার প্রকাশ ও বিকাশে উৎসবের ভূমিকাটাকে খাটো করে দেখার কোনো উপায় নেই। সেসব উৎসব দরকার যেগুলো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক নয়, সামাজিক। ঈদ ও পূজা ধর্মীয় উৎসব বটে। কিন্তু একটা সময় আমাদের এই বাংলাদেশেই ছিল যখন উভয় উৎসবেই অন্যরা যোগ দিত, ঈদে হিন্দুরা দাওয়াত পেত, পূজায় মুসলমানরা দেবদেবীর মূর্তি দেখতে যেত, প্রসাদও পেয়ে যেত। এখন তেমনটা নেই। ধর্মীয় উৎসবের বাইরে যে সর্বজনীন দিনগুলো রয়েছে, যেমন পহেলা বৈশাখ, নবান্ন, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস- সেগুলো ধর্মনিরপেক্ষ, পরিপূর্ণরূপেই অসাম্প্রদায়িক ও ইহজাগতিক।

আমাদের চাওয়া উৎসবগুলো হবে সর্বজনীন, সবাই হয়তো সব উৎসবে আসবে না, কিন্তু সবার জন্যই দরজা থাকবে উন্মুক্ত, সুযোগ থাকবে প্রসারিত। সেজন্য রাজনীতি ও রাজনৈতিক দল দরকার হবে। তেমন রাজনীতির ও দলের যাদের অঙ্গীকার হবে রাষ্ট্রকে জনগণের করা এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা ও বৈষম্য যত বেশি পরিমাণে পারা যায় সরিয়ে ফেলা।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

খুঁজুন