শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত এই অফিসে একমাত্র আমি কুত্তার বাচ্চা বলতে পারি:.. নাঈমুল ইসলাম খান

এই অফিসে একমাত্র আমি কুত্তার বাচ্চা বলতে পারি:.. নাঈমুল ইসলাম খান

সাংবাদিকতার শুরু যেভাবে হয়
২১ মার্চ ২০১৯ নক করলাম নাঈমুল ইসলাম খানকে। ভাইয়া একটা জব লাগবে। এর আগে একটা জাতীয় সাপ্তাহিকে রাজশাহী করসপন্ডেট হিসেবে কাজ করেছি। তার সঙ্গে ব্রিটিশ কাউন্সিলের একটিভ সিটিজেন প্রজেক্টে অর্গানাইজার, টিউশনি করেছি। সাংবাদিক বা ড্রাইভিং পারি, ড্রাইভার হিসেবেও কাজ করতে রাজি আছি। 
নাঈম ভাই জানালেন, কাল সকাল ১০টায় অফিসে আসো। 

১১টায় অফিসে গেলাম। নাঈম ভাই বললেন, তুমি অনার্স করছো রাজশাহীতে। এক কাজ করো সিটি কলেজে ট্রান্সফার নিয়ে নাও, কলেজের অধ্যক্ষ আমার পরিচিত উনি হেল্প করবেন। এ কথা বলে তিনি বিভূরঞ্জন সরকারকে ডেকে বললেন, ‘দাদা, ওকে আপনার হাতে তুলে দিচ্ছি। মেয়েটা অনেক সম্ভাবনাময়।’ কাল থেকে অফিস করবে। সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা অফিস আওয়ার। এর মধ্যে ক্লাসের সময় গিয়ে ক্লাস করে আসবে। 
২২ মার্চ এডিটরিয়াল টিমে কাজ শুরু করলাম। মাঝে মাঝে রিপোর্টিংয়েও পাঠানো হয়। 
কাজ মোটামুটি ভালোই করছিলাম। আমার প্রশ্ন করার ধরন দেখে বিভূদা বলতেন, আপনার মতো করে সবাই ভাবলে তো হতোই! 
একদিন হঠাৎ নাঈম ভাই টিভি মনিটর নামে একটা নতুন এক্সপেরিমেন্টাল টিম করলেন। এই টিমের কাজ টিভির স্পেশাল নিউজের লাইভ শুনে দ্রুত সময়ের মধ্যে লেখা এবং যেটুকু বাকি থাকবে সেটা রেকর্ডিং শুনে টাইপ করা। এর মাধ্যমে ডে কাভার করতে গেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে ফোনে টাইপ করে অফিসে নিউজ পাঠানো যাবে। 

ওই টিমের ১০-১২টা কম্পিউটারের প্রত্যেকটার সঙ্গে একটা ভালো মানের হেডফোন ও টিভি কার্ড লাগানো। অন্যান্য টিমের কাজ আমাদের রুম থেকে বিনা পারমিশনে যে কারও ডেস্ক থেকে হেডফোন নিয়ে গিয়ে গান শোনা। এদিকে হেডফোন খোলা এবং আবার কানেক্ট করার সময় টিভি কার্ড নড়ে যায়। মানে যার ডেস্ক থেকে হেডফোন নেওয়া হয় সে আসার পর কমপক্ষে আধাঘণ্টা লাগে সেই কানেকশন ঠিক করতে। 
একদিন অফিসে গিয়ে দেখি আমার ডেস্ক থেকে কেউ একজন হেডফোন নিয়ে গেছে। লাঞ্চ আওয়ারে টিমের সবাই লাঞ্চে গেছে। 

এদিকে ছোটবেলা একটা গালি খুব ভালো করে রপ্ত করেছিলাম। রেগে গেলে অটো কু*ত্তার বাচ্চা বলা। এই গালির জন্য ভাই বোন ছোটবেলা প্রচুর মারছে। মানে হাত পা বেঁধে মারা যাকে বলে। আপু বা কনক যতই বলতো, ‘আর বলবি?’ আমি বলতাম, ‘কু*ত্তার বাচ্চা।’ মুখ চেপে ধরে বলতো, তোর মুখই ভেঙ্গে ফেলবো। তবুও ভুলতে পারিনি। 
হেডফোন না পেয়ে কাউকে মিন না করে বললাম, ‘কোন কু*ত্তার বাচ্চা আমার ডেস্ক থেকে হেডফোন নিয়ে গেছে?’ এটা বলে টিভি মনিটরের রুম থেকে বের হয়ে গেছি। এ সময় টিভি মনিটরের পাশে টেকনিক্যাল টিম বসতেন। টেকনিক্যাল টিমের হেড শোনা কথা যিনি নাঈম ভাইয়ের পালক পুত্র। নাঈম ভাই তাকে আহসানুল্লাহ থেকে পড়াশোনার সব ব্যবস্থা করেছিলেন বলে জেনেছিলাম। 
হেডফোন পেয়ে কাজ শুরু করেছি। পিওন এসে বললো, স্যার আপনারে ডাকছে। নাঈম ভাই রিপোর্টারদের সঙ্গে মিটিং করছিলেন। 
আমি যাওয়ার পর খুব স্বাভাবিকভাবে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কী বলেছো?’
ততক্ষণে বুঝে গেছি কী নিয়ে কথা হচ্ছে। প্রথমে চুপ করে ছিলাম। নাঈম ভাই দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করলেন। তৃতীয়বার চিৎকার করে বললেন, কী বলেছো? 
বললাম, কু*ত্তার বাচ্চা। 
আরও রেগে নাঈম ভাই বললেন, ‘এই অফিসে একমাত্র আমি কু*ত্তার বাচ্চা বলতে পারি’। আর যেন কখনো না শুনি। কাজ করতে চাও? 
জি ভাইয়া বলে চলে আসলাম। 

রিপোর্টাররা পরে বলেছিলেন, কী ঝড়টায় না তুলেছিলে। এ ধরনের কথা কেউ বলে? আমরা তো ভাবছি তুমি গেছো আজ... 

মনে মনে বললাম, অফিস তোমার বইল্লা তুমি কইতে পারো। আমরা এমপ্লয়ি বলে আমাদের মুখে তো কসটেপ মারা। গালি অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ নয় সেটা সবার জন্যই প্রযোজ্য। এডিটর হলে সাতখুন মাফ। 

যদিও নাঈম ভাই সত্য বলার জন্য পরে ধন্যবাদও বলেছিলেন। যে গালিই দাও না কেন সত্য তো বলছো। 

বেতন হওয়ার আগের কয়েকদিন অফিসের সবাই ভয়ে থাকতেন। কখন বোম ফাটি অবস্থা। নাঈম ভাই গালি দিতেন তবে সেটা কখনো কোন সাংবাদিকের সঙ্গে দেখিনি। পিওনের সঙ্গে মাঝে মধ্যে উচ্চবাচ্য শুনেছি। তবে একদিন কামরুল ভাইকে থাপ্পড় মেরেছিলেন শুনেছিলাম। কামরুল ভাই প্রেসক্লাবের সামনেও দাঁড়িয়েছিলেন। সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যবশত ওই আমি অফিসে যাইনি বা ডে অফ ছিল। লাইভ দেখার সুযোগ হয়নি। কামরুল ভাই অফিসের বাইক ব্যবহার করতেন। তেলের টাকাও অফিস থেকে নিতেন। শোনা কথা, তিনি সেই বাইকে রাইড শেয়ার করতেন। একদিকে বেতন এতো বেশি যে তাকে রাইড শেয়ার করতে হয়, অন্যদিকে উনার রিপোর্ট কখনো হাইলাইট হয়েছিল কিনা মনে করতে পারি না। সন্ধ্যায় অফিসে এসে অনলাইন ঘেটেঘুঁটে কপি পেস্ট মেরে ডে কাভারের একটা নিউজ ধরায়ে দিতেন। 

 অফিসে মাঝে মাঝে লেট হতো। এমনিও আমি লেট লতিফ নামে পরিচিত। অফিসে যাচ্ছি বাসে, আমার বস কল দিয়ে বললেন, কত বড় সাংবাদিক হইছেন ? এখনো অফিসে আসেননি। 
এ ঘটনার পর নাঈম ভাই একদিন বললেন, তুমি ক্লাস শেষ করে অফিসের এই চেয়ারে বসে একঘণ্টা ঘুমাবে, রেস্ট নিয়ে কাজ করবে। কাজ করতে হবে। আমার পক্ষে এখনি সম্ভব নয় রেস্ট রুম তৈরি করা, তবে একদিন করবো। এখান থেকে শিখে অন্য কোথাও চলে যেও। 

  এদিকে আমার কলেজ ট্রান্সফার নিয়ে নাকানিচুবানি অবস্থা। নাঈম ভাই সেদিকে অনেকটাই হেল্প করলেন। একদিন ডেকে বললেন, ‘যাওয়ার আগে মেকাপ দিয়ে যেও, তোমারে দেখলে যেন মনে হয় তুমি কিছুই বোঝো না। সব প্রসেস জেনে আসো। ঘুষ কত চায় সেটা শুনে রিয়াক্ট করবে না। (নাঈম ভাই এটা এতো ভালভাবে রপ্ত করেছি যে এখন যেকোনো পরিস্থিতিতে আমার একটাই এক্সপ্রেশন থাকে আমি আলাভোলা ছোট একটা বাচ্চা, কিছুই বুঝি না। যদিও সময় লেগেছে)
অফিসে মেয়েদের প্রাধান্য সবচেয়ে বেশি দেওয়া হতো। প্রথম নাঈম ভাইয়ের অফিসে আবিষ্কার করি মেয়ে হওয়া কোন পাপ নয়। এখানে আমরা পাওয়ারফুল। কোন পুরুষ কলিগের ক্ষমতা নেই কোনো মেয়েকে চোখ রাঙায়ে কথা বলে। বেতন যত সামান্য দিতেন এটা যেমন সত্য তেমনি নাঈম ভাই আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিতেন। কেউ পিৎজা খাবে সেটা নিজে না বলে আমাকে দিয়ে বলাতেন। নাঈম ভাইকে যতবার কিছু খাবো বলেছি কখনো না করেনি। পিওনকে সঙ্গে নিয়ে পুরো অফিসের জন্য খাবার নিয়ে আসছি অনেকবার। 

বেতন কম আর পত্রিকা, দুপুরের লাঞ্চ কেটে মাসে যে কটা টাকা বেতন আসতো সেটা একমাত্র দুঃখের বিষয় ছিল। যদিও নাঈম ভাই সবসময় বলতেন, এটা তোমার ইন্টার্নশিপ। আমি বেতন দিচ্ছি না, ভাতা দিচ্ছি। কাজ শিখে বড় অফিসে যাও। 

নাঈম ভাইয়ের সঙ্গে প্রত্যেকটা মিটিং মনে হতো জীবনে কত কিছু করার আছে, কত ভাবে একটা বিষয়কে ভাবা যায়। 

জামায়াত চায়ই না নারীরা কাজ করুক। নারী বান্ধব কর্মস্থান কখনো কি বাংলাদেশে হবে? 

মিস ইউ নাঈম ভাই
বিঃদ্রঃ লেখার উদ্দেশ্য কাজ নাই তাই স্মৃতিচারণ করি।

খুঁজুন