কাজী আবদুল হান্নান, সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক :
ভেবেছিলাম এদেশের আইন আদালত নিয়ে আর লিখালিখি করব না। কিন্তু শাসনদন্ডের আঘাতে নাগরিকের শেষ আশ্রয়স্থলের বিপর্যস্ত অবস্থা ও নির্লিপ্ত আচরণ দেখে অসহায় নাগরিক হিসেবে নিজের নিরাপত্তা নিয়েই এখন শঙ্কিত দিশেহারা। অশান্ত মনকে প্রবোধ দিতে কিছু কথা লিখলাম
এদেশে সাধারণ প্রবনতা হচ্ছে- বিচারের রায় নিজের পক্ষে হলে বিচারক নিরপেক্ষ, আর বিপক্ষে গেলে বিচারক পক্ষপাতদুষ্ট। এই সরলীকরণের কারণে এদেশে আইন আদালতের প্রতি মানুষের আগ্রহ আস্থার সংকট অনেকদিনের। তারপরও অনাস্থার প্রকাশ বিচার পরবর্তী প্রতিশোধ প্রবনতা রোধে রাষ্ট্রের নানামুখী সক্রিয় ভূমিকা থাকে। আর সেকারণেই মানুষ নিরঙ্কুশ আস্থা না থাকার পরও আইন আদালতকে নিজের শেষ ভরসার জায়গা হিসেবে বিবেচনা করে। অথচ এবার সেই প্রতিশোধ প্রবনতা আঘাত করেছে সর্বোচ্চ আদালতকে। খোদ রাষ্ট্রই প্রতিশোধ প্রবন হয়ে বিচার বিভাগের মাথায় বাড়ি মেরেছে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে গ্ৰেফতার করার মধ্যদিয়ে।
অনেকে হয়তো বলবেন, প্রধান বিচারপতিকে নয়- যাকে গ্ৰেফতার করা হয়েছে তিনি অবসরপ্রাপ্ত।
কিন্তু না! বিচারকরা চাকরি থেকে অবসরে গেলেও সাবেক নন। অবস্থান ভেদে অনেক বিধিনিষেধের ঘেরে আবদ্ধ হয়ে বিচারকাজে নিযুক্ত না থেকেও তারা বিচারপতির মর্যাদাভোগ করেন। নিয়মিত আদালত প্রক্রিয়ায় অংশ না নিলেও আদালত বহির্ভূত বিতর্ক নিরসনে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। আর প্রধান বিচারপতি অবসরে গেলেও আমৃত্যু রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দেওয়া হয়।
প্রশ্ন থাকতে পারে, তারা কোন অপরাধ করলেও কি দেশের আইনের উর্ধ্বে?
না, তারা আইনের উর্ধ্বে নন। যেকোন নাগরিকের মতোই আচরণ তার প্রাপ্য। কিন্তু তা তার কর্মজীবনের কৃতকর্মের কারণে নয়। সেক্ষেত্রে আইন কি তাকে দায়মুক্তি দিয়েছে- এ প্রশ্নও কেউ করতে পারেন। জবাব হচ্ছে, আইন করে বিচারকদের দায়মুক্তি দিয়ে বিচারকদের রাষ্ট্রের অনুকম্পা ভাজন করা হয়না। বিচার বিভাগীয় মর্যাদাকে দায়মুক্তির মাধ্যমে মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ রাখা হয়না। পরিবর্তে সমগ্ৰ বিচারিক প্রক্রিয়াকে এমন ভাবে বিন্যাস করা হয়, যাতে বিচারকাজের ভুলত্রুটির দায় কোনভাবেই ব্যক্তি বিচারকের ওপর না বর্তায়। আর ভুলত্রুটি মুক্ত করার এই পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়াশেষে একটি মামলার রায় চূড়ান্ত হয়। যেজন্য এর পর্যবেক্ষণসহ সিদ্ধান্ত বিশ্বের অপরাপর দেশের মামলায় গ্ৰহণযোগ্য হয়। অর্থাৎ চূড়ান্তকৃত যেকোন রায় এভাবে আন্তর্জাতিকতা পায়।
বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা বরাবরই প্রতিহিংসা মূলক। ঘটে যাওয়া কোন ঘটনা থেকে উদ্ভূত বিদ্বেষ দূর করে সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার সর্বশেষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে যার যথাযথ ভূমিকা রাখার কথা বাস্তবে তা রাখে না। অথচ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন। এই নীতিতে সমাজের শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হবার মতো ঘটনা গুলো অঙ্কুরেই বিনাশ করতে ভূমিকা রাখার জন্যই আইনী ব্যবস্থাটির জন্ম। যাতেকরে অন্যকেউ অনুরূপ ঘটনা ঘটাবার মত ধৃষ্টতা না দেখায়।
সমাজ সংস্কারকরা মধ্যযুগের প্রতিশোধ মূলক বিচার ব্যবস্থা থেকে সমাজকে অধিকতর সভ্য বানানোর লক্ষ্যে বিচারের সাজাকে দৃষ্টান্তমূলক করে আইন অনুযায়ী শাসনের পথে এর আধুনিকায়ন করেন। যদিও ভূক্তভোগীর ক্ষোভ এর মধ্যদিয়ে প্রশমন সম্ভব হয়নি। তথাপি আইন হাতে তুলে নেয়ার প্রবনতা থেকে নিবৃত করে সামাজিক শৃঙ্খলাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে যৎকিঞ্চিৎ হলেও প্রতিকার দেয়ার জন্যই এই বিচার ব্যবস্থা।
এক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ যাতে ব্যক্তির ইচ্ছা অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল না হয় তারজন্য প্রাক নির্ধারিত অনুসরণ যোগ্য বিধান আছে। সেগুলো যথাযথ ভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কিনা তা দেখার জন্য আপীল এবং পুনঃপরীক্ষার (রিভিউ) ব্যবস্থা থাকে। বিচারাচারের স্বার্বজনীন গ্ৰহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক ভাবেই যা আইন আদালত ব্যবস্থার অংশ। এমনকি কোন একক ব্যক্তির মর্জিমাফিক বিচারাকাজ যাতে চূড়ান্ত অনুমোদন না পায় সেজন্য একাধিক বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত আদালতে বেশী সংখ্যকের মতকেই চূড়ান্ত রায় হিসেবে ঘোষণা করা হয়। যা লেখার দায়িত্ব পালন করেন বিচারকাজের অংশ নেয়া বিচারকদের কোন একজন। তার লেখার সাথে একমত বা ভীন্নমত প্রকাশ কিংবা আরও কিছু যোগ বিয়োগের থাকলে সেগুলোও অপর বিচারকেরা স্বাধীনভাবে নিজের সিদ্ধান্ত আকারে সেই রায়ে লিখেদেন। ফলে এই সমগ্ৰ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসা আদালতের কোন সিদ্ধান্তে ব্যক্তি বিচারকের কোন দায় থাকেনা। যে কারনে কোন চূড়ান্ত রায়ের পর কোনো পর্যায়ের একক বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার পথ বন্ধ হয়ে যায়।
অবসরপ্রাপ্ত এই প্রধান বিচারপতিকে একারণেই তার কৃতকর্মের জন্য কোন অভিযোগ তুলে আটক করা যায়নি। কিন্তু প্রতিহিংসা মূলক বিচার ব্যবস্থার স্বাভাবিক পরিনতিতে ক্ষুব্ধ অংশের প্রতিশোধ প্রবনতার শিকার হয়েছেন তিনি। প্রতিশোধ প্রবনতা রোধে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতা এক্ষেত্রে ব্যবহার হয়েছে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য। তাকে গ্ৰেফতার করে আটক রাখা হয়েছে কিছুকাল আগে দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলায়।
এপর্যন্ত পাওয়া খবর পড়ে যতদূর ধারণা পাওয়া গেছে তাতে প্রতীয়মান হয়, গ্ৰেফতার এবং আটকাদেশ দেয়ার প্রশ্নে অনুসরণীয় প্রক্রিয়া শাসকের দোর্দণ্ড প্রতাপের কাছে এক্ষেত্রে নত হয়েছে। বিশেষকরে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করার পর আটকাদেশ দেয়ার জন্য অভিযোগের যথার্থতা নিরূপণের ক্ষেত্রে। এজন্য যেসব সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা উচ্চ আদালত থেকে দেয়া আছে সেগুলো বিবেচনার প্রশ্নে। তদুপরি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় থাকা ব্যক্তির হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়ে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের এজাহার কিংবা জবানবন্দির অস্তিত্ব পরীক্ষার প্রশ্নে। আসামি হিসেবে উপস্থাপন করা ব্যক্তি এজাহার নামিয় হলে মামলা দায়ের হওয়ার আগে থেকেই পুলিশের নিরাপত্তা ভোগকারীকে গ্ৰেফতারে বিলম্বের কারণ বিবেচনার প্রশ্নে। কিংবা এজাহার নামিয় না হলে- নির্ধারিত সময়ের পরে তাকে এজাহার ভুক্ত করতে আদালতের আদেশ নেয়া এবং গ্ৰেফতারি পরোয়ানা জারির প্রার্থনা ছিল কিনা? সর্বোপরি সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা প্রাপ্ত ব্যক্তিটি মামলার তদন্তকাজ প্রভাবিত করতে পারে আশঙ্কা করে আটক রাখার পুলিশী আবেদনের প্রেক্ষিত বিবেচনা করতে গিয়ে নজরবন্দি বা গৃহবন্দি রাখার সুযোগ উপেক্ষিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। আর তা হয়ে থাকলে বিচারিক ম্যজিস্ট্রেট আদালত নিতান্তই একটি পোস্ট অফিসের ভূমিকা পালন করেছে বলেই ধারণা করা যায়।
অপরদিকে রায়ের কারণে অবসরে যাওয়ার পর বিচারকের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা মূলক আচরণ বিচারকাজে বিচারকের স্বাধীনতার ওপর সুস্পষ্ট হুমকি। দেশের লাইফলাইন বিচার ব্যবস্থার জন্য যা অশনিসংকেত।
বিচার বিভাগীয় সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব পালনকারীকে গ্ৰেফতার করে কারাগারে আটক রাখার আদেশ বিদ্বেষ প্রসূত, নাকি যথাযথ- তা পরীক্ষা করে দেখার দায়িত্ব উচ্চ আদালতের। দেশের বিচারকদের স্বাভাবিক ও স্বাধীন ভাবে কাজ করার ওপর অন্যায় হস্তক্ষেপ প্রতিহত করে প্রতিবিধান করা উচ্চ আদালতের জন্মগত (ইনহ্যারিট) দায়িত্ব। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষায় স্বতঃপ্রনোদিত (সুয়োমোটো) হয়েই তারা এ উদ্যোগ নিতে পারেন। এধরনের ক্ষেত্রে এমনকি হেবিয়াস-কারপাস রুল জারি করে যেকোন আটকাদেশ পরিবর্তনের ক্ষমতা তারা তাৎক্ষণিক প্রয়োগ করতে পারতেন। অথচ তারা নিরব নির্লিপ্ত। এমন ঘটনা বিস্ময়ের, এবং যেকোন অন্যায় অবিচার অত্যাচারে নাগরিকদের জন্য দেশে বিচার প্রাপ্তির পথ এরমধ্যদিয়ে রুদ্ধ হয়ে গেছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
এক শঙ্কিত নাগরিকের আর্ত চিৎকার
এক শঙ্কিত নাগরিকের আর্ত চিৎকার
কাজী আবদুল হান্নান, সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক :ভেবেছিলাম এদেশের আইন আদালত নিয়ে আর লিখালিখি করব না। কিন্তু শাসনদন্ডের আঘাতে নাগরিকের শেষ আশ্রয়স্থলের বিপর্যস্ত অবস্থা ও নির্লিপ্ত আচরণ দেখে অসহায় নাগরিক হিসেবে নিজের নিরাপত্তা নিয়েই এখন শঙ্কিত দিশেহারা। অশান্ত মনকে প্রবোধ দিতে কিছু কথা লিখলামএদেশে সাধারণ প্রবনতা হচ্ছে- বিচারের রায় নিজের পক্ষে হলে বিচারক নিরপেক্ষ, আর বিপক্ষে গেলে বিচারক পক্ষপাতদুষ্ট। এই সরলীকরণের কারণে এদেশে আইন আদালতের প্রতি মানুষের আগ্রহ আস্থার সংকট অনেকদিনের। তারপরও অনাস্থার প্রকাশ বিচার পরবর্তী প্রতিশোধ প্রবনতা রোধে রাষ্ট্রের নানামুখী সক্রিয় ভূমিকা থাকে। আর সেকারণেই মানুষ নিরঙ্কুশ আস্থা না থাকার পরও আইন আদালতকে নিজের শেষ ভরসার জায়গা হিসেবে বিবেচনা করে। অথচ এবার সেই প্রতিশোধ প্রবনতা আঘাত করেছে সর্বোচ্চ আদালতকে। খোদ রাষ্ট্রই প্রতিশোধ প্রবন হয়ে বিচার বিভাগের মাথায় বাড়ি মেরেছে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে গ্ৰেফতার করার মধ্যদিয়ে। অনেকে হয়তো বলবেন, প্রধান বিচারপতিকে নয়- যাকে গ্ৰেফতার করা হয়েছে তিনি অবসরপ্রাপ্ত। কিন্তু না! বিচারকরা চাকরি থেকে অবসরে গেলেও সাবেক নন। অবস্থান ভেদে অনেক বিধিনিষেধের ঘেরে আবদ্ধ হয়ে বিচারকাজে নিযুক্ত না থেকেও তারা বিচারপতির মর্যাদাভোগ করেন। নিয়মিত আদালত প্রক্রিয়ায় অংশ না নিলেও আদালত বহির্ভূত বিতর্ক নিরসনে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। আর প্রধান বিচারপতি অবসরে গেলেও আমৃত্যু রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দেওয়া হয়। প্রশ্ন থাকতে পারে, তারা কোন অপরাধ করলেও কি দেশের আইনের উর্ধ্বে? না, তারা আইনের উর্ধ্বে নন। যেকোন নাগরিকের মতোই আচরণ তার প্রাপ্য। কিন্তু তা তার কর্মজীবনের কৃতকর্মের কারণে নয়। সেক্ষেত্রে আইন কি তাকে দায়মুক্তি দিয়েছে- এ প্রশ্নও কেউ করতে পারেন। জবাব হচ্ছে, আইন করে বিচারকদের দায়মুক্তি দিয়ে বিচারকদের রাষ্ট্রের অনুকম্পা ভাজন করা হয়না। বিচার বিভাগীয় মর্যাদাকে দায়মুক্তির মাধ্যমে মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ রাখা হয়না। পরিবর্তে সমগ্ৰ বিচারিক প্রক্রিয়াকে এমন ভাবে বিন্যাস করা হয়, যাতে বিচারকাজের ভুলত্রুটির দায় কোনভাবেই ব্যক্তি বিচারকের ওপর না বর্তায়। আর ভুলত্রুটি মুক্ত করার এই পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়াশেষে একটি মামলার রায় চূড়ান্ত হয়। যেজন্য এর পর্যবেক্ষণসহ সিদ্ধান্ত বিশ্বের অপরাপর দেশের মামলায় গ্ৰহণযোগ্য হয়। অর্থাৎ চূড়ান্তকৃত যেকোন রায় এভাবে আন্তর্জাতিকতা পায়।বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা বরাবরই প্রতিহিংসা মূলক। ঘটে
যাওয়া কোন ঘটনা থেকে উদ্ভূত বিদ্বেষ দূর করে সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার সর্বশেষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে যার যথাযথ ভূমিকা রাখার কথা বাস্তবে তা রাখে না। অথচ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন। এই নীতিতে সমাজের শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হবার মতো ঘটনা গুলো অঙ্কুরেই বিনাশ করতে ভূমিকা রাখার জন্যই আইনী ব্যবস্থাটির জন্ম। যাতেকরে অন্যকেউ অনুরূপ ঘটনা ঘটাবার মত ধৃষ্টতা না দেখায়। সমাজ সংস্কারকরা মধ্যযুগের প্রতিশোধ মূলক বিচার ব্যবস্থা থেকে সমাজকে অধিকতর সভ্য বানানোর লক্ষ্যে বিচারের সাজাকে দৃষ্টান্তমূলক করে আইন অনুযায়ী শাসনের পথে এর আধুনিকায়ন করেন। যদিও ভূক্তভোগীর ক্ষোভ এর মধ্যদিয়ে প্রশমন সম্ভব হয়নি। তথাপি আইন হাতে তুলে নেয়ার প্রবনতা থেকে নিবৃত করে সামাজিক শৃঙ্খলাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে যৎকিঞ্চিৎ হলেও প্রতিকার দেয়ার জন্যই এই বিচার ব্যবস্থা। এক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ যাতে ব্যক্তির ইচ্ছা অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল না হয় তারজন্য প্রাক নির্ধারিত অনুসরণ যোগ্য বিধান আছে। সেগুলো যথাযথ ভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কিনা তা দেখার জন্য আপীল এবং পুনঃপরীক্ষার (রিভিউ) ব্যবস্থা থাকে। বিচারাচারের স্বার্বজনীন গ্ৰহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক ভাবেই যা আইন আদালত ব্যবস্থার অংশ। এমনকি কোন একক ব্যক্তির মর্জিমাফিক বিচারাকাজ যাতে চূড়ান্ত অনুমোদন না পায় সেজন্য একাধিক বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত আদালতে বেশী সংখ্যকের মতকেই চূড়ান্ত রায় হিসেবে ঘোষণা করা হয়। যা লেখার দায়িত্ব পালন করেন বিচারকাজের অংশ নেয়া বিচারকদের কোন একজন। তার লেখার সাথে একমত বা ভীন্নমত প্রকাশ কিংবা আরও কিছু যোগ বিয়োগের থাকলে সেগুলোও অপর বিচারকেরা স্বাধীনভাবে নিজের সিদ্ধান্ত আকারে সেই রায়ে লিখেদেন। ফলে এই সমগ্ৰ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসা আদালতের কোন সিদ্ধান্তে ব্যক্তি বিচারকের কোন দায় থাকেনা। যে কারনে কোন চূড়ান্ত রায়ের পর কোনো পর্যায়ের একক বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার পথ বন্ধ হয়ে যায়। অবসরপ্রাপ্ত এই প্রধান বিচারপতিকে একারণেই তার কৃতকর্মের জন্য কোন অভিযোগ তুলে আটক করা যায়নি। কিন্তু প্রতিহিংসা মূলক বিচার ব্যবস্থার স্বাভাবিক পরিনতিতে ক্ষুব্ধ অংশের প্রতিশোধ প্রবনতার শিকার হয়েছেন তিনি। প্রতিশোধ প্রবনতা রোধে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতা এক্ষেত্রে ব্যবহার হয়েছে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য। তাকে গ্ৰেফতার করে আটক রাখা হয়েছে কিছুকাল আগে দায়ের হওয়া একটি
হত্যা মামলায়। এপর্যন্ত পাওয়া খবর পড়ে যতদূর ধারণা পাওয়া গেছে তাতে প্রতীয়মান হয়, গ্ৰেফতার এবং আটকাদেশ দেয়ার প্রশ্নে অনুসরণীয় প্রক্রিয়া শাসকের দোর্দণ্ড প্রতাপের কাছে এক্ষেত্রে নত হয়েছে। বিশেষকরে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করার পর আটকাদেশ দেয়ার জন্য অভিযোগের যথার্থতা নিরূপণের ক্ষেত্রে। এজন্য যেসব সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা উচ্চ আদালত থেকে দেয়া আছে সেগুলো বিবেচনার প্রশ্নে। তদুপরি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় থাকা ব্যক্তির হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়ে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের এজাহার কিংবা জবানবন্দির অস্তিত্ব পরীক্ষার প্রশ্নে। আসামি হিসেবে উপস্থাপন করা ব্যক্তি এজাহার নামিয় হলে মামলা দায়ের হওয়ার আগে থেকেই পুলিশের নিরাপত্তা ভোগকারীকে গ্ৰেফতারে বিলম্বের কারণ বিবেচনার প্রশ্নে। কিংবা এজাহার নামিয় না হলে- নির্ধারিত সময়ের পরে তাকে এজাহার ভুক্ত করতে আদালতের আদেশ নেয়া এবং গ্ৰেফতারি পরোয়ানা জারির প্রার্থনা ছিল কিনা? সর্বোপরি সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা প্রাপ্ত ব্যক্তিটি মামলার তদন্তকাজ প্রভাবিত করতে পারে আশঙ্কা করে আটক রাখার পুলিশী আবেদনের প্রেক্ষিত বিবেচনা করতে গিয়ে নজরবন্দি বা গৃহবন্দি রাখার সুযোগ উপেক্ষিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। আর তা হয়ে থাকলে বিচারিক ম্যজিস্ট্রেট আদালত নিতান্তই একটি পোস্ট অফিসের ভূমিকা পালন করেছে বলেই ধারণা করা যায়। অপরদিকে রায়ের কারণে অবসরে যাওয়ার পর বিচারকের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা মূলক আচরণ বিচারকাজে বিচারকের স্বাধীনতার ওপর সুস্পষ্ট হুমকি। দেশের লাইফলাইন বিচার ব্যবস্থার জন্য যা অশনিসংকেত। বিচার বিভাগীয় সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব পালনকারীকে গ্ৰেফতার করে কারাগারে আটক রাখার আদেশ বিদ্বেষ প্রসূত, নাকি যথাযথ- তা পরীক্ষা করে দেখার দায়িত্ব উচ্চ আদালতের। দেশের বিচারকদের স্বাভাবিক ও স্বাধীন ভাবে কাজ করার ওপর অন্যায় হস্তক্ষেপ প্রতিহত করে প্রতিবিধান করা উচ্চ আদালতের জন্মগত (ইনহ্যারিট) দায়িত্ব। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষায় স্বতঃপ্রনোদিত (সুয়োমোটো) হয়েই তারা এ উদ্যোগ নিতে পারেন। এধরনের ক্ষেত্রে এমনকি হেবিয়াস-কারপাস রুল জারি করে যেকোন আটকাদেশ পরিবর্তনের ক্ষমতা তারা তাৎক্ষণিক প্রয়োগ করতে পারতেন। অথচ তারা নিরব নির্লিপ্ত। এমন ঘটনা বিস্ময়ের, এবং যেকোন অন্যায় অবিচার অত্যাচারে নাগরিকদের জন্য দেশে বিচার প্রাপ্তির পথ এরমধ্যদিয়ে রুদ্ধ হয়ে গেছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
১৫২/২, এ-২ গ্রীন রোড, রওশন টাওয়ার (লিফটের-৫),
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ । মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত