সবুজ শ্যামল বাংলাদেশ পরিচিত গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের জন্য। শহরের জাঁকজমকপূর্ণ জীবনের বাইরে এসে অনেকেই গ্রামীণ পরিবেশে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। গ্রামীণ সংস্কৃতির এক ঐতিহ্য হচ্ছে গ্রামীণ মেলা। যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে। গ্রামীণ মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, খাবার সবকিছুই গ্রামের মেলায় লক্ষণীয় ছিল। বর্তমান প্রজন্ম আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় গ্রামীণ সংস্কৃতির অনেক কিছু হারিয়ে যেতে বসেছে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ মেলার ইতিহাস অনেক পুরনো। বলা হয়ে থাকে যে, পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে বাংলার জমিদার ও নীলকররা গ্রামীণ মেলার প্রচলন শুরু করেছিলেন। এর মাধ্যমে গ্রামের মানুষজন একত্রিত হয়ে তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করত এবং বিনোদনের জন্য নানা ধরনের খেলার আয়োজন করা হতো। এ ছাড়া কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে আমাদের দেশে ফসল কাটার পর বা বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবের সময় মেলা বসানোর রীতি ছিল। প্রাচীনকালে, পহেলা বৈশাখ, ঈদ, পূজা এবং অন্যান্য সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় এই মেলাগুলো অনুষ্ঠিত হতো। মেলায় হস্তশিল্প, কৃষিপণ্য, মিষ্টি, খেলনা এবং বিভিন্ন রকমের খাদ্যসামগ্রী বিক্রি করা হতো। এ ছাড়া মেলায় সার্কাস, পুতুল নাচ, নাগরদোলা এবং ঝুমুর গানের মতো বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হতো। মেলাগুলো শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুই ছিল না, এগুলো ছিল সামাজিক মেলামেশার একটি মাধ্যম।
এই মেলাগুলো গ্রামের মানুষের জন্য বিনোদনের প্রধান মাধ্যম এবং গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল। এটি সমাজের মধ্যে একতা এবং সংহতি বৃদ্ধি করে। তাছাড়া মেলায় অনুষ্ঠিত বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও খেলাধুলার মাধ্যমে শিশু ও কিশোরদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ ঘটে। গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি এই গ্রামীণ মেলা। মেলার মাধ্যমে স্থানীয় পণ্য বাজারজাত করা হয়ে থাকে, যা কৃষক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য আয়ের একটি প্রধান উৎস। মেলায় অংশগ্রহণকারী হস্তশিল্পীরা তাদের তৈরি পণ্য বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করতে পারে, যা তাদের জীবিকা নির্বাহে বড় সহায়ক।
কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের গ্রামীণ মেলা তার পুরনো খ্যাতি হারাতে বসেছে। এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো প্রযুক্তির অগ্রগতি ও আধুনিক জীবনের চাহিদা। গ্রামের মানুষ এখন টেলিভিশন, মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিনোদন পাচ্ছে, যার ফলে মেলার প্রতি আগ্রহ দিন দিন কমে গেছে। আধুনিক জীবনযাত্রা, শহরকেন্দ্রিক জীবনযাপন এবং বিভিন্ন ধরনের বিনোদনের আগমনে গ্রামীণ মেলা তার আকর্ষণ হারিয়ে ফেলছে। অন্যদিকে সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই গ্রামীণ মেলাগুলো বাঁচিয়ে রাখার জন্য। অনেক গ্রামীণ মেলা এখন আর অনুষ্ঠিত হয় না বা অনুষ্ঠিত হলেও আগের মতো তেমন জনপ্রিয়তা পায় না। এ ছাড়া পরিবেশগত ও নিরাপত্তার কারণে অনেক মেলা বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষ করে করোনা ভাইরাস মহামারীর পর থেকে মেলাগুলোর আয়োজন আরও কমে গেছে।
আমাদের এই সংস্কৃতি ধরে রাখতে হলে প্রথমত আধুনিক প্রজন্মকে গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়া ও টেলিভিশনে বিজ্ঞাপনের মতো গ্রামীণ মেলার গুরুত্ব তুলে ধরা, স্থানীয়ভাবে উদ্যোগ নিয়ে মেলা আয়োজন করতে হবে। স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং হস্তশিল্পীদের উৎসাহিত করতে হবে মেলায় অংশগ্রহণ করার জন্য। গ্রামীণ মেলাগুলোকে পর্যটনশিল্পের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। বিদেশি এবং দেশীয় পর্যটকদের জন্য মেলাগুলো আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। মেলার দেশীয় সংস্কৃতি বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে বিদেশি পর্যটকের আকর্ষণ ধারণ করা জরুরি।
এমনটা ভাবার অবকাশ নেই যে, বাংলাদেশের গ্রামীণ মেলা নিয়ে কাজ করে আমরা পিছিয়ে যাব। বরং আমরা বলতে পারি যে, প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়াটা গৌরবের। এই প্রজন্ম ইতোমধ্যে তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ভোলার পথে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন বাংলার গৌরবময় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বাংলা থেকে মুছে যাবে।
তাই পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের গ্রামীণ মেলা আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি মূল্যবান অংশ। এটি শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আমাদের সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশের গ্রামীণ মেলা আবারও তার পুরনো জৌলুস ফিরে পাবে এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এই ঐতিহ্যকে আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
মো. মুবাশ্বির হোসেন রাতুল : শিক্ষার্থী, গগণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
গ্রাম্যমেলা রক্ষায় চাই সম্মিলিত উদ্যোগ
গ্রাম্যমেলা রক্ষায় চাই সম্মিলিত উদ্যোগ
সবুজ শ্যামল বাংলাদেশ পরিচিত গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের জন্য। শহরের জাঁকজমকপূর্ণ জীবনের বাইরে এসে অনেকেই গ্রামীণ পরিবেশে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। গ্রামীণ সংস্কৃতির এক ঐতিহ্য হচ্ছে গ্রামীণ মেলা। যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে। গ্রামীণ মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, খাবার সবকিছুই গ্রামের মেলায় লক্ষণীয় ছিল। বর্তমান প্রজন্ম আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় গ্রামীণ সংস্কৃতির অনেক কিছু হারিয়ে যেতে বসেছে।বাংলাদেশের গ্রামীণ মেলার ইতিহাস অনেক পুরনো। বলা হয়ে থাকে যে, পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে বাংলার জমিদার ও নীলকররা গ্রামীণ মেলার প্রচলন শুরু করেছিলেন। এর মাধ্যমে গ্রামের মানুষজন একত্রিত হয়ে তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করত এবং বিনোদনের জন্য নানা ধরনের খেলার আয়োজন করা হতো। এ ছাড়া কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে আমাদের দেশে ফসল কাটার পর বা বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবের সময় মেলা বসানোর রীতি ছিল। প্রাচীনকালে, পহেলা বৈশাখ, ঈদ, পূজা এবং অন্যান্য সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় এই মেলাগুলো অনুষ্ঠিত হতো। মেলায় হস্তশিল্প, কৃষিপণ্য, মিষ্টি, খেলনা এবং বিভিন্ন রকমের খাদ্যসামগ্রী বিক্রি করা হতো। এ ছাড়া মেলায় সার্কাস, পুতুল নাচ, নাগরদোলা এবং ঝুমুর গানের মতো বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হতো। মেলাগুলো শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুই ছিল না, এগুলো ছিল সামাজিক মেলামেশার একটি মাধ্যম।এই মেলাগুলো গ্রামের মানুষের জন্য বিনোদনের প্রধান মাধ্যম এবং গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল। এটি সমাজের
মধ্যে একতা এবং সংহতি বৃদ্ধি করে। তাছাড়া মেলায় অনুষ্ঠিত বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও খেলাধুলার মাধ্যমে শিশু ও কিশোরদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ ঘটে। গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি এই গ্রামীণ মেলা। মেলার মাধ্যমে স্থানীয় পণ্য বাজারজাত করা হয়ে থাকে, যা কৃষক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য আয়ের একটি প্রধান উৎস। মেলায় অংশগ্রহণকারী হস্তশিল্পীরা তাদের তৈরি পণ্য বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করতে পারে, যা তাদের জীবিকা নির্বাহে বড় সহায়ক।কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের গ্রামীণ মেলা তার পুরনো খ্যাতি হারাতে বসেছে। এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো প্রযুক্তির অগ্রগতি ও আধুনিক জীবনের চাহিদা। গ্রামের মানুষ এখন টেলিভিশন, মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিনোদন পাচ্ছে, যার ফলে মেলার প্রতি আগ্রহ দিন দিন কমে গেছে। আধুনিক জীবনযাত্রা, শহরকেন্দ্রিক জীবনযাপন এবং বিভিন্ন ধরনের বিনোদনের আগমনে গ্রামীণ মেলা তার আকর্ষণ হারিয়ে ফেলছে। অন্যদিকে সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই গ্রামীণ মেলাগুলো বাঁচিয়ে রাখার জন্য। অনেক গ্রামীণ মেলা এখন আর অনুষ্ঠিত হয় না বা অনুষ্ঠিত হলেও আগের মতো তেমন জনপ্রিয়তা পায় না। এ ছাড়া পরিবেশগত ও নিরাপত্তার কারণে অনেক মেলা বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষ করে করোনা ভাইরাস মহামারীর পর থেকে মেলাগুলোর আয়োজন আরও কমে গেছে।আমাদের এই সংস্কৃতি ধরে রাখতে হলে প্রথমত আধুনিক প্রজন্মকে গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রতি
আগ্রহী করে তুলতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়া ও টেলিভিশনে বিজ্ঞাপনের মতো গ্রামীণ মেলার গুরুত্ব তুলে ধরা, স্থানীয়ভাবে উদ্যোগ নিয়ে মেলা আয়োজন করতে হবে। স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং হস্তশিল্পীদের উৎসাহিত করতে হবে মেলায় অংশগ্রহণ করার জন্য। গ্রামীণ মেলাগুলোকে পর্যটনশিল্পের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। বিদেশি এবং দেশীয় পর্যটকদের জন্য মেলাগুলো আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। মেলার দেশীয় সংস্কৃতি বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে বিদেশি পর্যটকের আকর্ষণ ধারণ করা জরুরি।এমনটা ভাবার অবকাশ নেই যে, বাংলাদেশের গ্রামীণ মেলা নিয়ে কাজ করে আমরা পিছিয়ে যাব। বরং আমরা বলতে পারি যে, প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়াটা গৌরবের। এই প্রজন্ম ইতোমধ্যে তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ভোলার পথে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন বাংলার গৌরবময় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বাংলা থেকে মুছে যাবে।তাই পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের গ্রামীণ মেলা আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি মূল্যবান অংশ। এটি শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আমাদের সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশের গ্রামীণ মেলা আবারও তার পুরনো জৌলুস ফিরে পাবে এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এই ঐতিহ্যকে আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে।মো. মুবাশ্বির হোসেন রাতুল : শিক্ষার্থী, গগণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
১৫২/২, এ-২ গ্রীন রোড, রওশন টাওয়ার (লিফটের-৫),
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ । মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত