দেশের বিদ্যুৎ খাত বহুমাত্রিক চাপে আটকে গেছে। একদিকে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর হাজার হাজার কোটি টাকার বকেয়া, অন্যদিকে জ্বালানি আমদানি ও ক্যাপাসিটি পেমেন্টের অব্যাহত দায়; তার ওপর সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারÑ অন্তত দুই বছর বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে না। এমন প্রেক্ষাপটে চলতি অর্থবছরে পিডিবি ৭৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে। অবশ্য বাজেটে বরাদ্দ মিলেছে মাত্র ৩৬ হাজার কোটি। আয়-ব্যয়ের বিস্তর ফারাক, বাড়তে থাকা ট্যারিফ ঘাটতি এবং সামনে আইএমএফের বৈঠক; সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাত এখন শুধু আর্থিক সংকটে নয়, নীতিগত ও কাঠামোগত এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া পরিশোধ করে বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত দফায় দফায় বৈঠক করছেন বিদ্যুৎ বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে। জানা যায়, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত যত বৈঠক হয়েছে ঘুরেফিরে একই বিষয় সামনে আসছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকার পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে রেখে যাওয়া দেনা পরিশোধের কৌশল নির্ধারণ এবং বিএনপির প্রতিশ্রুতি হিসেবে অন্তত দুই বছর বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার বিষয়টি। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন কী করে দাম না বাড়িয়ে সিস্টেম লসসহ অপারেশনাল খাতে বিভিন্ন খরচ কমিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যায়। তবে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের ১৪ হাজার কোটি টাকা পাওনা, দেশি-বিদেশি কোম্পানির দেনা, এলএনজি আমদানি, জ্বালানি তেল আমদানি, রমজান ও গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে নতুন সরকারের সামনে।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, নির্বাচিত সরকার চেষ্টা করবে মানুষকে স্বস্তিতে রাখতে। তিনি বলেন, আমরা তো দায়িত্ব নিয়েছি মাত্র এক সপ্তাহ। এখন পাইপলাইনে গ্যাস নেই, প্রাথমিক জ্বালানির সংকট, আর্থিক সংকট, দেশি-বিদেশি পাওনাদারদের কাছে বিদ্যুৎ খাতে বিশাল দেনা। এগুলো তো সব বিগত আওয়ামী লীগ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া। এমন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছি। আমরা চেষ্টা করব দুই বছর বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে রাখতে। বাকিটা কী হয় পরে দেখা যাবে। তিনি বলেন, আগামী মাসে আইএমএফের প্রতিনিধি দল আসবে। তাদের কিছু পরামর্শ থাকে। সেসব সমন্বয় করতে হবে। এখন সিস্টেম লস প্রায় ১০ শতাংশ। আমরা সবাইকে বলেছি সিস্টেম লস কমিয়ে আনতে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ সামগ্রিক পরিস্থিতির বিষয়ে উল্লেখ করে বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে তবে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেই। বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না অথচ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হচ্ছে। পুরোই হ-য-ব-র-ল অবস্থা। অতীতের দায়িত্ব পালনের কথা তুল ধরে তিনি বলেন, আমার সময় সিস্টেম লস ছিল ৬ শতাংশ। ১৯ বছর পরে এসে দেখছি ১০ শতাংশ হয়ে গেছে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা। প্রাথমিকভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে। এটা করা গেলে লোকসান কমে আসে। না হলে দায় আরও বাড়বে, আইএমএফ এসে চাপ দিবে। আমরা বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে ভাবছি, কীভাবে উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষা হয়।
এক প্রশ্নে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, আমি যখন দায়িত্বে ছিলাম, ২০০৪ সালে নীতিমালা করেছিলাম; তাতে বলা ছিল বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি অংশীদারত্ব থাকবে ৩৫ শতাংশ। পরবর্তী সরকার এটা মানেনি। এখন বেসরকারি অংশ হয়ে গেছে ৮২ শতাংশ। যে কারণে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তারা জনগণের ওপর দায় চাপিয়ে দিয়ে গেছে। এত টাকার দায় ম্যানেজ করা কঠিন। বিদ্যুতের দাম বাড়াতে পারব না। আমরা চেষ্টা করছি উইন উইন সিচুয়েশনে আনতে হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবারও বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া নিয়ে নিজ দপ্তরে বৈঠক করেন বিদ্যুৎমন্ত্রী। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ফারজানা মমতাজ, জ্বালানি বিভাগের সচিব সাইফুল ইসলাম, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম। বৈঠক সূত্র জানা যায়, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কাছে বিভিন্ন কোম্পানির পাওনা এখন ৪৬ হাজার কোটি। বাকি ৩০ হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন সরকারি কোম্পানি পুঞ্জীভূত লোকসান। এই বকেয়া ও লোকসানের টাকা দেওয়া না হলে বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বেসরকারির পাশাপাশি সরকারি ও যৌথ মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ভর্তুকিও জমা হয়েছে। সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ বা উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদনের প্রক্রিয়াধীন দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের গত বছরের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ৫ মাসে ট্যারিফ ঘাটতি বাবদ জমা হয়েছে ৩ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা।
চলমান রমজান, সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় বিল পরিশোধের অনুরোধ করা হয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগকে। চলতি মাসের ৯ ফেব্রুয়ারি পিডিবি থেকে বিদ্যুৎ বিভাগে লেখা চিঠিতে বলা হয়েছে পিডিবির নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র, আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্র (ঝাড়খণ্ড) এবং অন্য আমদানি বিদ্যুতের ওপর পিডিবিকে সরকার ভর্তুকি দেয় না। এ ছাড়া সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন না থাকায় রামপাল মৈত্রী সুপার থার্মাল ১৩২০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্ল্যান্ট ও পায়রায় ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিপরীতে অর্থ বিভাগ থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে ভর্তুকির অর্থ প্রদান স্থগিত রাখা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপরীতে প্রায় ৩ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা ভর্তুকি বাবদ বকেয়া জমা হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটি ভর্তুকির অর্থ না পাওয়ায় পিডিবি বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিলও সময়মতো পরিশোধ করতে পারছে না। বিপিডিবি বলছেÑ এ দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনার কারণে এবং কম দামে বিক্রির কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটির বিপরীতে প্রতি মাসে প্রায় ৭০০ কোটি থেকে ৮০০ কোটি টাকার আর্থিক ঘাটতির সম্মুখীন হচ্ছে।
এ ছাড়া গত দুুই সপ্তাহের মধ্যে বেসকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের সংগঠন ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশন দুইবার সংবাদ সম্মেলন করে তাদের বকেয়া ১৪ হাজার কোটি টাকা দ্রুত পরিশোধের দাবি জানিয়ে আসছে। টাকা না পেলে তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্র চালিয়ে রাখা সম্ভব নয় বলেও জানিয়েছে। ফলে ভয়াবহ আর্থিক সংকটে পড়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যুৎ বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, মার্চের ৯ থেকে ১৩ তারিখের মধ্যে আইএমএফের প্রতিনিধি দলের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে। আইএমএফ বাংলাদেশকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বারবার বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি তুলে দিতে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। আগের সরকার ঋণের কিস্তি পেতে আইএমএফের পরামর্শ অনুযায়ী দফায় দফায় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে।
এদিকে বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে দুই বছর অন্তত বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর যে ঘোষণা দিয়েছে, সেটা তাদের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। এই কর্মকর্তা বলেন, যদিও গত কয়েক দিনে মন্ত্রীরা বলছেন সিস্টেম লস কমিয়ে বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখবেন। বাস্তবে এটা করা কঠিন। তিনি বলেন, এর ফলে আর্থিক সংকটের মধ্যে থাকা বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি আরও বাড়বে।
সর্বশেষ পিডিবির এক হিসাবে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের মোট আয় হয়েছে ৭০ হাজার ৯২৬ দশমিক ৯৩ কোটি টাকা। একই অর্থ বছরে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে লোকসান বা ঘাটতি দিতে হয়েছে ৫৫ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা। সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি বাবদ পেয়েছে ৩৮ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা। এ সময়ে পিডিবির নিট ঘাটতি রয়েছে ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছর ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে পিডিপির মোট আয় হয়েছে ৬৪ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকা ও ব্যয় ১ লাখ ১১ হাজার ৫০২ কোটি টাকা। লোকসান বা ঘাটতি বাবদ খরচ হয়েছে ৪৭ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি বাবদ পেয়েছে ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। সংস্থাটির নিট ঘাটতি ছিল ১৭ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা।
গভীর অর্থ সংকটে বিদ্যুৎ খাত
গভীর অর্থ সংকটে বিদ্যুৎ খাত
দেশের বিদ্যুৎ খাত বহুমাত্রিক চাপে আটকে গেছে। একদিকে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর হাজার হাজার কোটি টাকার বকেয়া, অন্যদিকে জ্বালানি আমদানি ও ক্যাপাসিটি পেমেন্টের অব্যাহত দায়; তার ওপর সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারÑ অন্তত দুই বছর বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে না। এমন প্রেক্ষাপটে চলতি অর্থবছরে পিডিবি ৭৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে। অবশ্য বাজেটে বরাদ্দ মিলেছে মাত্র ৩৬ হাজার কোটি। আয়-ব্যয়ের বিস্তর ফারাক, বাড়তে থাকা ট্যারিফ ঘাটতি এবং সামনে আইএমএফের বৈঠক; সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাত এখন শুধু আর্থিক সংকটে নয়, নীতিগত ও কাঠামোগত এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া পরিশোধ করে বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত দফায় দফায় বৈঠক করছেন বিদ্যুৎ বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে। জানা যায়, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত যত বৈঠক হয়েছে ঘুরেফিরে একই বিষয় সামনে আসছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকার পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে রেখে যাওয়া দেনা পরিশোধের কৌশল নির্ধারণ এবং বিএনপির প্রতিশ্রুতি হিসেবে অন্তত দুই বছর বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার বিষয়টি। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন কী করে দাম না বাড়িয়ে সিস্টেম লসসহ অপারেশনাল খাতে বিভিন্ন খরচ কমিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যায়। তবে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের ১৪ হাজার কোটি টাকা পাওনা, দেশি-বিদেশি কোম্পানির দেনা, এলএনজি আমদানি, জ্বালানি তেল আমদানি, রমজান ও গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে নতুন সরকারের সামনে।বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, নির্বাচিত সরকার চেষ্টা করবে মানুষকে স্বস্তিতে রাখতে। তিনি বলেন, আমরা তো দায়িত্ব নিয়েছি মাত্র এক সপ্তাহ। এখন পাইপলাইনে গ্যাস নেই, প্রাথমিক জ্বালানির সংকট, আর্থিক সংকট, দেশি-বিদেশি পাওনাদারদের কাছে বিদ্যুৎ খাতে বিশাল দেনা। এগুলো তো সব বিগত আওয়ামী লীগ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া। এমন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছি। আমরা চেষ্টা করব দুই বছর বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে রাখতে। বাকিটা কী হয় পরে দেখা যাবে। তিনি বলেন, আগামী মাসে আইএমএফের প্রতিনিধি দল আসবে। তাদের কিছু পরামর্শ থাকে। সেসব সমন্বয় করতে হবে। এখন সিস্টেম লস প্রায় ১০ শতাংশ। আমরা সবাইকে বলেছি সিস্টেম লস কমিয়ে আনতে।ইকবাল হাসান মাহমুদ সামগ্রিক পরিস্থিতির বিষয়ে উল্লেখ করে বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে তবে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেই। বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না অথচ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হচ্ছে। পুরোই হ-য-ব-র-ল
অবস্থা। অতীতের দায়িত্ব পালনের কথা তুল ধরে তিনি বলেন, আমার সময় সিস্টেম লস ছিল ৬ শতাংশ। ১৯ বছর পরে এসে দেখছি ১০ শতাংশ হয়ে গেছে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা। প্রাথমিকভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে। এটা করা গেলে লোকসান কমে আসে। না হলে দায় আরও বাড়বে, আইএমএফ এসে চাপ দিবে। আমরা বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে ভাবছি, কীভাবে উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষা হয়।এক প্রশ্নে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, আমি যখন দায়িত্বে ছিলাম, ২০০৪ সালে নীতিমালা করেছিলাম; তাতে বলা ছিল বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি অংশীদারত্ব থাকবে ৩৫ শতাংশ। পরবর্তী সরকার এটা মানেনি। এখন বেসরকারি অংশ হয়ে গেছে ৮২ শতাংশ। যে কারণে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তারা জনগণের ওপর দায় চাপিয়ে দিয়ে গেছে। এত টাকার দায় ম্যানেজ করা কঠিন। বিদ্যুতের দাম বাড়াতে পারব না। আমরা চেষ্টা করছি উইন উইন সিচুয়েশনে আনতে হবে।গতকাল বৃহস্পতিবারও বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া নিয়ে নিজ দপ্তরে বৈঠক করেন বিদ্যুৎমন্ত্রী। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ফারজানা মমতাজ, জ্বালানি বিভাগের সচিব সাইফুল ইসলাম, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম। বৈঠক সূত্র জানা যায়, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কাছে বিভিন্ন কোম্পানির পাওনা এখন ৪৬ হাজার কোটি। বাকি ৩০ হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন সরকারি কোম্পানি পুঞ্জীভূত লোকসান। এই বকেয়া ও লোকসানের টাকা দেওয়া না হলে বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বেসরকারির পাশাপাশি সরকারি ও যৌথ মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ভর্তুকিও জমা হয়েছে। সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ বা উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদনের প্রক্রিয়াধীন দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের গত বছরের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ৫ মাসে ট্যারিফ ঘাটতি বাবদ জমা হয়েছে ৩ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা।চলমান রমজান, সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় বিল পরিশোধের অনুরোধ করা হয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগকে। চলতি মাসের ৯ ফেব্রুয়ারি পিডিবি থেকে বিদ্যুৎ বিভাগে লেখা চিঠিতে বলা হয়েছে পিডিবির নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র, আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্র (ঝাড়খণ্ড) এবং অন্য আমদানি বিদ্যুতের ওপর পিডিবিকে সরকার ভর্তুকি দেয় না। এ ছাড়া সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন না থাকায় রামপাল মৈত্রী সুপার থার্মাল ১৩২০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্ল্যান্ট ও পায়রায় ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিপরীতে অর্থ বিভাগ থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে ভর্তুকির অর্থ প্রদান স্থগিত রাখা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপরীতে
প্রায় ৩ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা ভর্তুকি বাবদ বকেয়া জমা হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটি ভর্তুকির অর্থ না পাওয়ায় পিডিবি বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিলও সময়মতো পরিশোধ করতে পারছে না। বিপিডিবি বলছেÑ এ দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনার কারণে এবং কম দামে বিক্রির কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটির বিপরীতে প্রতি মাসে প্রায় ৭০০ কোটি থেকে ৮০০ কোটি টাকার আর্থিক ঘাটতির সম্মুখীন হচ্ছে।এ ছাড়া গত দুুই সপ্তাহের মধ্যে বেসকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের সংগঠন ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশন দুইবার সংবাদ সম্মেলন করে তাদের বকেয়া ১৪ হাজার কোটি টাকা দ্রুত পরিশোধের দাবি জানিয়ে আসছে। টাকা না পেলে তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্র চালিয়ে রাখা সম্ভব নয় বলেও জানিয়েছে। ফলে ভয়াবহ আর্থিক সংকটে পড়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যুৎ বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, মার্চের ৯ থেকে ১৩ তারিখের মধ্যে আইএমএফের প্রতিনিধি দলের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে। আইএমএফ বাংলাদেশকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বারবার বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি তুলে দিতে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। আগের সরকার ঋণের কিস্তি পেতে আইএমএফের পরামর্শ অনুযায়ী দফায় দফায় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে।এদিকে বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে দুই বছর অন্তত বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর যে ঘোষণা দিয়েছে, সেটা তাদের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। এই কর্মকর্তা বলেন, যদিও গত কয়েক দিনে মন্ত্রীরা বলছেন সিস্টেম লস কমিয়ে বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখবেন। বাস্তবে এটা করা কঠিন। তিনি বলেন, এর ফলে আর্থিক সংকটের মধ্যে থাকা বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি আরও বাড়বে।সর্বশেষ পিডিবির এক হিসাবে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের মোট আয় হয়েছে ৭০ হাজার ৯২৬ দশমিক ৯৩ কোটি টাকা। একই অর্থ বছরে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে লোকসান বা ঘাটতি দিতে হয়েছে ৫৫ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা। সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি বাবদ পেয়েছে ৩৮ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা। এ সময়ে পিডিবির নিট ঘাটতি রয়েছে ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছর ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে পিডিপির মোট আয় হয়েছে ৬৪ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকা ও ব্যয় ১ লাখ ১১ হাজার ৫০২ কোটি টাকা। লোকসান বা ঘাটতি বাবদ খরচ হয়েছে ৪৭ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি বাবদ পেয়েছে ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। সংস্থাটির নিট ঘাটতি ছিল ১৭ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা।
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
১৫২/২, এ-২ গ্রীন রোড, রওশন টাওয়ার (লিফটের-৫),
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ । মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত