শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত হাদির হত্যাকাণ্ড: রাষ্ট্রের নীরব অপরাধ

হাদির হত্যাকাণ্ড: রাষ্ট্রের নীরব অপরাধ

শহীদ ওসমান হাদির সঙ্গে কারও ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল—এমন কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর হত্যাকাণ্ডকে আর ‘ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব’ বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এটি ছিল স্পষ্টতই একটি বার্তা—রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করো, সমাজকে বিভক্ত করো, মানুষকে আতঙ্কিত করো।

হত্যার পরপরই যেভাবে আগুন জ্বালানো হলো, গাড়ি ভাঙচুর হলো, সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপন্ন করা হলো—তা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়। এটি একটি চেনা চিত্র, একটি পরীক্ষিত কৌশল। মৃত্যু সংবাদকে মুহূর্তের মধ্যেই অরাজকতায় রূপান্তর করা হয়েছে।
 
“হাদিরা বারবার জন্ম নেয় না”—এই সত্যটা আমাদের মানতেই হবে।  শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, আরবাব—এই নামগুলো ইতিহাসে একবারই আসে। তারা কোনো কারখানার পণ্য নয় যে প্রয়োজন পড়লে আবার তৈরি করা যাবে। মুগ্ধ, আবু সাঈদ কিংবা ওসমান হাদিরাও তেমনি—একবারই এসেছেন, একবারই হারিয়ে গেছেন। অথচ আমরা এমনভাবে কথা বলি, এমনভাবে রাষ্ট্র চালাই, যেন আরও মানুষ মরবে, আর সেখান থেকেই আবার নতুন ‘হাদি’ তৈরি হয়ে যাবে। এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর ভ্রান্তি। এটাই সবচেয়ে নিষ্ঠুর রাষ্ট্রীয় আত্মপ্রবঞ্চনা।

একটি সমাজ যখন তার সেরা মানুষদের মৃত্যুকে “স্বাভাবিক ক্ষয়ক্ষতি” হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে—সে সমাজ গভীরভাবে অসুস্থ। কারণ সুস্থ রাষ্ট্র জানে, ভালো মানুষ হারানো মানে ভবিষ্যৎ হারানো।

ওসমান হাদির মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি ধারাবাহিক ব্যর্থতার ফল—নিরাপত্তার ব্যর্থতা, নৈতিকতার ব্যর্থতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছার ব্যর্থতা। আমরা খুব সহজে বলি, “তদন্ত হবে”, “বিচার হবে”। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আগে কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, যেখানে একজন হাদি নিরাপদ ছিলেন না? আরও ভয়ংকর প্রশ্ন হলো—মৃত্যুর পরপরই যেভাবে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ল, যেভাবে আগুন, ভাঙচুর, সহিংসতা শুরু হলো—এগুলো কি সত্যিই শোকের বহিঃপ্রকাশ? নাকি শহীদের রক্তকে ব্যবহার করে অন্য কোনো স্বার্থ আদায়ের চেষ্টা? যদি শহীদের নামে আগুন জ্বালানো হয়, তাহলে সেটি শহীদের প্রতি সম্মান নয়—তা শহীদকেই দ্বিতীয়বার হত্যা করা।

এই প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই— এইদেশেটিকেথাকেকারা? টিকে থাকে কি তারা, যারা সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়? না। তারা সবচেয়ে অনিরাপদ। টিকে থাকে তারাই, যারা লেহন আর দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। যারা ক্ষমতার পায়ের কাছে নিজেদের বিবেক জমা দিয়ে দেয়। যারা জানে—চুপ থাকলে পদ থাকবে, সুবিধা থাকবে, রিজিক থাকবে।

এই দেশে সৎ মানুষের রিজিক সব সময় অনিশ্চিত। তার চাকরি ঝুঁকিতে, তার সম্মান প্রশ্নবিদ্ধ, তার নিরাপত্তা নড়বড়ে। আর অন্যদিকে, যারা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত, যারা অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে—তাদের জন্য সুবহাল ব্যবস্থা প্রস্তুত থাকে। পদোন্নতি, সুযোগ, নিরাপত্তা—সবকিছু। এটা কোনো আবেগের কথা নয়, এটা বাস্তবতা।

আমরা প্রায়ই শুনি—“ভাই, রিজিকের ব্যাপার।” এই একটি বাক্য দিয়ে কত অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া হয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই। রিজিকের ভয় দেখিয়ে সত্যকে চুপ করানো হয়। রিজিকের ভয় দেখিয়ে অন্যায়ের পক্ষে দাঁড় করানো হয়। রিজিকের দোহাই দিয়ে সৎ মানুষকে কোণঠাসা করা হয়।

অথচ ধর্মীয়ভাবে, নৈতিকভাবে—রিজিক তো কারও হাতে নয়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় এমন এক বাস্তবতা তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ভালো মানুষের রিজিক কমে যায়, আর খারাপদের রিজিক নিরাপদ থাকে।

এই বৈষম্যের মধ্যেই হাদিরা মারা যায়। সবচেয়ে বিপজ্জনক ধারণা হলো—রাষ্ট্র যেন ধরে নিয়েছে, কিছু মানুষ মরবে, কিছু মানুষ হারিয়ে যাবে, তবু দেশ চলবে। ইতিহাস বলে—এই ধারণাই রাষ্ট্র ধ্বংসের সূচনা।

কারণ হাদিরা সংখ্যায় কম, কিন্তু তারা গুণে ভারী। তারা সমাজের নৈতিক মেরুদণ্ড। একবার সেই মেরুদণ্ড ভেঙে গেলে আর কোনো উন্নয়ন, কোনো প্রবৃদ্ধি টেকে না। যে দেশে একজন ভালো মানুষ নিরাপদ নয়, সে দেশে কেউ স্থায়ীভাবে ভালো থাকতে চায় না। তখন শুরু হয় মেধাপাচার, নীরব পলায়ন, ভেতর থেকে খালি হয়ে যাওয়া।

এই বাস্তবতায় নতুন করে আর কোনো হাদি জন্ম নেবে না—এই কথাটা কঠিন, কিন্তু সত্য। কারণ মানুষ আর বিশ্বাস করতে পারছে না যে সততা নিরাপদ। মানুষ আর নিশ্চিত নয় যে সত্য বললে রাষ্ট্র পাশে দাঁড়াবে। ফলে জন্ম নিচ্ছে না হাদি—জন্ম নিচ্ছে হিসাবি মানুষ, নীরব মানুষ, সুবিধাবাদী মানুষ। তারা হয়তো বেঁচে থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেবে না। আর শোকের তালিকা? সেটাই শুধু লম্বা হবে।

আজ প্রশ্নটা আর আবেগের নয়, প্রশ্নটা অস্তিত্বের—আমরাকীধরনেরবাংলাদেশচাই? একটি বাংলাদেশ, যেখানে ভালো মানুষ মারা যাবে, আর খারাপরা নিরাপদ থাকবে? নাকি একটি বাংলাদেশ, যেখানে হাদিরা বাঁচবে, কাজ করবে, নেতৃত্ব দেবে? হাদিরা বারবার জন্ম নেয় না। এই সত্য মেনে নেওয়াই রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব। নইলে ইতিহাস একদিন প্রশ্ন করবে—তোমরা হাদিদের দেশ গড়তে পারোনি কেন?

খুঁজুন