শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত হজরত মুসা (আ.) ও হজরত ইউসুফ (আ.) -এর জীবনির মিল

হজরত মুসা (আ.) ও হজরত ইউসুফ (আ.) -এর জীবনির মিল

হজরত মুসা (আ.)-এর কাহিনি কোরআনের বিভিন্ন সুরায় ছড়িয়ে আছে, যেখানে তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিক ও ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। অন্যদিকে, হজরত ইউসুফ (আ.)-এর কাহিনি প্রধানত সুরা ইউসুফে একটি পূর্ণাঙ্গ গল্প হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। সুরাগুলো পড়লে উভয় নবীর জীবন ও শিক্ষা সম্পর্কে গভীর ধারণা পাওয়া যায়।

১. শৈশবে পরিবারের বিচ্ছিন্নতা ও ত্যাগ: ইউসুফ (আ.) -কে তাঁর ভাইয়েরা ঈর্ষাবশত কূপে ফেলে দেয়।
মূসা (আ.) -কে তাঁর মা ফেরাউনের হত্যাযজ্ঞ থেকে বাঁচাতে নদীতে ভাসিয়ে দেন।

দুইজনকেই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়, কিন্তু আল্লাহ তাঁদের রক্ষা করেন এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করেন।
২. মিশর—উভয়ের জীবনের কেন্দ্রস্থল: ইউসুফ (আ.) মিশরের অর্থনৈতিক দুর্দশা দূর করেন, মিশরের রাজদরবারে সম্মান পান।
মূসা (আ.) ফেরাউনের বিরুদ্ধে মিশরেই আল্লাহর পক্ষ থেকে দাঁড়ান। মিশর উভয় কাহিনিতে আল্লাহর কুদরতের বড় মঞ্চ হিসেবে কাজ করে।

৩. দুইজনই অন্যায়ের শিকার হন, তবু ধৈর্য ধরেন: ইউসুফ (আ.) -কে মিথ্যা অপবাদে কারাগারে পাঠানো হয়।
মূসা (আ.) একজন মানুষকে আঘাত করার পর আতঙ্কে পালিয়ে যান, পরে আল্লাহর নবী হন।
অন্যায়ের মুখে উভয়েই ধৈর্য ধরেন এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সফল হন।
৪. আল্লাহর দিকনির্দেশনা ও স্বপ্ন/ওহি : ইউসুফ (আ.) -এর কাহিনিতে স্বপ্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মূসা (আ.) সরাসরি ওহি পান তুর পাহাড়ে।

উভয়ের পথনির্দেশ আল্লাহ সরাসরি দিয়েছেন – একজনকে স্বপ্নের মাধ্যমে, আরেকজনকে ওহির মাধ্যমে।
৫. দুইজনই বিদেশি হিসেবে বড় হন:

ইউসুফ (আ.) কূপ থেকে উদ্ধার হয়ে অন্য দেশের প্রাসাদে বড় হন।
মূসা (আ.) ফিরআউনের ঘরে শত্রুর ঘরেই লালিত হন।নিজ জাতি থেকে দূরে থেকেও আল্লাহ তাঁদের প্রতিপালন করেন।

৬. উভয়ের জীবনে নারীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ: ইউসুফ (আ.) -এর কাহিনিতে নারী (আজিজের স্ত্রী) পরীক্ষা হিসেবে আসে।
মূসা (আ.) -এর মা, ফেরাউনের স্ত্রী, ও পরবর্তীতে মাদিয়ান দেশের মেয়ে তাঁর জীবনে ভূমিকা রাখে।
নারীরা তাঁদের জীবনে বিভিন্নভাবে সহায়ক, পরীক্ষাস্বরূপ বা রক্ষাকারী ছিলেন।

৭. আল্লাহর পরিকল্পনা অদৃশ্য হলেও সুপরিকল্পিত:ইউসুফ (আ.) কূপে ফেলা হলেও শেষ পর্যন্ত রাজদরবারে পৌঁছেন।
মূসা (আ.) নদীতে ভাসানো হলেও ফেরাউনের প্রাসাদেই আশ্রয় পান। আল্লাহর পরিকল্পনা কখনোই তাৎক্ষণিক বোঝা যায় না, কিন্তু শেষপরিণাম সর্বোৎকৃষ্ট হয়।

৮. উভয়েই তাঁদের জাতিকে কঠিন পরিস্থিতি থেকে মুক্ত করেন: ইউসুফ (আ.) দুর্ভিক্ষে খাদ্য সরবরাহ করে তাঁর পরিবারসহ গোটা জাতিকে রক্ষা করেন।
মূসা (আ.) বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের দাসত্ব থেকে মুক্ত করেন।
আল্লাহ তাঁদের মাধ্যমে জাতিকে উদ্ধার করেন, যদিও উভয়ের শুরু ছিল কঠিন ও দুর্বল অবস্থান থেকে।

৯. দুইজনকেই আল্লাহ বিশেষ জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দেন:ইউসুফ (আ.) স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়ে জ্ঞানের প্রমাণ দেন।
মূসা (আ.) -কে আল্লাহ কিতাব ও মুজিজা দেন (যেমন লাঠি)। উভয়েই ছিলেন জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান নবী।

১০. উভয়ের কাহিনিতে পরিবারের পুনর্মিলন ঘটে: ইউসুফ (আ.) অনেক বছর পর ভাইদের ও বাবাকে ফিরে পান।মূসা (আ.) দীর্ঘকাল পর তাঁর মা-কে ফেরত পান (আল্লাহর বিশেষ প্রতিশ্রুতি)।
বিচ্ছেদের পর আবার আল্লাহ পরিবার ফিরিয়ে দেন, যা কোরআনের অন্যতম করুণাদায়ী বার্তা।
কোরআনে হজরত মুসা (আ.)

হজরত মুসা (আ.)-এর জীবন ও ঘটনাবলি কোরআনের বিভিন্ন সুরায় বর্ণিত হয়েছে, যিনি কোরআনে সবচেয়ে বেশি উল্লেখিত নবী। তাঁর কাহিনির প্রধান সুরাগুলো হলো:

সুরা আল-বাকারা (২): আয়াত ৪৯-৬১, ৬৭-৭৪, এবং অন্যান্য আয়াতে ফেরাউনের অত্যাচার, বনি ইসরাইলের মুক্তি, সমুদ্র বিভাজন, তাওরাত প্রদান ইত্যাদি উল্লেখ আছে।

সুরা আ’রাফ (৭): আয়াত ১০৩-১৬০-এ মুসা (আ.)-এর ফেরাউনের সাথে সাক্ষাৎ, যাদুকরদের সাথে প্রতিযোগিতা, এবং বনি ইসরাইলের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।

সুরা তা-হা (২০): আয়াত ৯-৯৮-এ মুসা (আ.)-এর জন্ম, ফেরাউনের দরবারে বড় হওয়া, তুর পাহাড়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ, এবং সমুদ্র বিভাজনের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।

সুরা আশ-শুয়ারা (২৬): আয়াত ১০-৬৮-এ মুসা (আ.) ও ফেরাউনের মধ্যে সংঘর্ষ এবং নবুওয়াতের ঘটনা উল্লেখ আছে।
সুরা কাসাস (২৮): আয়াত ৩-৪৩-এ মুসা (আ.)-এর জন্ম, শৈশব, ফেরাউনের দরবারে লালন-পালন, মাদইয়ানে গমন, এবং নবুওয়াত প্রাপ্তির বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে।

সুরা মু’মিন (৪০): আয়াত ২৩-৪৬-এ মুসা (আ.)-এর ফেরাউনের কাছে প্রেরণ এবং তাঁর দাওয়াতের কথা উল্লেখ আছে।
অন্যান্য সুরা: সুরা মায়িদা (৫), সুরা ইউনুস (১০), সুরা হুদ (১১), সুরা ইবরাহীম (১৪), সুরা বানী ইসরাইল (১৭), সুরা কাহফ (১৮), সুরা আল-আনকাবুত (২৯), সুরা আস-সাজদা (৩২), সুরা গাফির (৪০), সুরা আশ-শুরা (৪২), সুরা আয-যুখরুফ (৪৩), সুরা আদ-দুখান (৪৪), এবং সুরা আন-নাজিয়াত (৭৯)-এ মুসা (আ.)-এর বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়।
কোরআনে হজরত ইউসুফ (আ.)
হজরত ইউসুফ (আ.)-এর কাহিনি কোরআনে প্রধানত একটি সুরায় বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে, যা কোরআনের সবচেয়ে সুন্দর ও পূর্ণাঙ্গ গল্প হিসেবে বিবেচিত হয়:
সুরা ইউসুফ (১২): এই সুরার প্রায় পুরোটাই (আয়াত ৩-১০১) হজরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবনকাহিনি নিয়ে। এতে তাঁর শৈশব, ভাইদের ষড়যন্ত্র, কূপে নিক্ষেপ, মিসরে দাস হিসেবে বিক্রি, আযীযে মিসরের স্ত্রীর প্রতারণা, কারাবাস, স্বপ্নের ব্যাখ্যা, মিসরের শাসক হওয়া, এবং পরিবারের সাথে পুনর্মিলনের ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।
অন্যান্য সুরা: সুরা আন’আম (৬, আয়াত ৮৪) এবং সুরা গাফির (৪০, আয়াত ৩৪)-এ হজরত ইউসুফ (আ.)-এর নাম সংক্ষেপে উল্লেখ আছে, তবে বিস্তারিত কাহিনি শুধুমাত্র সুরা ইউসুফেই পাওয়া যায়।

খুঁজুন