পলাশ রহমান, সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক :
কলরব নিয়ে আমার খানিকটা আগ্রহ আছে। আগ্রহের মূলত কারণ দুইটা- এক, কলরবের প্রতিষ্ঠাতা আইনুদ্দিন আল আজাদ; দুই, কলরব ই আন্দোলনের সাংস্কৃতিক সংগঠন।
আইনুদ্দিন আল আজাদ বয়সে আমার চেয়ে বড় ছিলেন, কিন্তু তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব ছিলো অনেক নিবিড়। তিনি যখন ‘আইনুদ্দিন আল আজাদ’ হয়ে ওঠেননি, দেশের মানুষ তাকে চিনতো না- তখন থেকেই আমাদের বন্ধুত্বের শুরু- সেই নব্বইয়ের দশকে। এক সময় আমি প্রবাসী হই, উনি ঝিনাইদহ থেকে ঢাকায় হিজরত করেন। কিন্তু আমাদের বন্ধুত্বে দুরত্ব আসেনি কখনো।
প্রবাস থেকে ঢাকায় গেলে আমি আইনুদ্দিন ভাইর বাসায় থাকতাম। দুধ, গুড় দিয়ে গরম ভাত খেতে আমি পছন্দ করি, এটা তিনি জানতেন। আমি উনার বাসায় যাওয়ার আগেই- এগুলো জোগাড় করে রাখতেন। অর্থাৎ দুধ, খেজুরের গুড় আর গরম ভাত ছিলো কম্পলচারি।
একবার উনার বনশ্রীর বাসায় গেলাম দুপুর বেলা। পোলাও, মুরগির মাংস রান্না হয়েছে। আমি পেট ভরে খেয়ে হাত ধুতে যাব- ঠিক তখনই ভেতরের ঘর থেকে একটা সংকেত এলো। আইনুদ্দিন ভাই আমাকে থামিয়ে দিলেন। পর্দার আড়াল থেকে গরম ভাত, দুধের বাটি, আর খেজুরের গুড় এগিয়ে দিলেন ওনার স্ত্রী। এটা নিয়ে আমরা অনেক সময় ধরে হাসাহাসি করেছিলাম। পোলাও খাওয়ার পরে কেউ দুধ ভাত খায়, এটাই ছিলো আমাদের হাসির উপকরণ।
শেষবার যখন আইনুদ্দিন ভাইর সঙ্গে আমার দেখা হয়, তখনও তার বাসায় গিয়েছিলাম। উনার মেয়ে তাবাচ্চুমের বয়স ছিলো মাত্র তিন বছর। আইনুদ্দিন ভাই খুলনায় গেলে অধিকাংশ সময়ে আমাদের বাড়িতে থাকতেন। আমাদের বাড়িতে তার এমন এক্সেস ছিলো যে, আমি না থাকলেও তিনি নির্দ্বিধায় চলে যেতেন, থাকতেন।
এক রাতে আমার ঘরে বসে তার কাছে একটি নাম চেয়েছিলাম- কবিতাভিত্তিক একটা দেয়ালিকার জন্য। তিনি দুইটা নাম বলেছিলেন- ‘স্বরলিপি’ এবং ‘কলরব’। আমি ‘স্বরলিপি’ নামটা বেছে নিয়েছিলাম। তখন আমরা কেউই জানতাম না, ভবিষ্যতে ‘কলরব’ নামে একটা সাংস্কৃতিক সংগঠন তৈরি হবে।
ছাত্র রাজনীতির সুবাদে এক সময় আইনুদ্দিন ভাই ঢাকায় স্থায়ী হন। বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ‘কলরব’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলেন। এ সময়ে তিনি অনেক আর্থিক কষ্টের মধ্যে ছিলেন- পরে জেনেছি। সেই আর্থিক সংকটে তার দুই একজন কাছের মানুষের দায় ছিলো বলেও জেনেছি। অর্থাভাবে আইনুদ্দিন ভাই- ধার-করযো করে প্রকাশিত তার প্রথম গানের অ্যালবামটি বিক্রি করে দেন। কিন্তু সেটি আলোর মুখ দেখে অনেক পরে, যখন তার দ্বিতীয় অ্যালবামটি জনপ্রিয় হয়। (সে এক অন্য ইতিহাস, আরেকদিন বলবো)
আইনুদ্দিন ভাই মারা যাওয়ার পরে আমি ‘কলরব’ এর কোনো খবর রাখিনি। তার পরিবারের সাথেও কখনো যোগাযোগ হয়নি। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে কিছু খোঁজখবর পেতাম।
‘কলরব’ এর আয়-ব্যয়, মালিকানা নিয়ে অনেক বার নানা কথা কানে এসেছে, কিন্তু গুরুত্ব দিইনি। সম্প্রতি আবার বিষয়টা সামনে এসেছে। একাধিক পক্ষ আমার সাথে যোগাযোগ করেছে। যদিও আমার সাথে যোগাযোগের বিশেষ কোনো কারণ আমি খুঁজে পাইনি।
‘কলরব’ কিভাবে চলে, এর মালিকানা কী, আয়-ব্যয় কি, এসব কখনো জানার আগ্রহ আমার হয়নি, এখনও নেই। তবে এটুকু বুঝি- এটা নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ আছে। কিছু অপ্রিয় গল্পও আছে।
কলরবের নির্বাহী পরিচালক উজ্জ্বল জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার খবরটি পাকা হওয়ার পরে- সম্ভবত তার বিপক্ষের লোকজন বিষয়টা ফের সামনে এনেছে। না হয় এতকাল পরে, নির্বাচনের আগে- হঠাৎ কেনো এই প্রসঙ্গটা জনসম্মুখে আসবে? তবে, যদি আইনুদ্দিন ভাইয়ের গানের রয়্যালটিসহ এই সংগঠনের ওপরে তার পরিবারের কোনো হক থেকে থাকে এবং তাদের বঞ্চিত করা হয়, সেটা হবে খুব বড় অন্যায়। সেটা হবে এতিমের হক নষ্ট করার অপরাধ। কলরব নিয়ে আমার মূল আগ্রহ হলো- এটা ই আন্দোলনের সাংস্কৃতিক সংগঠন।
রাজনীতিতে সাংস্কৃতিক বয়ান অত্যন্ত শক্তিশালী। রাজনীতি করতে হলে সাংস্কৃতিক বয়ান তৈরি করতে হয়। সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজন হয়। কালচারাল মিথ বানাতে হয়। ‘কলরব’ এ পর্যন্ত ই আন্দোলনের জন্য কয়টা সাংস্কৃতিক বয়ান তৈরি করতে পেরেছে? জাতীয় সংস্কৃতিতে ‘কলরব’ কতটা অবদান রাখতে পেরেছে? ‘কলরব’ কতটা কালজয়ী গান, কবিতা, প্রতীক বানিয়েছে? দেশের কতো শতাংশ মানুষের কাছে কলরব সাংস্কৃতিকভাবে পৌঁছাতে পেরেছে?
জনসভা, কর্মীসভার স্টেজে গান গাওয়া, অনলাইনে গান প্রচার করে বাণিজ্য করা এবং স্টেজ প্রোগ্রাম করে অর্থ কামাই করা ছাড়া- আর কী করেছে, করছে এই সংগঠনটি? একটি রাজনৈতিক দলের সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে ‘কলরব’ এর মৌলিক অবদান কী?
হোক কলরব, ফুলগুলো সব..
হোক কলরব, ফুলগুলো সব..
পলাশ রহমান, সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক :কলরব নিয়ে আমার খানিকটা আগ্রহ আছে। আগ্রহের মূলত কারণ দুইটা- এক, কলরবের প্রতিষ্ঠাতা আইনুদ্দিন আল আজাদ; দুই, কলরব ই আন্দোলনের সাংস্কৃতিক সংগঠন।আইনুদ্দিন আল আজাদ বয়সে আমার চেয়ে বড় ছিলেন, কিন্তু তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব ছিলো অনেক নিবিড়। তিনি যখন ‘আইনুদ্দিন আল আজাদ’ হয়ে ওঠেননি, দেশের মানুষ তাকে চিনতো না- তখন থেকেই আমাদের বন্ধুত্বের শুরু- সেই নব্বইয়ের দশকে। এক সময় আমি প্রবাসী হই, উনি ঝিনাইদহ থেকে ঢাকায় হিজরত করেন। কিন্তু আমাদের বন্ধুত্বে দুরত্ব আসেনি কখনো।প্রবাস থেকে ঢাকায় গেলে আমি আইনুদ্দিন ভাইর বাসায় থাকতাম। দুধ, গুড় দিয়ে গরম ভাত খেতে আমি পছন্দ করি, এটা তিনি জানতেন। আমি উনার বাসায় যাওয়ার আগেই- এগুলো জোগাড় করে রাখতেন। অর্থাৎ দুধ, খেজুরের গুড় আর গরম ভাত ছিলো কম্পলচারি।একবার উনার বনশ্রীর বাসায় গেলাম দুপুর বেলা। পোলাও, মুরগির মাংস রান্না হয়েছে। আমি পেট ভরে খেয়ে হাত ধুতে যাব- ঠিক তখনই ভেতরের ঘর থেকে একটা সংকেত এলো। আইনুদ্দিন ভাই আমাকে থামিয়ে দিলেন। পর্দার আড়াল থেকে গরম ভাত, দুধের বাটি, আর খেজুরের গুড় এগিয়ে দিলেন ওনার স্ত্রী। এটা নিয়ে আমরা অনেক সময় ধরে হাসাহাসি করেছিলাম। পোলাও খাওয়ার পরে কেউ দুধ ভাত খায়, এটাই ছিলো আমাদের হাসির উপকরণ।শেষবার যখন আইনুদ্দিন ভাইর সঙ্গে আমার দেখা হয়, তখনও তার বাসায় গিয়েছিলাম। উনার মেয়ে তাবাচ্চুমের বয়স
ছিলো মাত্র তিন বছর। আইনুদ্দিন ভাই খুলনায় গেলে অধিকাংশ সময়ে আমাদের বাড়িতে থাকতেন। আমাদের বাড়িতে তার এমন এক্সেস ছিলো যে, আমি না থাকলেও তিনি নির্দ্বিধায় চলে যেতেন, থাকতেন।এক রাতে আমার ঘরে বসে তার কাছে একটি নাম চেয়েছিলাম- কবিতাভিত্তিক একটা দেয়ালিকার জন্য। তিনি দুইটা নাম বলেছিলেন- ‘স্বরলিপি’ এবং ‘কলরব’। আমি ‘স্বরলিপি’ নামটা বেছে নিয়েছিলাম। তখন আমরা কেউই জানতাম না, ভবিষ্যতে ‘কলরব’ নামে একটা সাংস্কৃতিক সংগঠন তৈরি হবে।ছাত্র রাজনীতির সুবাদে এক সময় আইনুদ্দিন ভাই ঢাকায় স্থায়ী হন। বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ‘কলরব’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলেন। এ সময়ে তিনি অনেক আর্থিক কষ্টের মধ্যে ছিলেন- পরে জেনেছি। সেই আর্থিক সংকটে তার দুই একজন কাছের মানুষের দায় ছিলো বলেও জেনেছি। অর্থাভাবে আইনুদ্দিন ভাই- ধার-করযো করে প্রকাশিত তার প্রথম গানের অ্যালবামটি বিক্রি করে দেন। কিন্তু সেটি আলোর মুখ দেখে অনেক পরে, যখন তার দ্বিতীয় অ্যালবামটি জনপ্রিয় হয়। (সে এক অন্য ইতিহাস, আরেকদিন বলবো)আইনুদ্দিন ভাই মারা যাওয়ার পরে আমি ‘কলরব’ এর কোনো খবর রাখিনি। তার পরিবারের সাথেও কখনো যোগাযোগ হয়নি। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে কিছু খোঁজখবর পেতাম।‘কলরব’ এর আয়-ব্যয়, মালিকানা নিয়ে অনেক বার নানা কথা কানে এসেছে, কিন্তু গুরুত্ব দিইনি। সম্প্রতি আবার বিষয়টা সামনে এসেছে। একাধিক পক্ষ আমার সাথে যোগাযোগ করেছে। যদিও আমার সাথে যোগাযোগের বিশেষ কোনো কারণ আমি খুঁজে পাইনি।‘কলরব’ কিভাবে চলে, এর
মালিকানা কী, আয়-ব্যয় কি, এসব কখনো জানার আগ্রহ আমার হয়নি, এখনও নেই। তবে এটুকু বুঝি- এটা নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ আছে। কিছু অপ্রিয় গল্পও আছে। কলরবের নির্বাহী পরিচালক উজ্জ্বল জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার খবরটি পাকা হওয়ার পরে- সম্ভবত তার বিপক্ষের লোকজন বিষয়টা ফের সামনে এনেছে। না হয় এতকাল পরে, নির্বাচনের আগে- হঠাৎ কেনো এই প্রসঙ্গটা জনসম্মুখে আসবে? তবে, যদি আইনুদ্দিন ভাইয়ের গানের রয়্যালটিসহ এই সংগঠনের ওপরে তার পরিবারের কোনো হক থেকে থাকে এবং তাদের বঞ্চিত করা হয়, সেটা হবে খুব বড় অন্যায়। সেটা হবে এতিমের হক নষ্ট করার অপরাধ। কলরব নিয়ে আমার মূল আগ্রহ হলো- এটা ই আন্দোলনের সাংস্কৃতিক সংগঠন।রাজনীতিতে সাংস্কৃতিক বয়ান অত্যন্ত শক্তিশালী। রাজনীতি করতে হলে সাংস্কৃতিক বয়ান তৈরি করতে হয়। সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজন হয়। কালচারাল মিথ বানাতে হয়। ‘কলরব’ এ পর্যন্ত ই আন্দোলনের জন্য কয়টা সাংস্কৃতিক বয়ান তৈরি করতে পেরেছে? জাতীয় সংস্কৃতিতে ‘কলরব’ কতটা অবদান রাখতে পেরেছে? ‘কলরব’ কতটা কালজয়ী গান, কবিতা, প্রতীক বানিয়েছে? দেশের কতো শতাংশ মানুষের কাছে কলরব সাংস্কৃতিকভাবে পৌঁছাতে পেরেছে?জনসভা, কর্মীসভার স্টেজে গান গাওয়া, অনলাইনে গান প্রচার করে বাণিজ্য করা এবং স্টেজ প্রোগ্রাম করে অর্থ কামাই করা ছাড়া- আর কী করেছে, করছে এই সংগঠনটি? একটি রাজনৈতিক দলের সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে ‘কলরব’ এর মৌলিক অবদান কী?
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
১৫২/২, এ-২ গ্রীন রোড, রওশন টাওয়ার (লিফটের-৫),
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ । মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত