বিশ্বরাজনীতির মানচিত্রে মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিরতার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিপুল জ্বালানিসম্পদ ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে অঞ্চলটি বৈশ্বিক কৌশলগত হিসাব-নিকাশের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যখনই যুদ্ধ বা উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, তার প্রভাব শুধু আঞ্চলিক রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা বৈশ্বিক জ্বালানির বাজারেও গভীর প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক সময়েও সেই বাস্তবতা আবার সামনে এসেছে।
ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে- এই লক্ষ্য সামনে রেখে দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ব্যাপক সামরিক হামলা চালায়। এর পর থেকে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এক উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এই উত্তেজনার প্রভাব ইতোমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে, যার প্রভাব আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতির দেশগুলোতে, বিশেষ করে বাংলাদেশে পড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশের জ্বালানিব্যবস্থার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ক্রমবর্ধমান আমদানিনির্ভরতা। একসময় দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উৎস ছিল দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস। কিন্তু গত এক দশকে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার সে অনুপাতে হয়নি। ফলে ঘাটতি পূরণে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশই এলএনজি, ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের মতো আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভর করছে।
বিশ্বের এলএনজি সরবরাহের বড় অংশ আসে কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানের মতো দেশগুলো থেকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই নির্ভরতা স্পষ্ট। ২০২৫ সালে দেশের মোট এলএনজি আমদানির অর্ধেকের বেশি এসেছে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। এসব সরবরাহের বড় অংশ আসে কৌশলগত সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে। ফলে এই প্রণালিতে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে তেল ও গ্যাস পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ছে এবং সরবরাহেও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানি চুক্তি করলেও মোট চাহিদা পূরণের জন্য প্রায়ই স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে এবং দামও দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ ছাড়া স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হতে পারে না। জ্বালানির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত জাতীয় বাজেট ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এই বাস্তবতা বাংলাদেশের জ্বালানিনীতির সীমাবদ্ধতাকেও সামনে এনেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হলেও দেশীয় জ্বালানির উৎস উন্নয়নে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি হয়নি। নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, অফশোর খনন এবং বিকল্প জ্বালানি উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। এ অবস্থায় বাংলাদেশের জন্য একটি টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল গড়ে তোলা জরুরি। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা, বঙ্গোপসাগরের অফশোর ব্লকগুলোতে অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে সৌরশক্তি ও বায়ুশক্তির মতো বিকল্প উৎসে বিনিয়োগ বাড়ালে আমদানিনির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এই বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি এখনই জ্বালানিনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার আনা যায়, তবে ভবিষ্যতের বড় ধরনের জ্বালানি সংকট এড়ানো সম্ভব হবে।
মো. শাহিন আলম : শিক্ষার্থী, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
জ্বালানি বাজার : কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ
জ্বালানি বাজার : কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ
বিশ্বরাজনীতির মানচিত্রে মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিরতার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিপুল জ্বালানিসম্পদ ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে অঞ্চলটি বৈশ্বিক কৌশলগত হিসাব-নিকাশের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যখনই যুদ্ধ বা উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, তার প্রভাব শুধু আঞ্চলিক রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা বৈশ্বিক জ্বালানির বাজারেও গভীর প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক সময়েও সেই বাস্তবতা আবার সামনে এসেছে।ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে- এই লক্ষ্য সামনে রেখে দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ব্যাপক সামরিক হামলা চালায়। এর পর থেকে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এক উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এই উত্তেজনার প্রভাব ইতোমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে, যার প্রভাব আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতির দেশগুলোতে, বিশেষ করে বাংলাদেশে পড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশের জ্বালানিব্যবস্থার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ক্রমবর্ধমান আমদানিনির্ভরতা। একসময় দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উৎস ছিল দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস। কিন্তু গত এক দশকে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার সে অনুপাতে হয়নি। ফলে ঘাটতি পূরণে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর
নির্ভরশীলতা বেড়েছে। বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশই এলএনজি, ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের মতো আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভর করছে।বিশ্বের এলএনজি সরবরাহের বড় অংশ আসে কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানের মতো দেশগুলো থেকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই নির্ভরতা স্পষ্ট। ২০২৫ সালে দেশের মোট এলএনজি আমদানির অর্ধেকের বেশি এসেছে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। এসব সরবরাহের বড় অংশ আসে কৌশলগত সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে। ফলে এই প্রণালিতে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে তেল ও গ্যাস পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ছে এবং সরবরাহেও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানি চুক্তি করলেও মোট চাহিদা পূরণের জন্য প্রায়ই স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে এবং দামও দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান
উৎস, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ ছাড়া স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হতে পারে না। জ্বালানির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত জাতীয় বাজেট ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এই বাস্তবতা বাংলাদেশের জ্বালানিনীতির সীমাবদ্ধতাকেও সামনে এনেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হলেও দেশীয় জ্বালানির উৎস উন্নয়নে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি হয়নি। নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, অফশোর খনন এবং বিকল্প জ্বালানি উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। এ অবস্থায় বাংলাদেশের জন্য একটি টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল গড়ে তোলা জরুরি। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা, বঙ্গোপসাগরের অফশোর ব্লকগুলোতে অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে সৌরশক্তি ও বায়ুশক্তির মতো বিকল্প উৎসে বিনিয়োগ বাড়ালে আমদানিনির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এই বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি এখনই জ্বালানিনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার আনা যায়, তবে ভবিষ্যতের বড় ধরনের জ্বালানি সংকট এড়ানো সম্ভব হবে।মো. শাহিন আলম : শিক্ষার্থী, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
১৫২/২, এ-২ গ্রীন রোড, রওশন টাওয়ার (লিফটের-৫),
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ । মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত