শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত কিছু মানুষ আছে যাদের নাম কোথাও লেখা হয় না

কিছু মানুষ আছে যাদের নাম কোথাও লেখা হয় না

ইতিহাসে থাকে রাজা, সেনাপতি, নেতা, যাদের নাম সোনার অক্ষরে খোদাই করা। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন যাদের নাম কোথাও লেখা হয় না, কিন্তু তারা পৃথিবীকে আলোকিত করেন। তারা আসে নীরবে, চলে যান নীরবেই। তাদের ত্যাগই গড়ে তোলে আমাদের স্বপ্ন, আমাদের মানবতা, আমাদের আগামী।

এক গ্রামে এক বাবা দিনমজুরের কাজ করতেন। খালি পায়ে, ছেঁড়া জামা গায়ে নিয়ে সারাদিন শ্রম করতেন।  নতুন জামার স্বপ্ন তিনি ত্যাগ করেছিলেন, কারণ ছেলের কলেজ ফি দিতে হবে।

ছেলেটা ইঞ্জিনিয়ার হলো। সে দিনের আলোয় উদযাপন করল। কিন্তু বাবা তখন আর নেই। অতিরিক্ত খাটুনির আঘাত, অভাবের চাপ, শরীর ভেঙে পড়েছে বহু আগে।

তিনি ইতিহাসে নেই, ছবিতে নেই, কোনো পদকও নেই, কিন্তু সন্তানের হাসিমুখে, তার সাফল্যের প্রতিটা ছোঁয়ায় তিনি বেঁচে আছেন।
ঢাকার গলিতে ছুটত এক রিকশা। চালক সারাদিন ঘামে ভিজে ঘরে ফিরত, হাতে থাকত সামান্য টাকা। লোকেরা ভাবত ও টাকায় হয়তো সংসার চলে।

কিন্তু মৃত্যুর পর জানা গেল, ও সেই টাকা দিত এতিম শিশুদের পড়াশোনার জন্য। তার ছোট্ট ঘরে পাওয়া গেল ছেঁড়া এক ডায়েরি, পাতায় লেখা, 

"আমি চাই, আমার মতো কোনো শিশু যেন অন্ধকারে হারিয়ে না যায়।"
নিজ সন্তানের মুখে ভাত তুলে দেননি, কিন্তু অগণিত অনাথ শিশুর চোখে আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি নেই, নামটাও জানা নেই, তবুও তাঁর ত্যাগ বেঁচে আছে শিক্ষিত শিশুর হাসিতে।

রাজশাহীর এক মা, স্বামী নেই, সারাদিন ইটভাঙার কাজ করতেন। রাতে তিন বেলা ভাত রান্না হলে প্রথমে সন্তানদের খাওয়াতেন, তারপর নিজে ঠাণ্ডা ভাত আর নুন খেতেন।
একদিন মেয়ে কেঁদে বলল, 
"মা, তুমি তো কিছুই খেল না!"
মা হেসে বললেন, "আমি তো আগে খেয়ে নিয়েছি।"
সত্যটা ছিল ভিন্ন। সারাদিনের শ্রম শেষে তাঁর ভাগে থাকত এক মুঠো ভাত। সন্তানদের জন্য নিজের ক্ষুধা তিনি গোপন করেছিলেন। তিনি বইয়ে নেই, ইতিহাসে নেই, কিন্তু প্রতিটি সন্তানের মুখে তার ত্যাগ বেঁচে আছে।
করোনার ভয়াবহ সময়, এক নার্স টানা চৌদ্দ দিন হাসপাতালে ছিলেন। নিজের পরিবারকে দেখতে পারেননি, শিশুর মুখে চুমু দিতে পারেননি। অসুস্থদের সেবা করতে করতে নিজেই সংক্রমিত হয়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গেলেন।
মৃত্যুর আগে তাঁর ফোনে রেকর্ড করা শেষ কথাগুলো ছিল—
"আমি খুশি, যদি আমার কারণে কয়েকটা জীবন বেঁচে থাকে।"
তিনি পুরস্কার পাননি, সংবর্ধনা পাননি। তিনি চলে গেছেন নিঃশব্দে, কিন্তু তাঁর ত্যাগ এক জাতিকে কাঁদিয়েছে, এক জাতিকে বাঁচিয়েছে।

পাহাড়ি অঞ্চলের এক শিক্ষক প্রতিদিন ৮ কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতেন স্কুলে। ঝড়, বৃষ্টি, রোদ, কোনো কিছুই তাঁকে থামাতে পারেনি। একদিন অসুস্থ হয়ে পড়লেও তিনি শেষবারের মতো ক্লাস নিলেন।
সেই ক্লাসের পর আর ফেরেননি। তাঁর ছাত্ররা আজও বলে, 
"স্যার না থাকলে আমরা হয়তো অক্ষর চিনতাম না।"
তিনি বইয়ে নেই, ইতিহাসে নেই। কিন্তু প্রতিটি অক্ষরে, প্রতিটি শিক্ষিত শিশুর মনে তিনি বেঁচে আছেন।
এক কৃষক সারাজীবন চাষ করেছেন, মানুষের পেট ভরিয়েছেন। দুর্ভিক্ষের দিনে নিজের ঘরের ধান লুকিয়ে প্রতিবেশীর ঘরে পাঠাতেন, যেন কেউ না জানে ।
মৃত্যুর পর গ্রাম কেঁদে উঠল, 
"আমাদের ভরসার মানুষটা চলে গেল!"
কৃষকের নাম কোথাও নেই। কিন্তু তার ঘাম মিশে আছে জমির প্রতিটি শস্যদানায়, মানুষের প্রতিটি অন্নকণায়। তিনি বেঁচে আছেন প্রতিটি পূর্ণ পেটে, প্রতিটি অন্নভোজের আনন্দে।

শেষ কথা হলো: 
এই মানুষগুলো কোনো রাজা বা সেনাপতি নন। তারা কোনো পদক বা সংবর্ধনার পাতায় অমর নন। তবু তারা আলোকবর্তিকা হয়ে প্রতিটি হৃদয়ে বেঁচে আছেন।
হয়তো ইতিহাসে তাদের নাম লেখা হবে না। কিন্তু মহাকালের খাতায়, সৃষ্টিকর্তার অদৃশ্য পাতায়, তাদের নাম অমর হয়ে আছে, নির্জন ত্যাগের আলো হিসেবে।

খুঁজুন