শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত মানুষ বদলায়, এটাই বাস্তব

মানুষ বদলায়, এটাই বাস্তব

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী :

মানুষ ভুল করে, এটাই সত্য। কিন্তু মানুষ বদলায়, এটাই বাস্তব। তবু সমাজ প্রায়ই অতীতের শিকল দিয়ে একজন মানুষকে বেঁধে রাখে।
একজন মানুষ একসময় হয়তো কোনো ভুল করেছে, হয়তো ভুল বন্ধুত্বে গিয়েছিলো, হয়তো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। কিন্তু সেই ভুল দিয়ে তাকে সারাজীবনের জন্য অপরাধী বানিয়ে রাখা কি ন্যায়সঙ্গত ?

অতীত ভুলের জন্য আজও অনেক মানুষকে বিচার করা হয়, আঙুল তোলা হয়। অথচ সেই মানুষ হয়তো সারাজীবন চেষ্টা করছে নতুন পথে হাঁটতে, ভালো হতে। কিন্তু বারবার যখন তাকে তার অতীতের আয়নায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়, তখন তার বর্তমানের শক্তিটুকুও ভেঙে যায়। ধীরে ধীরে সে বিশ্বাস করতে শুরু করে, “আমার পরিবর্তনের কোনো মূল্য নেই।”

কিন্তু মানুষ বদলায়। এটাই মানবজীবনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। যেমন আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন, “যে মানুষ কখনো ভুল করেনি, সে নতুন কিছু করার চেষ্টাই করেনি।”

একজন মাদকাসক্ত হয়েও আবার নতুন জীবন শুরু করতে পারে, একজন অপরাধীও অনুতাপে, তপস্যায়, সমাজসেবায় একদিন সবার শ্রদ্ধার মানুষ হতে পারে,  একজন ব্যর্থ ছাত্রও হয়তো একদিন শিক্ষক হয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পথ দেখাতে পারে।

হযরত উমর (রা.), ইসলামের আগে তিনি প্রবল বিরোধী ছিলেন, কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর ন্যায়পরায়ণ খলিফা হয়ে উঠলেন। হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.), উহুদের যুদ্ধে মুসলিমদের ক্ষতি করেছিলেন, পরে ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতি “সাইফুল্লাহ” হিসেবে খ্যাতি অর্জন করলেন।

সেন্ট অগাস্টিন, তরুণ বয়সে ভোগবিলাসে নিমগ্ন ছিলেন, পরে খ্রিষ্টধর্মের শ্রেষ্ঠ দার্শনিকদের একজন হয়ে ওঠেন। নেলসন ম্যান্ডেলা, ২৭ বছরের কারাবাস পেরিয়ে সহিংসতার পথ থেকে সরে এসে শান্তির প্রতীক হয়ে উঠলেন। আব্রাহাম লিঙ্কন, জীবনের শুরুতে বারবার ব্যর্থ হয়েও শেষ পর্যন্ত আমেরিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রপতি হয়েছেন।

অপরাধ ও অন্ধকার জীবন থেকে উঠে দাঁড়িয়েছেন মালকম এক্স, তার কঠোর সংগ্রাম ও অধ্যবসায় তাকে বিশ্বজুড়ে অধিকার আন্দোলনের নেতারূপে পরিচিত করেছে,  স্টিভ জবস, কোম্পানি থেকে বহিষ্কৃত হলেও ফিরে এসে প্রযুক্তির বিপ্লব ঘটিয়েছেন, মাইক টাইসন, সহিংস অতীত পেরিয়ে এখন শান্তি ও অনুপ্রেরণার বার্তাবাহক।

কলম একবার লিখে ফেললে সহজে মুছে দেওয়া যায় না, এটাই তার সীমাবদ্ধতা। তবু কলম থেমে থাকে না; কালি ফুরোলেই আবার নতুন কালি নিয়ে নতুন অক্ষর আঁকে, নতুন গল্প বুনে চলে। মানুষের জীবনও ঠিক এরকম। হয়তো অতীতের ভুল পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না, কিন্তু মানুষ চাইলে সেই ভুলের মধ্যেই শিক্ষার আলো খুঁজে বের করতে পারে এবং নতুন করে এগিয়ে চলতে পারে। যে মানুষ নিজের ভাঙনকে লুকায় না, নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করে, ভুলকে শিখনের পথ বানিয়ে অগ্রসর হয়, সে-ই প্রকৃত মানুষ, সে-ই মহত্ত্বের পথে যাত্রী।

ইসলামের দর্শনও শেখায়, “পাপ যদি মানুষকে ধ্বংস করত, তবে তওবা তাকে পুনর্জন্ম দেয়।”ইসলাম আমাদের শেখায়, ভুল করা মানুষের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু সেই ভুলের কারণে কাউকে স্থায়ীভাবে দোষারোপ করা উচিত নয়। কুরআনে আল্লাহ বলেন,
“যে ব্যক্তি পাপ করে, তারপর তা তওবা করে এবং সংশোধন করে, আল্লাহ তার ক্ষমা করেন।” (সূরা আজ-জুমার, 39:53)

অর্থাৎ অতীতের ভুল থাকলেও যদি মানুষ তা স্বীকার করে এবং নতুনভাবে ভালো পথে হাঁটে, তাকে বারবার আঘাত করা ঠিক নয়। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)  নিজে অনেক সময় অপরাধী বা ভুলপথে থাকা মানুষদের পুনরায় সঠিক পথে ফেরানোর চেষ্টা করেছেন। হাদিসে এসেছে,

“যে ব্যক্তি অন্যের ভুল দেখায়, কিন্তু তাকে সাহায্য করে না, তার জন্য দায় রয়েছে।”
এই শিক্ষাগুলো আমাদের বলে, অতীতকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা নয়, বরং তা থেকে শিক্ষা নিয়ে সাহায্য করা এবং মানুষকে নতুনভাবে গড়ে তোলাই প্রকৃত দয়া ও ন্যায়। ভুল হলো মানুষ হওয়ার অংশ, কিন্তু পরিবর্তনের প্রচেষ্টা তাকে সত্যিকারের মর্যাদা দেয়। যখন আমরা অন্যের পরিবর্তনকে স্বীকার করি, তাদের জন্য পথ উন্মুক্ত করি, তখনই সমাজে সত্যিকারের ন্যায়, দয়া ও মানবতার জ্বলন্ত আলো ফুটে ওঠে।

অতীতকে শুধুই শাস্তি হিসেবে দেখা উচিত নয়; যেমন কেউ একজন  বলেছেন, “অতীত একটি আয়না, তাতে তাকিয়ে শিক্ষা নিতে হয়; কিন্তু তাতে চিরকাল বন্দি হওয়া নয়।”

তবু আমরা তাদের অতীতকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে, সুযোগ না দিয়ে, শুধু দোষারোপ করি। অথচ 
মানুষ যদি পরিবর্তন না হতো, তবে দুনিয়ার কোনো সংস্কার, কোনো উন্নতি, কোনো ক্ষমা, কিছুই সম্ভব হতো না।
ভুল হলো মানুষ হওয়ার প্রমাণ। আর পরিবর্তন হলো মানুষ থাকার প্রমাণ।
তাই আসুন, 

অতীত নয়, বর্তমানকে দেখি, 
ভুল নয়, পরিবর্তনকে স্বীকার করি, 
কারণ যে মানুষ নিজেকে বদলাতে পারে, সে-ই আসল মানুষ।

খুঁজুন