শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত মনের ভিতরেই অদৃশ্য অক্ষর হয়ে জন্ম নেয়

মনের ভিতরেই অদৃশ্য অক্ষর হয়ে জন্ম নেয়

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী :
 
জীবনে কিছু কিছু সময় আসে যেগুলো আনন্দের জন্ম দেয়, উপলব্ধিরও জন্ম দেয় | পৃথিবীর সবকিছুর মধ্যেই মহান আল্লাহ কোনো না কোনো বার্তা দিয়ে থাকেন, সেই বার্তা কলমের কালিতে লেখা থাকেনা, বরং মনের ভিতরেই অদৃশ্য অক্ষর হয়ে জন্ম নেয় | তখন নিজেকে অনুভব করা যায়, নিজের ভিতরের সেই ফেলে আসা হারানো মানুষটাকে আবার খুঁজে পাওয়া যায় | যে মানুষটা একদিন সবার ছিল, সেই মানুষটা আবার সবার হতে চায় | যে মানুষটাকে সবাই যেভাবে চেয়েছিলো, সেই মানুষটা আবার তেমন একটা মানুষ হতে চায় | হয়তো সময়ের স্রোতের উত্থান-পতনে ঝড় এসেছিলো, সেই ঝড়ে উলোট-পালট হয়েছিল মানুষটা | হয়তো অনেককিছু বলার ছিল, বলা হয়নি কোনোটাই | সব যে বলা যায়না, নিজের সাথে নিজের লড়াইটা যে লড়ে যাওয়াটা পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন হয় | পর্দার বাইরেরটা সবাই দেখে, ভিতরেরটা নিজেকেই দেখতে হয় | আর দেখেন পরম করুনাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ, যিনি বিরাজ করেন মানুষের সর্বত্র | 

অনেকদিন পর শেকড়ের টানে গ্রামের বাড়িতে যাওয়া, অন্যরকম একটা নাড়ির টান, যেমন সন্তানের সাথে মায়ের নাড়ির বন্ধনের মতো | শরীরে লাগছে শীতল হাওয়া, চোখ জুড়ে একটাই রং সবুজ আর সবুজ, মাটিতে পা ফেলতেই মনে হলো এই মাটিতেই একদিন কবর হবে, হয়তো আজ, নয়তো কাল, সময়টা খুব অনিশ্চিত, একমাত্র পরম দয়ালু আল্লাহ জানেন, তিনি যে সর্বজ্ঞানী, সর্বশ্রেষ্ঠ | নিজের মৃত্যুর দিনক্ষণের মতো কতকিছুই অজানা মানুষের, তারপরও জীবনের মোহ, মায়া, লোভের মতো তুচ্ছ বিষয়ে মানুষ সারাটা জীবন কাটিয়ে দেয় | 
 
মানুষের পরীক্ষায় মানুষের দেয়া নম্বরে পাশ-ফেল থাকে, কি এমন মূল্য তার, বিনিময়ে একটা কাগজের সার্টিফিকেট হয়তো মিলে, খুব ভঙ্গুর উইপোকার ঢিবির মতো এগুলো, হালকা আঘাতেই ভেঙে পড়ে | অথচ আল্লাহুর পরীক্ষাই আসল পরীক্ষা, সেই পরীক্ষার জন্য কতটুকুইবা আমরা প্রস্তুতি নিতে পারি, নেওয়ার মতো নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে পারি | এই তো মানুষ আমরা, যে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেটির দিকে খেয়াল নেই, অথচ মিথ্যা মরীচিকার পিছনেই আজীবন পাগলা ঘোড়ার মতোই ছুটছে সবাই | 
 
গ্রামের প্রকৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে, যিনি সৃষ্টি করেছেন এই অনিন্দ্য সুন্দর প্রকৃতি, আমার সৃষ্টিকর্তাও তিনি, সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা তিনি | আর ছোট-বড়, দেখা-অদেখা প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যেই রয়েছে কোনো না কোনো চিন্তা, দর্শন, বৈচিত্র্য ও গভীরতা | সমুদ্রের হয়তো এপার ওপার থাকে, গভীর থেকে গভীরে তলদেশ থাকে, কিন্তু প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যে যে চিন্তাশীল মানুষদের জন্য নিদর্শন থাকে, তার কতটুকুইবা মানুষ বুঝতে পারে, যতই গভীরে ঢুকে মানুষ, ততই গভীরতা তৈরী হয়, গভীরের ভিতরে নতুন নতুন পথ তৈরী হয়, অথচ সে গভীরতাগুলোর কোনো তলদেশ থাকেনা, পথের কোনো শেষ থাকেনা | 
 
গ্রামের মানুষেরা সবুজ ধানক্ষেত্রের আইল ধরে যাচ্ছে আর বলছে আপনার দাদা-বাবার উত্তরাধিকারী হিসেবে এগুলো এখন আপনার | সহজসরল মানুষ উনারা, উনারা উনাদের মতো ভাবছে | আর আমি ভাবছি, আজ থেকে ১০০০ বছর, ৫০০ বছর আগে এটা হয়তো কারো ছিল, সে লোকগুলো এখন অজানা, এরপর কত মানুষের এটা ছিল, আসলে গূঢ় সত্য হলো এই জায়গা-জমি কোনো মানুষের কখনোই ছিলোনা, আমারও নয় | মানুষ আসে, মানুষ চলে যায়, যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, তিনিই তো সারা পৃথিবীর মালিক | আমরা মুসাফির, ক্ষনিকের পৃথিবীর সফর শেষে একদিন তাঁর কাছেই আমাদের প্রত্যাবর্তন করতে হবে | তবে সে দিনটি অনিশ্চিত, হয়তো খুবই কাছে, হয়তো খুবই দূরে, হয়তো সহসাই |
 
জোহরের নামাজ আদায় করে দাদার কবর জিয়ারতে গেলাম, হজ শেষে ১৯৬৮ সালে তিনি আল্লাহর কাছে চলে গেছেন, তখন আমার জন্মই হয়নি, কিন্তু মনে হলো আমার ভিতরে আমি তাকে অনুভব করছি, হয়তো এটাই অদৃশ্য অন্তরের টান, যা শেকড়ের মতোই শক্ত করে আঁকড়ে আছে চারপাশ | মনে হলো, হয়তো আমার কবরও একদিন কেউ জিয়ারতে আসবে, হয়তো বলছি, কারণ সেই ভাগ্য কি আমার আছে, ভাগ্যও যে অনিশ্চিত | পড়ন্ত বেলাশেষে সূর্যটা হেলে পড়েছে পশ্চিমে, তারপরও অপেক্ষা পূর্ব আকাশের সূর্যটার, অন্ধকার রাত, রাত শেষে আলো, আবার আরেকটা দিন..

খুঁজুন