শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত মুজিববাদ ও নতুন বন্দোবস্ত: দ্বন্দ্বে দেশ, দোলায় ভবিষ্যৎ

মুজিববাদ ও নতুন বন্দোবস্ত: দ্বন্দ্বে দেশ, দোলায় ভবিষ্যৎ

মাজহারুল ইসলাম মাসুম, সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক :

৭২ এর মূল সংবিধান নিয়ে একসময় ছিনিমিনি খেলেছিলেন যারা, আজ তাদের অনুভূতি কি? নার্ভের উপর চাপ কেমন দিচ্ছে নয়া বন্দোবস্তের নয়া রাজনৈতিক দলের তরুণরা? ক্ষমতায় থাকতে সুযোগ পেয়েও যারা গদিতে সুপারগ্লু বসাতে মূল সংবিধানকে বিসর্জন দিয়েছিলেন, তাদের এখন আত্মসমালোচনার সময় এসে গেছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ তাদের সকল এলায়েন্স মিলে 'ক্ষমতায় থাকতে আমাদের যত ভুল' নামে বই লেখা শুরু করতে পারেন কিন্তু!


আমাদের তো আর হারানোর কিছু বাকি নেই। আমরা শুধু প্রতিনিয়তই গুনে যাচ্ছি আপনাদের ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সাংবিধানিক দুর্বলতা, সামাজিক বিভাজন, রাষ্ট্রে আস্থাহীনতাসহ নানা সংকটে নিপতিত দেশ। আমাদের বুকে পাথর চাপা দিয়ে এখন দর্শক গ্যালারিতে বসে সম্মিলিত রাজনৈতিক ব্যর্থতার ‘সেলিব্রেশন’ দেখাই কি নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে?

আর নয়া বন্দোবস্ত!? কোথায় গেলো কাঙ্ক্ষিত প্রগতিশীল ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র কাঠামোর বিনির্মাণ? বঙ্গবন্ধুর বাণী আর মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের কথা বলে ‘জুলাই আন্দোলন’ করলেন, যে আন্দোলনে ঝরল তাজা প্রাণ, অনেকে পঙ্গু হয়ে গেলেন, শেখ হাসিনার সরকারের পতনও ঘটলো। সেই অভ্যুত্থান কী সত্যিই রাষ্ট্রকে বদলে দিতে পেরেছে? নাকি বদলে গেল শুধু ক্ষমতার ঠিকানা? আজ দেখছি, পুরনো ভুলগুলোকেই আরও নতুন প্যাকেজে, ভয়াবহ মাত্রায় ফিরিয়ে আনছেন নির্বিকার ভঙ্গিতে, যেন কিছুই হয়নি! সংবিধানকে শক্তিশালী না করে, বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করে, প্রশাসনিক সংস্কারের পরিবর্তে কোন সংস্কারের প্রোগ্রামড এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে এই নব্য বন্দোবস্ত?

মুজিববাদ নিয়ে খোদ আওয়ামী লীগই কখনও আলোচনা করেছে বলে আমার মনে পড়ে না। জুলাই আন্দোলন ও ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে সেই মুজিববাদ মুর্দাবাদ করতে আজ যখন একটি দল সক্রিয়, তখন এটি নিয়ে আলোচনা ও দ্বন্দ্ব মানুষকে ভাবাচ্ছে। আমরা যারা হৃদয়ে বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে ধারণ করে এ পর্যন্ত এসেছি, তাদের কাছে মুজিববাদ কোনো আলাদা তত্ত্ব নয়। বরং আমাদের কাছে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের গড়ে উঠার প্রতিটি সংগ্রাম, স্বপ্ন ও সাফল্যের যেখানে যেখানে বঙ্গবন্ধুর স্পর্শ, চিন্তা, আদর্শ, নেতৃত্ব, অবদান আর আত্মত্যাগ জড়িয়ে আছে তার পুরোটাই মুজিববাদ। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা অর্জনের পর সংবিধান রচনা থেকে রাষ্ট্র নির্মাণ, সর্বত্রই তো মুজিব জড়িয়ে আছেন। আমি মূর্খ, কম জানা মানুষ কোনটাকে মুজিববাদ হতে আলাদা করবো?! আমার কাছে মুজিবকে মুছে ফেলা মানেই তো মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে মুছে ফেলার অপচেষ্টার সামিল। যারা মুজিববাদ মুছে ফেলতে চায়, তাদের আগে মানচিত্র থেকে বাংলাদেশ মুছে ফেলতে হবে। সেটা কি সম্ভব? 


এই আপনারাই তো এতোকাল বলে এসেছেন, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু শুধু আওয়ামী লীগের একার সম্পত্তি নয়। শেখ হাসিনার সরকার বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধকে কুক্ষিগত করেছে। অথচ ৫ আগস্টের পর আপনারাই আবার সেই মুক্তিযুদ্ধ আর বঙ্গবন্ধুকে ঠেলে ধাক্কিয়ে শেখ হাসিনার দলকেই ফিরিয়ে দিলেন! আজ যখন সংবিধান আর মুজিব আদর্শের ব্যাখ্যা ঘিরে নতুন এক রাজনৈতিক উপাখ্যান রচনার অপচেষ্টা হচ্ছে, তখন আপনাদের দ্বিচারিতাই স্পষ্ট হয়!


আপনারা অনিয়ম, দুর্নীতি ও মানবাধিকার লংঘণের দেশ থেকে সোজা মব সহিংসতার বাস্তবতায় অবতরণ করিয়েছেন জাতিকে। অথচ চাইলেই অনেক ভালো কিছু করতে পারতেন! ৫ আগস্টের পর নোবেলজয়ী ড. ইউনূসের নেতৃত্বে আপনারা সেই সুযোগটা পেয়েছেনও। সেটা শেখ হাসিনার সরকারের দমননীতি ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যর্থতা কিংবা মেটিকুলাস ডিজাইন যে কারণেই হোক! গত ৯ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ফেসবুকে পোস্ট লেখার স্বাধীনতা ছাড়া উল্লেখ করার মতো ইতিবাচক কোন পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়নি। আর আমাদের বিদ্রোহী, প্রতিবাদী টাইপের পোস্টগুলো কিন্তু দিনশেষে বিদেশিদের কাছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হিসেবে দেখাতে আপনাদেরই দারুণভাবে উপকৃত করছে। বাকি সব বিগতদের যোগ্য উত্তরসূরির মতোই চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিহিংসার রাজনীতিকে ইতিমধ্যেই নয়া মাত্রায় নিয়ে গেছেন! আপনারা দারুণ সফলতার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ ও জুলাই আন্দোলনের বাংলাদেশকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন! নয়া বন্দোবস্তে প্রতিহিংসার রাজনীতিসহ আগের সব ব্যাড প্র্যাক্টিস বহাল রেখে নিজেরা মহানন্দে ক্ষমতা উপভোগে ব্যস্ত আছেন!


আপনারা স্মার্ট জেনারেশনকে যে খেলার জন্যই চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখান না কেনো, সত্য তো দিবালোকের মতো স্পষ্ট। দুঃখজনকভাবে হারিয়ে যাচ্ছে আজকের তরুণ প্রজন্মের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। কোটা আন্দোলন ও পরবর্তী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের চিন্তাশীল ও মেধাবী তরুণদের জড়িয়ে ফেলা হয়েছে ‘জুলাই কোটা ও রাজনীতি’র জটিল ফাঁদে। তারা একেকজন হয়ে উঠেছে প্রোগ্রামড ‘মেটা হিউম্যান’, যারা পুঁতে দেয়া আক্রোশ মনে নিয়ে  মুক্তিযোদ্ধা আর রাজাকার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে প্রবলভাবে! অথচ একটি জাতির আশা ও ভরসা তরুণরাই। 

বিগত সরকার পতনের এক বছর হতে চলেছে। এ সময়ে প্রশ্ন তো এসেই যায়, এতোদিন ধরে মব সহিংসতা জিইয়ে রেখে বিশ্বের চোখে এদেশের তরুণদের সহিংসতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে তুলে ধরা হলো কেনো? এর নেতিবাচক প্রভাব কি বৈদেশিক কর্মসংস্থান, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উচ্চশিক্ষা ও অভিবাসনের ওপর পড়বে না? অলরেডি বিভিন্ন দেশের ভিসা রিজেকশন শুরু হয়ে গেছে তা তো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই উঠে আসছে। সন্তানদের ভবিষ্যতের চিত্র আঁচ করে আতঙ্কিত আজ এদেশের প্রতিটি অভিভাবক। অথচ একটু দেশপ্রেম ও  সদিচ্ছাই, এই তরুণদের  ব্যবহার করে অনায়াসেই একটি দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তুলে ৫৪ বছরের ব্যর্থতাকে নতুনভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারতো। 

বাংলাদেশ আজ গভীর ও জটিল সংকটে। উত্তরণের উপায় হচ্ছে, ৫৪ বছরের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রতিহিংসা ও সংকীর্ণতার রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসা। এখনও সময় আছে। সব পক্ষ মিলে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের পথে হাঁটুন। একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক, অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রের স্বপ্নে ফিরুন। জুলাই হত্যার বিচার প্রক্রিয়া ও সংস্কার চলুক। পাশাপাশি দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তুতি এগিয়ে যাক। এই পথেই দেশ ও মানুষের কল্যাণ নিহিত।

খুঁজুন