মুক্তিযুদ্ধে আপনি হয়তো পরিবারের কোন সদস্যকেই হারাননি। আর তাই মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা ৩ হাজার নাকি ৩০ লাখ তা নিয়ে তর্ক করতে আসেন।
কিন্তু ছবির এই মানুষটা কিন্তু সেই তর্কে যাননা।
কারন মুক্তিযুদ্ধে তিনি একাই হারিয়েছেন ২৭ জন স্বজনকে। তাও আবার একরাতেই। যার মধ্যে রয়েছেন তাঁর বাবা, মা, পাঁচ ভাই বোন, নানী, দুই মামা, মামী, খালা এবং ফুফা। ফেনীর ফুলগাজীর জামুড়া গ্রামে গেলে আজো দেখা পাবেন শহীদ স্বজন এই করিমুল হকের।
.
মুক্তিযুদ্ধের এক বছর পর পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির একটি সামরিক হাসপাতালে এক তরুণ পাকিস্তানি অফিসারকে আনা হয়েছিলো মানসিক চিকিৎসার জন্য।
.
সেই তরুণ অফিসার যুদ্ধ শেষে পাকিস্তান ফিরে যাওয়ার পর গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। যুদ্ধের কথা মনে হলেই তার পুরো শরীরে খিঁচুনি দিয়ে জ্বর উঠত। ঘুমাতে গেলেই দুঃস্বপ্নে ভেঙে যেত ঘুম। কেউ যেন তাকে বলত, ফিরে যেতে হবে বাংলাদেশে। সেখানে থাকা হিন্দুদের মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। নয়তো তার মুক্তি নেই।’
.
মূলত দিনের পর দিন ওই অফিসারের নির্দেশে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানি সেনারা। পুরো মুক্তিযুদ্ধে তিনি কতো মানুষকে হত্যা করেছিলেন জানেন? একশো কিংবা পাঁচশো নয়।
.
এই লোকটি একাই হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন ১৪ হাজারের বেশী নিরীহ মানুষকে। পরে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।
.
পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী গওহর আইয়ুবের লেখা 'গ্লিমপসেস ইনটু দ্য করিডর অফ পাওয়ার' বইয়ে এই বর্ণনাটি রয়েছে। গওহর আইয়ুব তার বাবা পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের ব্যক্তিগত ডায়েরি থেকে এই তথ্যটি সংগ্রহ করেছিলেন। চাইলে চেক করে নিতে পারেন।
.
মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী বাহিনীতে এমন অনেক কিলিং স্কোয়াড ছিলো। যাদের একমাত্র কাজই ছিলো মানুষ হত্যা করা।
.
মুক্তিযুদ্ধের ২০মে মাত্র এক প্লাটুন পাকিস্তানি সেনা ৪ ঘণ্টায় ব্রাশফায়ার করে হত্যা করেছিল অন্তত ১২ হাজার নিরীহ মানুষকে। ঘটনাটি ঘটেছিলো খুলনার ডুমুরিয়ার চুকনগরে।
আসলে এই গণহত্যায় এরচেয়েও বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন। চুকনগরের পাশে ভদ্রা নদীর পানিতে লাশ ভাসিয়ে দেওয়ায় নিহতের প্রকৃত সংখ্যা পাওয়া যায়নি। স্থানীয়ভাবেও সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। কারণ ওই গণহত্যায় শহীদদের বেশিরভাগ চুকনগর, ডুমুরিয়া বা খুলনার বাসিন্দা ছিলেন না।
.
মুক্তিযুদ্ধে আপনার শহরে হয়তো কোন বধ্যভূমি ছিলোনা। কিন্তু এক চট্টগ্রাম শহরেই বধ্যভূমির সংখ্যা ছিল ১১৬টি।
.
যার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহতম বধ্যভূমি ছিল দামপাড়া বধ্যভূমি। বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরীর গরিবুল্লাহ শাহর মাজার যেখানে, সেখানেই ছিল দামপাড়া বধ্যভূমি। প্রতিদিন রাতে বেশ কয়েকটি ট্রাক ভর্তি করে মানুষ ধরে আনা হতো সেখানে। এরপর তাদের দিয়ে গর্ত খনন করিয়ে তাদেরকেই গুলি করে হত্যা করে মাটিচাপা দিতো পাকিস্তানি বাহিনী।
.
প্রতিটি গর্ত যখন পূর্ণ হয়ে যেত, তখন খুলি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হতো। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে এই বধ্যভূমিতে প্রায় ৪০ হাজারের মতো মানুষকে হত্যা করেছিলো পাকিস্তানি সেনারা।
.
মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের অন্যতম বড় বধ্যভূমি ছিলো পাহাড়তলী বধ্যভূমি। এই বধ্যভূমিতে পাওয়া যায় প্রায় ১০০ গর্ত। এরমধ্যে একটি গর্তেই পাওয়া যায় ১ হাজার ৮২টি খুলি। বাকি গর্তগুলোর হিসেব আপনিই করুন।
.
মুক্তিযুদ্ধে ৩০ মার্চ আর পরবর্তী কয়েকদিনে চট্টগ্রামের লালখান বাজারে পাকিস্তানি বাহিনী ও বিহারীরা একত্রিত হয়ে হত্যা করে প্রায় আড়াই হাজার বাঙালিকে। ৩০ মার্চ পানি সরবরাহের আশ্বাসে ওয়াসার মোড়ে গণহত্যা চালানো হয়।
.
যারা বলেন ২৫ মার্চের কালরাত্রির পরে ঢাকায় কোন গণহত্যা হয়নি তারা জানেন কি কেবল ঢাকার একটি ব্রিজেই সমগ্র মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ১৫ হাজারেরও বেশী বাঙালিকে হত্যা করেছিলো পাকিস্তানী বাহিনী।
.
কয়েক বছর আগেও বর্তমান গাবতলী ব্রিজের পাশে যে পুরনো ষ্টীল ব্রিজটি ছিল। হয়তো দেখেছেন ও। সেটাই ছিল সেই ভয়ঙ্কর মৃত্যুকূপ। গাবতলীর সেই গণহত্যার উপর যখন কাজ করতে গেলাম তখন দেখতে পেয়েছিলাম এর ভয়াবহতা। তখনকার সময়ের এক প্রত্যক্ষদর্শী মাঝি বলেছিল,. 'প্রতিদিন রাইতে মিলিটারি আর বিহারীরা শহরের বিভিন্ন জায়গার থেইকা ট্রাক ভইরা ব্রিজে মানুষ আনতো। রাত বারোটা পার হইতেই ব্রিজের দু’পাশের বাতি নিভাইয়া শুরু হতো গুলি। একটার পর একটা লাশ পড়তো নদীতে। পুরো যুদ্ধের কালে এমন কোন রাইত দেখি নাই যে রাইতে মিলিটারি এই ব্রিজে মানুষ মারে নাই।’
.
সমগ্র মুক্তিযুদ্ধকালে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার শীতলক্ষ্যা পাড়ের হরিহরপাড়া গ্রামে যে গণহত্যাগুলো হয়েছিলো সেই গণহত্যায় শহীদের আনুমানিক সংখ্যা ২০ হাজার। ১৯৭২ সালের বিশ্বখ্যাত পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্টেরই রিপোর্ট এটা। ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক লুইস এম সাইমনস ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি ঐ গ্রমে গিয়েছিলেন।
.
২৫ মার্চ রাতের এক সপ্তাহ পরেই ঢাকার জিঞ্জিরায় পাকিস্তানি গণহত্যায় শহীদ হয়েছিলেন ২ হাজারেরও বেশি নিরীহ মানুষ।
.
মুক্তিযুদ্ধের সময় মিরপুর যেন জলজ্যান্ত এক কসাইখানা ছিল। এক মিরপুরেই বধ্যভূমি ছিল ২৩টি। এরমধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি। একাত্তরে এই জায়গার একপাশে ছিল জঙ্গল। এই জঙ্গলে হাজার হাজার মানুষকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। বর্তমানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা ভবন থেকে কমার্স কলেজ যেতে যে কালভার্টটি পড়ে, সেখানে স্বাধীনতার পরে পাওয়া গিয়েছিল ৬০ বস্তা মাথার খুলি।
.
মিরপুরের বধ্যভূমিগুলোর মধ্যে অন্যতম শিরনিরটেক। মুক্তিযুদ্ধের সময় সেখানে ৩ হাজার মানুষকে হত্যা করেছিল রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনারা।
.
মুক্তিযুদ্ধের ২৪ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে ২৫ এপ্রিল দুপুর ১টা পর্যন্ত মিরপুরের আলোকদী গ্রামে পাকিস্তানিরা যে গণহত্যা চালিয়েছিল সেই গণহত্যায় শহীদ হয়েছিলেন প্রায় ৩ হাজার মানুষ। এই গ্রামের মোট ৮টি কুয়া ভরে গিয়েছিলো মানুষের লাশে।
.
১৯৭২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ অবজারভার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দিনাজপুর টিঅ্যান্ডটি অফিসের একটি টর্চার সেলের বিবরণ পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে লেখা ছিল, 'দিনাজপুরে টিঅ্যান্ডটি অফিসে একটি টর্চার সেলে প্রায় ১০ হাজার বাঙালিকে নির্যাতন করেছিল পাকিস্তানি সেনারা। সেলের মেঝেতে ৩ ইঞ্চি পুরু রক্ত জমাট বাঁধা ছিল।'
.
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সারা দেশের খেয়াঘাট, ফেরীঘাট, রেলওয়ে স্টেশনগুলো হয়ে উঠেছিলো একেকটি ভয়ঙ্কর বধ্যভূমি।
লাকসাম স্টেশনের পাশে সিগারেট ফ্যাক্টরি চিনেন তো? এটি স্থানীয়ভাবে বেলতলী নামে পরিচিত। হয়তো আপনি জীবনে নামও শুনেননি। এই বধ্যভূমিতেই সমগ্র মুক্তিযুদ্ধকালে ১০ হাজারেরও বেশী মানুষকে হত্যা করেছিল পাকিস্তানী বাহিনী ও রাজাকারেরা।
বেলতলী বধ্যভূমি নিয়ে ১৯৭২ সালেই দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার প্রতিনিধি লিখেছেন, লাকসাম জংশনে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ পশ্চিম দিকে দৃষ্টি মেলে ধরলে দেয়াল ঘেরা সুবিশাল এলাকাজুড়ে কালো রঙ মাখা যে প্রাসাদটি দেখা যাবে সেটা একটা সিগারেটের ফ্যাক্টরি। কিন্তু তার নামকরন যাই থাকুক না কেন লাকসামবাসীরা এটাকে হত্যাপুরী নামেই চিনে। বিগত নয়টি মাসে এই ফ্যাক্টরির বিভিন্ন কোণায়, বিভিন্ন কক্ষে ও কোঠায় বিভিন্ন সেলে এবং ছাদে যে অত্যাচার, নারী ধর্ষণ ও নির্বিচারে গণহত্যা চলেছিল তার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।'
.
এক খুলনা শহরের গল্লামারী বধ্যভূমিতেই ২৫ হাজারেরও বেশী মানুষকে হত্যা করেছিল পাকিস্তানী বাহিনী।
.
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সারাদেশে কতো বধ্যভূমি ছিল তার প্রকৃত সংখ্যা জানা নেই কারো। তবে মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যা নিয়ে গবেষণা করা ‘১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর এখন পর্যন্ত দেশের ৪০টি জেলায় গণহত্যার যে চিত্র তুলে এনেছে তাতে দেখা গেছে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে এই ৪০টি জেলায় ১৭৪৫৪টি গণহত্যা সংগঠিত হয়েছ।
.
৪০টি জেলায় যদি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ১৭৪৫৪টি গণহত্যা সংঘটিত হয় তবে ৬৪ জেলায় কতো গণহত্যা হয়েছে তা একটাবার হিসেব করে নিবেন। আর নিশ্চয়ই জানেন তো একটি গণহত্যা মানে কেবল ওখানে একজন হত্যার শিকার হয়েছেন এমন নয়।
.
আর হ্যাঁ এই ৪০টি জেলায় মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানিদের টর্চার সেলের সংখ্যা ছিল ১১১৮টি।
.
মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যা ছিলো পৃথিবীর ইতিহাসে বিরলতম এক উদাহরণ যেখানে সমগ্র দেশে নয়টি মাসই ফুল স্কেলে গণহত্যা চালিয়েছিলো পাকিস্তানী হায়েনা ও তাদের এদেশীয় দোসরেরা।
একাত্তরের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বখ্যাত ম্যাগাজিন নিউজ উইক প্রকাশ করেছিল পূর্ব পাকিস্তানে চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।
.
মুক্তিযুদ্ধের ১ অক্টোবর লন্ডন থেকে প্রকাশিত 'দ্য হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেট এক্সপ্রেস; প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয় পূর্ব বাংলার যুদ্ধে মৃতের সংখ্যা আনুমানিক ২০ লাখ।
তাহলে ৩০ লাখের সংখ্যাটি কোথা থেকে এলো। এটা কি শুধুই শেখ মুজিবের তিন লাখকে তিন মিলিয়ন মনে করে ভুল করে বলা? নাহ!
.
মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের তিন সপ্তাহ পরে ১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারিতে প্রকাশিত সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপাত্র প্রাভাদা পত্রিকায় প্রকাশিত ‘পূর্ব পাকিস্তানের উপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মমতা গোপন করা সম্ভব হয়নি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিলো ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে চলমান গণহত্যায় প্রায় ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাংলাদেশে এসেছে তারও এক সপ্তাহ পরে অর্থাৎ ১৯৭২'র ১০ জানুয়ারিতে।
.
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ভারতের শরণার্থী শিবিরে কলেরায় অন্তত ৫ লাখ শরণার্থী মৃত্যুবরণ করেছেন। এই সংখ্যাটি ৩০ লাখের বাইরে রাখা হয়েছে। অথচ এরাও কিন্তু স্রেফ প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হয়ে দেশ ত্যাগ করে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল। কোন সময়েই এদের শহীদের স্বীকৃতি দেয়া হয়নি।
মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যায় কতো শহীদ হয়েছেন তা কখনোই নির্ণয় করা সম্ভব হবেনা। গণহত্যায় কতো সংখ্যক শহীদ হয় তা কখনো নির্ণয় করা সম্ভব ও না। যা করা যায় তা হলো গবেষণার মাধ্যমে অনুমান। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কম বলে স্বর্গসুখ লাভ করতে চান, তাদের জন্য মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যার জন্য এটি কেবল একটিমাত্র পরিসংখ্যান।
প্রকৌশলী মহিদুল ইসলাম মিশন :মুক্তিযুদ্ধে আপনি হয়তো পরিবারের কোন সদস্যকেই হারাননি। আর তাই মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা ৩ হাজার নাকি ৩০ লাখ তা নিয়ে তর্ক করতে আসেন।কিন্তু ছবির এই মানুষটা কিন্তু সেই তর্কে যাননা। কারন মুক্তিযুদ্ধে তিনি একাই হারিয়েছেন ২৭ জন স্বজনকে। তাও আবার একরাতেই। যার মধ্যে রয়েছেন তাঁর বাবা, মা, পাঁচ ভাই বোন, নানী, দুই মামা, মামী, খালা এবং ফুফা। ফেনীর ফুলগাজীর জামুড়া গ্রামে গেলে আজো দেখা পাবেন শহীদ স্বজন এই করিমুল হকের।.মুক্তিযুদ্ধের এক বছর পর পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির একটি সামরিক হাসপাতালে এক তরুণ পাকিস্তানি অফিসারকে আনা হয়েছিলো মানসিক চিকিৎসার জন্য। .সেই তরুণ অফিসার যুদ্ধ শেষে পাকিস্তান ফিরে যাওয়ার পর গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। যুদ্ধের কথা মনে হলেই তার পুরো শরীরে খিঁচুনি দিয়ে জ্বর উঠত। ঘুমাতে গেলেই দুঃস্বপ্নে ভেঙে যেত ঘুম। কেউ যেন তাকে বলত, ফিরে যেতে হবে বাংলাদেশে। সেখানে থাকা হিন্দুদের মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। নয়তো তার মুক্তি নেই।’.মূলত দিনের পর দিন ওই অফিসারের নির্দেশে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানি সেনারা। পুরো মুক্তিযুদ্ধে তিনি কতো মানুষকে হত্যা করেছিলেন জানেন? একশো কিংবা পাঁচশো নয়। .এই লোকটি একাই হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন ১৪ হাজারের বেশী নিরীহ মানুষকে। পরে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। . পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী গওহর আইয়ুবের লেখা 'গ্লিমপসেস ইনটু দ্য করিডর অফ পাওয়ার' বইয়ে এই বর্ণনাটি রয়েছে। গওহর আইয়ুব তার বাবা পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের ব্যক্তিগত ডায়েরি থেকে এই তথ্যটি সংগ্রহ করেছিলেন। চাইলে চেক করে নিতে পারেন।. মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী বাহিনীতে এমন অনেক কিলিং স্কোয়াড ছিলো। যাদের একমাত্র কাজই ছিলো মানুষ হত্যা করা। . মুক্তিযুদ্ধের ২০মে মাত্র এক প্লাটুন পাকিস্তানি সেনা ৪ ঘণ্টায় ব্রাশফায়ার করে হত্যা করেছিল অন্তত ১২ হাজার নিরীহ মানুষকে। ঘটনাটি ঘটেছিলো খুলনার ডুমুরিয়ার চুকনগরে। আসলে এই গণহত্যায় এরচেয়েও বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন। চুকনগরের পাশে ভদ্রা নদীর পানিতে লাশ ভাসিয়ে দেওয়ায় নিহতের প্রকৃত সংখ্যা পাওয়া যায়নি। স্থানীয়ভাবেও সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। কারণ ওই গণহত্যায় শহীদদের বেশিরভাগ চুকনগর, ডুমুরিয়া বা খুলনার বাসিন্দা ছিলেন না।.মুক্তিযুদ্ধে আপনার শহরে হয়তো কোন বধ্যভূমি ছিলোনা। কিন্তু এক চট্টগ্রাম শহরেই বধ্যভূমির সংখ্যা ছিল ১১৬টি।. যার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহতম বধ্যভূমি ছিল দামপাড়া বধ্যভূমি। বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরীর গরিবুল্লাহ শাহর মাজার যেখানে, সেখানেই ছিল দামপাড়া বধ্যভূমি। প্রতিদিন রাতে বেশ কয়েকটি ট্রাক ভর্তি করে মানুষ ধরে আনা হতো সেখানে। এরপর তাদের দিয়ে গর্ত খনন করিয়ে তাদেরকেই গুলি করে হত্যা করে মাটিচাপা দিতো পাকিস্তানি বাহিনী। .প্রতিটি গর্ত যখন পূর্ণ হয়ে যেত, তখন খুলি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হতো। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে এই বধ্যভূমিতে প্রায় ৪০ হাজারের মতো মানুষকে হত্যা করেছিলো পাকিস্তানি সেনারা।.মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের অন্যতম বড় বধ্যভূমি ছিলো পাহাড়তলী বধ্যভূমি। এই বধ্যভূমিতে পাওয়া যায় প্রায় ১০০ গর্ত। এরমধ্যে একটি গর্তেই পাওয়া যায় ১ হাজার ৮২টি খুলি। বাকি গর্তগুলোর হিসেব আপনিই করুন। .মুক্তিযুদ্ধে ৩০ মার্চ আর পরবর্তী কয়েকদিনে
চট্টগ্রামের লালখান বাজারে পাকিস্তানি বাহিনী ও বিহারীরা একত্রিত হয়ে হত্যা করে প্রায় আড়াই হাজার বাঙালিকে। ৩০ মার্চ পানি সরবরাহের আশ্বাসে ওয়াসার মোড়ে গণহত্যা চালানো হয়। .যারা বলেন ২৫ মার্চের কালরাত্রির পরে ঢাকায় কোন গণহত্যা হয়নি তারা জানেন কি কেবল ঢাকার একটি ব্রিজেই সমগ্র মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ১৫ হাজারেরও বেশী বাঙালিকে হত্যা করেছিলো পাকিস্তানী বাহিনী।.কয়েক বছর আগেও বর্তমান গাবতলী ব্রিজের পাশে যে পুরনো ষ্টীল ব্রিজটি ছিল। হয়তো দেখেছেন ও। সেটাই ছিল সেই ভয়ঙ্কর মৃত্যুকূপ। গাবতলীর সেই গণহত্যার উপর যখন কাজ করতে গেলাম তখন দেখতে পেয়েছিলাম এর ভয়াবহতা। তখনকার সময়ের এক প্রত্যক্ষদর্শী মাঝি বলেছিল,. 'প্রতিদিন রাইতে মিলিটারি আর বিহারীরা শহরের বিভিন্ন জায়গার থেইকা ট্রাক ভইরা ব্রিজে মানুষ আনতো। রাত বারোটা পার হইতেই ব্রিজের দু’পাশের বাতি নিভাইয়া শুরু হতো গুলি। একটার পর একটা লাশ পড়তো নদীতে। পুরো যুদ্ধের কালে এমন কোন রাইত দেখি নাই যে রাইতে মিলিটারি এই ব্রিজে মানুষ মারে নাই।’ .সমগ্র মুক্তিযুদ্ধকালে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার শীতলক্ষ্যা পাড়ের হরিহরপাড়া গ্রামে যে গণহত্যাগুলো হয়েছিলো সেই গণহত্যায় শহীদের আনুমানিক সংখ্যা ২০ হাজার। ১৯৭২ সালের বিশ্বখ্যাত পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্টেরই রিপোর্ট এটা। ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক লুইস এম সাইমনস ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি ঐ গ্রমে গিয়েছিলেন। .২৫ মার্চ রাতের এক সপ্তাহ পরেই ঢাকার জিঞ্জিরায় পাকিস্তানি গণহত্যায় শহীদ হয়েছিলেন ২ হাজারেরও বেশি নিরীহ মানুষ।.মুক্তিযুদ্ধের সময় মিরপুর যেন জলজ্যান্ত এক কসাইখানা ছিল। এক মিরপুরেই বধ্যভূমি ছিল ২৩টি। এরমধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি। একাত্তরে এই জায়গার একপাশে ছিল জঙ্গল। এই জঙ্গলে হাজার হাজার মানুষকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। বর্তমানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা ভবন থেকে কমার্স কলেজ যেতে যে কালভার্টটি পড়ে, সেখানে স্বাধীনতার পরে পাওয়া গিয়েছিল ৬০ বস্তা মাথার খুলি। .মিরপুরের বধ্যভূমিগুলোর মধ্যে অন্যতম শিরনিরটেক। মুক্তিযুদ্ধের সময় সেখানে ৩ হাজার মানুষকে হত্যা করেছিল রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনারা।.মুক্তিযুদ্ধের ২৪ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে ২৫ এপ্রিল দুপুর ১টা পর্যন্ত মিরপুরের আলোকদী গ্রামে পাকিস্তানিরা যে গণহত্যা চালিয়েছিল সেই গণহত্যায় শহীদ হয়েছিলেন প্রায় ৩ হাজার মানুষ। এই গ্রামের মোট ৮টি কুয়া ভরে গিয়েছিলো মানুষের লাশে। .১৯৭২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ অবজারভার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দিনাজপুর টিঅ্যান্ডটি অফিসের একটি টর্চার সেলের বিবরণ পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে লেখা ছিল, 'দিনাজপুরে টিঅ্যান্ডটি অফিসে একটি টর্চার সেলে প্রায় ১০ হাজার বাঙালিকে নির্যাতন করেছিল পাকিস্তানি সেনারা। সেলের মেঝেতে ৩ ইঞ্চি পুরু রক্ত জমাট বাঁধা ছিল।' .মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সারা দেশের খেয়াঘাট, ফেরীঘাট, রেলওয়ে স্টেশনগুলো হয়ে উঠেছিলো একেকটি ভয়ঙ্কর বধ্যভূমি। লাকসাম স্টেশনের পাশে সিগারেট ফ্যাক্টরি চিনেন তো? এটি স্থানীয়ভাবে বেলতলী নামে পরিচিত। হয়তো আপনি জীবনে নামও শুনেননি। এই বধ্যভূমিতেই সমগ্র মুক্তিযুদ্ধকালে ১০ হাজারেরও বেশী মানুষকে হত্যা করেছিল পাকিস্তানী বাহিনী ও রাজাকারেরা। বেলতলী বধ্যভূমি নিয়ে ১৯৭২ সালেই দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার প্রতিনিধি লিখেছেন, লাকসাম জংশনে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ পশ্চিম দিকে দৃষ্টি মেলে ধরলে দেয়াল ঘেরা সুবিশাল এলাকাজুড়ে কালো রঙ মাখা
যে প্রাসাদটি দেখা যাবে সেটা একটা সিগারেটের ফ্যাক্টরি। কিন্তু তার নামকরন যাই থাকুক না কেন লাকসামবাসীরা এটাকে হত্যাপুরী নামেই চিনে। বিগত নয়টি মাসে এই ফ্যাক্টরির বিভিন্ন কোণায়, বিভিন্ন কক্ষে ও কোঠায় বিভিন্ন সেলে এবং ছাদে যে অত্যাচার, নারী ধর্ষণ ও নির্বিচারে গণহত্যা চলেছিল তার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।' .এক খুলনা শহরের গল্লামারী বধ্যভূমিতেই ২৫ হাজারেরও বেশী মানুষকে হত্যা করেছিল পাকিস্তানী বাহিনী। . মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সারাদেশে কতো বধ্যভূমি ছিল তার প্রকৃত সংখ্যা জানা নেই কারো। তবে মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যা নিয়ে গবেষণা করা ‘১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর এখন পর্যন্ত দেশের ৪০টি জেলায় গণহত্যার যে চিত্র তুলে এনেছে তাতে দেখা গেছে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে এই ৪০টি জেলায় ১৭৪৫৪টি গণহত্যা সংগঠিত হয়েছ।.৪০টি জেলায় যদি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ১৭৪৫৪টি গণহত্যা সংঘটিত হয় তবে ৬৪ জেলায় কতো গণহত্যা হয়েছে তা একটাবার হিসেব করে নিবেন। আর নিশ্চয়ই জানেন তো একটি গণহত্যা মানে কেবল ওখানে একজন হত্যার শিকার হয়েছেন এমন নয়। .আর হ্যাঁ এই ৪০টি জেলায় মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানিদের টর্চার সেলের সংখ্যা ছিল ১১১৮টি।.মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যা ছিলো পৃথিবীর ইতিহাসে বিরলতম এক উদাহরণ যেখানে সমগ্র দেশে নয়টি মাসই ফুল স্কেলে গণহত্যা চালিয়েছিলো পাকিস্তানী হায়েনা ও তাদের এদেশীয় দোসরেরা।একাত্তরের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বখ্যাত ম্যাগাজিন নিউজ উইক প্রকাশ করেছিল পূর্ব পাকিস্তানে চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। .মুক্তিযুদ্ধের ১ অক্টোবর লন্ডন থেকে প্রকাশিত 'দ্য হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেট এক্সপ্রেস; প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয় পূর্ব বাংলার যুদ্ধে মৃতের সংখ্যা আনুমানিক ২০ লাখ। তাহলে ৩০ লাখের সংখ্যাটি কোথা থেকে এলো। এটা কি শুধুই শেখ মুজিবের তিন লাখকে তিন মিলিয়ন মনে করে ভুল করে বলা? নাহ!.মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের তিন সপ্তাহ পরে ১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারিতে প্রকাশিত সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপাত্র প্রাভাদা পত্রিকায় প্রকাশিত ‘পূর্ব পাকিস্তানের উপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মমতা গোপন করা সম্ভব হয়নি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিলো ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে চলমান গণহত্যায় প্রায় ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাংলাদেশে এসেছে তারও এক সপ্তাহ পরে অর্থাৎ ১৯৭২'র ১০ জানুয়ারিতে।.মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ভারতের শরণার্থী শিবিরে কলেরায় অন্তত ৫ লাখ শরণার্থী মৃত্যুবরণ করেছেন। এই সংখ্যাটি ৩০ লাখের বাইরে রাখা হয়েছে। অথচ এরাও কিন্তু স্রেফ প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হয়ে দেশ ত্যাগ করে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল। কোন সময়েই এদের শহীদের স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যায় কতো শহীদ হয়েছেন তা কখনোই নির্ণয় করা সম্ভব হবেনা। গণহত্যায় কতো সংখ্যক শহীদ হয় তা কখনো নির্ণয় করা সম্ভব ও না। যা করা যায় তা হলো গবেষণার মাধ্যমে অনুমান। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কম বলে স্বর্গসুখ লাভ করতে চান, তাদের জন্য মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যার জন্য এটি কেবল একটিমাত্র পরিসংখ্যান।