শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত মুসলিম উম্মাহর স্বপ্ন ও বঙ্গবন্ধু

মুসলিম উম্মাহর স্বপ্ন ও বঙ্গবন্ধু

ড. মাহাথির মোহাম্মদ :

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেবল বাংলাদেশের স্থপতিই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে তাঁকে হত্যার মাধ্যমে কেবল একটি দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়নি, বরং বিশ্ব মুসলিম জাহানের এক বিশাল সম্ভাবনা ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল। মালয়েশিয়ার আধুনিক রূপকার ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদের একটি ঐতিহাসিক মূল্যায়ন আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, যেখানে তিনি বঙ্গবন্ধুকে মুসলিম উম্মাহর এক ‘স্বপ্নদ্রষ্টা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

এক নজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, 

মুসলিম বিশ্বের অভিভাবকত্ব: ড. মাহাথির মোহাম্মদের মতে, বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে তিনি মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি করেছিলেন।

১৯৭৫-এর ট্র্যাজেডি: বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে মুসলিম বিশ্ব তার এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতাকে হারিয়েছে, যা এই জনপদকে ‘এতিম’ করে দিয়েছে বলে মনে করেন বিশ্বনেতারা।

ওআইসি (OIC) ও বঙ্গবন্ধু: ১৯৭৪ সালে লাহোর সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর যোগদান ছিল মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিতে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। সেখানে তিনি শোষিত মানুষের পক্ষে এবং মুসলিম ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন।

ইসলামের প্রাতিষ্ঠানিক সেবা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, বিশ্ব ইজতেমার ভূমি বরাদ্দ এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পুনর্গঠনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে ইসলামের প্রকৃত ভিত্তি স্থাপন করেন।

সামাজিক সংস্কার: স্বাধীনতার পর মদ, জুয়া এবং ঘোড়দৌড় নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে একটি নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি।

মুসলিম উম্মাহর অপূরণীয় ক্ষতি
মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ বিভিন্ন সময়ে আক্ষেপ করে বলেছেন, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে মুসলিম উম্মাহর সেই স্বপ্ন চূর্ণ হয়ে যায়, যা তাঁকে কেন্দ্র করে দানা বাঁধছিল। তাঁর মতে, বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব এবং অসাম্প্রদায়িক ধর্মীয় চেতনা সারা বিশ্বের মুসলিমদের জন্য এক অনন্য উদাহরণ হতে পারত। ১৫ আগস্টের সেই কালো অধ্যায় বাংলাদেশকে নেতৃত্বের সংকটে ফেলে দিয়েছে এবং মুসলিম উম্মাহ হারিয়েছে এক আপসহীন কণ্ঠস্বর।

বিশ্বনেতাদের চোখে বঙ্গবন্ধু
কেবল ড. মাহাথির নন, ফিলিস্তিনের কিংবদন্তি নেতা ইয়াসির আরাফাত থেকে শুরু করে মিশরের আনোয়ার সাদাত পর্যন্ত সকলেই বঙ্গবন্ধুকে মুসলিম বিশ্বের এক অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে শ্রদ্ধা করতেন। ইয়াসির আরাফাত প্রায়ই বলতেন, "বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছিলেন শোষিত মানুষের আলোকবর্তিকা।" ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে আরবদের সমর্থনে বঙ্গবন্ধুর সক্রিয় পদক্ষেপ আজও মুসলিম বিশ্বে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করা হয়।

ইসলামের প্রসারে কালজয়ী ভূমিকা
বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন ইসলামের উদারনৈতিক এবং মানবিক মূলবোধে। ১৯৭৫ সালের ২৮ মার্চ তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন’ আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ইসলামি সংস্থা। এছাড়া টঙ্গীর তুরাগ তীরে বিশ্ব ইজতেমার জন্য বিশাল জায়গা বরাদ্দ এবং কাকরাইল মসজিদের প্রসারণে তাঁর অবদান বাংলাদেশের আলেম সমাজের কাছে চিরস্মরণীয়। তিনি মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে বোর্ড গঠন করেছিলেন এবং হাজীদের জন্য সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা করেছিলেন।

ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বঙ্গবন্ধু
বিশ্লেষকদের মতে, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সবসময় মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব এবং পারস্পরিক সহযোগিতার কথা বলতেন। তাঁর পররাষ্ট্রনীতি ছিল— "সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়।" বিশেষ করে ওআইসি সদস্যপদ লাভের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশকে মুসলিম বিশ্বের মূল ধারায় সম্পৃক্ত করেছিলেন

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার না বানিয়ে বরং ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্যকে রাষ্ট্রীয় জীবনে ধারণ করতে চেয়েছিলেন। ড. মাহাথির মোহাম্মদের সেই বিখ্যাত উক্তি— "বঙ্গবন্ধুকে হত্যার কারণে বাংলাদেশ এতিম হয়ে যায়"—আজও প্রমাণ করে যে, বঙ্গবন্ধু কেবল বাঙালির সম্পদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন সারা বিশ্বের শোষিত মানুষ এবং মুসলিম উম্মাহর এক অমূল্য সম্পদ।

খুঁজুন