বাংলাদেশের হিন্দুরা (প্রায় ৯৫%) এখন আর শাস্ত্রের বিধান মেনে নিয়ে নিজেদের শূদ্র বা দাস পরিচয় দিতে চায় না। নিজেরা নিম্নবর্ণের, অচ্ছুৎ এবং দাস হয়ে থাকতে চায় না। এটা ভালো। তবে হিন্দু পুরুষরা মেয়েদের দাসী হিসেবেই চায়। সেবা চায়! অধীনস্থ করে রাখতে চায়। মানুষ হিসেবে প্রাপ্য সম-অধিকার দিতে চায় না। কিছু টাউট ব্যক্তি সাধু পরিচয়ে বা বেশভূষা ধারণ করে বিভিন্ন জায়গায় বক্তব্য দেয়—তাদেরকেও দেখতে পাই, নারীর কর্তব্য হিসেবে "স্বামীর সেবা" করার পক্ষে লম্বা জ্ঞান দেয়। ওটাই নাকি নারীর ধর্ম! কিন্তু শূদ্র হিসেবে তার নিজের ‘সেবা-ধর্ম’ কী ধরনের—সে বিষয়ে একদম চুপ! ভণ্ডরা তখন বলে, বর্ণ পরিচয় জন্মসূত্রে হয় না, গুণ ও কর্মসূত্রে হয়। তবে গুণ ও কর্মসূত্রে নারীর অবস্থান কেন নির্ধারণ হবে না, বন্ধু?
সমাজটা সামগ্রিকভাবেই বৈষম্যের। এই সমাজে টাকাপয়সা, অর্থবিত্ত, সম্পত্তির মালিকানা, শিক্ষা, সামর্থ্য, যোগ্যতা, নেতৃত্ব ইত্যাদিই মানুষের পরিচয় ও সামাজিক অবস্থান নির্ধারণ করে। যার এসব আছে, সে শূদ্র হলেও সামর্থ্যে ও মর্যাদায় শীর্ষে থাকে। প্রাচীন শাস্ত্রে নির্ধারিত জন্মসূত্রে পরিচয়ের গৌণতা ও অসারতা এখন জীবনের ঘাটে ঘাটে প্রমাণিত। তবুও যার যতটুকু আছে, ততটাই ব্যবহার করে উপরে থাকতে চায়, উপরে উঠতে চায়। বংশ পরিচয়ে কিংবা বাপের পরিচয়ে মেম্বার, চেয়ারম্যান, এমপি, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী হওয়া এদেশের এখনো বাস্তবতা। যাদের সেই পরিচয় নেই, যাদেরকে শুধুমাত্র যোগ্যতা দিয়ে উপরে উঠতে হবে—তারা কার্যক্ষেত্রে বংশ পরিচয়ের ব্যাপারটা সবসময় আড়াল করে।
তাই করা উচিত। অসম্মানের পরিচয় বহন করা উচিত নয়। কর্মই পরিচয় হওয়া উচিত। এটাই প্রকৃত আদর্শ। গুণ ও কর্মই প্রকৃত সম্মান। বংশ পরিচয়, বর্ণ পরিচয় নিছক ভণ্ডামি—এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। তবে সত্য গোপন করাও ভণ্ডামি। শাস্ত্র তোমাকে শূদ্র বানিয়ে রেখেছে, সেই সত্য তুমি গোপন করবে, তখন শাস্ত্র মানবে না; কিন্তু নারীকে দাসত্বের শিক্ষা দেওয়ার জন্য শাস্ত্র খুঁজবে—এটা শুধু ভণ্ডামি নয়, চরম ইতরামি।
গীতা তোমার শূদ্র পরিচয় মুছে দিয়েছে, জন্মসূত্রে দাস-পরিচয় ও দাস-কর্তব্য থেকে তোমাকে রেহাই দিয়েছে—কে বলেছে? গীতার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জন্মসূত্রে বর্ণ পরিচয় এবং সেই পরিচয়ে কর্তব্য/স্বধর্ম পালনের তাগিদ আছে! গীতা জন্মান্তরবাদ স্বীকার করে। পাপ বা পুণ্য অনুযায়ী—গুণ, কর্ম বা সংস্কার অনুযায়ী ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য বা শূদ্রকূলে তোমার জন্মের তত্ত্ব গীতা জোরের সাথে স্বীকার করে। বাস্তবে সেই শিক্ষাই গীতা প্রচার করে। গীতায় পাপের কারণে পাপ-যোনীতে জন্মের তত্ত্ব আছে। (গীতা ৯/৩২)
চতুর্থ অধ্যায়ে (৪/১৩) গুণ ও কর্ম অনুযায়ী চতুর্বর্ণ সৃষ্টির বিষয়ে একটি শ্লোক আছে। গীতার মতে, সেই গুণ ও কর্ম মানুষ জন্মসূত্রে প্রাপ্ত হয়। গীতার সকল শ্লোকে জন্মান্তরবাদ, কর্মগুণে অধঃকূলে বা উত্তম কূলে জন্ম, জন্মের কারণে কর্তব্য নির্ণয়—এই ধারায় জীবনব্যবস্থা নির্ধারণ করা আছে। যখন তোমার আত্মমর্যাদা ও স্বার্থবোধে আঘাত লাগছে, তখন তুমি গীতার প্রকৃত অর্থ অস্বীকার করে নিজের মতো করে অর্থ খুঁজ! ভালো কথা—কিন্তু নারীকে কেন 'মানুষের অধিকার' থেকে বঞ্চিত রাখতে চাও? সেখানে তোমার স্বার্থ। বিশাল মহাভারতের মাত্র ৭০০টি শ্লোক 'গীতা' নামে পরিচিত। সেই মহাভারতের পুরোটা জুড়ে জন্মসূত্রে বর্ণ, পরিবার, পারস্পরিক সম্পর্ক ও কর্তব্যধারা নির্ধারিত আছে। শুধু চারবর্ণ তো নয়; বরং বহু শঙ্করবর্ণ ও বহু জাতি বিভাগে মহাভারতের সমাজ-বিন্যাস। সকল পুরাণ ও সকল সংহিতা ঐ ধারায় রচিত। পুরাণের চেয়েও অতি প্রাচীন বেদ—ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, উপনিষদ—গ্রন্থগুলোতে বরং পরিবার, বর্ণ ও সমাজ প্রথা কিছুটা শিথিল দেখা যায়। সেখানে আদিমতা আছে। পুরাণের সমাজ বেদের আদিম সমাজের চেয়ে অগ্রবর্তী; কিন্তু তা দাসতন্ত্র, সামন্ততন্ত্র ও জাতিভেদের শেকলে অধিক শক্ত করে বাঁধা।
বাস্তবতা হচ্ছে, হিন্দু সমাজের ৯৯.৯৯% মানুষ তাদের বংশপরম্পরায় বেদ দেখেনি। প্রতি ১০ হাজার হিন্দুর মধ্যে ০১ জন পাওয়া যাবে না, যে বেদ অধ্যয়ন করেছে। গীতা পাঠ করেছে—এমন মানুষের সংখ্যা এখন মোটামুটি ভালো। তবে ধর্মশাস্ত্র কাকে বলে, কোনটি আইনি বিধিবিধান আর কোনটি আধ্যাত্মিক জ্ঞান, সে কথা জানে না।
তোমার বিয়ের বিধিবিধান, মন্ত্র, শ্রাদ্ধবিধি, নিত্যকর্ম, কর্তব্য-অকর্তব্য গীতায় আছে নাকি? কোন শাস্ত্রে আছে জানো? বকছ, হিন্দু আইন নাকি শাস্ত্রীয়! কোন শাস্ত্রের বন্ধু? শাস্ত্র পড়েছ? লেখাপড়া জেনে মূর্খ হওয়া কি উচিত? তুমি যদি শাস্ত্রের হিন্দু আইন মান, তবে তা অতি বিচিত্র। প্রাচীন ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম শাস্ত্রবিধান ও প্রথা প্রচলিত ছিল। তবে সেসব শাস্ত্রে একটি বিষয় মোটামুটি অভিন্ন। তা হলো, তোমরা ৯০% জনতা শূদ্র, দাস তথা অচ্ছুৎ। শাস্ত্রে তোমার যে কর্তব্য নির্ধারিত; মানব-মর্যাদার অবদমিত ও অসম্মানিত যে স্তরে তোমার অবস্থান পর্যবসিত—তা তুমি সহজভাবে নিতে পারবে না। মেনে নেওয়া উচিতও নয়। তেমনিভাবে নারীর প্রতি অত্যন্ত অবমাননাকর অবস্থান ও অধিকারহীনতাও মানার যোগ্য নয়। নিজে দাস হতে না চাইলে নারীকেও তোমার দাসী হিসেবে ভেবো না।
বেদ পরমব্রহ্ম তথা ঈশ্বর থেকে এসেছে বটে। কারণ মানুষ ঈশ্বর স্বরূপ। যা মানুষ লিখেছে, তা ঈশ্বরেরই লেখা। ঈশ্বর বহুরূপী। শুধু মানুষ নয়—জগতের সর্বরূপে ঈশ্বর। মাছ, কচ্ছপ, শুকর, পশুপ্রাণী, তৃণলতা—সবকিছু ঈশ্বরের বহুরূপের প্রকাশ। প্রাচীনতম গ্রন্থ ঋগ্বেদ থেকে শুরু করে আধুনিক পুরাণের যুগ পর্যন্ত সনাতন ধর্মের সকল গ্রন্থে সুস্পষ্টভাবে একথা লেখা আছে। "ব্রহ্ম হতে কীট পরমাণু সর্বভূতে সেই প্রেমময়।"
সুতরাং মানুষের লেখা সকল বেদই ঈশ্বরের লেখা। প্রাচীন গ্রন্থ থেকে কার্ল মার্ক্সের 'দাস ক্যাপিটাল' সর্বত্র ঈশ্বরের হাতের ছোঁয়া। সমস্যা হলো, মানুষ যখন ঈশ্বরের দায়িত্ব পালন করেছে, তখন তার মধ্যে খারাপ মানুষেরাও ঢুকে অনেক ভয়ঙ্কর বিধান যুক্ত করেছে। সতীদাহের মতো ভয়াবহ কর্ম শাস্ত্রের বিধান হয়ে গেছে। তুমি যেমন নিজের স্বার্থে নারীর সেবা চাও, কিছু শাস্ত্রকর্তা তাদের স্বার্থে তোমার সেবা নেওয়ার জন্য তোমার জন্য শূদ্রের কর্তব্য বুঝিয়েছে। বলেছে,
কপিলাক্ষীরপানেন ব্রাহ্মণীগমনেন চ।
বেদাক্ষরবিচারেণ শূদ্রস্য নরকং ধ্রুবম্।।
—১/৬৪ পরাশর সংহিতা
অর্থ: “কপিলা গাভীর দুগ্ধ পান, ব্রাহ্মণীগমন এবং বেদাক্ষর বিচার—এই কার্য্যে শূদ্র নিশ্চয়ই নরকগামী হইবে।”
কপিলা সবচেয়ে উন্নত জাতের গাভী। শূদ্রদের জন্য শুধুমাত্র শাস্ত্রপাঠ নিষিদ্ধ করা নয়, ভালো জাতের গাভীর দুধ পান করতেও নিষেধ করা হয়েছে। মনে রাখবে, হিন্দু আইন গীতার বাণী নয়; বরং সংহিতা শাস্ত্র অনুসারে আইনগুলো বানানো হয়েছে। যে শাস্ত্র তোমাকে শূদ্র বানিয়েছে, সেই শাস্ত্র বলেছে,
তীর্থস্নানার্থিনী নারী পতিপাদোদকং পিবেৎ।
শঙ্করস্যাপি বিষ্ণোর্ভা প্রয়াতি পরমং পদম।।
—শ্লোক ১৩৭, অত্রি সংহিতা
অর্থ: “নারী তীর্থস্নান-অভিলাষিণী হইলে স্বামী, শিব বা বিষ্ণুর পাদোদক (পা ধোয়া জল) পান করিবে; ইহাতে পরম স্থান লাভ করিবে।”
নারীকে তীর্থ করার পরিবর্তে তোমার পা ধোয়া জল পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। স্বামীকে শিব এবং বিষ্ণুর সমতুল্য বলা হয়েছে—এই হলো নারীর মর্যাদা। এটা যদি মানবে, তবে নিজে শূদ্রের ধর্ম মানবে না কেন?
শাস্ত্রে ভয়াবহ সংকীর্ণতা আছে এবং অনেক উদারতা আছে। সংকীর্ণতা পরিহার কর, উদারতা গ্রহণ কর। শাস্ত্র অযৌক্তিক শাস্ত্রবিধান পরিত্যাগ করার কথা বলেছে। বিবেকের বাণী অনুসরণ করার কথা বলেছে। বৃহস্পতি সংহিতার সুস্পষ্ট নির্দেশ,
“কেবলং শাস্ত্রমাশ্রিত্য ন কর্তব্যো বিনির্ণয়ঃ।
যুক্তিহীনবিচারেণ ধর্মহানিঃ প্রজায়তে।”
অর্থ: ‘কেবল শাস্ত্রকে আশ্রয় করে কর্তব্য নির্ণয় করা উচিত নয়। কারণ যুক্তিহীন বিচারে ধর্মহানি হয়ে থাকে।’
সেখানে আরও শক্তভাবে বলা হচ্ছে,
“যুক্তিযুক্তমুপাদেয়ং বচনং বালকাদপি।
অন্যং তৃণমিব ত্যজ্যমপ্যুক্তং পদ্মজন্মনা।”
অর্থাৎ, একজন বালকও যদি যুক্তিযুক্ত কথা বলে, তা মানা উচিত; স্বয়ং ব্রহ্মাও যদি অযৌক্তিক কথা বলেন, তা তৃণবৎ পরিত্যাগ করবে।
বেদ মানে জ্ঞান। জ্ঞান কখনো নির্দিষ্ট পরিসরে আবদ্ধ থাকতে পারে না। চারটি গ্রন্থ—ঋকবেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ ও অথর্ববেদের মধ্যে সকল জ্ঞান সীমাবদ্ধ নয়। আয়ুর্বেদও বেদ হিসেবে স্বীকৃত। প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্রকে বেদ হিসেবে মানছ, কিন্তু সর্বাধুনিক উন্নত চিকিৎসাশাস্ত্রকে 'বেদ' মানছ না—এই যদি তোমার বিশ্বাস হয়, তবে আধুনিক জীবন ছেড়ে গুহাবাসী হও।
ধনুর্বেদও বেদ হিসেবে স্বীকৃত। এটা যুদ্ধবিদ্যা। ধনুর্বেদকে বেদ হিসেবে মানছ, কিন্তু আধুনিক যুদ্ধবিদ্যাকে 'বেদ' মানছ না—তবে তুমি আগেই হেরে বসে আছ। তবে তোমাকে তীর-ধনুক নিয়ে অরণ্যে ফিরে যেতে হবে।
যদি প্রাচীন শাস্ত্রে কর্তব্য খোঁজ, তবে তোমাকে দাসত্বের পরিচয়েই ফিরে যেতে হবে। আধুনিক শাস্ত্র তোমাকে মুক্তি দেবে। আধুনিক ও উন্নত হও।
সনাতন ধর্ম অনুযায়ী জ্ঞান স্বয়ং ঈশ্বর স্বরূপ, বা সরস্বতী স্বরূপা। জ্ঞানের প্রতিটি শাখা ঈশ্বরের অঙ্গ—কোনোটিই তুচ্ছ নয়। প্রাচীন জ্ঞান সরস্বতী রূপা, আধুনিক জ্ঞান তার বাইরে—এমন ভাবনা নির্বুদ্ধিতা। শুধুমাত্র অতীত শাস্ত্রে সনাতন ধর্ম খোঁজা কুশিক্ষার প্রভাব। বিজ্ঞানের সর্বশেষ আবিষ্কারটিও সনাতন ধর্ম। এই ধর্ম বিশ্বাস কর। বিজ্ঞান বিশ্বাস কর—যা পরিবর্তনশীল, বর্ধনশীল। আইন চিরস্থায়ী হয় না। আইন ও সমাজ পরিবর্তনশীল। সমাজের পরিবর্তনশীলতা বুঝতে হবে, মানতে হবে। সমাজের মতো ধর্মও পরিবর্তনশীল। মূর্খরা এটা বোঝে না। জ্ঞান, শাস্ত্র, ধর্মের পরিবর্তনশীলতায় বিশ্বাস না করলে তুমি সনাতন ধর্মে বিশ্বাস কর না, মূর্খতায় বিশ্বাস কর মাত্র। সনাতন ধর্মের ইতিহাস পরিবর্তনেরই ইতিহাস। পরিবর্তনশীলতাই শাশ্বত (চিরন্তন) ধর্ম; সনাতন ধর্ম। পুরাতন বর্ণবাদী ও নারীবিরোধী সমাজ ও শাস্ত্রে আবদ্ধ থাকা ধর্ম নয়; আধুনিক উন্নত সমাজতত্ত্ব, বিজ্ঞান, রাষ্ট্রব্যবস্থা, মানবাধিকার, আইন, সংবিধান তথা আধুনিক শাস্ত্রকে গ্রহণ করা সনাতন ধর্ম। এসো, একই সাথে সর্বপ্রাচীন ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হয়ে সর্বাধুনিক ও সর্বোন্নত ধর্মের অনুসারী হই। নারী ও শূদ্রের মুক্তি এক সাথে হোক।
সমাজটা সামগ্রিকভাবেই বৈষম্যের। এই সমাজে টাকাপয়সা, অর্থবিত্ত, সম্পত্তির মালিকানা, শিক্ষা, সামর্থ্য, যোগ্যতা, নেতৃত্ব ইত্যাদিই মানুষের পরিচয় ও সামাজিক অবস্থান নির্ধারণ করে। যার এসব আছে, সে শূদ্র হলেও সামর্থ্যে ও মর্যাদায় শীর্ষে থাকে। প্রাচীন শাস্ত্রে নির্ধারিত জন্মসূত্রে পরিচয়ের গৌণতা ও অসারতা এখন জীবনের ঘাটে ঘাটে প্রমাণিত। তবুও যার যতটুকু আছে, ততটাই ব্যবহার করে উপরে থাকতে চায়, উপরে উঠতে চায়। বংশ পরিচয়ে কিংবা বাপের পরিচয়ে মেম্বার, চেয়ারম্যান, এমপি, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী হওয়া এদেশের এখনো বাস্তবতা। যাদের সেই পরিচয় নেই, যাদেরকে শুধুমাত্র যোগ্যতা দিয়ে উপরে উঠতে হবে—তারা কার্যক্ষেত্রে বংশ পরিচয়ের ব্যাপারটা সবসময় আড়াল করে।
তাই করা উচিত। অসম্মানের পরিচয় বহন করা উচিত নয়। কর্মই পরিচয় হওয়া উচিত। এটাই প্রকৃত আদর্শ। গুণ ও কর্মই প্রকৃত সম্মান। বংশ পরিচয়, বর্ণ পরিচয় নিছক ভণ্ডামি—এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। তবে সত্য গোপন করাও ভণ্ডামি। শাস্ত্র তোমাকে শূদ্র বানিয়ে রেখেছে, সেই সত্য তুমি গোপন করবে, তখন শাস্ত্র মানবে না; কিন্তু নারীকে দাসত্বের শিক্ষা দেওয়ার জন্য শাস্ত্র খুঁজবে—এটা শুধু ভণ্ডামি নয়, চরম ইতরামি।
গীতা তোমার শূদ্র পরিচয় মুছে দিয়েছে, জন্মসূত্রে দাস-পরিচয় ও দাস-কর্তব্য থেকে তোমাকে রেহাই দিয়েছে—কে বলেছে? গীতার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জন্মসূত্রে বর্ণ পরিচয় এবং সেই পরিচয়ে কর্তব্য/স্বধর্ম পালনের তাগিদ আছে! গীতা জন্মান্তরবাদ স্বীকার করে। পাপ বা পুণ্য অনুযায়ী—গুণ, কর্ম বা সংস্কার অনুযায়ী ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য বা শূদ্রকূলে তোমার জন্মের তত্ত্ব গীতা জোরের সাথে স্বীকার করে। বাস্তবে সেই শিক্ষাই গীতা প্রচার করে। গীতায় পাপের কারণে পাপ-যোনীতে জন্মের তত্ত্ব আছে। (গীতা ৯/৩২)
চতুর্থ অধ্যায়ে (৪/১৩) গুণ ও কর্ম অনুযায়ী চতুর্বর্ণ সৃষ্টির বিষয়ে একটি শ্লোক আছে। গীতার মতে, সেই গুণ ও কর্ম মানুষ জন্মসূত্রে প্রাপ্ত হয়। গীতার সকল শ্লোকে জন্মান্তরবাদ, কর্মগুণে অধঃকূলে বা উত্তম কূলে জন্ম, জন্মের কারণে কর্তব্য নির্ণয়—এই ধারায় জীবনব্যবস্থা নির্ধারণ করা আছে। যখন তোমার আত্মমর্যাদা ও স্বার্থবোধে আঘাত লাগছে, তখন তুমি গীতার প্রকৃত অর্থ অস্বীকার করে নিজের মতো করে অর্থ খুঁজ! ভালো কথা—কিন্তু নারীকে কেন 'মানুষের অধিকার' থেকে বঞ্চিত রাখতে চাও? সেখানে তোমার স্বার্থ। বিশাল মহাভারতের মাত্র ৭০০টি শ্লোক 'গীতা' নামে পরিচিত। সেই মহাভারতের পুরোটা জুড়ে জন্মসূত্রে বর্ণ, পরিবার, পারস্পরিক সম্পর্ক ও কর্তব্যধারা নির্ধারিত আছে। শুধু চারবর্ণ তো নয়; বরং বহু শঙ্করবর্ণ ও বহু জাতি বিভাগে মহাভারতের সমাজ-বিন্যাস। সকল পুরাণ ও সকল সংহিতা ঐ ধারায় রচিত। পুরাণের চেয়েও অতি প্রাচীন বেদ—ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, উপনিষদ—গ্রন্থগুলোতে বরং পরিবার, বর্ণ ও সমাজ প্রথা কিছুটা শিথিল দেখা যায়। সেখানে আদিমতা আছে। পুরাণের সমাজ বেদের আদিম সমাজের চেয়ে অগ্রবর্তী; কিন্তু তা দাসতন্ত্র, সামন্ততন্ত্র ও জাতিভেদের শেকলে অধিক শক্ত করে বাঁধা।
বাস্তবতা হচ্ছে, হিন্দু সমাজের ৯৯.৯৯% মানুষ তাদের বংশপরম্পরায় বেদ দেখেনি। প্রতি ১০ হাজার হিন্দুর মধ্যে ০১ জন পাওয়া যাবে না, যে বেদ অধ্যয়ন করেছে। গীতা পাঠ করেছে—এমন মানুষের সংখ্যা এখন মোটামুটি ভালো। তবে ধর্মশাস্ত্র কাকে বলে, কোনটি আইনি বিধিবিধান আর কোনটি আধ্যাত্মিক জ্ঞান, সে কথা জানে না।
তোমার বিয়ের বিধিবিধান, মন্ত্র, শ্রাদ্ধবিধি, নিত্যকর্ম, কর্তব্য-অকর্তব্য গীতায় আছে নাকি? কোন শাস্ত্রে আছে জানো? বকছ, হিন্দু আইন নাকি শাস্ত্রীয়! কোন শাস্ত্রের বন্ধু? শাস্ত্র পড়েছ? লেখাপড়া জেনে মূর্খ হওয়া কি উচিত? তুমি যদি শাস্ত্রের হিন্দু আইন মান, তবে তা অতি বিচিত্র। প্রাচীন ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম শাস্ত্রবিধান ও প্রথা প্রচলিত ছিল। তবে সেসব শাস্ত্রে একটি বিষয় মোটামুটি অভিন্ন। তা হলো, তোমরা ৯০% জনতা শূদ্র, দাস তথা অচ্ছুৎ। শাস্ত্রে তোমার যে কর্তব্য নির্ধারিত; মানব-মর্যাদার অবদমিত ও অসম্মানিত যে স্তরে তোমার অবস্থান পর্যবসিত—তা তুমি সহজভাবে নিতে পারবে না। মেনে নেওয়া উচিতও নয়। তেমনিভাবে নারীর প্রতি অত্যন্ত অবমাননাকর অবস্থান ও অধিকারহীনতাও মানার যোগ্য নয়। নিজে দাস হতে না চাইলে নারীকেও তোমার দাসী হিসেবে ভেবো না।
বেদ পরমব্রহ্ম তথা ঈশ্বর থেকে এসেছে বটে। কারণ মানুষ ঈশ্বর স্বরূপ। যা মানুষ লিখেছে, তা ঈশ্বরেরই লেখা। ঈশ্বর বহুরূপী। শুধু মানুষ নয়—জগতের সর্বরূপে ঈশ্বর। মাছ, কচ্ছপ, শুকর, পশুপ্রাণী, তৃণলতা—সবকিছু ঈশ্বরের বহুরূপের প্রকাশ। প্রাচীনতম গ্রন্থ ঋগ্বেদ থেকে শুরু করে আধুনিক পুরাণের যুগ পর্যন্ত সনাতন ধর্মের সকল গ্রন্থে সুস্পষ্টভাবে একথা লেখা আছে। "ব্রহ্ম হতে কীট পরমাণু সর্বভূতে সেই প্রেমময়।"
সুতরাং মানুষের লেখা সকল বেদই ঈশ্বরের লেখা। প্রাচীন গ্রন্থ থেকে কার্ল মার্ক্সের 'দাস ক্যাপিটাল' সর্বত্র ঈশ্বরের হাতের ছোঁয়া। সমস্যা হলো, মানুষ যখন ঈশ্বরের দায়িত্ব পালন করেছে, তখন তার মধ্যে খারাপ মানুষেরাও ঢুকে অনেক ভয়ঙ্কর বিধান যুক্ত করেছে। সতীদাহের মতো ভয়াবহ কর্ম শাস্ত্রের বিধান হয়ে গেছে। তুমি যেমন নিজের স্বার্থে নারীর সেবা চাও, কিছু শাস্ত্রকর্তা তাদের স্বার্থে তোমার সেবা নেওয়ার জন্য তোমার জন্য শূদ্রের কর্তব্য বুঝিয়েছে। বলেছে,
কপিলাক্ষীরপানেন ব্রাহ্মণীগমনেন চ।
বেদাক্ষরবিচারেণ শূদ্রস্য নরকং ধ্রুবম্।।
—১/৬৪ পরাশর সংহিতা
অর্থ: “কপিলা গাভীর দুগ্ধ পান, ব্রাহ্মণীগমন এবং বেদাক্ষর বিচার—এই কার্য্যে শূদ্র নিশ্চয়ই নরকগামী হইবে।”
কপিলা সবচেয়ে উন্নত জাতের গাভী। শূদ্রদের জন্য শুধুমাত্র শাস্ত্রপাঠ নিষিদ্ধ করা নয়, ভালো জাতের গাভীর দুধ পান করতেও নিষেধ করা হয়েছে। মনে রাখবে, হিন্দু আইন গীতার বাণী নয়; বরং সংহিতা শাস্ত্র অনুসারে আইনগুলো বানানো হয়েছে। যে শাস্ত্র তোমাকে শূদ্র বানিয়েছে, সেই শাস্ত্র বলেছে,
তীর্থস্নানার্থিনী নারী পতিপাদোদকং পিবেৎ।
শঙ্করস্যাপি বিষ্ণোর্ভা প্রয়াতি পরমং পদম।।
—শ্লোক ১৩৭, অত্রি সংহিতা
অর্থ: “নারী তীর্থস্নান-অভিলাষিণী হইলে স্বামী, শিব বা বিষ্ণুর পাদোদক (পা ধোয়া জল) পান করিবে; ইহাতে পরম স্থান লাভ করিবে।”
নারীকে তীর্থ করার পরিবর্তে তোমার পা ধোয়া জল পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। স্বামীকে শিব এবং বিষ্ণুর সমতুল্য বলা হয়েছে—এই হলো নারীর মর্যাদা। এটা যদি মানবে, তবে নিজে শূদ্রের ধর্ম মানবে না কেন?
শাস্ত্রে ভয়াবহ সংকীর্ণতা আছে এবং অনেক উদারতা আছে। সংকীর্ণতা পরিহার কর, উদারতা গ্রহণ কর। শাস্ত্র অযৌক্তিক শাস্ত্রবিধান পরিত্যাগ করার কথা বলেছে। বিবেকের বাণী অনুসরণ করার কথা বলেছে। বৃহস্পতি সংহিতার সুস্পষ্ট নির্দেশ,
“কেবলং শাস্ত্রমাশ্রিত্য ন কর্তব্যো বিনির্ণয়ঃ।
যুক্তিহীনবিচারেণ ধর্মহানিঃ প্রজায়তে।”
অর্থ: ‘কেবল শাস্ত্রকে আশ্রয় করে কর্তব্য নির্ণয় করা উচিত নয়। কারণ যুক্তিহীন বিচারে ধর্মহানি হয়ে থাকে।’
সেখানে আরও শক্তভাবে বলা হচ্ছে,
“যুক্তিযুক্তমুপাদেয়ং বচনং বালকাদপি।
অন্যং তৃণমিব ত্যজ্যমপ্যুক্তং পদ্মজন্মনা।”
অর্থাৎ, একজন বালকও যদি যুক্তিযুক্ত কথা বলে, তা মানা উচিত; স্বয়ং ব্রহ্মাও যদি অযৌক্তিক কথা বলেন, তা তৃণবৎ পরিত্যাগ করবে।
বেদ মানে জ্ঞান। জ্ঞান কখনো নির্দিষ্ট পরিসরে আবদ্ধ থাকতে পারে না। চারটি গ্রন্থ—ঋকবেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ ও অথর্ববেদের মধ্যে সকল জ্ঞান সীমাবদ্ধ নয়। আয়ুর্বেদও বেদ হিসেবে স্বীকৃত। প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্রকে বেদ হিসেবে মানছ, কিন্তু সর্বাধুনিক উন্নত চিকিৎসাশাস্ত্রকে 'বেদ' মানছ না—এই যদি তোমার বিশ্বাস হয়, তবে আধুনিক জীবন ছেড়ে গুহাবাসী হও।
ধনুর্বেদও বেদ হিসেবে স্বীকৃত। এটা যুদ্ধবিদ্যা। ধনুর্বেদকে বেদ হিসেবে মানছ, কিন্তু আধুনিক যুদ্ধবিদ্যাকে 'বেদ' মানছ না—তবে তুমি আগেই হেরে বসে আছ। তবে তোমাকে তীর-ধনুক নিয়ে অরণ্যে ফিরে যেতে হবে।
যদি প্রাচীন শাস্ত্রে কর্তব্য খোঁজ, তবে তোমাকে দাসত্বের পরিচয়েই ফিরে যেতে হবে। আধুনিক শাস্ত্র তোমাকে মুক্তি দেবে। আধুনিক ও উন্নত হও।
সনাতন ধর্ম অনুযায়ী জ্ঞান স্বয়ং ঈশ্বর স্বরূপ, বা সরস্বতী স্বরূপা। জ্ঞানের প্রতিটি শাখা ঈশ্বরের অঙ্গ—কোনোটিই তুচ্ছ নয়। প্রাচীন জ্ঞান সরস্বতী রূপা, আধুনিক জ্ঞান তার বাইরে—এমন ভাবনা নির্বুদ্ধিতা। শুধুমাত্র অতীত শাস্ত্রে সনাতন ধর্ম খোঁজা কুশিক্ষার প্রভাব। বিজ্ঞানের সর্বশেষ আবিষ্কারটিও সনাতন ধর্ম। এই ধর্ম বিশ্বাস কর। বিজ্ঞান বিশ্বাস কর—যা পরিবর্তনশীল, বর্ধনশীল। আইন চিরস্থায়ী হয় না। আইন ও সমাজ পরিবর্তনশীল। সমাজের পরিবর্তনশীলতা বুঝতে হবে, মানতে হবে। সমাজের মতো ধর্মও পরিবর্তনশীল। মূর্খরা এটা বোঝে না। জ্ঞান, শাস্ত্র, ধর্মের পরিবর্তনশীলতায় বিশ্বাস না করলে তুমি সনাতন ধর্মে বিশ্বাস কর না, মূর্খতায় বিশ্বাস কর মাত্র। সনাতন ধর্মের ইতিহাস পরিবর্তনেরই ইতিহাস। পরিবর্তনশীলতাই শাশ্বত (চিরন্তন) ধর্ম; সনাতন ধর্ম। পুরাতন বর্ণবাদী ও নারীবিরোধী সমাজ ও শাস্ত্রে আবদ্ধ থাকা ধর্ম নয়; আধুনিক উন্নত সমাজতত্ত্ব, বিজ্ঞান, রাষ্ট্রব্যবস্থা, মানবাধিকার, আইন, সংবিধান তথা আধুনিক শাস্ত্রকে গ্রহণ করা সনাতন ধর্ম। এসো, একই সাথে সর্বপ্রাচীন ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হয়ে সর্বাধুনিক ও সর্বোন্নত ধর্মের অনুসারী হই। নারী ও শূদ্রের মুক্তি এক সাথে হোক।