শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত অপ্রশিক্ষিত মোজো সাংবাদিকদের ভবিষ্যৎ কোথায়?

অপ্রশিক্ষিত মোজো সাংবাদিকদের ভবিষ্যৎ কোথায়?

রহমত উল্লাহ :

টানা ৩ মাস সাংবাদিকতার বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ শেষে শুরু হয়েছিল আমার মোজো রিপোর্টার হিসেবে পথচলা। শুরুর দিকে নিয়মিত ফলো করতাম কিছু সিনিয়রদের বিশেষ করে Amrita Malangi বাংলাদেশ টাইমসের সাব্বির ভাই এবং Zakaria Ibn Yusuf  ভাইকে। তাদের লাইভ, রিপোর্টিং স্টাইল, স্টোরি বলার ধরণ। পরে মাঠে গিয়ে তাদের সরাসরি দেখা—একটা অন্যরকম অনুপ্রেরণা দিত।
তখন এই প্ল্যাটফর্মে মোটে ১৫-২০ জন মোজো রিপোর্টার ছিল। আমি সবার জুনিয়র হওয়ায় নিয়মিত তাদের কনটেন্ট দেখতাম, শেখার চেষ্টা করতাম, ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করতাম। প্রতিটি রিপোর্টের পর নিজেকে প্রশ্ন করতাম—আরও ভালো কীভাবে করা যায়?
কিন্তু ৫ বছরের ব্যবধানে সেই সংখ্যা এখন হাজার ছাড়িয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে—সংখ্যা বাড়লেও কি মান বেড়েছে?
বাস্তবতা হলো, নতুনদের বড় একটি অংশের কনটেন্টে সেই আগের মতো ডেপ্থ, গবেষণা বা স্টোরিটেলিং নেই। এমনকি বড় সংকট হলো তাদের আচার -আচরণ অথবা কমিনিকেশন বিহেভিয়ার। অথচ সুযোগ-সুবিধা আগের তুলনায় অনেক বেশি।ভালো ডিভাইস, দ্রুত ইন্টারনেট, সেলারি, লজিস্টিক সাপোর্ট—সবই এখন সহজলভ্য।

তবুও ২-৪টা রিলস বা ভাইরাল ভিডিও ছাড়া অনেকের প্রাপ্তির খাতা প্রায় শূন্য।
তাহলে এদের ভবিষ্যৎ কী?
প্রথমত:
অপ্রশিক্ষিত মোজো রিপোর্টারদের কারণে তৈরি হচ্ছে আস্থার সংকট। যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য, অতিরঞ্জিত শিরোনাম, এবং ক্লিকবেইট কনটেন্ট—এসবের ফলে দর্শক ধীরে ধীরে বিশ্বাস হারাচ্ছে। একটা সময় দর্শক বুঝে যায় কোনটা তথ্যভিত্তিক আর কোনটা শুধু ভিউয়ের জন্য বানানো। এর প্রভাব শুধু ব্যক্তির ওপর নয়—পুরো প্ল্যাটফর্ম এবং মিডিয়া ইকোসিস্টেমের ওপর পড়ে। ভবিষ্যতে নতুন মিডিয়া উদ্যোক্তাদের জন্যও এটা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, কমে যেতে পারে কর্মসংস্থানের সুযোগ।
দ্বিতীয়ত:
অনেকেই বুঝতেই পারছে না কেন তারা গ্রোথ পাচ্ছে না। কারণ তাদের কনটেন্টে নেই গল্প, নেই প্রেক্ষাপট, নেই বিশ্লেষণ। শুধু ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেই সাংবাদিকতা সম্পূর্ণ হয় না—দরকার ঘটনাটার “কেন” এবং “কিভাবে” তুলে ধরা। দর্শক এখন শুধু খবর জানতে চায় না, খবরের পেছনের গল্পও জানতে চায়।
তৃতীয়ত:
বর্তমান সময়ে অ্যালগরিদম একটি বড় ফ্যাক্টর। এটি হয়তো সাময়িকভাবে কিছু কনটেন্টকে ভাইরাল করে দেয়। কিন্তু এই ভাইরালিটি খুবই ক্ষণস্থায়ী। দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকে সেই কনটেন্ট, যেটার ভ্যালু আছে, তথ্য আছে, বিশ্বাসযোগ্যতা আছে। যারা শুধু ট্রেন্ড ফলো করে কনটেন্ট বানাবে, তারা কিছুদিন পরেই হারিয়ে যাবে।
চতুর্থত:
স্কিল ডেভেলপমেন্টের অভাব সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অনেকেই মনে করে—একটা স্মার্টফোন থাকলেই মোজো সাংবাদিক হওয়া যায়। কিন্তু বাস্তবে দরকার:
নিউজ সেন্স,তথ্য যাচাই (Fact-checking),স্টোরি স্ট্রাকচার,ক্যামেরা ও ফ্রেমিং,ভয়েস ও ডেলিভারি,এডিটিং সেন্স
এই স্কিলগুলো ছাড়া টিকে থাকা সম্ভব না।
পঞ্চমত:
এটা শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়—এটা পুরো ইন্ডাস্ট্রির জন্য ক্ষতিকর। নিম্নমানের কনটেন্টের ভিড়ে ভালো সাংবাদিকতাও চাপা পড়ে যাচ্ছে। ফলে দর্শক ভালো-মন্দ আলাদা করতে পারছে না, এবং ধীরে ধীরে পুরো মিডিয়ার প্রতিই অনাস্থা তৈরি হচ্ছে।
ষষ্ঠত:
একটা নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে,অনেকে সাংবাদিকতার চেয়ে “কনটেন্ট ক্রিয়েশন”-এর দিকে বেশি ঝুঁকছে। এটা খারাপ না, কিন্তু যদি সাংবাদিকতার জায়গায় শুধু বিনোদন বা ভাইরাল কনটেন্ট প্রাধান্য পায়, তাহলে মূল উদ্দেশ্যটাই হারিয়ে যাবে।
শেষ কথা:
মোজো সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ অন্ধকার নয়, তবে শর্তসাপেক্ষ।
যারা শিখবে, পড়বে, নিজেকে আপডেট করবে—তাদের জন্য এই সেক্টরে সুযোগ অসীম। তারা শুধু টিকে থাকবে না, বরং লিড করবে।
আর যারা শুধুই ভাইরাল হওয়ার পেছনে দৌড়াবে, শর্টকাট খুঁজবে—তাদের জন্য এই পথ খুব বেশি দীর্ঘ নয়।
সিদ্ধান্তটা একেবারেই ব্যক্তিগত— আপনি কি “ভিউ” চান, নাকি “বিশ্বাস”?

খুঁজুন