শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত পিএইচডি ও গবেষণা ছাড়াই অধ্যাপকের পদ

পিএইচডি ও গবেষণা ছাড়াই অধ্যাপকের পদ

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। ‘অধ্যাপক’,এই সম্মানজনক উপাধি এক সময়ে একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্ব, গবেষণার গভীরতা এবং জ্ঞানচর্চার প্রতীক ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে, অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ব্যক্তিদের অধ্যাপক বা সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে যাদের না আছে পিএইচডি ডিগ্রি, না আছে কোনো স্বীকৃত গবেষণাপত্র। ,এটি কেবল একাডেমিক নীতিভঙ্গ নয়; এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মান ও বিশ্বাসযোগ্যতার উপর এক গভীর আঘাত। এই প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এমন শিক্ষকদের কাছ থেকে শিক্ষা পাবে, যারা নিজেরাই গবেষণার প্রকৃত মূল্য জানেন না।
 
একাডেমিক বৃত্তে এক খোলা গোপন সত্য :এটি এখন আর গোপন কিছু নয়,দেশের কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পদোন্নতি প্রায়ই মেধা বা যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা আর্থিক স্বার্থের উপর নির্ভর করে দেওয়া হয়।অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যেখানে শুধুমাত্র স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী শিক্ষকদের কোনো গবেষণা ছাড়াই সহযোগী অধ্যাপক বা পূর্ণ অধ্যাপক বানানো হয়েছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সাথে ঘনিষ্ঠতা, প্রশাসনিক আনুগত্য, বা অভ্যন্তরীণ সমর্থন পাওয়াই একমাত্র যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এমন প্রক্রিয়া শুধু একাডেমিক মানদণ্ডকে ধ্বংস করে না, বরং তরুণ শিক্ষক ও গবেষকদের মাঝেও এক ধরনের হতাশা ও নিরুৎসাহ তৈরি করে।
 
বিশ্বমানের সঙ্গে বাংলাদেশের বৈপরীত্য :বিকশিত দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক পদ পেতে প্রয়োজন হয় অন্তত একটি পিএইচডি ডিগ্রি, দীর্ঘ গবেষণার অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনা, এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণা তত্ত্বাবধানের রেকর্ড। এসব মানদণ্ড বিশ্বব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয় মান বজায় রাখে।কিন্তু বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায়ই এসব মানদণ্ড উপেক্ষা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) নির্দেশিকা দিলেও এর প্রয়োগে শৈথিল্য রয়েছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় সেই নির্দেশিকাকে বাধ্যতামূলক আইন নয়, বরং পরামর্শ হিসেবে ধরে নেয়।
ফলে এক ধরনের অনিয়ন্ত্রিত অবস্থা তৈরি হয়েছে , যেখানে পদোন্নতির মাপকাঠি প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্ন এবং প্রায়ই অস্বচ্ছ।

শিক্ষা নয়, ব্যবসা , মূল সংকট এখানেই: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চশিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এদের অনেকের পরিচালন কাঠামো ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিচালিত। পরিচালনা পর্ষদের অধিকাংশ সদস্যই ব্যবসায়ী; তাদের মূল লক্ষ্য মুনাফা, মানসম্পন্ন শিক্ষা নয়।
ফলে প্রশাসনিক সুবিধা, আনুগত্য, বা অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে অনেক শিক্ষক দ্রুত পদোন্নতি পান। অনেক সময় এমন পদোন্নতি ব্যবহার হয় “বিজ্ঞাপনী প্রচারণা” হিসেবে , বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট বা ব্রোশিওরে ‘Professor’ নামটি দেখিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য, বাস্তবে যার কোনো একাডেমিক ভিত্তি নেই।
এটি যেন এক চকচকে মুখোশ — বাইরে ঝকঝকে, ভেতরে ফাঁপা।
 
গবেষণাহীন বিশ্ববিদ্যালয় , এক নীরব মৃত্যু: একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণশক্তি তার গবেষণা। কিন্তু দেশে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার পরিবেশ প্রায় অনুপস্থিত। পর্যাপ্ত তহবিল নেই, গবেষণাগার নেই, বিদেশি জার্নালে প্রকাশনার উৎসাহ নেই।শিক্ষকদের উপর অতিরিক্ত পাঠদান চাপানো হয়, ফলে গবেষণার জন্য সময় বা উৎসাহ দুটোই থাকে না। ফলে গবেষণাপত্রহীন শিক্ষকরা এক সময়ে প্রশাসনিক দায়িত্বে চলে যান, আর গবেষণার জায়গা হয়ে ওঠে ফাঁকা।এই অবস্থায় যখন গবেষণা উৎপাদন কমে যায়, তখন অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেরা “মানদণ্ড নরম” করে ফেলে। অর্থাৎ গবেষণা না থাকলেও পদোন্নতি দেওয়া হয়। এতে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়—গবেষণা না করলে ক্ষতি হয় না, বরং পদোন্নতি ত্বরান্বিত হয়।

পদোন্নতি বোর্ডের অস্বচ্ছতা ও স্বার্থসংঘাত :অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পদোন্নতি বোর্ড বা কমিটি সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ সদস্যদের দ্বারা গঠিত হয়। এতে থাকে একই বিভাগের সহকর্মীরা, যাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা প্রভাব থাকা স্বাভাবিক। ফলে নিরপেক্ষতা হারিয়ে যায়।বাহ্যিক মূল্যায়নকারীরা অনেক সময় কেবল নামমাত্রভাবে যুক্ত করা হয়—কখনও কখনও এমন ব্যক্তিদের, যাদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতাও নেই। ফলস্বরূপ, প্রকৃত যোগ্যতা নয়, বরং সম্পর্ক ও সুবিধার উপর ভিত্তি করে পদোন্নতি হয়।
 
নিয়ন্ত্রক সংস্থার সীমাবদ্ধতা: ইউজিসি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান নিয়ন্ত্রণে কাজ করলেও, বাস্তবে প্রয়োগে বাধা অনেক। প্রায় ১০০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যবেক্ষণ করা একক সংস্থার পক্ষে প্রায় অসম্ভব।তদুপরি, ইউজিসি’র সুপারিশগুলো অনেক সময় “পরামর্শমূলক” হিসেবেই থেকে যায়। পদোন্নতির তথ্য, গবেষণা প্রকাশনা, শিক্ষকের যোগ্যতার স্বচ্ছ ডেটাবেসের অভাবে ভুল তথ্যও সহজে যাচাই করা যায় না।
আর যারা অনিয়মের কথা প্রকাশ করতে চান, তাদের জন্য কোনো আইনি সুরক্ষা নেই। এতে একটি “নীরবতার সংস্কৃতি” তৈরি হয়েছে—যেখানে অনিয়ম সবাই জানে, কিন্তু কেউ মুখ খোলে না।
 
ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা: এই অবক্ষয়ের সবচেয়ে বড় শিকার শিক্ষার্থীরা। তারা স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়,ভাবেন যোগ্য ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের কাছ থেকে শিখবেন। কিন্তু বাস্তবে অনেকেই এমন শিক্ষকের কাছ থেকে পড়ছে, যাদের নিজেরাই গবেষণা বা একাডেমিক গভীরতার অভাব রয়েছে।
ফলে তারা আন্তর্জাতিক মানে প্রতিযোগিতার যোগ্যতা অর্জন করতে পারছে না। কর্মক্ষেত্রে বাংলাদেশি ডিগ্রির মূল্যও কমে যাচ্ছে।
যদি এভাবে মানহীন শিক্ষা চলতে থাকে, তবে “ডিগ্রিধারী” তরুণের সংখ্যা বাড়বে ঠিকই, কিন্তু “জ্ঞানধারী” তরুণের সংখ্যা কমে যাবে।
 
কীভাবে এই সংকট থেকে বের হওয়া সম্ভব
১. পিএইচডি বাধ্যতামূলক করা: সহযোগী অধ্যাপক বা অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য পিএইচডি এবং স্বীকৃত জার্নালে গবেষণা প্রকাশনা বাধ্যতামূলক করা হোক।
২. জাতীয় স্তরের মূল্যায়ন কমিটি: পদোন্নতি যাচাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন বোর্ড গঠন করা প্রয়োজন।
৩. ফ্যাকাল্টি ডেটাবেস: সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ডিগ্রি, গবেষণা ও প্রকাশনা নিয়ে একটি উন্মুক্ত জাতীয় ডেটাবেস তৈরি করা উচিত।

৪. গবেষণা অনুদান ও প্রণোদনা: গবেষণার জন্য আলাদা বাজেট ও পুরস্কার ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে শিক্ষকরা গবেষণায় উৎসাহ পান।

৫. নৈতিক তদারকি: নিয়মিত একাডেমিক অডিট এবং অনিয়ম প্রকাশকারীদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করা জরুরি।

শেষ কথা: শিক্ষা নয়, সনদ বিক্রি নয় : বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আবার জ্ঞানচর্চার পবিত্র আসনে ফিরিয়ে আনতে হবে। অধ্যাপক পদ শুধু পদবী নয়, এটি একটি দায়িত্ব, একটি প্রতিশ্রুতি।যখন একজন গবেষণাহীন, অযোগ্য ব্যক্তি অধ্যাপক হয়ে বসেন, তখন সেটি কেবল ব্যক্তিগত অনৈতিকতা নয়, জাতির প্রতি এক ধরনের প্রতারণা।এখনই সময় সত্যের মুখোমুখি হওয়ার। যদি আমরা এই অযোগ্যতার সংস্কৃতিকে বন্ধ না করি, তবে ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ব্যবসার কেন্দ্র নয়, জ্ঞানের কেন্দ্র হতে হবে। একমাত্র তখনই আমরা গর্ব করে বলতে পারব—বাংলাদেশের অধ্যাপক মানে জ্ঞানের আলো, না যে শুধু একটি পদবি।

লেখক পরিচিতি:

ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান , গবেষক এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোফেসর , ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি (MSU), মালয়েশিয়া।

খুঁজুন