শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত সাংবাদিকদের ওপর নিপীড়ন বন্ধ হোক

সাংবাদিকদের ওপর নিপীড়ন বন্ধ হোক

নুরুল ওয়াহিদ লেখক,সাংবাদিক :

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা পাক বাংলাদেশে সাংবাদিকতা এখন আর শুধু একটি পেশা নয় এটি যেন ধৈর্য, সাহস এবং আত্মত্যাগের পরীক্ষায় অবিরাম অংশগ্রহণ। সময়ের পরিক্রমায় গণমাধ্যম একদিকে যেমন বিকশিত হয়েছে, অন্যদিকে তার অস্তিত্ব এবং স্বাধীনতা বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। 

সাম্প্রতিক সময়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং নিউস্পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে, তা দেখে স্পষ্টভাবে অনুমান করা যায় বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে। বাস্তবতার নির্মম চিত্র নোয়াবের হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে ৪৯৬ জন সাংবাদিক নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৬৬ জনকে একটি গণ-অভ্যুত্থান সংক্রান্ত হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে যেখানে তাদের ভূমিকা ছিল কেবল ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ ও প্রতিবেদন করা। এর পাশাপাশি তিনজন সাংবাদিক দায়িত্ব পালনের সময় প্রাণ হারিয়েছেন, যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণমাধ্যমের নিরাপত্তা প্রশ্নে এক ভয়ঙ্কর বার্তা বহন করে।

তথ্য সংগ্রহের অধিকার ও সাংবাদিকতার নিরাপত্তা না থাকলে, একটি রাষ্ট্রের গণতন্ত্র কেবল কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। ২৪ জন সাংবাদিককে চাকরি থেকে অপসারণ, ৮টি সংবাদপত্রের সম্পাদক, ও ১১টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের বার্তাপ্রধানকে বরখাস্ত করার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা দেখায় যে, শুধু মাঠ পর্যায়ে নয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সাংবাদিকেরাও আজ রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপের শিকার। আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ভয়ের সংস্কৃতি এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো সাংবাদিকদের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ (self-censorship) বেড়ে যাওয়া।

যখন সাংবাদিক জানেন তাদের কোনো প্রতিবেদন বা মন্তব্যের কারণে গ্রেপ্তার, চাকরি হারানো, এমনকি প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে, তখন তারা সত্য বলার পরিবর্তে নীরব থাকেন। এর ফলে রাষ্ট্রে তথ্যের অবাধ প্রবাহ ব্যাহত হয়, এবং জনগণ প্রকৃত তথ্য থেকে বঞ্চিত হন। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশের অবস্থান সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে (World Press Freedom Index) বাংলাদেশের অবস্থান প্রতিবছরই অবনমন হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করা হলেও, বাস্তবে দেশে সাংবাদিকদের অধিকার ও নিরাপত্তার সুরক্ষায় উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখা যায় না। এমনকি অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় সংবিধানে থাকা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাস্তবে প্রয়োগ করা হয় না। গণতন্ত্রের জন্য স্বাধীন গণমাধ্যম কেন গুরুত্বপূর্ণ? সাংবাদিকরা জনগণের চোখ ও কান। তারা সত্য উদঘাটন করে, দুর্নীতিকে উন্মোচন করে, শোষণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে।  

তারা নিছক কোনো পেশাজীবী নন, বরং গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ। তাদের নিপীড়ন মানে, রাষ্ট্রের এক স্তম্ভ ধ্বংস করা। গণমাধ্যমকে যদি দলীয় বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতিয়ার বানানো হয়, তাহলে তা কেবল সাংবাদিকতার জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্যই এক বিপর্যয় ডেকে আনবে। আমাদের স্পষ্ট অবস্থান আমরা মনে করি, এখনই সময় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। সlogans, বক্তৃতা কিংবা শোভাযাত্রা নয় প্রয়োজন আইনি ও নীতিগত সুরক্ষা।

 আমাদের দাবি ও সুপারিশ: ১. সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত হয়রানিমূলক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। ২. সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হত্যা ও হুমকির ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ৩. সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের সম্পাদনা নীতিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। ৪.তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করতে এবং তথ্য অধিকার আইন কার্যকর করতে হবে। ৫.গণমাধ্যম মালিক ও সাংবাদিকদের মাঝে পেশাগত ন্যায্যতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সুরক্ষা নিশ্চিতে নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। ৬.আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।

 সাংবাদিকতা কোনো অপরাধ নয়। সত্য বলা কোনো বিদ্রোহ নয়। সংবাদ সংগ্রহ বা প্রকাশ করা রাষ্ট্রদ্রোহ হতে পারে না। সাংবাদিকরা সাহসের সঙ্গে কাজ করলে সমাজ এগিয়ে যায়; আর যদি তারা ভয় পেয়ে চুপ থাকেন, তবে তা কেবল সাংবাদিকতার পরাজয় নয়, আমাদের সবারই পরাজয়। আজ সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়ানোর সময়। আজ সত্যের পক্ষে কলম ধরার সময়। আজ রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকদের সম্মিলিতভাবে বলতে হবে স্বাধীন সাংবাদিকতা রক্ষা করো, মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করো। 

খুঁজুন