শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ : সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনএপি) বার্ষিক ফ্রন্টিয়ার্স রিপোর্ট-২০২২শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শব্দদূষণে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহর হিসেবে স্থান পেয়েছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (হু) নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবাসিক এলাকার জন্য অনুমোদনযোগ্য শব্দসীমার মাত্রা ৫৫ ডেসিবেল। এছাড়া বাণিজ্যিক এলাকা ও যেখানে যানজট রয়েছে সেখানে এই মাত্রা ৭০ ডেসিবেল। ঘনবসতিপূর্ণ ও ব্যাপক যানজটের শহর ঢাকায় শব্দের মাত্রা পাওয়া যায় ১১৯ ডেসিবেল। পরিবেশগত শব্দের উৎস হিসেবে রাস্তার যানজট, বিমান চলাচল, রেল চলাচল, যন্ত্রপতি, শিল্প ও বিনোদনমূলক কর্মকান্ডকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ধরনের শব্দ শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে বলেও উল্লেখ করা হয়। অন্য এক গবেষণা মতে, ঢাকার অনেক জায়গায় শব্দমাত্রা ১০৭ ডেসিবল পর্যন্ত ওঠে। ৬০ ডেসিবেলের ঊর্ধ্বে শব্দ মানুষকে সাময়িক এবং ১০০ ডেসিবেলে ঊর্ধ্বে শব্দে মানুষ চিরতরে শ্রবণশক্তি হারাতে পারে। থার্টিফাস্ট নাইট উদযাপনে এবারে ছিল ঢাকাজুড়ে আতশবাজি আর পটকা ফাটানোর গগনবিদারী মুহুর্মুহু শব্দ। আবার সড়কে ও অলিগলিতে চলেছে ভুঁভুজেলার বিরামহীন ধ্বনি। ফাঁকা রাস্তায় প্রাইভেটকার আর মোটরসাইকেলের হর্নের তীব্র শব্দে দিশেহারা ছিল জনগণ। বর্ষবরণের মতো উৎসব ছাড়াই বছরজুড়ে শব্দের সহনশীল মাত্রার চেয়ে দুই থেকে তিনগুণ তীব্র শব্দ প্রতিনিয়ত ঢাকাবাসীর কর্ণকুহরে এসে আঘাত হানে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত রাস্তায় যানবাহনের ভিড় কম থাকায় ভারী সব ট্রাক, মালপত্র বহনকারী লোডার অহেতুক হর্ন বাজিয়ে তীব্র বেগে ছুটে চলে। বিকট শব্দে হঠাৎ মানুষের ঘুম ভেঙে যায়। বেড়ে যায় হৃদকম্পন। ঘরে, বাইরে সুরবর্জিত শব্দ মানুষের কানে ঢুকে দেহমনের যে ক্ষতি করে চলেছে তা বেশির ভাগ মানুষ টেরই পায় না। শব্দ যদি উচ্চমাত্রার হয় তাহলে সে ক্ষতি হবে অপূরুীয়। গ্লোবাল সিটিস ইনস্টিটিউশনের এমন সমীক্ষায় দেখা যায়, রাজধানীতে প্রতিনিয়ত যে ধরনের শব্দদূষণ ঘটছে তাতে বসবাসকারী মানুষের এক-চতুর্থাংশ কানে কম শোনে এবং এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৩৫ সাল নাগাদ ৪৫ ভাগ মানুষ কানে কম শুনবে। এ হিসাবে ২০৪৫ সালে প্রায় দেড় কোটির বেশি মানুষ শব্দদূষণে আক্রান্ত হয়ে শ্রবণশক্তি হারাবে। মানব-সত্যতার বিকাশমান ধারায় অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পের দ্রুত প্রসার, পরিবহনের অবাধ প্রবাহ প্রতিনিয়ত সুরবর্জিত শব্দের বিস্তার ঘটাচ্ছে। ফলে শব্দদূষণও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্কুল-কলেজ, হাসপাতালের মতো স্পর্শকাতর স্থানেও এসব তীব্র শব্দের রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি নেই।

এছাড়া রেলওয়ে ট্রেনের হুইসেলের শব্দ ৯০ ডেসিবেলের ঊর্ধ্বে, যা মানুষের শ্রবণক্ষমতার বাইরে। অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনেক সময় জেনারেটর ব্যবহারের ফলে শব্দদূষণের সৃষ্টি হয়। প্রচারের কাজে, সভায় বক্তৃতাকালে এবং অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে মাইক ব্যবহারেও শব্দদূষণ ঘটে। আতশবাজির শব্দে তীব্্র শব্দদূষণ হয়। বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি চালানোর শব্দ এলাকায় দূষণের সৃষ্টি করে। এ ধরনের শব্দের মাত্রা সাধারুত ৮০ থেকে ১০০ ডেসিবেল হয়ে থাকে। শিল্পকারখানার ব্যবহৃত সাইরেন থেকে ১৪০ ডেসিবল মাত্রার তীব্র শব্দ উত্থিত হয়। বিমানবন্দর এলাকায় বসবাসকারীদের কাছে বিমান উড্ডয়ন এবং অবতরণের সময় প্রায় ১১০ ডেসিবেলের শব্দদূষণ হয়ে থাকে। সুরবর্জিত উচ্চ তীব্রতাসম্পন্ন শব্দ মানবদেহে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করে। শব্দদূষণের প্রত্যক্ষ প্রভাবে মানুষের শ্রবণশক্তির উপর অস্থায়ী বা স্থায়ী যেকোন ধরনের ক্ষতি হতে পারে যা কালক্রমে শ্রবণশক্তিহীনতা থেকে বধিরত্বে রূপ নিতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, সুরবর্জিত তীব্র শব্দ পরোক্ষভাবে মানুষের দেহে স্নায়ুতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। স্নায়ুতন্ত্রের ওপর এ ধরনের সুরবর্জিত উচ্চমাত্রার শব্দের প্রভাবে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া, রক্তচাপ, শ্বাসক্রিয়া, দৃষ্টিশক্তি এমনকি মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপে অস্থায়ী বা স্থায়ী প্রভাব ফেলে।

উচ্চমাত্রার শব্দদূষণে হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি পায়। হঠাৎ রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। স্নায়ুতন্ত্রের সক্রিয়তা বেড়ে দেহের চলাচলে গতি-প্রকৃতির ক্রিয়া বিঘ্নিত হতে পারে। হৃৎপিন্ডের ও মস্তিষ্কের কোষের ওপর অক্সিজেনের অভাবজনিত সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। একাগ্রতা হ্রাস পেয়ে হঠাৎ উত্তেজিত হওয়া এবং মাথাধরার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। কখনো উচ্চ মাত্রার সুরবর্জিত শব্দের কারণে কানের পর্দা ছিঁড়ে গিয়ে আংশিক বা পূর্ণ বধিরতা সৃষ্টি হতে পারে। শব্দদূষণে মানবদেহের রক্তের শর্করার ওপর প্রভাব ফেলে। শব্দদূষণে রাত্রিকালীন দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পায়। এমনকি সুরবর্জিত উচ্চমাত্রার শব্দে মানসিক অবসাদ সৃষ্টি ও স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে পারে। আইনানুসারে, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এবং সরকার নির্ধারিত কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে ১০০ মিটার পর্যন্ত এলাকায় গাড়ির হর্ন বাজানো বা মাইকিং করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অথচ রাজধানী ঢাকাসহ দেশের আটটি বিভাগে গাড়ির হর্নকেই প্রধান শব্দদূষণের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

শব্দদূষণ রোধে প্রয়োজন ব্যক্তিগত, প্রযুক্তিগত এবং আইনগত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ। বাড়িঘরে বিনোদনের কাজে ব্যবহৃত রেডিও, টেলিভিশনের শব্দ যথাসম্ভব কমিয়ে শুনতে হবে। পেশাগত কাজে শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্রপাতিতে শব্দ প্রতিরোধক যন্ত্র লাগিয়ে নিতে হবে। আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত লাউড স্পিকারের শব্দ সীমিত রাখতে হবে। এমনকি বাড়িঘরে এবং অফিস-আদালতে উচ্চস্বরে কথা বলা বন্ধ করতে হবে। মূলত যানবাহন, অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ, কলকারখানা থেকে যে অনাকাক্সিক্ষত উচ্চশব্দ উত্থিত হয় তা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে রোধ করা সম্ভব। শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি উন্নত প্রযুক্তি মানসম্পন্ন হলে তা থেকে অপেক্ষাকৃত কম শব্দ রেরোবে যা শব্দদূষণ রোধে সহায়তা করবে। উচ্চমাত্রার শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্রে শব্দ প্রতিরোধক আচ্ছাদন ব্যবহার করলে তা থেকে শব্দদূষণ হবে না। শব্দদূষণ স্থানে শব্দ প্রতিরোধক ডিভাইস ব্যবহার শব্দদূষণ প্রতিরোধে ইতিবাচক ফল দেবে। স্থলপথের পরিবহন এবং বায়ুযানের চলাচলজনিত সামাজিক শব্দদূষণও প্রযুক্তিগত উপায়ে রোধ করা সম্ভব। সড়ক পরিবহনে ব্যবহৃত যানবাহনে কম শব্দ বেরোয়, এ ধরনের ইঞ্জিনের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা জরুরি। বাংলাদেশে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় স্পষ্ট বলা আছে কোন এলাকায়, দিনের কোন সময়ে, কি ধরনের শব্দদূষণ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ বলে বিবেচিত হবে।

শব্দদূষণের জন্য দোষী হিসেবে কেউ প্রমাণিত হলে প্রথম অপরাধের জন্য এক মাসের কারাদন্ড বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অথবা দুই ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে। দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলে ছয় মাসের কারাদন্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ড দেয়ার কথা বলা রয়েছে। বিধান রয়েছে, আবাসিক এলাকায় রাত ৯টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত শব্দের মাত্রা ৪৫ ডেসিবেল এবং দিনের অন্য সময়ে ৫৫ ডেসিবেল অতিক্রম করতে পারবে না। বাণিজ্যিক এলাকায় তা যথাক্রমে ৬০ এবং ৭০ ডেসিবেল। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতের চারপাশে ১০০ মিটার পর্যন্ত নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেখানে রাতে ৪০ ও দিনে ৫০ ডেসিবেল শব্দমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া আছে। ১৯৯৭ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন শহরকে নীরব এলাকা, আবাসিক এলাকা, মিশ্র এলাকা, শিল্প এলাকা ও বাণিজ্যিক এলাকা- এই ৫ ভাগে ভাগ করে এলাকার দিন ও রাত ভেদে শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের অধীনে বলা আছে, সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত নির্মাণকাজে ব্যবহারের কোনো যন্ত্র চালানো যাবে না। ভয়াবহ শব্দ সৃষ্টিকারী হাইড্রলিক হর্ন বন্ধে নির্দেশনা চেয়ে ২০১৭ সালে রিট করা হলে হাইকোর্টের এক আদেশে হাইড্রলিক হর্ন আমদানিও নিষিদ্ধ করা হয়। এ আইনের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন জরুরি। আকাশপথে চলাচলকারী বাহনে কম শব্দদূষণ সৃষ্টিকারী ইঞ্জিন ইতোমধ্যে বের হয়েছে। উৎসব, আয়োজনে মাইক বা লাউড স্পিকার বাজানোর জন্য শব্দসীমা নির্ধারণ করা অত্যাবশ্যক। আতশবাজির মতো উচ্চ মাত্রার শব্দ সৃষ্টিকারী সবাই ধরনের আয়োজন বন্ধ করা জরুরি। বাড়িঘরে, স্কুল-কলেজে, হাট-বাজারের মতো জায়গায় নিচু স্বরে কথা বলার অভ্যেস করতে হবে। শব্দদূষণ রোধে জনসচেতনতার পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং ব্যক্তিগত গাড়িচালক, বাসচালক, ট্রাকচালকদের সচেতনতা বৃদ্ধি শব্দদূষণ রোধে সহায়ক হতে পারে।

আগামীতে বর্ষবরণের মতো অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসের বশবর্তী হয়ে শিশু-কিশোররা যাতে বেশি বাড়াবাড়ি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে সেদিকে মা-বাবাকে খেয়াল রাখতে হবে। আতশবাজি বা পটকা ফুটানোর নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে শিক্ষকরা তাদের শিক্ষার্থীদের বোঝাতে পারেন। বর্ষবরণের মতো কোনো আনন্দ উদযাপনের পথ বন্ধ করে দিলে হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই উন্মুক্ত কোনো স্থানকে বিশেষ জোন করে উৎসব পালনের জন্য নির্ধারণের কথা ভাবা যায়। দেশের শিল্পপতি, ব্যবসায়ীরা তাদের মালিকানাধীন শিল্পকারখানার শব্দ নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারেন। রাজনৈতিক সভা সমাবেশে কম শব্দের লাউডস্পিকার ব্যবহার করে শব্দদূষণ কমিয়ে আনা যায়। শব্দদূষণকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে গাড়ির হর্ন এবং মাইকের উচ্চশব্দ নীতি নির্ধারকরা সহজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও জরুরিভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতে হবে।

[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ও শিক্ষক]

 

খুঁজুন