শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত সমাজ বদলাতে চরিত্রের পরিবর্তন প্রয়োজন

সমাজ বদলাতে চরিত্রের পরিবর্তন প্রয়োজন

মাজহারুল ইসলাম মাসুম, সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক, গবেষক :

প্রতিদিন শিশু, বৃদ্ধা পর্যন্ত ধর্ষিত হচ্ছে। শিক্ষক, পেশাজীবী সব শ্রেণির মানুষ প্রায় সময় দেখা যাচ্ছে ধর্ষণে জড়িত। ইদানীং মাদরাসা অধ্যক্ষ, শিক্ষককে দেখা যাচ্ছে বেশি ধর্ষণে জড়িত হতে। অথচ মাদরাসা শিক্ষক হচ্ছে ইসলামি শিক্ষার গুরু।

সমাজে ভালো কাজের উপদেশ, ধর্মীয় শিক্ষা, ধর্মীয় জ্ঞান মাদরাসা শিক্ষকরা যুগ যুগ ধরে দিয়ে আসছেন। কলেজ, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের ঘৃণ্য খারাপ কাজে নিয়োজিত হতে প্রায় পত্রিকায় খবরে প্রকাশ পাচ্ছে। ধর্ষণ এই চিত্র আজকাল বেশি বেশি প্রকাশ পাচ্ছে। কিন্তু অনেকে বলেন, ধর্ষণ আগেও সমাজে ছিল। তখন নারী সমাজ প্রতিবাদ করত না, তা প্রকাশ পেতও না। তখন নারী সমাজ শিক্ষিত, প্রতিবাদ শিখেছে। তাদের সাহস হয়েছে। তাই ঘটনা খবরের কাগজের খবর হয়ে প্রতিনিয়ত বের হচ্ছে।
অনেকে বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি রয়েছে। ঘটনা ঘটছে। তা ওইসব দেশে তেমন প্রকাশ পায় না। কিন্তু আমাদের দেশে প্রকাশ বেশি। কিন্তু প্রতিবেশী দেশ ভারতেও যৌন হয়রানি, ধর্ষণ ঘটনা বেশ ঘটছে। প্রকাশও পাচ্ছে। নারী জাতিকে স ষ্টা অনেক বেশি সম্মান, মান-মর্যাদা ও অধিকার দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু আমরা কি সেই সম্মান রক্ষা করে চলতে পারছি। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোয় নারীকে সম্মান অধিকার দিয়ে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। নারী-পুরুষের কোনো ভেদাভেদ উন্নত দেশগুলোয় এখন নেই। শুধু অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে নারী এখনও অবহেলিত।
একসময় আমাদের দেশে নারীদের এসিড মেরে আহত করার বেশ প্রচলন হয়েছিল। প্রতিদিন যুবকরা কিছু কিছু নারীকে যৌন হয়রানি করত। প্রেমের ভ্রান্ত দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হলে তখন এসিড মেরে ওই নারীকে আহত করত। এখন বেশ কম দেখা যায় এসিড নিক্ষেপ। কেন এসিড নিক্ষেপ কমল। কী কারণ রয়েছে এর পেছনে। সমাজ বিজ্ঞানীরা তখনও এ বিষয়ে গবেষণা প্রকাশ করেননি। নিশ্চয় এসিড নিক্ষেপ কমে যাওয়ার পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
এখনও আমাদের সমাজে অনিয়ম, অন্যায়, আইন অমান্য, ঘুষ, দুর্নীতি নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় প্রতিদিন অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্যের নানা খবর দেশে আসছে। বর্তমান সরকারও এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে বেশ সোচ্চার। দুর্নীতি দমন কমিশনও এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে সক্রিয়। বেশ কিছু মামলা হয়েছে। অনেক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। নতুন নতুন অনুসন্ধান চলেছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে। পত্রপত্রিকায়ও প্রকাশ পাচ্ছে। সরকারও বেশ কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে বলে ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি বেশ কম হচ্ছে। কেন এ অবস্থার সৃষ্টি হলো। কিংবা আমাদের উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।
বাংলাদেশি বিপুলসংখ্যক ধনী ব্যক্তি সুইস ব্যাংকে প্রচুর অর্থ জমা রেখেছেন। ব্যাংকে অর্থ কীভাবে জমা হয়েছে, তা নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। শুধু যে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার হয়েছে তা নাও হতে পারে। এই অর্থ বিদেশে উপার্জিত অর্থ থেকেজমাও হতে পারে। শুধু যে পাচারের টাকা জমা হয়েছে তা নয়।

কেন এসব ঘটছে :

 আমরা এগিয়ে চলেছি। আমাদের চরম উন্নতি হচ্ছে বলে আমাদের রাষ্ট্রীয় ঘোষণা রয়েছে। রাষ্ট্র এগিয়ে চলেছে। কিন্তু জনগণ তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে যেন বারবার হোঁচট খাচ্ছে। চলতি বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষা-দীক্ষা ও উন্নয়নে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এরই পাশাপাশি দেশের সমাজব্যবস্থায় বিভিন্ন কারণে বাড়ছে অস্থিরতা, বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা, বাড়ছে হতাহতের ঘটনা।
খবরের কাগজ উল্টালেই চোখে পড়ছে ধর্ষণ, আত্মহত্যা, খুন, শিশু নির্যাতন, সন্ত্রাসবাদ, মাদক, মারামারি আর হানাহানির খবর। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ মূল্যবোধ তথা মানুষগুলোর নৈতিক অবক্ষয়। পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধন ঢিলে হয়ে যাওয়া এবং অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়ার
বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য।


বাড়ছে পারিবারিক কলহ: পরিবার আমাদের সমাজব্যবস্থার অন্যতম মূল ভিত্তি। এ সময়টায় বিভিন্ন কারণে পারিবারিক কলহের ঘটনা বেড়ে গেছে। বেড়ে গেছে পরিবারের এক সদস্যের হাতে আরেক সদস্যের খুন হওয়ার ঘটনা। স্বামী-স্ত্রীর কলহের জেরে প্রাণ দিতে হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুদের।

পারিবারিক কলহের কারণে পরিবারের সবাই একসঙ্গে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে। মানুষ এখন শুধু ঘরের বাইরেই নয়, তার আপনজনদের কাছেও নিরাপদ নয়। বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ বিভাগের তথ্যানুযায়ী বছরে মোট হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৪০ শতাংশ সংঘটিত হচ্ছে পারিবারিক কলহের কারণে।


অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলছেন
: অভাব-অনটন, অর্থের প্রতি প্রবল দুর্বলতা, চাওয়া-পাওয়ার অসংগতির কারণে দাম্পত্য কলহ ও স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের প্রতি বিশ্বাসহীনতা, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অস্থিরতা, অন্য দেশের সংস্কৃতির আগ্রাসন, স্বল্প সময়ে ধনী হওয়ার আকাক্ষা, বিষন্নতা ও মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন কারণে সামাজিক অশান্তি বাড়ছে। পুলিশ সদর দফতর সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য মতে, দেশে প্রতিদিন গড়ে খুন হচ্ছে ১৪ থেকে ১৫ জন। আর এর অধিকাংশই পারিবারিক ও সামাজিক অস্থিরতার কারণে।


মনোবিজ্ঞানী মোহিত কামাল জানান
: সমাজে কেউ অপরাধী হয়ে জন্ম নেন না। মানুষ অপরাধী হয়ে ওঠে পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে। বেশিরভাগ সময়ে সে পরিবেশ তার কাছের মানুষরাই তৈরি করে দেয়। কখনও কখনও সমাজে মানুষদের আচরণ, অসহযোগিতার কারণে পরিবারে, সমাজে দ্বন্দ্ব সংঘাতের মাত্রা বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে মানসিক যন্ত্রণা বা মনোকষ্টে ভুগলে এসব হতে পারে। এ জন্য কাউন্সিলিং দরকার। প্রত্যেককে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে।


একাকিত্ব থেকে অশান্তি: একাকিত্ব মানসিক বিষন্নতা সৃষ্টির অনেক বড় একটা কারণ। অনেক সংসারেই স্বামীরা বুঝতে পারেন না তার কাজের ব্যস্ততার কারণে স্ত্রীকে একদম সময় দেওয়া হচ্ছে না। এ জন্য অফিসে গেলে মাঝে মধ্যে স্ত্রীকে ফোন দিতে হবে। মাঝে মধ্যে কী করছে না করছে সেটির খোঁজ নিতে হবে।

অফিস থেকে আসতে দেরি হলে বাসায় জানাতে হবে। নিজের ব্যস্ততার বিষয়টি স্ত্রীকে বোঝাতে হবে। আবার স্ত্রীকেও স্বামীর ব্যস্ততা বুঝতে হবে। ব্যস্ততার মাঝেও সপ্তাহে অন্তত একটা দিন স্ত্রীকে নিয়ে বিনোদনের জন্য পার্ক বা দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে যাওয়া, সিনেমা দেখা, রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়ার অভ্যাস করতে হবে। কোনো কারণে স্ত্রী যদি বুঝতে পারে তার স্বামী তাকে যথেষ্ট সময় দিচ্ছেন না, তাহলে তাদের মধ্যে দূরত্বের সৃষ্টিই হবে। একাকিত্বের ফাঁদে পড়ে মেয়েরা অনৈতিক কোনো সম্পর্ক বা মানসিক রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।


দাম্পত্য জীবনে অতৃপ্তি: বিয়ে বা সাংসারিক জীবনে কোনোভাবেই যৌনতাকে বাদ দেওয়া যাবে না। বরং যৌনতাকে ঘিরেই দাম্পত্য জীবনে গতি আসে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, কোনো সংসারে অভাব-অনটন থাকলে যতটা অশান্তি হবে তার চেয়ে ভয়াবহ অশান্তি হবে যদি কোনো দম্পতির যৌনজীবন সুখের না হয়। পরকীয়া বা বিবাহ বিচ্ছেদের সবচেয়ে আদিম কারণ শারীরিক চাহিদা অপূর্ণ থাকা।
 স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি, হতাশা বা দূরত্ব বাড়ার অন্যতম একটি কারণ হলো শারীরিক চাহিদা অপূর্ণ থাকা। আমাদের দেশের অধিকাংশ ছেলে জানে না, একটা মেয়েকে কীভাবে শারীরিকভাবে সুখী করতে হয়। অনেকেই জানেন না, আদিম এই খেলায় ছেলের পাশাপাশি মেয়েরও পরিপূর্ণতা বা সন্তুষ্ট হওয়ার একটা ব্যাপার আছে।

মেয়েদের অর্গাজম ঘটানোর ব্যাপারেও উদাসীন ছেলেরা। ছেলেদের যৌনজ্ঞানের অভাব মেয়েদের চরমানন্দ থেকে বঞ্চিত করে। এভাবে দিনের পর দিন মেয়েরা বঞ্চিত হতে হতে একটা সময় তাদের মধ্যে এক ধরনের উদাসীনতা বা হতাশার সৃষ্টি হয়। আমাদের দেশের ছেলেরা মনে করে, মেয়েরা শুধু ভোগের বস্তু।
বিছানায় নিজের সন্তুষ্টি অর্জন হলেই সব শেষ। সঙ্গীর জৈবিক চাহিদার ব্যাপারে কোনো তোয়াক্কা নেই। এরকম ঘটনা যে শুধু ছেলেদের ক্ষেত্রেই ঘটে, সেটি নয়। অনেক মেয়েও তার সঙ্গীর শারীরিক চাহিদা পূরণে সচেতন, কিংবা আগ্রহী নন। এই শারীরিক অপূর্ণতাই পর-পুরুষ বা পর-নারীতে আগ্রহের সৃষ্টি করে। কাজেই শারীরিক চাহিদা পূরণের ব্যাপারে উভয়কে সচেতন হতে হবে।

খুঁজুন