মাজহারুল ইসলাম মাসুম, সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক, গবেষক :
ভাইরাল হওয়া খবরে দেখলাম, ‘অসামপ্ত আত্মজীবনী’ সাবেক আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারীর লেখা। দাবি করা হয়েছে, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের দায়িত্বে থাকাকালে ১২৩ জনের দল নিয়ে বইটি লেখেন জাবেদ পাটয়োরী। তবে দাবিটি ভীষণ দুর্বল।
কারণ, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ প্রকাশ পেয়েছে ২০১২ সালের ১৯ জুন। আর জাবেদ পাটোয়ারী এসবির দায়িত্ব পান ২০১৩ সালে।
খবরে দাবি করা হয়েছে বইটি ‘লেখায়’ যুক্ত ১২৩ জনের দলের প্রত্যেকে রাজধানীর ধানমন্ডি, মিরপুর, বসুন্ধরায় ফ্ল্যাট এবং এক কোটি করে টাকা পেয়েছেন। এই ‘১২৩ জনের’ তথ্যের একমাত্র সূত্র এসবি।
কিন্তু ৩ মিনিট ২২ সেকেন্ডর খবরে নেই, কারা এই ১২৩ জন। জাবেদ ছাড়া কারো নাম পরিচয় নেই। অজ্ঞাত এই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিতরণ করা কথিত ফ্ল্যাটগুলো কোথায়? কত নম্বর সড়কের কোন ভবনে? ফ্ল্যাট কী সরকারি না বেসরকারি? টাকা কী সরকার না অন্য কেউ দিয়েছে? এসব প্রশ্নের জবাব নেই।
ঘেঁটে জানা গেলো, ধানমন্ডি এবং বসুন্ধরা এলাকায় সরকারি ফ্ল্যাট প্রকল্প নেই। সুতরাং কাউকে ২০১২ সালের পর এইসব এলাকায় ফ্ল্যাট দেওয়ার সুযোগ নেই। মিরপুরের ভাসানটেক এলাকায় দরিদ্রদের জন্য ৬০০ বর্গফুট আয়তনের ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প রয়েছে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের। এসব ফ্ল্যাট পুলিশের ‘হেডমওয়ালা’ অফিসার নেবেন বলে বিশ্বাস হয় না।
রাতের ভোট বাস্তবায়নের মাস্টারমাইন্ড জাবেদেকে ২০১৮ সালের নির্বাচনের ১০ মাস আগে আইজিপি পদে বসান শেখ হাসিনা। তিনি আইজিপি হওয়ার আগে ২০১৭ সালের মার্চে প্রকাশিত শেখ মুজিবুর রহমানের ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইটি সংকলনে সহায়তা করেন। জেল থেকে বঙ্গবন্ধুর ডায়রি উদ্ধার করেন।
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’ বই দুটিতে এমন কোন তথ্য নেই- যা ইতিহাসের বিপরীত। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রতি তরুণ শেখ মুজিবের ব্যাপক ভক্তির কথা রয়েছে। জিন্নাহকে কায়েদ-ই-আজম নামেই লিখেছেন পাকিস্তান আন্দোলনকারী ছাত্রনেতা মুজিব। যদি বইটি শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর গোস্ট রাইটার দিয়ে লেখানো হতো, রাজনৈতিক কারণে নিশ্চিতভাবেই জিন্নাহ থাকত না।
এবার আসল ঘটনা বলি। শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে পাকিস্তানি আমলের গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংকলিত ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অফ দা নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ বইটি জাবেদ পাটোয়ারীর নেতৃত্বাধীন এসবি সংকলন করে। ২০১৮ সাল থেকে প্রকাশ শুরু হয়।
হাক্কানি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বইটি ১৪ খন্ডের। ২০১৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় খন্ডের প্রকাশনী অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০০৯ সালে আবার যখন আমরা সরকার গঠন করি তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এটা প্রকাশ করার। এ তথ্যগুলো আরও সমৃদ্ধ আকারে বের করার জন্য আমি আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারীকে দায়িত্ব দেই। তার নেতৃত্বে ২০ থেকে ২২ সদস্যের একটা টিম রাত দিন অত্যন্ত পরিশ্রম করেছে। তাদের আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সেই সঙ্গে যারা আমাদের এই বই প্রকাশ করছেন হাক্কানী পাবলিশার্স তাদেরও আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। এর জন্য আমরা আলাদা একটি অফিস করেছি’। (সূত্র-জাগো নিউজি)
মূল আলাপ হল, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত বইয়ের সংকলনে সরকারি বেতনভোগী এসবির ২০-২২ কর্মকর্তা-কর্মচারী সার্বক্ষনিক নিয়োজিত থাকতে পারেন কিনা? প্রধানমন্ত্রী সরকারি কর্মচারীদের তাঁর বাবার জন্য প্রকাশিত বইয়ের কাজে ব্যবহার করতে পারেন? প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কাজ করে দেওয়ায়, সেই সরকারি কর্মচারীরা বিশেষ সুবিধা পেয়েছিলেন কি না?
নিউজে এসব প্রশ্ন এবং জবাব এলে খুশি হতাম। কিন্তু এসবির ‘তথ্যের’ ভিত্তিতে রিপোর্ট করতে গিয়ে ঘটনাপ্রবাহ, ফ্যাক্ট, ডকুমেন্ট, লজিক এলোমেলো হয়ে গেছে।
জাবেদ পাটোয়ারি আইজি হওয়ার পর প্রকাশিত খবরের একটিতে বলা হয়েছে, ‘১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এসবির রেকর্ড রুমে বঙ্গবন্ধুর বিষয়ে ৬৬ হাজার ক্লাসিফাইড গোয়েন্দা তথ্য সংরক্ষিত আছে। জাবেদ পাটোয়ারী এসবির শীর্ষ পদে আসার পর গুরুত্বপূর্ণ এই দলিলাদি বিশেষভাবে সংরক্ষণে বিশেষ উদ্যোগ নেন’। (সূত্র- ইটিভি অনলাইন)
ঘটনাপ্রবাহ এবং তথ্য বিশ্লেষণ করলে নিশ্চিত হওয়া যায়, জাবেদ পাটোয়ারী ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নয় জাবেদ পাটোয়ারীর লেখা নয়। বরং তা শেখ মুজিবের ডায়রির সংকলন।
জাবেদ পাটোয়ারী আদতে শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে পূর্ব পাকিস্তান পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (আইবি) প্রতিবেদন থেকে প্রণীত বইয়ের সংকলনকারী মাত্র, লেখক নন।
বছর দেড়েক আগেও খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, বিএনপি, জামায়াত সম্পর্কে যা তা খবর প্রচার প্রকাশ হতো। কারণ, তাদের প্রতিকারের ক্ষমতা ছিল না। এতে আমাদের সাংবাদিকতার মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়েছে। এখন আওয়ামী লীগ, শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা সম্পর্কে ভুল ভুয়া খবর প্রকাশ করলে, মাইরের ভয় নেই। কিন্তু এতে সাংবাদিকতার উন্নতি নয়, আরও অধঃপতন হবে।
ভাইরাল হওয়া খবরে দেখলাম, ‘অসামপ্ত আত্মজীবনী’ সাবেক আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারীর লেখা। দাবি করা হয়েছে, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের দায়িত্বে থাকাকালে ১২৩ জনের দল নিয়ে বইটি লেখেন জাবেদ পাটয়োরী। তবে দাবিটি ভীষণ দুর্বল।
কারণ, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ প্রকাশ পেয়েছে ২০১২ সালের ১৯ জুন। আর জাবেদ পাটোয়ারী এসবির দায়িত্ব পান ২০১৩ সালে।
খবরে দাবি করা হয়েছে বইটি ‘লেখায়’ যুক্ত ১২৩ জনের দলের প্রত্যেকে রাজধানীর ধানমন্ডি, মিরপুর, বসুন্ধরায় ফ্ল্যাট এবং এক কোটি করে টাকা পেয়েছেন। এই ‘১২৩ জনের’ তথ্যের একমাত্র সূত্র এসবি।
কিন্তু ৩ মিনিট ২২ সেকেন্ডর খবরে নেই, কারা এই ১২৩ জন। জাবেদ ছাড়া কারো নাম পরিচয় নেই। অজ্ঞাত এই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিতরণ করা কথিত ফ্ল্যাটগুলো কোথায়? কত নম্বর সড়কের কোন ভবনে? ফ্ল্যাট কী সরকারি না বেসরকারি? টাকা কী সরকার না অন্য কেউ দিয়েছে? এসব প্রশ্নের জবাব নেই।
ঘেঁটে জানা গেলো, ধানমন্ডি এবং বসুন্ধরা এলাকায় সরকারি ফ্ল্যাট প্রকল্প নেই। সুতরাং কাউকে ২০১২ সালের পর এইসব এলাকায় ফ্ল্যাট দেওয়ার সুযোগ নেই। মিরপুরের ভাসানটেক এলাকায় দরিদ্রদের জন্য ৬০০ বর্গফুট আয়তনের ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প রয়েছে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের। এসব ফ্ল্যাট পুলিশের ‘হেডমওয়ালা’ অফিসার নেবেন বলে বিশ্বাস হয় না।
রাতের ভোট বাস্তবায়নের মাস্টারমাইন্ড জাবেদেকে ২০১৮ সালের নির্বাচনের ১০ মাস আগে আইজিপি পদে বসান শেখ হাসিনা। তিনি আইজিপি হওয়ার আগে ২০১৭ সালের মার্চে প্রকাশিত শেখ মুজিবুর রহমানের ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইটি সংকলনে সহায়তা করেন। জেল থেকে বঙ্গবন্ধুর ডায়রি উদ্ধার করেন।
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’ বই দুটিতে এমন কোন তথ্য নেই- যা ইতিহাসের বিপরীত। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রতি তরুণ শেখ মুজিবের ব্যাপক ভক্তির কথা রয়েছে। জিন্নাহকে কায়েদ-ই-আজম নামেই লিখেছেন পাকিস্তান আন্দোলনকারী ছাত্রনেতা মুজিব। যদি বইটি শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর গোস্ট রাইটার দিয়ে লেখানো হতো, রাজনৈতিক কারণে নিশ্চিতভাবেই জিন্নাহ থাকত না।
এবার আসল ঘটনা বলি। শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে পাকিস্তানি আমলের গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংকলিত ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অফ দা নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ বইটি জাবেদ পাটোয়ারীর নেতৃত্বাধীন এসবি সংকলন করে। ২০১৮ সাল থেকে প্রকাশ শুরু হয়।
হাক্কানি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বইটি ১৪ খন্ডের। ২০১৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় খন্ডের প্রকাশনী অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০০৯ সালে আবার যখন আমরা সরকার গঠন করি তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এটা প্রকাশ করার। এ তথ্যগুলো আরও সমৃদ্ধ আকারে বের করার জন্য আমি আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারীকে দায়িত্ব দেই। তার নেতৃত্বে ২০ থেকে ২২ সদস্যের একটা টিম রাত দিন অত্যন্ত পরিশ্রম করেছে। তাদের আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সেই সঙ্গে যারা আমাদের এই বই প্রকাশ করছেন হাক্কানী পাবলিশার্স তাদেরও আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। এর জন্য আমরা আলাদা একটি অফিস করেছি’। (সূত্র-জাগো নিউজি)
মূল আলাপ হল, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত বইয়ের সংকলনে সরকারি বেতনভোগী এসবির ২০-২২ কর্মকর্তা-কর্মচারী সার্বক্ষনিক নিয়োজিত থাকতে পারেন কিনা? প্রধানমন্ত্রী সরকারি কর্মচারীদের তাঁর বাবার জন্য প্রকাশিত বইয়ের কাজে ব্যবহার করতে পারেন? প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কাজ করে দেওয়ায়, সেই সরকারি কর্মচারীরা বিশেষ সুবিধা পেয়েছিলেন কি না?
নিউজে এসব প্রশ্ন এবং জবাব এলে খুশি হতাম। কিন্তু এসবির ‘তথ্যের’ ভিত্তিতে রিপোর্ট করতে গিয়ে ঘটনাপ্রবাহ, ফ্যাক্ট, ডকুমেন্ট, লজিক এলোমেলো হয়ে গেছে।
জাবেদ পাটোয়ারি আইজি হওয়ার পর প্রকাশিত খবরের একটিতে বলা হয়েছে, ‘১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এসবির রেকর্ড রুমে বঙ্গবন্ধুর বিষয়ে ৬৬ হাজার ক্লাসিফাইড গোয়েন্দা তথ্য সংরক্ষিত আছে। জাবেদ পাটোয়ারী এসবির শীর্ষ পদে আসার পর গুরুত্বপূর্ণ এই দলিলাদি বিশেষভাবে সংরক্ষণে বিশেষ উদ্যোগ নেন’। (সূত্র- ইটিভি অনলাইন)
ঘটনাপ্রবাহ এবং তথ্য বিশ্লেষণ করলে নিশ্চিত হওয়া যায়, জাবেদ পাটোয়ারী ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নয় জাবেদ পাটোয়ারীর লেখা নয়। বরং তা শেখ মুজিবের ডায়রির সংকলন।
জাবেদ পাটোয়ারী আদতে শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে পূর্ব পাকিস্তান পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (আইবি) প্রতিবেদন থেকে প্রণীত বইয়ের সংকলনকারী মাত্র, লেখক নন।
বছর দেড়েক আগেও খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, বিএনপি, জামায়াত সম্পর্কে যা তা খবর প্রচার প্রকাশ হতো। কারণ, তাদের প্রতিকারের ক্ষমতা ছিল না। এতে আমাদের সাংবাদিকতার মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়েছে। এখন আওয়ামী লীগ, শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা সম্পর্কে ভুল ভুয়া খবর প্রকাশ করলে, মাইরের ভয় নেই। কিন্তু এতে সাংবাদিকতার উন্নতি নয়, আরও অধঃপতন হবে।