মহিউদ্দিন সরকার, সিনিয়র সাংবাদিক :
দিন তারিখ ঠিক মনে নেই। অফিস শেষে জিম করে প্রতিদিনকার মতো গুলশান ০১ এর গ্লোরিয়া জিনস কফি শপে আড্ডা দিচ্ছিলাম। আনুমানিক সোয়া ১০ টার দিকে হঠ্যাৎ মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো। প্রেস সচিব শফিক ভাইয়ের ফোন। কি যেন একটা নিউজ নিয়ে কথা বললেন। বেশ উত্তেজিত মনে হল। আমি স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করে বিষয়টা দেখছি বলে উনাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু না উনি মালিকের কাছে অভিযোগ, চাকরি খেয়ে দেয়াসহ আরো কি কি যেন বললেন।
দিন তারিখ ঠিক মনে নেই। অফিস শেষে জিম করে প্রতিদিনকার মতো গুলশান ০১ এর গ্লোরিয়া জিনস কফি শপে আড্ডা দিচ্ছিলাম। আনুমানিক সোয়া ১০ টার দিকে হঠ্যাৎ মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো। প্রেস সচিব শফিক ভাইয়ের ফোন। কি যেন একটা নিউজ নিয়ে কথা বললেন। বেশ উত্তেজিত মনে হল। আমি স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করে বিষয়টা দেখছি বলে উনাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু না উনি মালিকের কাছে অভিযোগ, চাকরি খেয়ে দেয়াসহ আরো কি কি যেন বললেন।
বিষয়টা আমার কাছে একটু অন্যরকম মনে হলো। শফিক ভাইয়ের সাথে জাগো নিউজ থেকে আমার সম্পর্ক ও পরিচয়। মাঝে মাঝে কথা হতো। কিন্তু সেদিনের বিষয়টা মেনে নিতে পারছিলাম না। মাঝে মাঝে সহকর্মীদের কাছ থেকে শুনতাম ড. ইউনূসের প্রেস উইং ঢাকা পোস্টের ব্যাপারে খুবই নেগেটিভ। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সংবাদ সম্মেলন কাভার করতে কার্ড দেয়নি ঢাকা পোস্টকে। আটকে দিয়েছিলেন এসবি পাশ। বিশেষ করে আমার ব্যাপারে সহকারী প্রেস সচিব নাকি বেশি নেগেটিভ ছিলেন।
সেই থেকেই বুঝতে চেষ্টা করতেছিলাম সমস্যাটা আসলে কোন জায়গায়। আমার কাজ করা দুটি হাউজ জাগো নিউজ ও ঢাকা পোস্ট কখনোই কোনো দল বা গোষ্ঠীর পক্ষাবলম্বন করেনি। যতটুকু সম্ভব স্বাধীন সাংবাদিকতা করার চেষ্টা করেছে। আমার সহকর্মীদের সবাই অকপটে এ সত্যটি বলবে। আর সে কারণেই এখনো বাজারে দুটি প্রতিষ্ঠানই পাঠকের প্রিয় হয়ে আছে।
এরপরের ঘটনাটাতো সবারই জানা। এনসিবিটির পাঠ্যপ্রস্তুকে নিম্নমানের কাগজ ও আসিফ নজরুল এবং মাহফুজের নাম করে এক এনসিপি নেতার বেপরোয়া বাণিজ্যের নিউজ প্রকাশ হলো ঢাকা পোস্টে। সারাদেশে শুরু হলো তোলপাড় এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টা ভাইরাল হয়ে গেল। আমার ডাক পড়লো তথ্য মন্ত্রণালয়ে। ঢাকা পোস্টের সিনিয়র রিপোর্টার নূর মোহাম্মদ ও আমি সাড়ে ৫টার দিকে উপদেষ্টার সাথে দেখা করলাম। এক ঘণ্টার সেই মিটিং নিয়ে আরেকদিন লিখবো।
এর মধ্যেই ঢাকা পোস্টে হামলার হুমকি। আমাকে ব্যক্তিগতভাবে ফোনে হত্যার হুমকিসহ আমার ছেলেমেয়েদের স্কুল থেকে তুলে নেয়ার হুমকি দেয়া হল প্রকাশ্যে ফেসবুকে। অবস্থা বেগতিক দেখে রাতে উপদেষ্টার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা রাতে ফোন করে আমার খবর নিলেন। বললেন উপদেষ্টা নিজেও উদ্বিগ্ন আমার নিরাপত্তা নিয়ে।
আমার উপর হামলার হুমকি বা পরদিন মামলা দায়েরের পর মোটেও বিচলিত হইনি। কিন্তু আমার ছেলেমেয়েকে তুলে নেয়ার হুমকির বিষয়টি আমাকে ভাবিয়ে তোলে। কারণ ওদের দুজনের স্কুল ছিল ঢাবি ক্যাম্পাসের উদয়ন স্কুল। ভয় পেয়ে ওদের স্কুলে যাওয়াটা বন্ধ করে দেই। আর তখন ঢাবি ক্যাম্পাসে গিয়ে স্কুলে ক্লাশ করার মতো পরিবেশও ছিল না।
ঘটনার ঠিক ১০/১২ দিন পর বাড্ডা থানার একজন এসআই ফোন দিলেন। আমি মনে করেছিলাম এনসিপি নেতার মানহানির মামলার ব্যাপারে কথা বলবেন। কিন্তু না শুনলাম বাড্ডা থানার একটা হত্যা চেষ্টা মামলায় আমার নাম। তখন আর বুঝতে বাকি রইলো না ঘটনাটা ধীরে ধীরে কোনো দিকে মোড় নিচ্ছে।
দীর্ঘ ২৫ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে কখনোই কারো কোনো ক্ষতি করেছি মনে পড়ে না। পেশাগত কারণে হয়তো অনেকের সাথেই রূঢ় আচরণ করেছি বা চাকরিতে না বলেছি অনেককে। সেটা অবশ্যই প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে অথবা তার ক্যারিয়ারের কথা বিবেচনা করে। পেশার সাথে সাংঘর্ষিক এমন কোনো কাজ করেছি বলে মনে হয় না।
শেষ ৫/৬ বছর চাকরির পাশাপাশি দাতা সদস্য হিসেবে চির্কা চাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। আমি নিজেও এই স্কুলেরই ছাত্র ছিলাম। আমার আগে আমার বাবাও দীর্ঘদিন এই স্কুলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। প্রতিটি মিটিংয়ে ঢাকা থেকে যেতে আমার অনেকগুলো টাকা খরচ হতো। তারপরও যেতাম। মায়ের সঙ্গে দেখা করে আসতাম এই সুযোগে।
এর মধ্যেই সহকর্মীদের কাছ থেকে শুনতে পেলাম ঢাকা পোস্টের সম্পাদক পদের জন্য কেউ কেউ চেষ্টা তদবির করতেছিলেন। আমি নিজের চাকরি নিয়ে কখনোই উদ্বিগ্ন ছিলাম না। বিষয়টি নিয়ে আমার স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করলাম। সেও বেশ চিন্তায় পড়ে গেল। এর মধ্যেই বিভিন্ন মিডিয়া হাউজ দখল/সম্পাদক বদল হতে লাগলো।
তারপর আর যা হবার তাই হলো। নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে চেষ্টা করলাম। শেষ তক দেশ ছেড়ে দেয়ার মতো সিদ্ধান্তই নিলাম। অনেক বড় এবং কঠিন সিদ্ধান্ত। অনেক মিস করি জন্মভূমি বাংলাদেশকে। অনেক মিস করি আমার সহকর্মীদের। আমি জানি সহকর্মীরা আমার উপর রেগে আছে। কারণ ওদের কারো কাছেই বিদায় নিয়ে আসতে পারিনি। আমার পরিবারের একান্ত আপনজন হয়ে উঠা আমার ড্রাইভার স্বাধীনকেও বলে আসতে পারিনি। সবাইকে খুব মিস করি।
গত বছর ঈদুল আযহার পরদিন সকালে স্বপরিবারে দেশ ছেড়ে চলে আসি। ওইদিন না হলে হয়তো আসতেই পারতাম না। দেশ ছেড়ে আসার পরও শুনলাম আরেকটি মামলার খবর। সেটাও বাড্ডা থানায়। মোটামুটি একই ধরনের মামলা।
আজ মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। নিজের কিছু কষ্টের কথা শেয়ার করলাম বন্ধুদের সাথে। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন। বাংলাদেশে বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকারের সময়ে গণমাধ্যম ভালো থাকুক ভালো থাকুক আমার পেশার মানুষজন।