শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত ভালো শিক্ষা মানেই ভালো রেজাল্ট নয়

ভালো শিক্ষা মানেই ভালো রেজাল্ট নয়

শিক্ষা কেবল পরীক্ষার ভালো ফলাফলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—এই কথাটি আজ যত সহজে বলা যায়, তত সহজে মানা হয় না। বর্তমান সমাজে 'সফলতা'র যে সংজ্ঞা তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে মার্কশিট আর উচ্চ বেতনের চাকরি। অথচ, একটি শিশুকে সুশিক্ষিত করে তুলতে প্রয়োজন হয় মানবিকতা, নৈতিকতা, সামাজিক জ্ঞান, এবং জীবনে সমস্যা সমাধানের দক্ষতার মতো গুণাবলির। ভালো রেজাল্ট হয়তো একটি ভালো ভবিষ্যতের দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু একটি সুন্দর জীবন গঠনের জন্য সুশিক্ষা অপরিহার্য। এই সুশিক্ষার পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে অভিভাবকদের এক ধরনের উদাসীনতা বা ভুল ধারণা।

ভালো রেজাল্ট বনাম সুশিক্ষা: ধারণার বদল প্রয়োজন
ভালো রেজাল্ট অবশ্যই পরিশ্রমের ফল এবং তা প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু এটি শিক্ষার একটি অংশ মাত্র, সম্পূর্ণ চিত্র নয়।

ভালো রেজাল্ট: এটি নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রমের জ্ঞান ও মুখস্থ করার ক্ষমতা পরিমাপ করে। এটি সাময়িক চাপ মোকাবিলার কৌশল শেখাতে পারে।

সুশিক্ষা: এটি শেখায় কীভাবে একটি চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে সহানুভূতিশীল ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এটি কৌতূহলকে উদ্দীপিত করে, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা তৈরি করে এবং সামাজিক-আবেগিক বিকাশে সহায়তা করে।

যে অভিভাবক কেবল সন্তানের পরীক্ষার ফল নিয়ে চিন্তিত, তিনি হয়তো ভুলে যান যে প্রকৃত শিক্ষা হল একটি সার্বিক বিকাশ—শারীরিক, মানসিক, সামাজিক এবং নৈতিক বিকাশ।

অভিভাবকদের উদাসীনতা: সুশিক্ষার পথে প্রধান বাধা
সন্তানের সুশিক্ষিত হওয়ার পথে অভিভাবকদের উদাসীনতা বলতে আমরা সাধারণত সময় না দেওয়া বুঝি, কিন্তু বিষয়টি আরও গভীর। এটি মূলত শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভুল ধারণা এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ না নেওয়া।

১. ফলাফলের উপর অতিরিক্ত জোর এবং চাপ
অনেকে মনে করেন, ভালো স্কুলের ফি দেওয়া বা দামি গৃহশিক্ষক রাখা মানেই অভিভাবকত্বের দায়িত্ব শেষ। তারা ক্রমাগত সন্তানের উপর ভালো ফলের জন্য চাপ দেন। এই চাপে শিশুরা খেলাধুলা, শিল্প, সংস্কৃতি বা সৃজনশীল কার্যকলাপ থেকে দূরে সরে যায়। তারা ভুলে যায় যে, অতিরিক্ত চাপ শিশুর স্বাভাবিক কৌতূহল ও শেখার আনন্দকে নষ্ট করে দেয়।

২. উদাহরণের অভাব (Lack of Role Model)
শিশুরা তাদের চারপাশের পরিবেশ এবং বিশেষ করে অভিভাবকদের কাছ থেকে শেখে। একজন অভিভাবক যদি নিজে বই না পড়েন, অন্যের প্রতি অসম্মান দেখান বা অসৎ পথে চলেন, তবে সন্তান যতই ভালো রেজাল্ট করুক না কেন, সে নৈতিকভাবে সুশিক্ষিত হতে পারে না। অভিভাবকরা যখন তাদের সন্তানের সঙ্গে গুণগত সময় (Quality Time) কাটান না এবং কেবল রুটিন মাফিক দায়িত্ব পালন করেন, তখন তাদের মধ্যে মূল্যবোধের সঞ্চার কম হয়।

৩. মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি অমনোযোগিতা
শিক্ষার প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে গিয়ে অনেক অভিভাবকই সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্য উপেক্ষা করেন। তারা বোঝেন না যে আবেগ নিয়ন্ত্রণ, চাপ মোকাবিলা বা ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার মতো দক্ষতাগুলোও সুশিক্ষার অংশ। সন্তানের আবেগিক প্রয়োজন পূরণে উদাসীনতা তার সার্বিক বিকাশে অন্তরায় সৃষ্টি করে।

সমাধানের পথ: অভিভাবকদের সক্রিয় ও সচেতন ভূমিকা
সন্তানকে সুশিক্ষিত করতে অভিভাবকদের অবশ্যই তাদের উদাসীনতা ত্যাগ করে সচেতন হতে হবে।

১. 'প্রসেস'-কে গুরুত্ব দিন, 'প্রোডাক্ট'-কে নয়
ফলাফলের চেয়ে শেখার প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করুন। সন্তান যদি কোনো বিষয়ে আগ্রহ দেখায়, তাকে সেই পথে সহায়তা করুন, তা সে অঙ্ক হোক বা ছবি আঁকা। তার চেষ্টা ও পরিশ্রমের প্রশংসা করুন, কেবল সাফল্যের নয়। ব্যর্থতা একটি শেখার ধাপ, এটি তাকে শেখান।

২. গুণগত সময় এবং কথোপকথন
প্রতিদিন সন্তানের সঙ্গে এমন কিছু সময় কাটান যখন কোনো পড়া বা পরীক্ষার আলোচনা থাকবে না। গল্প করুন, একসঙ্গে বই পড়ুন বা কোনো সামাজিক ঘটনা নিয়ে আলোচনা করুন। এই কথোপকথনগুলি তাকে সমালোচনামূলক চিন্তা করতে এবং মানবিক মূল্যবোধ বুঝতে সাহায্য করবে।

৩. আদর্শ স্থাপন করুন
নিজে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক, সহানুভূতিশীল মানুষ ও কৌতূহলী পাঠক হিসেবে বাঁচুন। শিশুরা যা দেখে, সেটাই শেখে। পরিবেশের প্রতি যত্ন, বয়স্কদের প্রতি শ্রদ্ধা, এবং সততার মতো বিষয়গুলি আপনি যদি নিজের জীবনে অনুশীলন করেন, তবে সন্তান আপনা-আপনিই সুশিক্ষিত হয়ে উঠবে।

উপসংহার:
ভালো রেজাল্ট অর্জন একটি শিক্ষণীয় যাত্রা, কিন্তু সুশিক্ষিত হওয়া একটি জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া। অভিভাবকের উদাসীনতা নয়, বরং তাদের সচেতন অংশগ্রহণ, সময় এবং সঠিক মূল্যবোধের মাধ্যমে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ কেবল সফল নয়, সার্থক হতে পারে। মনে রাখবেন, সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রয়োজন কেবল শিক্ষিত মানুষের নয়, সুশিক্ষিত ও সংবেদনশীল মানুষের। এই পরিবর্তন শুরু করতে হবে প্রতিটি পরিবার থেকে।
 
লেখক : জয়ন্ত সেন, শিক্ষার্থী, আইন ও বিচার বিভাগ, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ

খুঁজুন