শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত ভোগবাদিতা অনেকটা ফোলা বেলুনের মতো

ভোগবাদিতা অনেকটা ফোলা বেলুনের মতো

মাজহারুল ইসলাম মাসুম, সিনিয়র সাংবাদিক লেখক ও গবেষক :

মানুষ যতই সুখের পেছনে ছুটতে থাকে সুখ ততই হাতছাড়া হতে থাকে। এই সুখ খুঁজতে গিয়ে তারা ভোগবাদিতাকে আঁকড়ে ধরে। ভোগবাদিতার প্রেমে পড়ে, যে প্রেমে ত্যাগ থাকে না, লোভ থাকে। চিন্তার স্বকীয়তা থাকে না, পরাধীনতার দাসত্ব থাকে। ভোগবাদিতা অনেকটা ফোলা বেলুনের মতো। যতক্ষণ সেখানে অবরুদ্ধ বাতাস আটকে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত ভোগবাদিতা বিরাজ করে। বাতাসটা বেরিয়ে গেলে ভোগবাদিতাও ফুস করে চুপসে যায়। আইসবার্গ তত্ত্ব বা থিওরি অব ওমিসনে আইসবার্গ হলো এমন একটি বরফের তৈরি স্তর যার বড় অংশটি পানির নিচে থাকে এবং তুলনামূলকভাবে ছোট অংশটি পানির ওপর থাকে। আইসবার্গ তত্ত্বের সঙ্গে কোথায় যেন জীবনের একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। 

মানুষ সব সময় ওপরের দিকে তাকাতে ভালোবাসে কিন্তু নিচের দিকে কখনো তাকাতে চায় না। অথচ মাটির নিচের অদৃশ্য শিকড় যদি না থাকত তবে উদ্ভিদের ওপরের অংশটুকুর কোনো গুরুত্বই থাকত না। মানুষ তার ভেতরের লোভী মানুষটাকে সব সময় দেখতে পায়, ত্যাগী মানুষটাকে কখনো দেখার চেষ্টা করে না। মানুষের পরাজয় এখানেই, যেটাকে মানুষ সব সময় জয় হিসেবে দেখতে ভালোবাসে। আসলে যে মানুষটাকে আমরা জীবন যুদ্ধে হারতে দেখছি হয়তো সে মানুষটা তার মনুষ্যত্বের সঙ্গে লড়াই করে জিতছে। আর যে মানুষটাকে আমরা জিততে দেখছি সে মানুষটা হয়তো তার মনুষ্যত্বের কাছে হারছে। মানুষ মানুষের বাইরেরটা দেখে, ভাবে সে মানুষের সবটাই দেখছে অথচ মানুষ মানুষের বেশিরভাগটাই দেখতে পায় না। যতটুকু মানুষ দেখছে ততটুকু দিয়ে মানুষকে বিচার করা সম্ভব নয়। 

মাঝে মাঝে ইট পাথরের তৈরী সিঁড়িটার দিকে তাকাই | অনেক সময় সেখানে একটা অসহায় মানুষের মুখ  দেখতে পাই | কত মানুষ এই সিঁড়িটাকে পদদলিত করে উপরে উঠেছে তার ইয়ত্তা নেই | সভ্য দুনিয়ার তথাকথিত  মানুষদের দামি  ব্রান্ডের  আধুনিক জুতোর শক্ত আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হয়েছে সিঁড়ির খোলা শরীরটা |  হয়তো ভিতরে ভিতরে রক্তক্ষরণ হয়েছে কিন্তু সেই রক্তক্ষরণের আবেগটাকে কেউ কখনো অনুভূতির শক্তি দিয়ে বোঝার মতো উদারতা দেখাতে পারেনি | সিঁড়িটা অন্তঃদহনে পুড়তে পুড়তে কেঁদেছে অনেক |  

স্বার্থপর, অকৃতজ্ঞ মানুষ অবহেলায় পরে থাকা সিঁড়িটার নির্বাক কান্নাকে কখনো দেখার চেষ্টা করেনি, নিথর দেহের আকুতি কখনো শুনার মতো মন গড়তে পারেনি  | বরং এই সিঁড়িটাকে  তাদের উপরে উঠার দুর্গ বানিয়ে নিলজ্জের মতো হেসেছে | স্যুট-বুট-টাই পড়ে এলিট সমাজে ঢুকেছে অথচ সিঁড়িটার ত্যাগের কথা একবারও ভাবেনি, বরং বড় মুখের বড় মানুষ হয়ে সিঁড়িটাই যেন হয়েছে তাদের অনুগ্রহের পাত্র | একদিন এই সিঁড়িটাতে উঠতে কত অভিনয় তারা করেছে, নাটকের পর নাটক সাজিয়েছে  অথচ সিঁড়িটার প্রয়োজন  যখন ফুরিয়েছে তখন সিঁড়িটা তাদের কাছে মূল্যহীন বস্তুতে পরিণত হয়েছে | তবে এই সিঁড়িটা তাকে বেয়ে যেমন অনেক মানুষকে তর তর করে উপরে উঠতে দেখেছে, ঠিক তেমনি তাদের দ্রুত পতনও দেখেছে | 

তারারা আকাশে যখন ঝুলে থাকে তখন তার সৌন্দর্যের লোভে পড়ে যায় মানুষ, তারারাও ভাবে তার মতো এতো সুন্দর পৃথিবীতে বুঝি আর কেউ নেই |  কিন্তু এই তারাদেরও আকাশ ভেঙে পতন ঘটে, মাটিতে পা ফেলার মতো সময় হয়ে উঠেনা তাদের,   তার আগেই নিজেদের দহনে পুড়তে পুড়তে আকাশেই ছাই হয়ে যায় | সিঁড়ির যেমন থাকার তেমনই থাকে, দলিত-পদদলিত হয় |  মুখোশের মানুষ চিনতে চিনতে তার অপরিবর্তনীয় ত্যাগের মূল্য দিয়েই যায়, কেবল বদলে যায় মানুষ | যাদের দেহের ভিতরে এখন উপরে উঠার লোভ, ঈর্ষা, জিঘাংসা | চারপাশে তাদের সুবিধাবাদিতা, রাজনীতি, লোভীদের দল | যারা এই আছে, এই নেই | 

সিঁড়িটা তো মানুষ না, যা ভাবছি তা হয়তো ভাবছিনা | সিঁড়িটা মাড়িয়ে উপরে উঠা দেহগুলো  কি মানুষের, যা প্রশ্ন করছি তার হয়তো উত্তর খুজঁছিনা | সময় কখনো স্থির থাকেনা, জীবন কখনো থেমে থাকেনা, সব বদলায় |  সব লেখা আছে সিঁড়ির আঘাত করা শরীরের ভিতরে যেখানে সিঁড়ির  নিজে ছাড়া আর অন্য কারো প্রবেশাধিকার নেই | 

আর্নল্ড জোহানস উইলহেলম সমারফিল্ড একজন বিশ্ববিখ্যাত পদার্থবিদ | তার ছাত্র ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ কোয়ান্টাম তত্ত্বে,  ওলফগ্যাং পলি‘ ইপোনিমাস পলি এক্সক্লুসন প্রিন্সিপাল’ তত্ত্বে ,হ্যানস বেথাকে  ‘স্টেলার নিউক্লিয় সিন্থেসিস’ আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কার  পেলেও তিনি পাননি | বার বার সুযোগ এসেছে তবে কথিত আছে তা হাতছাড়া হয়ে গেছে নোবেল বিচারকদের একজনের প্রতিহিংসার কারণে | আলবার্ট আইনস্টাইন তাকে একবার বলেছিলেন,

 “তোমার যে বিষয়টি আমাকে বেশ অভিভূত করে, তা হলো তোমার শিক্ষকতা। যার মাধ্যমে তুমি অনেক নতুন মেধাবী মুখ বের করতে পেরেছ।”

গবেষকের চেয়ে তিনি বড় হয়ে উঠেছিলেন শিক্ষক হিসেবে | যিনি তার শিক্ষকতা দিয়ে যুগান্তকারী সব গবেষক  গড়তে পারেন তাকে কেবল মানুষের পৃথিবীর  নোবেল পুরস্কার দিয়ে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়, কারণ কখনো কখনো ত্যাগ পুরস্কারের চেয়েও অনেক বড় হয়  | তিনি নোবেল পুরস্কার পাননি ঠিকই কিন্তু মনে মনে একটা সান্তনা খুঁজেছেন তা হলো পৃথিবীতে  নোবেল পুরস্কারের বিষয়টি যখন আলোচিত হবে তখন কোন মানুষটি সবচেয়ে বেশি ৮৪ বার  নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েও পুরস্কার অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন সে বিষয়টিও আসবে |  ব্যর্থতা কখনো কখনো সফল মানুষদের চিনিয়ে দেয়  |  সারা পৃথিবীর মানুষ  সফলতার পূজারী হলেও মানুষকে ব্যর্থ করার দায়ভারও  যে সে সময়ের মানুষের  সেটিও আমাদের ইতিহাস ও সময় আঙ্গুল তুলে জানিয়ে দেয় |

লেখক ঃ

[email protected]

খুঁজুন