শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, আর প্রাথমিক শিক্ষা সেই মেরুদণ্ডের ভিত্তি। কিন্তু গত কয়েক দশকে আমাদের দেশে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি প্রক্রিয়াটি একটি অমানবিক 'যুদ্ধে' পরিণত হয়েছিল। পাঁচ-ছয় বছরের একটি শিশুকে খেলার সাথিদের ছেড়ে কোচিং সেন্টারের চার দেয়ালে বন্দি হতে হতো কেবল একটি 'নামি' স্কুলে ভর্তির আশায়। এই অমানবিক প্রতিযোগিতার বিপরীতে সরকারের ‘লটারি পদ্ধতি’ চালুর সিদ্ধান্তটি কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি শিশুদের শৈশব রক্ষার একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।
ভর্তি যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব* : ক্ষতবিক্ষত শৈশব
ভর্তি পরীক্ষার নামে যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলত, তার নেতিবাচক প্রভাব শিশুদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ট্রমা তৈরি করে। যে বয়সে শিশুদের রূপকথার গল্প শোনার কথা, সেই বয়সে তাদের সাধারণ জ্ঞান ও কঠিন গণিত মুখস্থ করতে হতো। এই অতিরিক্ত চাপ শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে এবং পড়াশোনার প্রতি এক ধরণের বিতৃষ্ণা তৈরি করে।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো পরাজয়ের গ্লানি। ভর্তি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া একটি শিশুর মনে এই ধারণা গেঁথে দেয় যে সে ‘অযোগ্য’। কোমলমতি বয়সে এই ব্যর্থতার হীনম্মন্যতা তাদের আত্মবিশ্বাস ধূলিসাৎ করে দেয়, যার প্রভাব বয়ে বেড়াতে হয় সারা জীবন। খেলার মাঠের পরিবর্তে কোচিং সেন্টার আর পাঠ্যবইয়ের চাপে শিশুদের সৃজনশীলতা ও কল্পনাশক্তির মৃত্যু ঘটে এই অসম প্রতিযোগিতার যাঁতাকলে।
বড়দের জন্য পরীক্ষা, ছোটদের জন্য কেন লটারি?
যেকোনো ব্যবস্থার উৎকর্ষ যাচাইয়ে প্রতিযোগিতার প্রয়োজন আছে, তবে তার একটি নির্দিষ্ট সময় ও স্থান থাকা চাই। উচ্চশিক্ষা বা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে ভর্তি পরীক্ষা বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা অত্যন্ত যৌক্তিক। কারণ, প্রাপ্তবয়স্ক একজন শিক্ষার্থী মানসিক ও শারীরিকভাবে চাপের মোকাবিলা করতে সক্ষম এবং সেখানে মেধার বিশেষায়িত মূল্যায়নের প্রয়োজন পড়ে।
কিন্তু পাঁচ বা ছয় বছরের একটি শিশুর মেধা যাচাই করার কোনো বৈজ্ঞানিক মাপকাঠি নেই। এই বয়সে প্রতিটি শিশুই অপার সম্ভাবনাময়। একটি নির্দিষ্ট দিনে এক ঘণ্টার পরীক্ষায় কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারার মানে এই নয় যে সেই শিশুটি মেধাবী নয়। তাই বড়দের জন্য পরীক্ষা গ্রহণযোগ্য হলেও, প্রথম শ্রেণির শিশুদের জন্য 'লটারি' পদ্ধতিই হলো সবচেয়ে মানবিক ও বৈজ্ঞানিক সমাধান। এটি শিশুদের মেধার তকমা দিয়ে আলাদা না করে সবাইকে সমানভাবে বিকাশের সুযোগ দেয়।
লটারি কেন শিশুদের জন্য শ্রেয়?
লটারি পদ্ধতি শিশুদের জন্য একটি আশীর্বাদ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। এর
ইতিবাচক দিকগুলো হলো:
ভয়হীন আনন্দময় শৈশব : লটারির ফলে শিশুদের আর ভর্তি পরীক্ষার বিভীষিকার মুখোমুখি হতে হয় না। তারা হাসিখুশি মনে স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে পারে।
সকলের জন্য সমান সুযোগ : লটারি পদ্ধতিতে মেধা বা বিত্তের কোনো বাছবিচার নেই। এখানে প্রত্যেকটি শিশু সমান সুযোগ পায়, যা সংবিধানে বর্ণিত শিক্ষার অধিকারকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। এতে সামাজিক বৈষম্য হ্রাস পায়।
কোচিং বাণিজ্যের অবসান : ভর্তি যুদ্ধের নামে গড়ে ওঠা অসাধু কোচিং সিন্ডিকেট এখন বিলুপ্তপ্রায়। এতে অভিভাবকদের আর্থিক সাশ্রয় হচ্ছে এবং শিশুদের ওপর থেকে মানসিক চাপ কমেছে।
সহমর্মিতা ও বৈচিত্র্য : লটারির মাধ্যমে একটি ক্লাসরুমে বিভিন্ন মেধা ও স্তরের শিশু একত্রিত হয়। এতে তারা একে অপরের থেকে শেখার সুযোগ পায় এবং তাদের মধ্যে সহমর্মিতা ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয়।
পরিশেষে বলা যায়, ভর্তি যুদ্ধ শিশুদের শৈশবকে বিষিয়ে তুলেছিল, যেখানে লটারি পদ্ধতি তাদের মুখে হাসি ফিরিয়ে দিয়েছে। একটি মানবিক ও উন্নত জাতি গঠনে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। লটারি পদ্ধতির স্বচ্ছতা বজায় রেখে একে আরও আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন, যাতে কোনো শিশুই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয়। তবে লটারি পদ্ধতির পাশাপাশি সব স্কুলের শিক্ষার মান উন্নত করা জরুরি, যাতে নির্দিষ্ট কিছু স্কুলের প্রতি অভিভাবকদের অতিরিক্ত চাপ কমে। আমাদের মনে রাখতে হবে, শিশুকে দক্ষ করার চেয়ে আগে তাকে একজন সুখী ও সুস্থ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা বেশি জরুরি।
ভর্তি যুদ্ধ : শিশুদের শৈশব রক্ষার লড়াই !
ভর্তি যুদ্ধ : শিশুদের শৈশব রক্ষার লড়াই !
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, আর প্রাথমিক শিক্ষা সেই মেরুদণ্ডের ভিত্তি। কিন্তু গত কয়েক দশকে আমাদের দেশে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি প্রক্রিয়াটি একটি অমানবিক 'যুদ্ধে' পরিণত হয়েছিল। পাঁচ-ছয় বছরের একটি শিশুকে খেলার সাথিদের ছেড়ে কোচিং সেন্টারের চার দেয়ালে বন্দি হতে হতো কেবল একটি 'নামি' স্কুলে ভর্তির আশায়। এই অমানবিক প্রতিযোগিতার বিপরীতে সরকারের ‘লটারি পদ্ধতি’ চালুর সিদ্ধান্তটি কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি শিশুদের শৈশব রক্ষার একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।ভর্তি যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব* : ক্ষতবিক্ষত শৈশবভর্তি পরীক্ষার নামে যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলত, তার নেতিবাচক প্রভাব শিশুদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ট্রমা তৈরি করে। যে বয়সে শিশুদের রূপকথার গল্প শোনার কথা, সেই বয়সে তাদের সাধারণ জ্ঞান ও কঠিন গণিত মুখস্থ করতে হতো। এই অতিরিক্ত চাপ শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে এবং পড়াশোনার প্রতি এক ধরণের বিতৃষ্ণা তৈরি করে।সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো পরাজয়ের গ্লানি। ভর্তি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া একটি শিশুর মনে এই ধারণা গেঁথে দেয় যে সে ‘অযোগ্য’। কোমলমতি বয়সে এই ব্যর্থতার হীনম্মন্যতা তাদের আত্মবিশ্বাস ধূলিসাৎ করে দেয়, যার প্রভাব বয়ে বেড়াতে হয় সারা জীবন। খেলার মাঠের পরিবর্তে কোচিং সেন্টার আর পাঠ্যবইয়ের চাপে শিশুদের সৃজনশীলতা ও কল্পনাশক্তির মৃত্যু ঘটে
এই অসম প্রতিযোগিতার যাঁতাকলে।বড়দের জন্য পরীক্ষা, ছোটদের জন্য কেন লটারি?যেকোনো ব্যবস্থার উৎকর্ষ যাচাইয়ে প্রতিযোগিতার প্রয়োজন আছে, তবে তার একটি নির্দিষ্ট সময় ও স্থান থাকা চাই। উচ্চশিক্ষা বা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে ভর্তি পরীক্ষা বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা অত্যন্ত যৌক্তিক। কারণ, প্রাপ্তবয়স্ক একজন শিক্ষার্থী মানসিক ও শারীরিকভাবে চাপের মোকাবিলা করতে সক্ষম এবং সেখানে মেধার বিশেষায়িত মূল্যায়নের প্রয়োজন পড়ে।কিন্তু পাঁচ বা ছয় বছরের একটি শিশুর মেধা যাচাই করার কোনো বৈজ্ঞানিক মাপকাঠি নেই। এই বয়সে প্রতিটি শিশুই অপার সম্ভাবনাময়। একটি নির্দিষ্ট দিনে এক ঘণ্টার পরীক্ষায় কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারার মানে এই নয় যে সেই শিশুটি মেধাবী নয়। তাই বড়দের জন্য পরীক্ষা গ্রহণযোগ্য হলেও, প্রথম শ্রেণির শিশুদের জন্য 'লটারি' পদ্ধতিই হলো সবচেয়ে মানবিক ও বৈজ্ঞানিক সমাধান। এটি শিশুদের মেধার তকমা দিয়ে আলাদা না করে সবাইকে সমানভাবে বিকাশের সুযোগ দেয়।লটারি কেন শিশুদের জন্য শ্রেয়?লটারি পদ্ধতি শিশুদের জন্য একটি আশীর্বাদ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। এরইতিবাচক দিকগুলো হলো:ভয়হীন আনন্দময় শৈশব : লটারির ফলে শিশুদের আর ভর্তি পরীক্ষার বিভীষিকার মুখোমুখি হতে হয় না। তারা হাসিখুশি মনে স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে পারে।সকলের জন্য সমান সুযোগ : লটারি পদ্ধতিতে মেধা বা বিত্তের
কোনো বাছবিচার নেই। এখানে প্রত্যেকটি শিশু সমান সুযোগ পায়, যা সংবিধানে বর্ণিত শিক্ষার অধিকারকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। এতে সামাজিক বৈষম্য হ্রাস পায়।কোচিং বাণিজ্যের অবসান : ভর্তি যুদ্ধের নামে গড়ে ওঠা অসাধু কোচিং সিন্ডিকেট এখন বিলুপ্তপ্রায়। এতে অভিভাবকদের আর্থিক সাশ্রয় হচ্ছে এবং শিশুদের ওপর থেকে মানসিক চাপ কমেছে।সহমর্মিতা ও বৈচিত্র্য : লটারির মাধ্যমে একটি ক্লাসরুমে বিভিন্ন মেধা ও স্তরের শিশু একত্রিত হয়। এতে তারা একে অপরের থেকে শেখার সুযোগ পায় এবং তাদের মধ্যে সহমর্মিতা ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয়।পরিশেষে বলা যায়, ভর্তি যুদ্ধ শিশুদের শৈশবকে বিষিয়ে তুলেছিল, যেখানে লটারি পদ্ধতি তাদের মুখে হাসি ফিরিয়ে দিয়েছে। একটি মানবিক ও উন্নত জাতি গঠনে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। লটারি পদ্ধতির স্বচ্ছতা বজায় রেখে একে আরও আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন, যাতে কোনো শিশুই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয়। তবে লটারি পদ্ধতির পাশাপাশি সব স্কুলের শিক্ষার মান উন্নত করা জরুরি, যাতে নির্দিষ্ট কিছু স্কুলের প্রতি অভিভাবকদের অতিরিক্ত চাপ কমে। আমাদের মনে রাখতে হবে, শিশুকে দক্ষ করার চেয়ে আগে তাকে একজন সুখী ও সুস্থ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা বেশি জরুরি।
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
১৫২/২, এ-২ গ্রীন রোড, রওশন টাওয়ার (লিফটের-৫),
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ । মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত