শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত যার সাহস একটি জাতিকে মৃত্যু ভয় ভুলিয়ে দেয়

যার সাহস একটি জাতিকে মৃত্যু ভয় ভুলিয়ে দেয়

বঙ্গবন্ধুকে বুঝতে হলে পালানো শব্দটা আগে ইতিহাসের অভিধান থেকে মুছে ফেলতে হবে। কারণ তাঁর জীবনটাই ছিল প্রকাশ্য সংগ্রামের। কারাঘারে যার জন্য ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত ছিল, যার জন্য মৃত্যুদণ্ডের ফাইল প্রস্তুত ছিল বারবার, তাঁর কাছে গ্রেফতার হওয়া এবং মৃত্যু কোন বিষয়ই ছিল না, বরং তা ছিল জাতিকে জাগিয়ে তোলার সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা। তিনি জানতেন পালিয়ে যাওয়া নেতা কখনো স্বাধীনতা এনে দিতে পারে না!

১৯৬৯ সালে যখন গণ-অভ্যুত্থানের ঢেউ স্বৈরশাসনকে ভেঙে দিয়েছিল। সেই সময় গণ-অভ্যুত্থান দেখিয়ে দিয়েছিল একজন মানুষ বন্দী মানেই একটি জাতি বিস্ফোরণের পথে। তাই ১৯৭১ সালে তিনি আত্মগোপনে যাননি। পলায়ন শব্দটি তাঁর অভিধানে ছিল না কখনো। তার কাছে ১৯৭১ সালে আত্মগোপন নয়, দৃঢ়ভাবে মুখোমুখি দাঁড়ানোই ছিল স্বাভাবিক পথ। কারণ তিনি জানতেন, এই জনতার শক্তি যেকোনো অস্ত্রবাহিনীর চেয়েও ভয়ংকর। তিনি জনতাকে সবচেয়ে ভাল জানতেন এবং বুঝতেন। তিনি জানতেন একজন বন্দী নেতাই ইতিহাসের মূখ্য চরিত্র হয়ে উঠতে পারে।

ফাঁসির দড়িকে খুব কাছ থেকে দেখেছে যে মানুষ, তার কাছে মৃত্যুভয় কেবল একটি ধারণা মাত্র। ইতিহাস বলে, আগরতলা মামলায় তার জন্য ফাঁসির কাঠ প্রস্তুতই ছিল, কিন্তু সেই কাঠই শেষ পর্যন্ত হোঁচট খায় জনতার জলোচ্ছ্বাসে। কারাগারের অন্ধকার কক্ষে দাঁড়িয়েও তিনি জানতেন, এই দেশের মানুষ তার মুক্তির জন্য শুধু মিছিলই করবে না, প্রয়োজনে শাসকের মসনদও উল্টে দেবে। তাই যখন সময় এলো, তিনি নিজেকে লুকাননি। তিনি নিজেকে উৎসর্গ করলেন।

কারাগারে থাকা একজন মুজিব কতটা শক্তিশালী হতে পারে, তা যুদ্ধের দিনগুলোতেই প্রমাণ হয়েছিল। তিনি পালিয়ে যাননি বলেই মুক্তিযুদ্ধের সময় চারদিকে স্লোগানে ঢেউ উঠেছিল- মহান জাতির মহান নেতা, শেখ শেখ মুজিব, তোমার নেতা আমার নেতা, শেখ মুজিব শেখ মুজিব। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন তিনি যে, তার নাম হয়ে উঠেছিল একটি ভূখণ্ডের বিকল্প রূপ। অথচ তিনি তখন পৃথিবীর সবচেয়ে নির্জন কারাকক্ষে, তবুও যুদ্ধের গতিপথ থামেনি। বরং আরো দৃঢ় হয়েছে, কারণ আদর্শ কোনো কারাগারে বন্দী থাকে না।

যিনি যৌবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় এবং জীবনের উচ্ছাস জনতার জন্য কারাঘারে উৎসর্গ করেছে, যিনি জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাড়িয়ে জনতাকে বেঁচে নিয়েছেন
তাকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা অসম্ভব। তাকে নিয়ে সাময়িক বিভ্রান্তি তৈরি করা যায়, প্রজন্মকে ভুল তথ্য শেখানো যায়, কিন্তু সত্যকে চাপিয়ে রাখা যায় না। বঙ্গবন্ধু মুজিব ছিলেন সেই সূর্যের মতো, যাকে মেঘ ঢেকে রাখতে পারে কিছুক্ষণের জন্য, কিন্তু যতবার ঢাকে, ততবার আরও উজ্জল আলো হয়ে ফিরে আসে। হয়ে ফিরে আসে।

তাঁর নাম হয়ে উঠেছিল একটি দেশের সমার্থক শব্দ। তিনি জীবিত থাকুন বা না থাকুন, তার নাম একটি জাতির জন্মের চিহ্ন, একটি অসম্ভব সাহসের ইতিহাস, আর একটি দেশের আত্মপরিচয়ের সবচেয়ে গভীর মানচিত্র। বঙ্গবন্ধু ছিলেন সেই মানুষ, যার সাহস একটি জাতিকে মৃত্যু ভয় ভুলিয়ে দেয়।

খুঁজুন