২০১৪ সালে এফবিসিসিআইয়ের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে প্রথমবার চীনের কুনমিং যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সফরসঙ্গীদের প্রায় সবার ধ্যান-জ্ঞান তখন ব্যবসাকে ঘিরে। কিন্তু আমার মাথায় সারাক্ষণ ঘুরছিল একটিই নাম—স্টোন ফরেস্ট। জায়গাটির কথা প্রথম জেনেছিলাম প্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের চীন ভ্রমণকাহিনি পড়ে।
যতটুকু মনে পড়ে, স্টোন ফরেস্টের অপূর্ব সৃষ্টি সম্পর্কে তাঁর লেখার সারমর্ম ছিল—স্রষ্টার অস্তিত্ব নিয়ে কারও মনে সংশয় থাকলে এমন বিস্ময়কর সৃষ্টি দেখলে হয়তো তার মনে হবে, এই সৃষ্টির পেছনে নিশ্চয়ই একজন স্রষ্টা আছেন।
চারজন সঙ্গী নিয়ে রওনা দিলাম বহুদিনের কল্পনায় আঁকা সেই স্বপ্নের রাজ্যের উদ্দেশে।
আমাদের চীনা ড্রাইভার আসল স্টোন ফরেস্ট থেকে বেশ দূরের একটি পাথুরে দৃশ্য দেখিয়ে বললেন,
“এই তো স্টোন ফরেস্ট।”
কিন্তু বইয়ে পড়া বর্ণনা সেদিন আমার জন্য অন্ধকারে আলোকবর্তিকার মতো হয়ে দাঁড়াল। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললাম—এটা আসল স্টোন ফরেস্ট নয়।
শেষ পর্যন্ত ড্রাইভার হার মানলেন। আমাদের নিয়ে গেলেন কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে।
কুনমিং থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরের স্টোন ফরেস্ট ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকার অংশ। দূর থেকে অনেক পাথরের স্তম্ভকে অবিকল বৃক্ষের মতো মনে হয়। সেই কারণেই হয়তো নাম—স্টোন ফরেস্ট, পাথরের বন।
পাথরের সেই গোলকধাঁধার ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমার মনে হচ্ছিল—আমি বুঝি পৃথিবীর পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে অন্য কোনো গ্রহে এসে পড়েছি! প্রকৃতির এমন অদ্ভুত শিল্পকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের নিজের ক্ষুদ্রতা খুব সহজেই উপলব্ধি করা যায়।
এক যুগ পর, ২০২৬ সালে, আবার কুনমিং যাওয়ার সুযোগ হলো। তবে এবারের সফরের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। আমার আধ্যাত্মিক শিক্ষকের সঙ্গে তেরো জনের একটি দল নিয়ে ধর্মীয় শিক্ষার এক সংক্ষিপ্ত সফর।
সফর যতই ব্যস্ত হোক, আল্লাহর সুন্দর সৃষ্টি দেখার ক্ষুধা আমার কখনো কমে না। মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম—এবার যেন এমন কোনো সুন্দর জায়গা দেখার সুযোগ হয়, যা আগে দেখিনি।
সময়ের স্বল্পতার কারণে এবার দল স্টোন ফরেস্টে না গিয়ে কুনমিং শহরের কাছের দিয়ানচি লেক বেছে নিল। আমার মনে হলো, প্রার্থনাটি যেন অন্যভাবে কবুল হয়ে গেল।
দিয়ানচি লেক প্রথম দর্শনে অনেকটা আমাদের কাপ্তাই হ্রদের কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে দুটির উৎপত্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন—কাপ্তাই একটি কৃত্রিম হ্রদ, আর দিয়ানচি একটি প্রাকৃতিক মিঠাপানির হ্রদ। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৮৮৬ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এবং ইউনান প্রদেশের বৃহত্তম মিঠাপানির হ্রদ।
কুনমিংয়ের উচ্চভূমির অবস্থান ও মৃদু জলবায়ু শহরটির ‘চিরবসন্তের শহর’ পরিচিতি পাওয়ার অন্যতম কারণ।
হ্রদের জলে ভেসে বেড়াচ্ছিল বিভিন্ন রকমের যাযাবর পাখি, যা দৃশ্যটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছিল। পাড়ে গিয়ে চোখ আটকে গেল ফুলের সমারোহে। বাগানবিলাস, ক্যামেলিয়া, অর্কিডসহ নানা রঙের ফুল ও নয়নাভিরাম বৃক্ষ চারপাশকে এক অসাধারণ রূপ দিয়েছিল। লেকের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা দৃষ্টিনন্দন সবুজ পাহাড় সেই সৌন্দর্যকে আরও গভীর ও প্রশান্তিময় করে তুলেছিল। বিকেলের নরম আলোয় হ্রদের ধারে হাঁটতে হাঁটতে দূরের পাহাড়ের রেখা, বিস্তীর্ণ জলরাশি, পাখির উড়াউড়ি আর পাড়জুড়ে ফুলের সৌন্দর্য মিলে তৈরি করেছিল এক অপার্থিব দৃশ্য।
তখন মনে হচ্ছিল—এই শহর সত্যিই তার নাম সার্থক করেছে, ‘চিরবসন্তের শহর’।
তবে কুনমিংয়ের সৌন্দর্য শুধু দিয়ানচি লেক কিংবা দু-একটি পার্কের ফুলের বাগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমার চোখে পুরো কুনমিং শহরটাই যেন এক বিশাল ফুলের বাগান।
ফুলের সঙ্গে কুনমিংয়ের সম্পর্ক শুধু সৌন্দর্যের নয়, অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। শহরের দৌনান ফ্লাওয়ার মার্কেট এশিয়ার বৃহত্তম ফুলের বাজারগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। এখান থেকে বিপুল পরিমাণ ফুল চীনজুড়ে সরবরাহের পাশাপাশি বিশ্বের বহু দেশ ও অঞ্চলেও রপ্তানি হয়।
এক যুগ আগে যে গভীর আগ্রহ ও কৌতূহল নিয়ে স্টোন ফরেস্ট খুঁজে বের করেছিলাম, এবার সেই একই মুগ্ধতা নিয়ে হারিয়ে গেলাম দিয়ানচি লেকের সৌন্দর্যে।
তবে একটি পার্থক্য ছিল।
সেবারের খোঁজার মধ্যে ছিল প্রচণ্ড কৌতূহল, উত্তেজনা ও একধরনের তাড়া; এবারের দেখার মধ্যে ছিল শুধুই প্রশান্তি।
সময়ের সঙ্গে হয়তো ভ্রমণের অর্থও বদলে যায়। যৌবনের ভ্রমণে আমরা বিস্ময় খুঁজি, নতুন কিছু জয় করার আনন্দ খুঁজি; বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই একই ভ্রমণের মধ্যে মানুষ কখনো কখনো খুঁজে পায় প্রশান্তি, উপলব্ধি আর স্রষ্টার সৃষ্টির প্রতি গভীর মুগ্ধতা।
আরেকটি বিষয় আমি বারবার অনুভব করেছি—একটি ভ্রমণ কতটা সুখময়, শান্তিময় ও আনন্দময় হবে, তার অনেকটাই নির্ভর করে সফরসঙ্গীদের ওপর।
সেদিক থেকে এবারের সফরটি আমার কাছে ছিল বিশেষভাবে স্মরণীয়—পুণ্যময়তা, প্রশান্তি ও আনন্দের এক অসাধারণ সমন্বয়।
চিরবসন্তের শহর কুনমিং: কৌতূহল থেকে প্রশান্তির এক যুগ
চিরবসন্তের শহর কুনমিং: কৌতূহল থেকে প্রশান্তির এক যুগ
২০১৪ সালে এফবিসিসিআইয়ের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে প্রথমবার চীনের কুনমিং যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সফরসঙ্গীদের প্রায় সবার ধ্যান-জ্ঞান তখন ব্যবসাকে ঘিরে। কিন্তু আমার মাথায় সারাক্ষণ ঘুরছিল একটিই নাম—স্টোন ফরেস্ট। জায়গাটির কথা প্রথম জেনেছিলাম প্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের চীন ভ্রমণকাহিনি পড়ে। যতটুকু মনে পড়ে, স্টোন ফরেস্টের অপূর্ব সৃষ্টি সম্পর্কে তাঁর লেখার সারমর্ম ছিল—স্রষ্টার অস্তিত্ব নিয়ে কারও মনে সংশয় থাকলে এমন বিস্ময়কর সৃষ্টি দেখলে হয়তো তার মনে হবে, এই সৃষ্টির পেছনে নিশ্চয়ই একজন স্রষ্টা আছেন। চারজন সঙ্গী নিয়ে রওনা দিলাম বহুদিনের কল্পনায় আঁকা সেই স্বপ্নের রাজ্যের উদ্দেশে।আমাদের চীনা ড্রাইভার আসল স্টোন ফরেস্ট থেকে বেশ দূরের একটি পাথুরে দৃশ্য দেখিয়ে বললেন,“এই তো স্টোন ফরেস্ট।” কিন্তু বইয়ে পড়া বর্ণনা সেদিন আমার জন্য অন্ধকারে আলোকবর্তিকার মতো হয়ে দাঁড়াল। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললাম—এটা আসল স্টোন ফরেস্ট নয়। শেষ পর্যন্ত ড্রাইভার হার মানলেন। আমাদের নিয়ে গেলেন কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। কুনমিং থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরের স্টোন ফরেস্ট ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকার অংশ। দূর থেকে অনেক পাথরের স্তম্ভকে অবিকল বৃক্ষের মতো মনে হয়। সেই কারণেই হয়তো নাম—স্টোন ফরেস্ট, পাথরের বন। পাথরের সেই গোলকধাঁধার ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমার মনে হচ্ছিল—আমি বুঝি পৃথিবীর পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে অন্য কোনো গ্রহে এসে পড়েছি! প্রকৃতির এমন অদ্ভুত শিল্পকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের নিজের ক্ষুদ্রতা খুব সহজেই উপলব্ধি করা যায়। এক যুগ পর, ২০২৬ সালে, আবার কুনমিং
যাওয়ার সুযোগ হলো। তবে এবারের সফরের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। আমার আধ্যাত্মিক শিক্ষকের সঙ্গে তেরো জনের একটি দল নিয়ে ধর্মীয় শিক্ষার এক সংক্ষিপ্ত সফর। সফর যতই ব্যস্ত হোক, আল্লাহর সুন্দর সৃষ্টি দেখার ক্ষুধা আমার কখনো কমে না। মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম—এবার যেন এমন কোনো সুন্দর জায়গা দেখার সুযোগ হয়, যা আগে দেখিনি। সময়ের স্বল্পতার কারণে এবার দল স্টোন ফরেস্টে না গিয়ে কুনমিং শহরের কাছের দিয়ানচি লেক বেছে নিল। আমার মনে হলো, প্রার্থনাটি যেন অন্যভাবে কবুল হয়ে গেল। দিয়ানচি লেক প্রথম দর্শনে অনেকটা আমাদের কাপ্তাই হ্রদের কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে দুটির উৎপত্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন—কাপ্তাই একটি কৃত্রিম হ্রদ, আর দিয়ানচি একটি প্রাকৃতিক মিঠাপানির হ্রদ। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৮৮৬ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এবং ইউনান প্রদেশের বৃহত্তম মিঠাপানির হ্রদ। কুনমিংয়ের উচ্চভূমির অবস্থান ও মৃদু জলবায়ু শহরটির ‘চিরবসন্তের শহর’ পরিচিতি পাওয়ার অন্যতম কারণ। হ্রদের জলে ভেসে বেড়াচ্ছিল বিভিন্ন রকমের যাযাবর পাখি, যা দৃশ্যটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছিল। পাড়ে গিয়ে চোখ আটকে গেল ফুলের সমারোহে। বাগানবিলাস, ক্যামেলিয়া, অর্কিডসহ নানা রঙের ফুল ও নয়নাভিরাম বৃক্ষ চারপাশকে এক অসাধারণ রূপ দিয়েছিল। লেকের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা দৃষ্টিনন্দন সবুজ পাহাড় সেই সৌন্দর্যকে আরও গভীর ও প্রশান্তিময় করে তুলেছিল। বিকেলের নরম আলোয় হ্রদের ধারে হাঁটতে হাঁটতে দূরের পাহাড়ের রেখা, বিস্তীর্ণ জলরাশি, পাখির উড়াউড়ি আর পাড়জুড়ে ফুলের সৌন্দর্য মিলে তৈরি করেছিল
এক অপার্থিব দৃশ্য।তখন মনে হচ্ছিল—এই শহর সত্যিই তার নাম সার্থক করেছে, ‘চিরবসন্তের শহর’। তবে কুনমিংয়ের সৌন্দর্য শুধু দিয়ানচি লেক কিংবা দু-একটি পার্কের ফুলের বাগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমার চোখে পুরো কুনমিং শহরটাই যেন এক বিশাল ফুলের বাগান। ফুলের সঙ্গে কুনমিংয়ের সম্পর্ক শুধু সৌন্দর্যের নয়, অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। শহরের দৌনান ফ্লাওয়ার মার্কেট এশিয়ার বৃহত্তম ফুলের বাজারগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। এখান থেকে বিপুল পরিমাণ ফুল চীনজুড়ে সরবরাহের পাশাপাশি বিশ্বের বহু দেশ ও অঞ্চলেও রপ্তানি হয়। এক যুগ আগে যে গভীর আগ্রহ ও কৌতূহল নিয়ে স্টোন ফরেস্ট খুঁজে বের করেছিলাম, এবার সেই একই মুগ্ধতা নিয়ে হারিয়ে গেলাম দিয়ানচি লেকের সৌন্দর্যে। তবে একটি পার্থক্য ছিল। সেবারের খোঁজার মধ্যে ছিল প্রচণ্ড কৌতূহল, উত্তেজনা ও একধরনের তাড়া; এবারের দেখার মধ্যে ছিল শুধুই প্রশান্তি।সময়ের সঙ্গে হয়তো ভ্রমণের অর্থও বদলে যায়। যৌবনের ভ্রমণে আমরা বিস্ময় খুঁজি, নতুন কিছু জয় করার আনন্দ খুঁজি; বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই একই ভ্রমণের মধ্যে মানুষ কখনো কখনো খুঁজে পায় প্রশান্তি, উপলব্ধি আর স্রষ্টার সৃষ্টির প্রতি গভীর মুগ্ধতা। আরেকটি বিষয় আমি বারবার অনুভব করেছি—একটি ভ্রমণ কতটা সুখময়, শান্তিময় ও আনন্দময় হবে, তার অনেকটাই নির্ভর করে সফরসঙ্গীদের ওপর। সেদিক থেকে এবারের সফরটি আমার কাছে ছিল বিশেষভাবে স্মরণীয়—পুণ্যময়তা, প্রশান্তি ও আনন্দের এক অসাধারণ সমন্বয়।
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
রওশন টাওয়ার, (লিফট-৮) ১৫২/২/এ২ গ্রীণ রোড ,
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ ।
মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত