রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
নতুন বছরে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা পাবে বই-ড্রেস-জুতা ও ব্যাগ • এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে জালিয়াতি প্রতিরোধে ইসলামী ব্যাংকে কর্মশালা • নেতানিয়াহুকে হঠাতে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোটের দাবিতে ইসরায়েলিদের বিক্ষোভ • বাইনোকুলারে দেখলাম ওঁৎ পেতে আছে বাংলাদেশিরা, ফাঁক পেলে ঢুকে পড়বে: শুভেন্দু অধিকারী • ‘১৩ হাজার এমপিও শিক্ষক-কর্মচারী অবসর-কল্যাণের টাকা পাচ্ছেন’ • হ‌ুমায়ূন পড়লে বাংলা আর ভাষার প্রতি ভালোবাসা বেড়ে যায়: অনুপম রায় • বিনা খরচে মালয়েশিয়ায় চাকরি: লটারিতে প্রাথমিকভাবে ৩০০ জন নির্বাচিত • নিজেই তৈরি করে নিতে পারেন প্রাকৃতিক ময়েশ্চারাইজার • ‘শেখ হাসিনাকে ফেরাতে ইমোশন নয়, আইনের পথেই এগোবে সরকার’ • যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি পাচ্ছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ শিক্ষার্থী
রাজনীতি একজন খালেদ মোশাররফ এর গল্প

একজন খালেদ মোশাররফ এর গল্প

বাংলাদেশের ইতিহাসে খুব কম মানুষের জীবনই এত অল্প সময়ে এত বড় দুটি অধ্যায় ছুঁয়ে গেছে। একটি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, আরেকটি ১৯৭৫-এর নভেম্বরের সেই তিনটি দিন। খালেদ মোশাররফ বেঁচে ছিলেন মাত্র আটত্রিশ বছর। কিন্তু এই অল্প সময়েই তাঁকে নিয়ে প্রশংসা আর প্রশ্ন, দুটোই জমেছে বিস্তর।

১৯৩৭ সালের নভেম্বর মাসে জামালপুরের মোশাররফগঞ্জ গ্রামে তাঁর জন্ম। বাবার নাম মোশাররফ হোসেন, মা জমিলা আখতার। নিজের লেখা বইয়ে তিনি এভাবেই নিজের পরিচয় দিয়েছেন। ১৯৫৭ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তখনকার সময়ে বাঙালি তরুণদের জন্য সেনাবাহিনী সহজ পথ ছিল না। পদোন্নতি, সুযোগ, সম্মান, সবকিছুতেই একটা বৈষম্য টের পাওয়া যেত। সেই বৈষম্য দেখতে দেখতেই তাঁর মতো অফিসাররা বড় হয়েছেন।

২৫ মার্চের কালরাতের আগে তিনি ছিলেন ৪ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড ইন কমান্ড। ২৪ মার্চ পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ তাঁকে কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে সিলেটের দিকে সরিয়ে দেয়। কিন্তু অপারেশন সার্চলাইটের পর ২৬ মার্চ তিনি নিজের ইউনিট নিয়ে বিদ্রোহ করেন। এখান থেকেই শুরু তাঁর যুদ্ধজীবন।

পরে মুজিবনগর সরকার তাঁকে ২ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার করে। এই সেক্টরের আওতায় ছিল কুমিল্লা, নোয়াখালী, ঢাকার একাংশ আর ফরিদপুরের কিছু এলাকা। সদর দপ্তর ছিল ত্রিপুরার মতিনগরে। এই সেক্টর থেকেই ঢাকার ভেতরে গেরিলা অপারেশন চালানো হয়েছিল। একজন যোদ্ধা পরে স্মৃতিচারণে বলেছেন, ১৯৭১-এর মে মাসের শেষ দিকে খালেদ মোশাররফ নিজে ডেকে তাঁকে এবং আরও ষোলোজনকে ঢাকায় পাঠান। ঢাকার ভেতরে সেক্টর টুর প্রথম অপারেশনগুলোর একটি ছিল সেটি। এতে বোঝা যায়, তিনি শুধু সীমান্তে বসে কমান্ড দেওয়া অফিসার ছিলেন না। শত্রুর ঘাঁটির ভেতরে আঘাত করার পরিকল্পনাও তিনি নিজে সাজাতেন।

১৯৭১-এর অক্টোবরে গঠিত হয় কে ফোর্স। এটি ছিল নিয়মিত বাহিনীর একটি ব্রিগেড, যার প্রধান ছিলেন খালেদ মোশাররফ। ৪, ৯ ও ১০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট নিয়ে এই ফোর্স গড়া হয়, আর সদর দপ্তর ছিল আগরতলায়। নামের প্রথম অক্ষর এসেছে তাঁর নাম থেকেই। যুদ্ধের শেষ পর্বে সিলেট, আখাউড়া, কসবা আর ঢাকার দিকে অগ্রসর হওয়ার লড়াইগুলোতে এই বাহিনী বড় ভূমিকা রেখেছে। যুদ্ধের পর তিনি বীর উত্তম খেতাব পান। তাঁর লেখা *মুক্তিযুদ্ধে ২ নম্বর সেক্টর এবং কে ফোর্স* বইটিকে এখনও মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ দলিল ধরা হয়, কারণ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি সেক্টরের পুরো ইতিহাস একজন কমান্ডারের জবানিতে এত গুছিয়ে খুব কমই পাওয়া যায়।

যুদ্ধ শেষে তিনি নতুন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সিনিয়র অফিসার হিসেবে কাজ করেন। ব্রিগেডিয়ার পদে উঠে সেনাবাহিনীর জেনারেল স্টাফের প্রধানের দায়িত্বও পালন করেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পুরো দৃশ্যপট পাল্টে যায়। শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। ক্ষমতায় বসেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ, আর হত্যাকারী অফিসাররা বঙ্গভবনে অবস্থান নিয়ে থাকে। সেনাবাহিনীর ভেতরে একটা চাপা অস্বস্তি জমতে থাকে।

এই সময়ের একটা তথ্য বেশ আলোচিত। আগস্টের ঘটনার পর জেনারেল জিয়াউর রহমান নাকি খালেদ মোশাররফকে ভারতের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ ঠেকানোর একটি অপারেশন প্রস্তুত করতে বলেছিলেন। আবার ২২ আগস্ট খালেদ নিজে মোশতাকের সঙ্গে দেখা করে বঙ্গভবনে থাকা সেনাদের সরিয়ে নিতে বলেন। মোশতাক রাজি হননি। এর দুদিন পর জিয়া সেনাপ্রধান হন, আর খালেদ ধীরে ধীরে কোণঠাসা অবস্থায় চলে যেতে থাকেন।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ভোরে খালেদ মোশাররফ আর ঢাকা ব্রিগেডের কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিল মিলে একটি অভ্যুত্থান ঘটান। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো তাঁদের নিয়ন্ত্রণে আসে। জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয় আর তাঁকে অবসরে পাঠানো হয়। খালেদ নিজে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হয়ে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল মোশতাককে সরিয়ে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের ক্ষমতার বৃত্ত থেকে বের করা।

এখানে একটা কথা পরিষ্কার করা দরকার। অনেক জায়গায় তাঁকে "প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক" লেখা হয়। কিছু সূত্র অনুযায়ী ৩ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি এই ভূমিকায় ছিলেন। কিন্তু অন্য সূত্র বলছে, মোশতাক ৬ নভেম্বর পদত্যাগ করার পর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন। কাজেই পদবির ব্যাপারে সূত্রভেদে কিছুটা মতভেদ আছে। তবে এটুকু নিশ্চিত যে এই কয়েকদিন ক্ষমতার আসল চাবিকাঠি তাঁর হাতেই ছিল।

বিশ্লেষকদের একটা বড় অংশ মনে করেন, খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা ছিল এর পরিকল্পনা আর সমর্থনের ভিত। তিনি সেনাবাহিনীর ভেতরের একটি অংশের সমর্থন পেয়েছিলেন, কিন্তু সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে তাঁর পক্ষে জোরালো ভিত তৈরি ছিল না। ওই সময় সৈনিকদের মনে অফিসারদের নিয়ে যে অসন্তোষ ছিল, সেটা তিনি হয়তো পুরোপুরি আঁচ করতে পারেননি।

আরেকটা প্রশ্ন ওঠে হত্যাকারী অফিসারদের নিয়ে। ৪ নভেম্বর তারা দেশ ছেড়ে চলে যায়। অনেকে বলেন, তাদের বিচারের মুখোমুখি না করে ছেড়ে দেওয়াটা একটা বড় রাজনৈতিক ভুল ছিল। আবার কেউ কেউ বলেন, তখনকার পরিস্থিতিতে রক্তপাত এড়াতে এর বাইরে বেশি বিকল্প ছিল না। এই তর্কের কোনো চূড়ান্ত মীমাংসা আজও হয়নি। আর ৩ নভেম্বর ভোরেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। খালেদের অভ্যুত্থান সেই হত্যাকাণ্ড ঠেকাতে পারেনি, আর এটা তাঁর অভ্যুত্থানের ওপর একটা ভারী ছায়া ফেলেছে।

এই সময় আরেকটি পক্ষ সক্রিয় হয়ে ওঠে। কর্নেল আবু তাহেরের সংগঠন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা সৈনিকদের নিয়ে পাল্টা অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি নেয়। তাহেরের লক্ষ্য ছিল জিয়াকে মুক্ত করা। ৬ নভেম্বর রাতে খালেদ বঙ্গভবনে ছিলেন, আর ৭ নভেম্বর ভোরে ক্যান্টনমেন্টে সৈনিকদের বিদ্রোহ শুরু হয়। ওই দিনই খালেদ মোশাররফ নিহত হন। তাঁর সঙ্গে প্রাণ হারান লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ টি এম হায়দার ও কর্নেল নাজমুল হুদা। শাফায়াত জামিল গ্রেপ্তার হন।

এই ঘটনার পর জিয়াউর রহমান মুক্ত হন। সায়েম প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক থাকলেও জিয়া উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন, আর কয়েক বছরের মধ্যেই দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় চলে আসেন। ইতিহাসের পাতায় ৭ নভেম্বর তাই একেক পক্ষের কাছে একেক নামে পরিচিত। কেউ একে বলেন সিপাহি-জনতার বিপ্লব, কেউ বলেন পাল্টা অভ্যুত্থান। আর খালেদ মোশাররফ সেই বিতর্কের কেন্দ্রে একজন পরাজিত মানুষ হয়ে থেকে গেছেন।

খালেদ মোশাররফকে নিয়ে বিচার করতে গেলে দুটো আলাদা মানুষকে আলাদা করে দেখতে হয়। একাত্তরের খালেদ ছিলেন একজন সাহসী সেক্টর কমান্ডার, যাঁর যুদ্ধের রেকর্ড নিয়ে সত্যিই তর্কের জায়গা কম। পঁচাত্তরের খালেদ একজন অফিসার, যিনি ক্ষমতার একটা ভয়ংকর শূন্যতায় একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই সিদ্ধান্ত সফল হয়নি, আর এর মূল্য তিনি প্রাণ দিয়ে দিয়েছেন।

তাঁর মেয়ে মাহজাবিন খালেদ এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ১৯৭৫-এর ১ নভেম্বর বাবা তাঁদের মা-সহ তিন বোনকে নানাবাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, কারণ সেনানিবাস তখন নিরাপদ ছিল না। অর্থাৎ তিনি হয়তো আঁচ করেছিলেন সামনে কী আসছে, তবু পিছিয়ে যাননি।

শেষ পর্যন্ত খালেদ মোশাররফ বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন একজন, যাঁকে এক কথায় নায়ক বা খলনায়ক কোনোটাই বলা যায় না। যুদ্ধের মাঠে তিনি ছিলেন অধিনায়ক, রাজনীতির মাঠে ছিলেন এক ঝুঁকিপূর্ণ জুয়াড়ি। তাঁর গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধে জেতা আর রাষ্ট্র সামলানো এক জিনিস নয়, আর ইতিহাস অনেক সময় সবচেয়ে সাহসী মানুষকেও সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখে ফেলা। 

খুঁজুন