বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
পল্টন মোড় থেকে নর্থ সাউথ রোড পর্যন্ত মূল সড়ক হকারমুক্ত ঘোষণা ট্রাকচালক হোসেন হত্যা শেখ হাসিনাসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ফেনীতে নজরুলের অগ্নিস্রাবী বক্তৃতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছিল মানুষ বগুড়ার দুপচাঁচিয়ায় গাঁজা গাছসহ আটক এক বোয়িং-এর কাছ থেকে ১৫০টি উড়োজাহাজ কিনবে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা ডিএমপির অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৫৪৬, মামলা ৬২ বিষমুক্ত কৃষিতে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা জরুরি বরগুনার পাথরঘাটায় বিপুল পরিমাণ ভারতীয় শাড়ি ও পাঞ্জাবি জব্দ জ্বালানি তেলে ভর্তুকি নেই দাবি করা প্রতিবেদনটি বিভ্রান্তিকর বলে শনাক্ত শুটিংয়ের দৃশ্য ছড়িয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার শনাক্ত
দেশের খবর ফেনীতে নজরুলের অগ্নিস্রাবী বক্তৃতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছিল মানুষ

ফেনীতে নজরুলের অগ্নিস্রাবী বক্তৃতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছিল মানুষ

শতবর্ষ আগে ফেনী সফরে এসেছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। মাত্র কয়েক ঘন্টা ফেনীতে অবস্থান করেন তিনি।

এ সময়ে তাঁর সম্মানে আয়োজিত সংবর্ধনা সভায় তিনি যে অগ্নিস্রাবী বক্তৃতা করেছিলেন তা সব শ্রেণিপেশার মানুষকে ভীষণ উদ্দীপ্ত করেছিল। মন্ত্রমুগ্ধের মতো কবির জ্বালাময়ী বক্তৃতা শুনেছিলেন সকলে।

সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল ফেনীর তৎকালীন ইসলামিয়া হাইস্কুল মাঠে (বর্তমান ফেনী আলিয়া কামিল মাদ্রাসা)। 

কবি নজরুল ১৯২৬ সালের ১ আগস্ট সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের আমন্ত্রণে দুপুরের ট্রেনে চট্টগ্রাম থেকে ফেনীতে আসেন। এ সময়ে তাঁর বাবড়ি চুলের মাথায় খদ্দরের দোপাল্লা টুপি ছিল। হালকা গেরুয়া রঙের খদ্দরের পাঞ্জাবি ও ধুতি পরা ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। 

বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ও সাহিত্য সাময়িকী ‘নোফেল’ সম্পাদক ড. আবু হেনা আবদুল আউয়াল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ফেনী সফর সম্পর্কে বলতে গিয়ে কবির বিষয়ে এভাবেই বর্ণনা দেন।

তিনি বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ফেনীতে এমন রূপেই ধরা দিয়েছেন। তৎকালীন নোয়াখালী জেলার অধীনস্থ ছোট মহাকুমা শহর ফেনীতে  (১৯৮৪ সালে জেলা গঠিত হয়) ১৯২৬ সালের ১ আগস্ট কবি কাজী নজরুল ইসলাম চট্টগ্রাম থেকে ফেনীতে আসেন(যদিও তারিখটি নিয়ে মতান্তর রয়েছে)। এসময় তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন হবীবুল্লাহ বাহার, কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মী ও কিছু তরুণ শিক্ষক। পরের বছর ১৯২৭ সালে কলকাতা থেকে নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর সফরে এসেছিলেন তিনি। 

ছবি: বাসস

চলতি বছরের ১ আগস্ট ফেনীতে কাজী নজরুল ইসলামের আগমনের শতবর্ষ পূর্ণ হয়েছে। ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনায় নজরুল ভক্তরা দিনটি পালনও করেছেন। 

ড. আবু হেনা আবদুল আউয়াল বলেন, কাজী নজরুল ইসলামের সম্মানে আয়োজিত সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল ফেনীর তৎকালীন ইসলামিয়া হাইস্কুল মাঠে (বর্তমান ফেনী আলিয়া কামিল মাদ্রাসা)। সেদিনই একটি প্রাইমারী স্কুলের মাঠে আরেকটি সভায়ও অতিথি ছিলেন তিনি। কয়েক ঘন্টার জন্য ফেনীতে অবস্থান করেছিলেন এবং ঐদিনই তিনি চট্টগ্রামে ফিরে যান।

তিনি বলেন, সভায় নজরুল ইসলাম একটি কাঠের চেয়ারে বসেন। চেয়ারের সামনে রাখা একটি ছোট টেবিলে একটি সিঙ্গেল রীড হারমোনিয়াম রাখা হয়েছিল। নজরুল সভায় বক্তৃতা করার পর কবিতা আবৃত্তি ও গান গেয়ে শোনান।

তিনি আরো বলেন, বক্তৃতায় কাজী নজরুল সকল প্রকার দেশি-বিদেশি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। অত্যাচারী শাসক ও শোষকের বিরুদ্ধে, অসাম্য ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে, গোঁড়ামী ও ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তিনি বজ্রকন্ঠে আওয়াজ তুলেছিলেন।  নজরুলের অগ্নিস্রাবী সেই বক্তৃতা সব শ্রেণিপেশার মানুষকে ভীষণভাবে উদ্দীপ্ত করেছিল। 

আবু হেনা আবদুল আউয়াল সেদিনের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সাদা পোশাকধারী কয়েকজন গোয়েন্দা পুলিশ বা পুলিশ সদস্য সেদিনের সভা চলাকালে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। নজরুলের কানে সে খবর পৌঁছাতেই তিনি উপস্থিত জনগণকে অভয় দেন এবং বক্তৃতা চালিয়ে যেতে থাকেন। এরপর তিনি জোর গলায় আবৃত্তি করলেন তাঁর বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতার কিছু অংশ।

তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের প্রথিতযশা সমাজসেবক আইনজীবী ও বঙ্গীয় আইন পরিষদ এবং নোয়াখালী জেলা বোর্ডের নির্বাচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব খান সাহেব বজলুল হকের নাতি ইমন উল হক বাসসকে জানান, সেদিন ইসলামিয়া হাইস্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত সভা প্রায় দেড় ঘন্টা চলার পর বৃষ্টির কারণে শেষ করতে হয়েছিল। এরপর দাদু খান সাহেব বজলুল হকের বৈঠকখানায় নজরুলকে তাঁর সফরসঙ্গীসহ নিয়ে আসা হয়।

তিনি আরো জানান, তাদের বাড়িতে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের আগমনের তথ্যটি তারা জেনেছেন ২০০৮সালে। তার চাচা বরেণ্য সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকার ‘নজরুল ইনস্টিটিউট’ এর সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত ওবায়েদ উল হক এর একটি লেখা থেকে। 

ওবায়েদ উল হক ১৯৯৫ সালের ২৬ মে দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় ‘সেই দুর্লভ মুহুর্তগুলো’ শিরোনামে তাঁর স্মৃতিচারণমূলক লেখায় সেদিনের ঘটনার বিশদ বর্ণনা দেন।

ফেনীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংরক্ষণ ও গবেষণাধর্মী সংগঠন নরনীয়ার সাধারণ সম্পাদক এবং মাহবুব উল হক পেয়ারা ফাউন্ডেশনের সভাপতি ইমন উল হক চাচা ওবায়েদ উল হকের সেই স্মৃতিচারণ থেকে উদ্ধৃত করে আরো বলেন, ‘কাছারি ঘর থেকে কবিকে আমাদের বাসার অন্দরমহলে আনা হয়। সেকালে পেপসি, কোক, ফান্টার মতো কোন শীতল পানীয় বাজারে পাওয়া যেত না। লেমনেড সোডা ওয়াটারের চল ছিল। তাও কোন কোন রেলগাড়ীতে বিশেষ সময়েই পাওয়া যেত। জগভর্তি লেবুর শরবত দিয়ে কবিকে আপ্যায়ন করা হয়েছিল।’

ওবায়েদ উল হক তাঁর স্মৃতিকথায় আরো বলেন, ‘সেই সময়ে আমাদের ছোট শহরে বিদ্যুৎ আকাশেই চমকাতো। বৈদ্যুতিক পাখা ও বাতি বাড়িঘরে আসেনি। ঘরের সিলিংয়ের ওপর ঝুলানো টানা পাখা ছিল। নজরুলের আগমনে সেই পাখার হাওয়া কবিকে দিতে দডিটানার জন্যে অনেক হাতের হাতাহাতি ও প্রতিযোগিতাও শুরু হয়েছিল। মনে পড়ছে সেদিন সবাই তাঁকে ঘিরে রয়েছে। তাঁর বিশ্রাম হচ্ছিল না। কবিকে  দেখাশোনার ভার পরিবারের জ্যেষ্ঠদের ওপর ন্যস্ত ছিল। আমি স্কুলছাত্র ছিলাম। আমাদের ছোটদের কোন দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। কাজী নজরুল ইসলামের কিছু কবিতা পড়েছি, আন্দোলিত হয়েছি। কবিকে দেখার বিচিত্রানুভূতি এই ছিল সেই প্রথম।’

নজরুল একাডেমীর ফেনীর সভাপতি ফখরুদ্দিন আলী আহমদ তিতু বাসসকে বলেন, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের আগমনের শতবর্ষকে ঘিরে এবার ফেনীতে কবি, লেখক ও সাংবাদিকগণ ছাড়াও সব শ্রেণি পেশার মানুষ সরব হয়ে ওঠে। দিবসটি আনন্দ মুখরভাবে উদযাপন করা হয়।

ফেনীর প্রবীণ কবি ও সাংবাদিক, মাসিক আনন্দ ভৈরবী সম্পাদক কবি মঞ্জুর তাজিম বলেন, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ফেনী আগমনের দিনক্ষণ আমরা নানা গবেষণা থেকে জানতে পেরেছি এবং নিশ্চিত হয়েই এবার ১ আগস্ট তাঁর ফেনী আগমনের শতবর্ষ উদযাপন করেছি।

ফেনী সাহিত্য সভার সাধারণ সম্পাদক, ‘মাসিক আনন্দ ভৈরবী’ পত্রিকার দায়িত্বপ্রাপ্ত সম্পাদক কবি ও গবেষক শামিম পাটোয়ারী বলেন, দীর্ঘদিন অনিয়মিত থাকার পর সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল,  ‘আনন্দ ভৈরবী’ এর পুনর্জন্মের প্রথম সংখ্যাটি কবি নজরুলের ফেনী আগমনের শতবর্ষ উপলক্ষে হবে বিশেষ ‘নজরুল সংখ্যা’। একটি সুনির্দিষ্ট তারিখ ছাড়া শতবর্ষের মতো ঐতিহাসিক ঘটনার পূর্ণতা দেয়া অসম্ভব ছিল।

কবি ও গবেষক ফেনী সাহিত্য সভার প্রতিষ্ঠাতা শাবিহ মাহমুদ জানান, নজরুলের ফেনীতে আগমনের শতবর্ষ উদযাপনের মধ্যদিয়ে আমরা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্য সম্পর্কে দেশবাসী ও তরুণ প্রজন্মকে জানাতে চেয়েছি।

ফেনী সাহিত্য সভার সভাপতি কবি বকুল আকতার দরিয়া বলেন, আমরা কবিকে দেখিনি। কিন্তু তাঁর আগমনের শতবর্ষ উদযাপন করতে পেরে গৌরববোধ করছি। বর্তমান সরকারের ‘নজরুল বর্ষ’ উদযাপনকে নজরুল চর্চায় একটি ঐতিহাসিক উদ্যোগ বলে তিনি মনে করেন।

ফেনী শহরের যে কাছারি বাড়িতে এসে কবি কিছু সময় বিশ্রাম নিয়েছিলেন, সেখানে সেই ‘হক ভিলা’ এখন শহরের সর্বাধুনিক শপিং মল গ্র্যান্ড হক টাওয়ার। কবির প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ এখানে একটি নামফলক স্থাপন করা হয় ২০১১ সালের ১৩ মে। ‘ফেনীতে নজরুল’ শিরোনামে এ ফলক উন্মোচন করেন কবির নাতনী খিলখিল কাজী।  ফলকটিতে লেখা আছে ‘হে যুগ শ্রেষ্ঠ বিদ্রোহী কবি, তোমার আগমনে ধন্য এই মাটি’। পরবর্তীকালে ২০২২ সালের ১৫মার্চ কবির ম্যুরাল স্থাপন করা হয়। ম্যুরালের নিচে বিদ্রোহী কবিতার কয়েকটি পংক্তিও লেখা রয়েছে।

প্রতিবছর কবির জন্ম ও মৃত্যু দিবসে ফেনীর বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং কবি ও লেখকগণ এখানে কবিকে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন। এসব দিবসে হক টাওয়ার প্রাঙ্গণে নানা আয়োজনও হয়ে থাকে।

খুঁজুন