মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে টালমাটাল পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কর্মসংস্থান খাত। এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে নতুন করে আশা দেখাচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া। সাম্প্রতিক সময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক মালয়েশিয়া সফরের মাধ্যমে দীর্ঘ অচলাবস্থা কাটিয়ে নতুন করে উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে দেশটির শ্রমবাজার। এ সফরের যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক ইঙ্গিতে নতুন করে স্বপ্নের বুনন শুরু করেছেন লক্ষাধিক অভিবাসনপ্রত্যাশী ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমশক্তির অবস্থান
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের পরই মালয়েশিয়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার। দেশটিতে বর্তমানে নিবন্ধিত প্রায় ২৫ লাখ প্রবাসী শ্রমিকের মধ্যে ৩৭ শতাংশই বাংলাদেশি (প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার)। তালিকায় বাংলাদেশের পরই রয়েছে ইন্দোনেশিয়া (৬ লাখ) ও নেপাল (৪ লাখ)।
মালয়েশিয়া মূলত নির্মাণ, কারখানা বা উৎপাদন, সেবা, কৃষি, বাগান ও খনিজসহ ১৫টি খাতে বাংলাদেশসহ ১৪টি ‘সোর্স কান্ট্রি’ থেকে শ্রমিক নেয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও ২০২৫ সালে মালয়েশিয়া থেকে বৈধ পথে এসেছে ১.৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স, যা বাংলাদেশে প্রবাসী আয় পাঠানোর ক্ষেত্রে পঞ্চম সর্বোচ্চ।
ইতিহাস ও বারবার শ্রমবাজার বন্ধের খতিয়ান
১৯৭৮ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কূটনৈতিক তৎপরতায় অনানুষ্ঠানিকভাবে মাত্র ২৩ জন কর্মী পাঠানোর মাধ্যমে এই বাজারের সূচনা হয়। পরবর্তীতে চুক্তি ও সফলতার পরও অনিয়ম, শর্ত জটিলতা এবং সিন্ডিকেটের দুর্নীতির কারণে বিভিন্ন সময়ে পাঁচবার (১৯৮৬, ১৯৯৪, ২০০৯, ২০১৮ এবং সর্বশেষে ২০২৪ সালের ৩১ মে) এই শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়।
বিশেষ করে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২২ সালে পুরো প্রক্রিয়াটিকে ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি করা হয়। সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় ৭৮ হাজার ৯ ৯০ টাকা থাকলেও কর্মীপ্রতি আদায় করা হয় ৪ থেকে ৬ লাখ টাকা। অনুসন্ধানে জানা যায়, তালিকাভুক্ত হতে সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের এজেন্সিপ্রতি দিতে হয়েছিল প্রায় ৫ কোটি টাকা এবং প্রতি কর্মীর জন্য ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা বাড়তি গুনতে হয়েছিল। ফলশ্রতিতে অনিয়মের অভিযোগে ২০২৪ সালে আবারও লাল ফিতা ও নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে সম্ভাবনাময় এ বাজারটি।
প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশ
বিএমইটির তথ্যানুযায়ী, গত বছরের ৩১ মে থেকে ১৫টি দেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ থাকলেও চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অন্যান্য দেশগুলোর জন্য বাজারটি খুলে দেওয়া হয়। ইতোমধ্যেই ইন্দোনেশিয়া ও নেপাল থেকে নতুন করে ৪১ হাজার ৩৭৩ জন শ্রমিক নিয়েছে মালয়েশিয়া। যেখানে গত এক বছরে নেপাল ও ইন্দোনেশিয়া থেকে হাজার হাজার কর্মী মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন, সেখানে বাংলাদেশ থেকে গেছেন মাত্র ২৯০ জন।
২০২৫ সালের জন্য অন্যান্য সোর্স দেশ থেকে ১ লাখ ১৩ হাজারেরও বেশি শ্রমিক নিবন্ধন করলেও তথ্য জটিলতায় বাংলাদেশের নিবন্ধন ছিল মাত্র ১,৮৫৩ জনের।
ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের দীর্ঘশ্বাস
বর্তমানে বাংলাদেশে অনুমোদিত প্রায় ৩ হাজার বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি রয়েছে। জনশক্তি রপ্তানিকারক ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন বলেন, “একটি এজেন্সিতে ৩০ থেকে ৫০ জন লোক কাজ করেন। তৃণমূলের এজেন্টসহ এই খাতে অন্তত ৬ লাখ মানুষের রুটিরুজি জড়িত। দীর্ঘদিন মালয়েশিয়ার বাজার বন্ধ থাকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতায় আমরা অফিস ভাড়া ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রীর সফরের ওপরই এখন আমাদের সব আশা নির্ভরশীল।”
প্রধানমন্ত্রীর সফরের সাফল্য ও নতুন ভোর
২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন চেষ্টা চালালেও কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি। তবে বর্তমান নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই সিন্ডিকেটমুক্ত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শ্রমবাজার চালুর জোর আইনি ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেয়।
সর্বশেষ গত ২১-২২ জুন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক মালয়েশিয়া সফরে মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষের ইতিবাচক মনোভাব ও যৌথ বিবৃতির ভিত্তিতে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাফল্যের সুবাতাস বইছে। এই সফর মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চয়তার মুখে বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজারে এক নতুন আশা ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পথ দেখাচ্ছে।
মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে খুলছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার
মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে খুলছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে টালমাটাল পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কর্মসংস্থান খাত। এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে নতুন করে আশা দেখাচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া। সাম্প্রতিক সময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক মালয়েশিয়া সফরের মাধ্যমে দীর্ঘ অচলাবস্থা কাটিয়ে নতুন করে উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে দেশটির শ্রমবাজার। এ সফরের যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক ইঙ্গিতে নতুন করে স্বপ্নের বুনন শুরু করেছেন লক্ষাধিক অভিবাসনপ্রত্যাশী ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমশক্তির অবস্থান জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের পরই মালয়েশিয়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার। দেশটিতে বর্তমানে নিবন্ধিত প্রায় ২৫ লাখ প্রবাসী শ্রমিকের মধ্যে ৩৭ শতাংশই বাংলাদেশি (প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার)। তালিকায় বাংলাদেশের পরই রয়েছে ইন্দোনেশিয়া (৬ লাখ) ও নেপাল (৪ লাখ)। মালয়েশিয়া মূলত নির্মাণ, কারখানা বা উৎপাদন, সেবা, কৃষি, বাগান ও খনিজসহ ১৫টি খাতে বাংলাদেশসহ ১৪টি ‘সোর্স কান্ট্রি’ থেকে শ্রমিক নেয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও ২০২৫ সালে মালয়েশিয়া থেকে বৈধ পথে এসেছে ১.৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স, যা বাংলাদেশে প্রবাসী আয় পাঠানোর ক্ষেত্রে পঞ্চম সর্বোচ্চ। ইতিহাস ও বারবার শ্রমবাজার বন্ধের খতিয়ান ১৯৭৮ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কূটনৈতিক তৎপরতায় অনানুষ্ঠানিকভাবে মাত্র ২৩ জন কর্মী
পাঠানোর মাধ্যমে এই বাজারের সূচনা হয়। পরবর্তীতে চুক্তি ও সফলতার পরও অনিয়ম, শর্ত জটিলতা এবং সিন্ডিকেটের দুর্নীতির কারণে বিভিন্ন সময়ে পাঁচবার (১৯৮৬, ১৯৯৪, ২০০৯, ২০১৮ এবং সর্বশেষে ২০২৪ সালের ৩১ মে) এই শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষ করে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২২ সালে পুরো প্রক্রিয়াটিকে ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি করা হয়। সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় ৭৮ হাজার ৯ ৯০ টাকা থাকলেও কর্মীপ্রতি আদায় করা হয় ৪ থেকে ৬ লাখ টাকা। অনুসন্ধানে জানা যায়, তালিকাভুক্ত হতে সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের এজেন্সিপ্রতি দিতে হয়েছিল প্রায় ৫ কোটি টাকা এবং প্রতি কর্মীর জন্য ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা বাড়তি গুনতে হয়েছিল। ফলশ্রতিতে অনিয়মের অভিযোগে ২০২৪ সালে আবারও লাল ফিতা ও নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে সম্ভাবনাময় এ বাজারটি। প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশ বিএমইটির তথ্যানুযায়ী, গত বছরের ৩১ মে থেকে ১৫টি দেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ থাকলেও চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অন্যান্য দেশগুলোর জন্য বাজারটি খুলে দেওয়া হয়। ইতোমধ্যেই ইন্দোনেশিয়া ও নেপাল থেকে নতুন করে ৪১ হাজার ৩৭৩ জন শ্রমিক নিয়েছে মালয়েশিয়া। যেখানে গত এক বছরে নেপাল ও ইন্দোনেশিয়া থেকে হাজার হাজার কর্মী মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন, সেখানে বাংলাদেশ থেকে গেছেন মাত্র ২৯০
জন। ২০২৫ সালের জন্য অন্যান্য সোর্স দেশ থেকে ১ লাখ ১৩ হাজারেরও বেশি শ্রমিক নিবন্ধন করলেও তথ্য জটিলতায় বাংলাদেশের নিবন্ধন ছিল মাত্র ১,৮৫৩ জনের। ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের দীর্ঘশ্বাস বর্তমানে বাংলাদেশে অনুমোদিত প্রায় ৩ হাজার বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি রয়েছে। জনশক্তি রপ্তানিকারক ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন বলেন, “একটি এজেন্সিতে ৩০ থেকে ৫০ জন লোক কাজ করেন। তৃণমূলের এজেন্টসহ এই খাতে অন্তত ৬ লাখ মানুষের রুটিরুজি জড়িত। দীর্ঘদিন মালয়েশিয়ার বাজার বন্ধ থাকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতায় আমরা অফিস ভাড়া ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রীর সফরের ওপরই এখন আমাদের সব আশা নির্ভরশীল।” প্রধানমন্ত্রীর সফরের সাফল্য ও নতুন ভোর ২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন চেষ্টা চালালেও কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি। তবে বর্তমান নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই সিন্ডিকেটমুক্ত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শ্রমবাজার চালুর জোর আইনি ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেয়। সর্বশেষ গত ২১-২২ জুন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক মালয়েশিয়া সফরে মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষের ইতিবাচক মনোভাব ও যৌথ বিবৃতির ভিত্তিতে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাফল্যের সুবাতাস বইছে। এই সফর মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চয়তার মুখে বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজারে এক নতুন আশা ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পথ দেখাচ্ছে।
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
রওশন টাওয়ার, (লিফট-৮) ১৫২/২/এ২ গ্রীণ রোড ,
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ ।
মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত