মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
‘আমাদের চট্টগ্রাম’ অ্যাপে অভিযোগ: চসিকের উচ্ছেদ অভিযান ভাষা শিখে বিনা খরচে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের জাপানে চাকরির সুযোগ : মাহদী আমিন চট্টগ্রাম বন্দরে নিলাম-অযোগ্য ১২৬ কনটেইনার পণ্য ধ্বংস করা হচ্ছে জিম্বাবুয়ে টি-টোয়েন্টি দলে ফিরলেন ক্রিমার মহানবীর (সা.) আদর্শে হিংসা-বিদ্বেষ পরিহারের আহ্বান রাষ্ট্রপতির কিউট-বিএসপিএ স্পোর্টস কার্নিভাল ২০২৬ শুরু মহানবীর (সা.) আদর্শ অনুসরণে শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলবে বাংলাদেশ : ডি ভিলিয়ার্স রদ্রিকে না পেলেও স্কোয়াড নিয়ে সন্তুষ্ট মরিনহো ট্রাম্পের নতুন শুল্কের পাল্টা পদক্ষেপ ঘোষণা করবে কানাডা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অর্থনীতিতে গভীর পরিবর্তন ও সংকট সৃষ্টি করছে এআই

অর্থনীতিতে গভীর পরিবর্তন ও সংকট সৃষ্টি করছে এআই

মানুষের মগজের নিউরন আর সিলিকন চিপের এক অদ্ভুত মিলনমেলায় জন্ম নিল একবিংশ শতাব্দীর এমন আলাদিনের চেরাগ, যা মানুষের কল্পনাকে পলকেই বাস্তবে রূপ দিচ্ছে-Ai

মানুষের নিজের তৈরি এই অদৃশ্য মস্তিষ্ক আজ মানুষের চেয়েও দ্রুত ভাবছে, কথা বলছে এবং চোখের পলকে বদলে দিচ্ছে চেনা পৃথিবীর চেনা সব সমীকরণ।

কবির কবিতা থেকে শুরু করে মহাকাশের জটিল বিজ্ঞান -সবখানেই এখন এই নীরব জাদুকরের স্পর্শের  ছোঁয়া,যা মানবসভ্যতাকে এক অচেনা ভবিষ্যতের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

তবে এই অবিশ্বাস্য চমৎকারের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিরাট সংকটও, -

কি সেই সংকট? 

চলুন সেটা উন্মোচন করা যাক।

এআই যে পুরো অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেবে -বোস্টন ইউনিভার্সিটির 'দ্য এআই লে-অফ ট্র্যাপ' নামের একটি গবেষণাপত্রে সেই আশঙ্কার কথা জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে। 

সেখানে পরিষ্কার বলা হয়েছে, "শেষ সীমায় গিয়ে কোম্পানিগুলো অটোমেশনের মাধ্যমে সীমাহীন উৎপাদনশীলতা তো ঠিকই অর্জন করবে, কিন্তু বাজারে কোনো পণ্যের আর 'চাহিদা' বা ক্রেতা থাকবে না।"

কী,কঠিন হয়ে গেল?
চলুন সহজে বুঝি ব্যাপারটা -

* ধরুন, একটা কোম্পানি তাদের ৫০০ জন কর্মীকে তাড়িয়ে সেখানে এআই বসাল। তাদের দেখাদেখি প্রতিযোগী আরেকটা কোম্পানি তাড়াল ৭০০ জনকে, অন্য আরেকটা কোম্পানি তাড়াল ১ হাজার জনকে। 

এখানে প্রতিটি কোম্পানিই নিজেদের জায়গায় একদম সঠিক আর লাভজনক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে -তারা খরচ বাঁচিয়ে পকেট ভারী করছে, কিন্তু এই সিদ্ধান্তের কারণে বাজারের যে বড় অংশের চাহিদা ধ্বংস হচ্ছে, তার দায় পড়ছে সামান্যই।

* আসল টুইস্ট হলো, যে ছাঁটাই হওয়া কর্মীরা চাকরি হারালেন, তাঁরা তো দিনশেষে কোনো না কোনো কোম্পানির কাস্টমার বা ক্রেতাও ছিলেন!

 যখন পুরো অর্থনীতিতে নতুন চাকরি তৈরি হওয়ার গতির চেয়ে মানুষ দ্রুত গতিতে চাকরি হারাতে থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তারা খরচ করা বন্ধ করে দেয়।

ফলে বাজারে পণ্যের চাহিদা ধপাস করে কমে যায়। আর চাহিদা কমলে কোম্পানিগুলো খরচ আরও কমাতে আরও বেশি এআই বা অটোমেশন ব্যবহার করে -

যার ফলে আরও বেশি মানুষের চাকরি যায়। আর সেটা বাজারের কেনাকাটা বা চাহিদাকে আরও তলানিতে নামিয়ে আনে।

•এই চক্রের কোনো শেষ নেই!


যত বেশি অটোমেশন হবে, তত বেশি 
ছাঁটাই হবে; আর যত ছাঁটাই হবে, 
বাজারের কেনাকাটার চাহিদা তত 
দুর্বল হবে। এই চক্রটি নিজে নিজেই  
ঘুরতে থাকে এবং পরিস্থিতি 
 আরও জটিল করে তোলে।

 গবেষকেরা একে বলছেন 'কোঅর্ডিনেশন ফেইলিওর' বা সমন্বয়ের অভাব। অর্থাৎ, যে সিদ্ধান্তটা একটা একক কোম্পানির জন্য দারুণ লাভজনক, সেটাই পুরো দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটা চরম বিপর্যয় ডেকে আনছে।

* গত ২০২৫ সালে প্রযুক্তি খাতে চাকরি হারিয়েছেন ১ লাখ ২৪ হাজার মানুষ। মানে তাদেরকে ছাঁটাই করে এআই বসানো হয়েছে। আর এই ২০২৬ সালের মাত্র প্রথম পাঁচ মাসেই ১০৬টি কোম্পানির প্রায় ৯৩ হাজারেরও বেশি কর্মী ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন।

* 'ব্লক' কোম্পানি তাদের ৪ হাজার কর্মী ছাঁটাই করছে।এর স্থলে বসানো হচ্ছে অটোমেশন। মেটা গত জানুয়ারিতে ১৫০০ জন বাদ দেওয়ার পর মে মাসেই এক ধাক্কায় তাড়িয়েছে ৮ হাজার কর্মী।

ওরাকল গত এপ্রিলে ছাঁটাই করেছে ৩০ হাজার মানুষ। কয়েনবেস, স্ন্যাপচ্যাটসহ অন্যান্য কোম্পানিগুলোও একই লাইনে হাঁটছে।

 ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ ছাঁটাই হয়েছে, তার মধ্যে ৮০ হাজারেরও বেশি হাতবদল হয়েছে কেবল মার্কিন কোম্পানিগুলোতে।

এরকম হলে বেকারত্বের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।সমাধান তাহলে কী?

* এই গবেষণায় সচরাচর আলোচনা করা বেশ কয়েকটি বহুল পরিচিত সমাধান পরীক্ষা করে দেখা হয়েছিল:

* - ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম বা সবার জন্য ন্যূনতম মৌলিক ভাতা।অর্থাৎ  সরকার বা কোম্পানি সবার জন্য একটা ভাতা নির্ধারণ করবে,যেন তারা বসে বসে খেতে পারে।কোন কাজ করতে না হয়।{এটা বাস্তব,কোন কল্পনা না} 

* - কোম্পানির মালিকানা ও শেয়ারে শ্রমিকদের অংশীদারিত্ব দেওয়া।

* - নতুন করে কাজ শেখানো বা আপস্কিলিং প্রোগ্রাম।

* - কোম্পানিগুলোর নিজেদের মধ্যে স্বেচ্ছায় একটা সমন্বয় করা।

* কিন্তু দুঃখের বিষয়,উপরের সব ফর্মুলা পরীক্ষা করে দেখার পর, এই এআই মডেলের ভেতরে বাজারের চাহিদার বিশাল ধস ঠেকাতে, ওপরের কোনো ফর্মুলাই নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করেনি।

* পুরো সিস্টেমটাকে স্থিতিশীল রাখার জন্য কেবল একটি প্রক্রিয়াই সফলভাবে কাজ করেছে,আর তা হলো-'পিগোভিয়ান অটোমেশন ট্যাক্স'।

সহজ কথায়, এআই ব্যবহার করে মানুষের চাকরি কেড়ে নেওয়ার ওপর একটা বড়সড় ট্যাক্স বসানো।একটা কোম্পানি ai বসানোর জন্য কোন কর্মী ছাঁটাই করলে তাকে বড় পরিমাণ জরিমানা বা ট্যাক্স দিতে হবে। 

এর ফলে কোম্পানিগুলো মানুষের চাকরি খাওয়ার আগে এই ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক ক্ষতিটা নিজেরা টের পেতে বাধ্য হবে।

* আসলে, কোম্পানিগুলো বাজারে যে চাহিদার ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে, তার জরিমানা তাদের নিজেদের পকেট থেকেই দিতে হবে। 

এই ধরণের কোনো কড়া নিয়ম না থাকলে, বাজারের লোভ কোম্পানিগুলোকে দিন দিন আরও বড় অটোমেশনের দিকে ঠেলে দেবে

-এমনকি সেই পরিণাম যখন নিজেদের ব্যবসার জন্যও আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়াবে, তখনও তারা থামবে না।

* অথচ, এত কিছুর পরেও এআই পরিকাঠামো তৈরির পেছনে খরচের জোয়ার কিন্তু থামছেই না।

* - অ্যামাজন কোম্পানি ইন্ডিয়ানার এক গ্রামীণ এলাকায় এক এআই দানব তৈরি করতে ১১ বিলিয়ন ডলার খরচ করছে।

 এর আকার শুনলে আপনার চোখ কপালে উঠতে বাধ্য:

১২০০ একর জমি, ৩০টিরও বেশি বিশাল ভবন, ২.২ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ,যা দিয়ে ১০ লাখ সাধারণ বাড়ির বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো সম্ভব, এবং বছরে ৩০০ মিলিয়ন গ্যালন পানি!

* - লুইজিয়ানায় মেটা-র ২৭ বিলিয়ন ডলারের ডেটা সেন্টারটি প্রতিদিন প্রায় ২৩ মিলিয়ন গ্যালন পানি খরচ করবে -যা ১৭ হাজার বাসিন্দার পানির চাহিদার সমান। 

আর টেক্সাসে তাদের যে ফেসিলিটি আছে, সেটির ১ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ একাই পুরো সান ফ্রান্সিসকোর মতো একটা আস্ত শহর চালানোর জন্য যথেষ্ট।

* - গুগল-এর ডেটা সেন্টারগুলো ২০২৪ সালে একাই ৩০ মিলিয়ন মেগাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ গিলে খেয়েছে। মেটা খরচ করেছে ১৮ মিলিয়ন, এবং মাইক্রোসফট গিলেছে ২৯ মিলিয়ন মেগাওয়াট ঘণ্টা।

সংখ্যাগুলো কত বড় তা কি টের পাচ্ছেন!

গুগলের ৩০ মিলিয়ন মেগাওয়াট ঘণ্টা মানে হলো ৩ কোটি মেগাওয়াট ঘণ্টা। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ দিয়ে আস্ত একটা মাঝারি সাইজের দেশ যেমন আয়ারল্যান্ড বা নিউজিল্যান্ড পুরো এক বছর চলতে পারে!

 মাইক্রোসফটের ২৯ মিলিয়ন এবং মেটার ১৮ মিলিয়ন মেগাওয়াট ঘণ্টার হিসাব যোগ করলে তা অনেক উন্নত দেশের মোট বার্ষিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেও ছাড়িয়ে যায়।

* ওপর থেকে দুনিয়াকে দেখানোর জন্য বলা হচ্ছে -

এই ডেটা সেন্টারগুলো মূলত সার্ভার ঠান্ডা রাখতে আর চ্যাটজিপিটি-র মতো সার্ভিসগুলোকে সচল রাখতে চালানো হচ্ছে। 

কিন্তু পর্দার আড়ালের আসল সত্যিটা হলো, এগুলো আসলে প্রতিটি একক মানুষের জন্য এক একটা ডিজিটাল নজরদারির জেলখানা হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য খুব পরিষ্কার-

যে কাউকে, যেকোনো সময় কড়া নজরে রাখা এবং পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটাকে এমনভাবে পঙ্গু করে দেওয়া, যাতে কোনো মানুষই কোনোদিন এই পরনির্ভরশীলতার বেড়াজাল কেটে পালিয়ে বাঁচতে না পারে।

মানুষের তৈরি এই সিলিকনের জাদুকর আজ নিজেই নিজের ধ্বংসের ফাঁদ বুনছে। একদিকে চাকরি খেয়ে কোটি কোটি মানুষকে আয়ের পথহীন ভিখারিতে রূপান্তর করা, 

আর অন্যদিকে সেই বেকার জনগোষ্ঠীর পকেট শূন্য করে দিয়ে বাজারের সমস্ত বেচাকেনা ও অর্থনৈতিক চাহিদাকে একবারে আইসিইউ-তে পাঠিয়ে দেওয়া -এই হলো তথাকথিত আধুনিক টেক-জায়ান্টদের আসল কারসাজি।

এটার যদি এখনই লাগাম টেনে ধরা না হয়,তবে সামনের দিনগুলোতে দেউলিয়া বাজার, ভেঙে পড়া অর্থনীতি আর কোটি কোটি ক্ষুধার্ত বেকারের হাহাকারে পুরো বিশ্ব ব্যবস্থা এক অবর্ণনীয় ও চরম সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে।

খুঁজুন