আওয়ামী লীগের শাসনামলে তিনটি নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি—এটাই তো আওয়ামী লীগের অপরাধ? গত ৫০ বছরে কার শাসনামলে ভালো নির্বাচন হয়েছে? জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখলের পর ১৯৭৭ সালের ‘হ্যাঁ’ ‘না’ ভোট সাচ্চা ছিল? ১৯৭৮ সালে জেনারেল জিয়ার প্রেসিডেন্ট হওয়ার নির্বাচনটা কেমন ছিল? তাঁর অধীনে ৭৯’র সংসদ নির্বাচন কেমন ছিল? নির্বাচন, না হাসির খোরাক?
আজ যেমন আওয়ামী লীগের নাম নেওয়া বা মুক্তিযুদ্ধের শ্লোগান ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণ করা বিপদজনক, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পরও পরিস্থিতি এমন করা হয়েছিল। সেই পরিবেশে ‘ক্ষমতা বিনোদিত’ নির্বাচন করেছিলেন জিয়া।
জিয়ার মৃত্যুর পর ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনটা কেমন ছিল? সেদিন বিএনপির প্রার্থী বিচারপতি আবদুস সাত্তার কীভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন? সব আর্মি-নিয়ন্ত্রিত ভোট। শেষে আরেক আর্মি এরশাদ ক্ষমতা নিয়ে নিলেন। আচ্ছা, এরশাদের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো কেমন ছিল? সেসব একটা একটা করে আর না বলি। বরং খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক আমলে চলে আসি।
বাংলাদেশের ইতিহাসে মোটামুটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রথম অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালে—বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে দলনিরপেক্ষ অস্থায়ী সরকারের অধীনে। বিএনপি ঐ নির্বাচনে জয়ী হয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে প্রথম নির্বাচিত সরকার গঠন করেছিল। পাঁচ বছর দেশ শাসন করার পর খালেদা জিয়া ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি নির্বাচন আয়োজন করেছিলেন। কেমন ছিল সেই নির্বাচন? মরা ভোটাররাও তাতে ভোট দিয়েছিল—কোনো কোনো আসনে ৯৮% এর অধিক ভোট পড়েছিল—সব পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। এমনই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন—কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে পারেননি খালেদা জিয়া। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সর্বাত্মক গণআন্দোলনের মুখে তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। সেবার সাংবিধানিকভাবে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার।
ক্ষমতা হারানো বিএনপিকে নিষিদ্ধ করা হয়নি—বিএনপির নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়া হয়নি। তারাও নির্বাচনে সম-দাপটে অংশ নিয়েছিল। মাত্র চার মাসের ব্যবধানে ১২ জুন আবার নির্বাচন—জয়ী হয়েছিল আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনা প্রথমবার হলেন প্রধানমন্ত্রী। বিএনপির মনোনিত প্রেসিডেন্ট আবদুর রহমান বিশ্বাস তখন স্বপদে ছিলেন—তিনি একটি সেনা-অভ্যুত্থানের পরিবেশ তৈরি করে গণেশ উল্টে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার মোটামুটি সফলভাবে পরিস্থিতি সামলেছেন। নির্বাচনটি বাংলাদেশের বাস্তবতায় সন্দেহাতীতভাবে একটি ভালো নির্বাচন ছিল।
মেয়াদান্তে শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন। তখন দেশের প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ ও প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমান। তাঁদের অধীনে ২০০১-এর ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেবারও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন বাংলাদেশের বাস্তবতায় ভালো ও গ্রহণযোগ্য হয়েছিল।
এবার নির্বাচিত হয় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর চারদলীয় জোট। খালেদা-নিজামীর ঐ আমলটা বাংলাদেশে ইসলামী জঙ্গিবাদ উত্থানের প্রথম বসন্তকাল—ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতনের রেকর্ডকাল। বাংলাভাই তখন প্রকাশ্যে মানুষকে ফাঁসি দিচ্ছেন; ক্ষমতায় খালেদা জিয়া—সরকারের ভরকেন্দ্র হাওয়া ভবনে। শেখ হাসিনাসহ দলের সকল শীর্ষ নেতাকে মেরে ফেলার জন্য ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা করা হলো। প্রাণ হারালেন আইভি রহমানসহ ২৪ জন। আসামি আবিষ্কার করা হলো একজন ভবঘুরে জজ মিয়াকে। এরপর ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারা দেশে একযোগে বোমা হামলা চালানো হলো।
এতসবের পর মেয়াদান্তে খালেদা জিয়া নিরপেক্ষ সরকারের কাছে নয়, তাঁর দলের অনুগত একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করার জন্য সাংবিধানিক কারসাজি করলেন। বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা পরিবর্তন করে তাঁর সমর্থক একজন বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টা বানাতে চাইলেন। প্রেসিডেন্ট তখন তাঁর অতি বিশ্বস্ত ইয়াজউদ্দিন; নির্বাচন কমিশনে আলোচিত এম. এ. আজিজ। হাসিনার নেতৃত্বে শুরু হলো গণআন্দোলন। অনমনীয় বিএনপি, অনমনীয় ইয়াজউদ্দিন। শেষ পর্যায়ে তিনি একাই প্রেসিডেন্ট এবং একাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাংবিধানিক সিস্টেমটা যেন ফোঁপা হয়ে গেল। তবে আন্দোলনের তোড়ে তাঁরা টিকতে পারেননি, করতে পারেননি নির্বাচন।
আসে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার— যার মেয়াদ তিন মাস নয়, হয়ে গেল ইচ্ছাধীন। সংবিধান যেন ফোকলা ব্যাপার। তবে দুই বছর পর তারাও নির্বাচন দিয়ে জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য হয়।
ক্ষমতা হারানোর পর বিএনপি নিষিদ্ধ হয়নি—তাদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য মব-উৎসব দেখা যায়নি। গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা হারিয়েও তারা মহাদাপটে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। অথচ বিএনপি-জামায়াত তাদের ঐ আমলেই মানুষের ওপর সর্বাধিক ক্ষমতা প্র্যাকটিস করেছিল, অত্যাচারের সীমা ছিল না। শেখ হাসিনা বেঁচে ছিলেন ভাগ্যে। ২০০৮-এর ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তাঁর দল বিপুল ভোটে জয়ী হলো। নির্বাচন ছিল অবাধ ও গ্রহণযোগ্য।
বাংলাদেশের ইতিহাসে মোটা দাগে চারটি নির্বাচন—২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১, ১২ জুন ১৯৯৬, ১ অক্টোবর ২০০১ এবং ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮—অনুষ্ঠিত হয়েছিল সবার অংশগ্রহণে এবং গ্রহণযোগ্য। চারটি নির্বাচনই নির্দলীয় সরকারের অধীনে হয়েছিল। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আওয়ামী লীগ আমলে ভালো হয়নি, বিএনপির আমলে ভালো হয়নি, জাতীয় পার্টির আমলেও ভালো হয়নি। পার্থক্য হলো, খালেদা জিয়া ১৫ ফেব্রুয়ারির হাস্যকর নির্বাচন করে টিকে থাকতে পারেননি; শেখ হাসিনা কথিত “রাতের ভোট” আয়োজন করেও টিকে থাকতে পেরেছিলেন। বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে সেই নির্বাচন হয়েছিল বলেই আওয়ামী লীগ পেরেছিল।
নিশ্চয় খারাপ নির্বাচন গণতন্ত্র নয়—হাসিনাকে যারা সরাতে চেয়েছে, তারাও কেবল ক্ষমতা চেয়েছে—গণতন্ত্র চায়নি। ইউনুসের জঙ্গি-মববাদী সরকারের অধীনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম-সুযোগ দূরের কথা, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতেই দেওয়া হয়নি। ক্ষমতা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগির একতরফা নির্বাচন হয়েছে। বাংলাদেশ ভারসাম্য হারিয়েছে।
আওয়ামী লীগবিহীন একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং পাতানো বিরোধী দল জামায়াতের ভাগাভাগির ক্ষেত্রে পরিণত হওয়া এই দেশ আজ সংকটময়; দুর্যোগময়। দেশে জঙ্গি পাকিস্তানিদের উত্থানের ফলে সৃষ্ট এই দুর্যোগে বাংলাদেশকে রক্ষায় আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক দল দেখছি না। রাজনৈতিক ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় দ্রুত আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন দরকার। বাংলাদেশে ন্যূনতম আইনের শাসন ও গণতন্ত্র রাখতে হলে আওয়ামী লীগ ছাড়া বিকল্প নেই।
হ্যাঁ, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলেই সুস্থ গণতন্ত্র আসবে, একথা বিশ্বাস করা কঠিন। কারণ দেশে গণতান্ত্রিক বাস্তবতায় ব্যাপক ঘাটতি। সত্যিকার অর্থে কেউ গণতন্ত্র চায় না—সবাই ক্ষমতা চায়। পূর্ণ গণতন্ত্র না হোক, আওয়ামী লীগ ফিরলে রাজনীতিতে একটা ভারসাম্য ফিরবে, গণতান্ত্রিক লড়াই ফিরবে—গণতন্ত্রের সম্ভাবনা ফিরবে। ন্যূনতম ভারসাম্য না আসলে দেশ ধ্বংস হবে—জঙ্গিবাদীরা দেশকে আফগানিস্তান, সিরিয়া, সুদান বানাতে চায়; ইউক্রেনের মতো সংকটে ফেলতে চায়।
মানুষ দেখছে, আওয়ামী লীগ না থাকলে বাংলাদেশ থাকে না। সামগ্রিক চরিত্রে দেশটা “পূর্ব পাকিস্তান” হয়ে যায়। ৭৭ বছর আগে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় মুক্তিসংগ্রামের ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছিল; এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আজ ঐ একটি দলের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনার মধ্যে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ মিশে আছে। ”জয় বাংলা বলে আগে বাড়ো।”
আওয়ামী লীগ না থাকলে বাংলাদেশ থাকে না
আওয়ামী লীগ না থাকলে বাংলাদেশ থাকে না
আওয়ামী লীগের শাসনামলে তিনটি নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি—এটাই তো আওয়ামী লীগের অপরাধ? গত ৫০ বছরে কার শাসনামলে ভালো নির্বাচন হয়েছে? জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখলের পর ১৯৭৭ সালের ‘হ্যাঁ’ ‘না’ ভোট সাচ্চা ছিল? ১৯৭৮ সালে জেনারেল জিয়ার প্রেসিডেন্ট হওয়ার নির্বাচনটা কেমন ছিল? তাঁর অধীনে ৭৯’র সংসদ নির্বাচন কেমন ছিল? নির্বাচন, না হাসির খোরাক? আজ যেমন আওয়ামী লীগের নাম নেওয়া বা মুক্তিযুদ্ধের শ্লোগান ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণ করা বিপদজনক, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পরও পরিস্থিতি এমন করা হয়েছিল। সেই পরিবেশে ‘ক্ষমতা বিনোদিত’ নির্বাচন করেছিলেন জিয়া। জিয়ার মৃত্যুর পর ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনটা কেমন ছিল? সেদিন বিএনপির প্রার্থী বিচারপতি আবদুস সাত্তার কীভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন? সব আর্মি-নিয়ন্ত্রিত ভোট। শেষে আরেক আর্মি এরশাদ ক্ষমতা নিয়ে নিলেন। আচ্ছা, এরশাদের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো কেমন ছিল? সেসব একটা একটা করে আর না বলি। বরং খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক আমলে চলে আসি। বাংলাদেশের ইতিহাসে মোটামুটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রথম অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালে—বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে দলনিরপেক্ষ অস্থায়ী সরকারের অধীনে। বিএনপি ঐ নির্বাচনে জয়ী হয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে প্রথম নির্বাচিত সরকার গঠন করেছিল। পাঁচ বছর দেশ শাসন করার পর খালেদা জিয়া ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি নির্বাচন আয়োজন করেছিলেন। কেমন ছিল সেই নির্বাচন? মরা ভোটাররাও তাতে ভোট দিয়েছিল—কোনো কোনো আসনে ৯৮% এর অধিক ভোট পড়েছিল—সব পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। এমনই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন—কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে পারেননি খালেদা জিয়া। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সর্বাত্মক গণআন্দোলনের মুখে তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। সেবার সাংবিধানিকভাবে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ক্ষমতা হারানো বিএনপিকে নিষিদ্ধ করা হয়নি—বিএনপির নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়া হয়নি। তারাও নির্বাচনে সম-দাপটে অংশ নিয়েছিল। মাত্র চার মাসের ব্যবধানে ১২ জুন আবার নির্বাচন—জয়ী হয়েছিল আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনা প্রথমবার হলেন প্রধানমন্ত্রী। বিএনপির মনোনিত প্রেসিডেন্ট আবদুর রহমান বিশ্বাস তখন স্বপদে ছিলেন—তিনি একটি সেনা-অভ্যুত্থানের পরিবেশ তৈরি করে গণেশ উল্টে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার মোটামুটি সফলভাবে পরিস্থিতি সামলেছেন। নির্বাচনটি বাংলাদেশের বাস্তবতায় সন্দেহাতীতভাবে একটি ভালো নির্বাচন ছিল। মেয়াদান্তে শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে দায়িত্ব ছেড়ে
দিয়েছিলেন। তখন দেশের প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ ও প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমান। তাঁদের অধীনে ২০০১-এর ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেবারও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন বাংলাদেশের বাস্তবতায় ভালো ও গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। এবার নির্বাচিত হয় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর চারদলীয় জোট। খালেদা-নিজামীর ঐ আমলটা বাংলাদেশে ইসলামী জঙ্গিবাদ উত্থানের প্রথম বসন্তকাল—ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতনের রেকর্ডকাল। বাংলাভাই তখন প্রকাশ্যে মানুষকে ফাঁসি দিচ্ছেন; ক্ষমতায় খালেদা জিয়া—সরকারের ভরকেন্দ্র হাওয়া ভবনে। শেখ হাসিনাসহ দলের সকল শীর্ষ নেতাকে মেরে ফেলার জন্য ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা করা হলো। প্রাণ হারালেন আইভি রহমানসহ ২৪ জন। আসামি আবিষ্কার করা হলো একজন ভবঘুরে জজ মিয়াকে। এরপর ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারা দেশে একযোগে বোমা হামলা চালানো হলো। এতসবের পর মেয়াদান্তে খালেদা জিয়া নিরপেক্ষ সরকারের কাছে নয়, তাঁর দলের অনুগত একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করার জন্য সাংবিধানিক কারসাজি করলেন। বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা পরিবর্তন করে তাঁর সমর্থক একজন বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টা বানাতে চাইলেন। প্রেসিডেন্ট তখন তাঁর অতি বিশ্বস্ত ইয়াজউদ্দিন; নির্বাচন কমিশনে আলোচিত এম. এ. আজিজ। হাসিনার নেতৃত্বে শুরু হলো গণআন্দোলন। অনমনীয় বিএনপি, অনমনীয় ইয়াজউদ্দিন। শেষ পর্যায়ে তিনি একাই প্রেসিডেন্ট এবং একাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাংবিধানিক সিস্টেমটা যেন ফোঁপা হয়ে গেল। তবে আন্দোলনের তোড়ে তাঁরা টিকতে পারেননি, করতে পারেননি নির্বাচন। আসে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার— যার মেয়াদ তিন মাস নয়, হয়ে গেল ইচ্ছাধীন। সংবিধান যেন ফোকলা ব্যাপার। তবে দুই বছর পর তারাও নির্বাচন দিয়ে জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য হয়। ক্ষমতা হারানোর পর বিএনপি নিষিদ্ধ হয়নি—তাদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য মব-উৎসব দেখা যায়নি। গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা হারিয়েও তারা মহাদাপটে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। অথচ বিএনপি-জামায়াত তাদের ঐ আমলেই মানুষের ওপর সর্বাধিক ক্ষমতা প্র্যাকটিস করেছিল, অত্যাচারের সীমা ছিল না। শেখ হাসিনা বেঁচে ছিলেন ভাগ্যে। ২০০৮-এর ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তাঁর দল বিপুল ভোটে জয়ী হলো। নির্বাচন ছিল অবাধ ও গ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশের ইতিহাসে মোটা দাগে চারটি নির্বাচন—২৭
ফেব্রুয়ারি ১৯৯১, ১২ জুন ১৯৯৬, ১ অক্টোবর ২০০১ এবং ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮—অনুষ্ঠিত হয়েছিল সবার অংশগ্রহণে এবং গ্রহণযোগ্য। চারটি নির্বাচনই নির্দলীয় সরকারের অধীনে হয়েছিল। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আওয়ামী লীগ আমলে ভালো হয়নি, বিএনপির আমলে ভালো হয়নি, জাতীয় পার্টির আমলেও ভালো হয়নি। পার্থক্য হলো, খালেদা জিয়া ১৫ ফেব্রুয়ারির হাস্যকর নির্বাচন করে টিকে থাকতে পারেননি; শেখ হাসিনা কথিত “রাতের ভোট” আয়োজন করেও টিকে থাকতে পেরেছিলেন। বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে সেই নির্বাচন হয়েছিল বলেই আওয়ামী লীগ পেরেছিল। নিশ্চয় খারাপ নির্বাচন গণতন্ত্র নয়—হাসিনাকে যারা সরাতে চেয়েছে, তারাও কেবল ক্ষমতা চেয়েছে—গণতন্ত্র চায়নি। ইউনুসের জঙ্গি-মববাদী সরকারের অধীনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম-সুযোগ দূরের কথা, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতেই দেওয়া হয়নি। ক্ষমতা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগির একতরফা নির্বাচন হয়েছে। বাংলাদেশ ভারসাম্য হারিয়েছে। আওয়ামী লীগবিহীন একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং পাতানো বিরোধী দল জামায়াতের ভাগাভাগির ক্ষেত্রে পরিণত হওয়া এই দেশ আজ সংকটময়; দুর্যোগময়। দেশে জঙ্গি পাকিস্তানিদের উত্থানের ফলে সৃষ্ট এই দুর্যোগে বাংলাদেশকে রক্ষায় আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক দল দেখছি না। রাজনৈতিক ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় দ্রুত আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন দরকার। বাংলাদেশে ন্যূনতম আইনের শাসন ও গণতন্ত্র রাখতে হলে আওয়ামী লীগ ছাড়া বিকল্প নেই। হ্যাঁ, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলেই সুস্থ গণতন্ত্র আসবে, একথা বিশ্বাস করা কঠিন। কারণ দেশে গণতান্ত্রিক বাস্তবতায় ব্যাপক ঘাটতি। সত্যিকার অর্থে কেউ গণতন্ত্র চায় না—সবাই ক্ষমতা চায়। পূর্ণ গণতন্ত্র না হোক, আওয়ামী লীগ ফিরলে রাজনীতিতে একটা ভারসাম্য ফিরবে, গণতান্ত্রিক লড়াই ফিরবে—গণতন্ত্রের সম্ভাবনা ফিরবে। ন্যূনতম ভারসাম্য না আসলে দেশ ধ্বংস হবে—জঙ্গিবাদীরা দেশকে আফগানিস্তান, সিরিয়া, সুদান বানাতে চায়; ইউক্রেনের মতো সংকটে ফেলতে চায়। মানুষ দেখছে, আওয়ামী লীগ না থাকলে বাংলাদেশ থাকে না। সামগ্রিক চরিত্রে দেশটা “পূর্ব পাকিস্তান” হয়ে যায়। ৭৭ বছর আগে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় মুক্তিসংগ্রামের ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছিল; এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আজ ঐ একটি দলের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনার মধ্যে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ মিশে আছে। ”জয় বাংলা বলে আগে বাড়ো।”
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
১৫২/২, এ-২ গ্রীন রোড, রওশন টাওয়ার (লিফটের-৮),
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ । মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত