অনেকদিন ধরে লিখছি না। কারণ শুধু মানুষই ক্লান্ত হয় না, লেখাও ক্লান্ত হয়। শব্দেরও বিশ্রাম লাগে, ভাবনারও নীরবতা প্রয়োজন হয়। কখনও কখনও কলম থেমে যায়, কাগজ অপেক্ষা করে, আর লেখক নিজের ভেতরের অরণ্যে হারিয়ে যায়।
তবু আশ্চর্যের বিষয়, আমি যাদের অনেককেই চিনি না, তারাই আমার লেখার জন্য অপেক্ষা করে। তারা চায় আমি আবার লিখি। তারা বলে, আমার লেখার ভেতর নাকি তারা নিজেদের জীবন খুঁজে পায়। আমার বাক্যের কোথাও তাদের অপ্রকাশিত কষ্ট, কোথাও তাদের না-বলা স্বপ্ন, কোথাও তাদের নিঃশব্দ সংগ্রাম লুকিয়ে থাকে। আমি অবাক হয়ে ভাবি, আমি তো তাদের চিনি না, তবে কীভাবে তাদের গল্প আমার লেখায় এসে যায়?
হয়তো এর কারণ, মানুষের গল্প আলাদা হলেও তার অনুভূতির ভাষা এক। সুখের রং ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু অশ্রুর স্বাদ প্রায় একই। একজন মানুষের নিঃসঙ্গতা আরেকজন মানুষের নিঃসঙ্গতার সঙ্গে কোথাও গিয়ে মিলিত হয়। তাই একজনের গল্প লিখতে গিয়ে অজান্তেই অনেকের গল্প লেখা হয়ে যায়।
জীবন আসলে এক অদ্ভুত গল্প। এর কোনো নির্দিষ্ট কাহিনি নেই, তবু প্রতিটি মানুষের জীবন একটি সম্পূর্ণ উপন্যাস। আমরা প্রতিদিন নতুন নতুন চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত হই। কেউ অল্প সময়ের জন্য আসে, কেউ দীর্ঘদিন পাশে থাকে, কেউ আবার চলে যাওয়ার পরও স্মৃতিতে বেঁচে থাকে। আমরা তাদের দেখি, বুঝতে চেষ্টা করি, বিচার করি, ভালোবাসি কিংবা ঘৃণা করি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা কি সত্যিই তাদের চিনি?
মানুষের সবচেয়ে বড় রহস্য সম্ভবত তার চরিত্র। আমরা যে মানুষটিকে প্রতিদিন দেখি, সে কি সত্যিই সেই মানুষ? নাকি সে কেবল তার একটি মুখ, একটি প্রকাশিত সংস্করণ? মানুষের ভেতরে কত স্তর, কত গোপন কক্ষ, কত অপ্রকাশিত গল্প লুকিয়ে থাকে তার হিসাব কে রাখে? যে মানুষটিকে আমরা সৎ ভাবি, তার ভেতরে হয়তো কোনো অদেখা দুর্বলতা আছে। যাকে আমরা কঠোর বলি, সে হয়তো একান্তে খুব সহজেই ভেঙে পড়ে। যাকে আমরা শক্তিশালী মনে করি, সে হয়তো নিজের সঙ্গেই প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে যাচ্ছে।
তাহলে মানুষের চরিত্র আসলে কী?
এটি কি তার মুখে বলা কথা?
নাকি তার নীরবে নেওয়া সিদ্ধান্ত?
এটি কি তার অর্জন?
নাকি তার ব্যর্থতার মুহূর্তে নিজেকে ধারণ করার ক্ষমতা?
হয়তো চরিত্র কোনো স্থির বিষয় নয়। এটি নদীর মতো, সময়ের সঙ্গে বদলায়, অভিজ্ঞতার সঙ্গে রূপান্তরিত হয়। একজন মানুষ এক জীবনে বহুবার নতুন মানুষ হয়ে ওঠে। তার বিশ্বাস বদলায়, তার স্বপ্ন বদলায়, তার অগ্রাধিকার বদলায়। তাই কাউকে সম্পূর্ণ চিনে ফেলার দাবি হয়তো সবচেয়ে বড় ভুল।
আমি যখন মানুষকে নিয়ে লিখি, তখন আসলে কোনো নির্দিষ্ট মানুষকে নিয়ে লিখি না। আমি লিখি মানুষের সম্ভাবনা, তার দ্বন্দ্ব, তার আলো এবং তার অন্ধকারকে নিয়ে। আমি লিখি সেই প্রশ্নগুলো নিয়ে, যেগুলোর উত্তর আজও পুরোপুরি পাওয়া যায়নি। কারণ মানুষের গল্প শেষ হয় না; প্রতিটি উত্তর থেকে জন্ম নেয় নতুন প্রশ্ন।
হয়তো এ কারণেই আবার লিখতে ইচ্ছে করে। কারণ সমাজ এখনও বদলাচ্ছে, মানুষ এখনও হাসছে, কাঁদছে, ভালোবাসছে, হারিয়ে যাচ্ছে, আবার ফিরে আসছে। জীবন এখনও প্রতিদিন নতুন গল্প লিখছে। আর সেই গল্পের ভেতরেই কোথাও লুকিয়ে আছে আমাদের সবার পরিচয়।
তবে আজও একটি প্রশ্ন আমাকে তাড়া করে,
মানুষের যে চরিত্র আমরা দেখি, সেটিই কি তার প্রকৃত চরিত্র? নাকি প্রতিটি মানুষের ভেতরে আরেকজন মানুষ বাস করে, যাকে সে নিজেও সম্পূর্ণ চেনে না?
সম্ভবত জীবনভর আমরা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি। আর সেই খোঁজের নামই মানুষ, সমাজ ও জীবন, হয়তো চোখ দিয়ে তার একবিন্দু পানিটুকুই দেখি, মহাসমুদ্রটাই অচেনা থেকে যায় ।
আমি লিখছিনা, এই না লেখাটাই লেখার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, কারণ নীরবতা জন্ম দেয় অনেক প্রশ্নের, যার কোনো উত্তর থাকেনা, থেমে যাওয়া মানে বুড়ো হয়ে যাওয়া নয়, নতুন করে ফিরে আসা, যেখানে অভিজ্ঞতার ছেঁড়া পকেটে জমে থাকে অনেকগুলো জীবনের গল্প. যেখানে অভিমান আর ভালোবাসা দুটো সমান্তরাল রেললাইনের মতো একে অপরের সাথে লড়াই করে, অথচ সেখানে জয় নেই, পরাজয় নেই, আছে একটুকরো হাসি, হাসির পিছনে মেঘে জমা কান্না, সে হাসিতে চিৎকার আছে, আর কান্নায় আছে গভীর নিস্তব্ধতা |
দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে, শহর ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত গ্রামের অসংখ্য মানুষ আমার মতো খুব ক্ষুদ্র, নগন্য, সাধারণ একটা মানুষের লেখা পড়বে বলে তাদের আকুতি প্রকাশ করছে, কখনো কাগজে লেখা চিঠিতে, কখনো ইমেইলে, কখনো মোবাইলে, তাদের জন্য একটাই বার্তা আমি লেখক কিনা জানিনা, কিন্তু আমি আবার লিখবো, "না আমার জন্য না, সেই সব মানুষের জন্য যারা প্রতিদিন খুঁজছে নিজের ভিতরের অচেনা মানুষটিকে, খুব চেনা চেনা, কিন্তু তারপরও যেন খুব অচেনা |
মানুষ, সমাজ, জীবন, এই ছিল আমার লেখার বিষয়বস্তু
মানুষ, সমাজ, জীবন, এই ছিল আমার লেখার বিষয়বস্তু
অনেকদিন ধরে লিখছি না। কারণ শুধু মানুষই ক্লান্ত হয় না, লেখাও ক্লান্ত হয়। শব্দেরও বিশ্রাম লাগে, ভাবনারও নীরবতা প্রয়োজন হয়। কখনও কখনও কলম থেমে যায়, কাগজ অপেক্ষা করে, আর লেখক নিজের ভেতরের অরণ্যে হারিয়ে যায়। তবু আশ্চর্যের বিষয়, আমি যাদের অনেককেই চিনি না, তারাই আমার লেখার জন্য অপেক্ষা করে। তারা চায় আমি আবার লিখি। তারা বলে, আমার লেখার ভেতর নাকি তারা নিজেদের জীবন খুঁজে পায়। আমার বাক্যের কোথাও তাদের অপ্রকাশিত কষ্ট, কোথাও তাদের না-বলা স্বপ্ন, কোথাও তাদের নিঃশব্দ সংগ্রাম লুকিয়ে থাকে। আমি অবাক হয়ে ভাবি, আমি তো তাদের চিনি না, তবে কীভাবে তাদের গল্প আমার লেখায় এসে যায়? হয়তো এর কারণ, মানুষের গল্প আলাদা হলেও তার অনুভূতির ভাষা এক। সুখের রং ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু অশ্রুর স্বাদ প্রায় একই। একজন মানুষের নিঃসঙ্গতা আরেকজন মানুষের নিঃসঙ্গতার সঙ্গে কোথাও গিয়ে মিলিত হয়। তাই একজনের গল্প লিখতে গিয়ে অজান্তেই অনেকের গল্প লেখা হয়ে যায়। জীবন আসলে এক অদ্ভুত গল্প। এর কোনো নির্দিষ্ট কাহিনি নেই, তবু প্রতিটি মানুষের জীবন একটি সম্পূর্ণ উপন্যাস। আমরা প্রতিদিন নতুন নতুন চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত হই। কেউ অল্প সময়ের জন্য আসে, কেউ দীর্ঘদিন পাশে থাকে, কেউ আবার চলে যাওয়ার পরও স্মৃতিতে বেঁচে থাকে। আমরা তাদের দেখি, বুঝতে চেষ্টা করি, বিচার করি, ভালোবাসি কিংবা ঘৃণা করি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা কি সত্যিই তাদের চিনি? মানুষের সবচেয়ে বড় রহস্য সম্ভবত তার চরিত্র। আমরা যে মানুষটিকে প্রতিদিন দেখি, সে
কি সত্যিই সেই মানুষ? নাকি সে কেবল তার একটি মুখ, একটি প্রকাশিত সংস্করণ? মানুষের ভেতরে কত স্তর, কত গোপন কক্ষ, কত অপ্রকাশিত গল্প লুকিয়ে থাকে তার হিসাব কে রাখে? যে মানুষটিকে আমরা সৎ ভাবি, তার ভেতরে হয়তো কোনো অদেখা দুর্বলতা আছে। যাকে আমরা কঠোর বলি, সে হয়তো একান্তে খুব সহজেই ভেঙে পড়ে। যাকে আমরা শক্তিশালী মনে করি, সে হয়তো নিজের সঙ্গেই প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে যাচ্ছে। তাহলে মানুষের চরিত্র আসলে কী?এটি কি তার মুখে বলা কথা?নাকি তার নীরবে নেওয়া সিদ্ধান্ত?এটি কি তার অর্জন?নাকি তার ব্যর্থতার মুহূর্তে নিজেকে ধারণ করার ক্ষমতা? হয়তো চরিত্র কোনো স্থির বিষয় নয়। এটি নদীর মতো, সময়ের সঙ্গে বদলায়, অভিজ্ঞতার সঙ্গে রূপান্তরিত হয়। একজন মানুষ এক জীবনে বহুবার নতুন মানুষ হয়ে ওঠে। তার বিশ্বাস বদলায়, তার স্বপ্ন বদলায়, তার অগ্রাধিকার বদলায়। তাই কাউকে সম্পূর্ণ চিনে ফেলার দাবি হয়তো সবচেয়ে বড় ভুল। আমি যখন মানুষকে নিয়ে লিখি, তখন আসলে কোনো নির্দিষ্ট মানুষকে নিয়ে লিখি না। আমি লিখি মানুষের সম্ভাবনা, তার দ্বন্দ্ব, তার আলো এবং তার অন্ধকারকে নিয়ে। আমি লিখি সেই প্রশ্নগুলো নিয়ে, যেগুলোর উত্তর আজও পুরোপুরি পাওয়া যায়নি। কারণ মানুষের গল্প শেষ হয় না; প্রতিটি উত্তর থেকে জন্ম নেয় নতুন প্রশ্ন। হয়তো এ কারণেই আবার লিখতে ইচ্ছে করে। কারণ সমাজ এখনও বদলাচ্ছে, মানুষ এখনও হাসছে, কাঁদছে, ভালোবাসছে, হারিয়ে যাচ্ছে, আবার ফিরে আসছে। জীবন এখনও প্রতিদিন নতুন গল্প লিখছে। আর সেই গল্পের ভেতরেই কোথাও লুকিয়ে আছে আমাদের
সবার পরিচয়। তবে আজও একটি প্রশ্ন আমাকে তাড়া করে, মানুষের যে চরিত্র আমরা দেখি, সেটিই কি তার প্রকৃত চরিত্র? নাকি প্রতিটি মানুষের ভেতরে আরেকজন মানুষ বাস করে, যাকে সে নিজেও সম্পূর্ণ চেনে না? সম্ভবত জীবনভর আমরা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি। আর সেই খোঁজের নামই মানুষ, সমাজ ও জীবন, হয়তো চোখ দিয়ে তার একবিন্দু পানিটুকুই দেখি, মহাসমুদ্রটাই অচেনা থেকে যায় । আমি লিখছিনা, এই না লেখাটাই লেখার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, কারণ নীরবতা জন্ম দেয় অনেক প্রশ্নের, যার কোনো উত্তর থাকেনা, থেমে যাওয়া মানে বুড়ো হয়ে যাওয়া নয়, নতুন করে ফিরে আসা, যেখানে অভিজ্ঞতার ছেঁড়া পকেটে জমে থাকে অনেকগুলো জীবনের গল্প. যেখানে অভিমান আর ভালোবাসা দুটো সমান্তরাল রেললাইনের মতো একে অপরের সাথে লড়াই করে, অথচ সেখানে জয় নেই, পরাজয় নেই, আছে একটুকরো হাসি, হাসির পিছনে মেঘে জমা কান্না, সে হাসিতে চিৎকার আছে, আর কান্নায় আছে গভীর নিস্তব্ধতা | দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে, শহর ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত গ্রামের অসংখ্য মানুষ আমার মতো খুব ক্ষুদ্র, নগন্য, সাধারণ একটা মানুষের লেখা পড়বে বলে তাদের আকুতি প্রকাশ করছে, কখনো কাগজে লেখা চিঠিতে, কখনো ইমেইলে, কখনো মোবাইলে, তাদের জন্য একটাই বার্তা আমি লেখক কিনা জানিনা, কিন্তু আমি আবার লিখবো, "না আমার জন্য না, সেই সব মানুষের জন্য যারা প্রতিদিন খুঁজছে নিজের ভিতরের অচেনা মানুষটিকে, খুব চেনা চেনা, কিন্তু তারপরও যেন খুব অচেনা |
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
১৫২/২, এ-২ গ্রীন রোড, রওশন টাওয়ার (লিফটের-৮),
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ । মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত