সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
জাতীয় বজ্রপাতে মৃৃত্যুতে কেন শীর্ষে বাংলাদেশ?

বজ্রপাতে মৃৃত্যুতে কেন শীর্ষে বাংলাদেশ?

শুনলে বজ্রধ্বনি, ঘরে যাই তখনই’— আন্তর্জাতিক বজ্রপাত নিরাপত্তা দিবসের এই ঝকঝকে স্লোগানটি শুনতে যতটা আধুনিক, আমাদের বাস্তবতার নির্মম চিত্রটি ঠিক ততটাই আদিম।

নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ কিংবা মৌলভীবাজারের অন্তহীন হাওরের বুক চিরে যে কৃষক রোদে পুড়ে, কাদা মেখে দেশের অন্ন জোগান, মাথার ওপরে কালবৈশাখীর মেঘ ডাকলে তার ছুটে যাওয়ার মতো কোনো ‘ঘর’ নেই।

স্লোগানগুলো যেন সেই খেটে খাওয়া মানুষগুলোর সাথে এক ধরনের পরিহাস। সচেতনতার চটকদার বার্তার আড়ালে বাংলাদেশ আজ এক নিঃশব্দ কিন্তু ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।

গত ১২ বছরে এ দেশের বুকে ঝরে গেছে ৩,৮৬০টি তাজা প্রাণ। অর্থাৎ, বছরে গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন মানুষ কোনো যুদ্ধ বা মহামারি ছাড়াই স্রেফ আকাশের আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাচ্ছেন। প্রযুক্তির উন্নয়নের বুলি যতই আওড়ানো হোক না কেন, মাঠপর্যায়ে মৃত্যুর এই নির্মম মিছিল থামানোর কোনো বাস্তবমুখী উদ্যোগ আজও দৃশ্যমান নয়।

বিশ্বের ‘ডেথ জোন’: কেন শীর্ষে বাংলাদেশ: ভৌগোলিক কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় ভেনিজুয়েলার ‘লেক মারাকাইবো’ অঞ্চলে এবং মধ্য আফ্রিকার কঙ্গোতে। দক্ষিণ এশিয়ায় বিশাল আয়তনের কারণে ভারতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হলেও, আয়তনের তুলনায় মৃত্যুঝুঁকিতে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। প্রতি ১ হাজার বর্গকিলোমিটারে বজ্রপাতে মৃত্যুর হারে আমরাই বিশ্বসেরা!

এর পেছনে কাজ করছে প্রকৃতি ও মানুষের যৌথ ধ্বংসলীলা: প্রকৃতির ভৌগোলিক ফাঁদ: আমাদের উত্তরে হিমালয় পর্বতমালা আর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। মার্চ থেকে মে মাসে সাগর থেকে আসা গরম-আর্দ্র বাতাস যখন উত্তরের ঠান্ডা-শুষ্ক বাতাসের সাথে ধাক্কা খায়, তখন বায়ুমণ্ডলে এক প্রলয়ংকরী ওলটপালট ঘটে। তৈরি হয় দানবীয় ‘কিউমুলোনিম্বাস’ মেঘ, যা বুক চিরে নেমে আসে ঘাতক বিদ্যুৎ।

উত্তপ্ত হচ্ছে বাতাস: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বজ্রপাতের আশঙ্কা ১২ শতাংশ বেড়ে যায়। বাংলাদেশ এখন সেই চরম তাপমাত্রার শিকার।

সবুজ বর্মের বিনাশ: একসময় গ্রামবাংলার মাঠে মাঠে সারি সারি তাল, নারকেল ও সুপারি গাছ ছিল। এগুলো প্রাকৃতিকভাবে ‘লাইটেনিং অ্যারেস্টার’ বা বজ্রপাত নিরোধক হিসেবে কাজ করত। লোভের কুঠারে আমরা সেই প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ কেটে সাবাড় করেছি।

এ যেন এক অবাস্তব প্রস্তুতির ট্র্যাজেডি: মৃত্যুর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ার মূল কারণ আমাদের নীতিনির্ধারকদের অপরিপক্ব পরিকল্পনা। হাওরাঞ্চলের খোলা প্রান্তরে যখন মেঘ ডাকে, তখন চারপাশের সমতল ভূমির মধ্যে সবচেয়ে উঁচু বস্তু থাকেন ওই অভাগা কৃষক বা জেলেই। ফলে বজ্রপাত সরাসরি তাঁদের ওপরেই আঘাত হানে। আমাদের নিহত ভাইদের ৭০ শতাংশেরও বেশি এই দেশের কৃষক ও জেলে।

আর আমাদের সতর্কবার্তা? এসি রুমে বসে ভাবা হয়—স্মার্টফোনের অ্যাপ বা এসএমএসের নোটিফিকেশন দেখে কৃষক কাদামাটি মাখা হাত মুছে নিরাপদ আশ্রয়ে দৌড়াবে! এই ডিজিটাল ব্যবস্থা মাঠের বাস্তবতায় সম্পূর্ণ অকেজো। সময়মতো, সহজ ভাষায় এবং সঠিক জায়গায় সতর্কবার্তা পৌঁছানোর গোটা সিস্টেমটাই গলদে ভরা।

স্লোগান নয়, চাই বাঁচবার বাস্তব হাতিয়ার: বজ্রপাত ঠেকানো প্রকৃতির নিয়মেই অসম্ভব, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা থাকলে প্রাণহানি শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ:

১. ডিজিটাল অ্যাপ নয়, লাউড সাইরেন: হাওর ও বিল অঞ্চলে এমন সাইরেন সিস্টেম বসাতে হবে যা মেঘের অবস্থা বুঝে ২০-৩০ মিনিট আগেই তীব্র আওয়াজে মানুষকে সতর্ক করতে পারে।

২. মাঠে মাঠে আশ্রয়কেন্দ্র: বিস্তীর্ণ কৃষিজমির মাঝে নির্দিষ্ট দূরত্বে আর্থিং সিস্টেম বা বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড যুক্ত ছোট, কংক্রিটের শেড তৈরি করতে হবে, যাতে মানুষ দ্রুত মাথা গোঁজার ঠাঁই পায়।

৩. দ্রুত বর্ধনশীল গাছ: তালগাছ বড় হতে ২৫-৩০ বছর লাগে। তাই দীর্ঘমেয়াদী এই প্রকল্পের পাশাপাশি দ্রুত বাড়ে এমন উঁচু গাছ রোপণ করতে হবে।

জীবন বাঁচাতে নিজের প্রস্তুতি (জরুরি গাইড) রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি আমাদের নিজেদেরও কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে:

ঘন কালো মেঘ বা মেঘের ডাক শুনলে খোলা মাঠে না থেকে দ্রুত পাকা বা আচ্ছাদিত ভবনে আশ্রয় নিন।

খোলা মাঠে থাকা অবস্থায় হুট করে বজ্রপাত শুরু হলে দৌড়াদৌড়ি করবেন না। মাটিতে শুয়েও পড়া যাবে না। দু’পায়ের গোড়ালিতে ভর দিয়ে, হাঁটু মুড়ে, মাথা নিচু করে গুটিসুটি মেরে বসে পড়ুন।

কোনো অবস্থাতেই বৈদ্যুতিক খুঁটি, মোবাইল টাওয়ার বা বড় কোনো গাছের নিচে দাঁড়াবেন না।

হাতের কাছে থাকা ধাতব বস্তু (যেমন: কাস্তে, কোদাল, ছাতা) থেকে দূরে থাকুন।

জলাশয়ে বা নৌকায় থাকলে অতি দ্রুত ডাঙায় ফিরে আসুন।

প্রকৃতির মেঘ ডাকবেই, আকাশ ভাঙা বিদ্যুৎও নামবে। কিন্তু আমরা যদি কার্যকর পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং মাঠপর্যায়ে নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে না পারি, তবে প্রতিবছর কেবল ক্যালেন্ডার দেখে ‘আন্তর্জাতিক দিবস’ পালন আর ফাঁপা স্লোগান দিয়ে এই লাশের সারি ছোট করা যাবে না। আমাদের কৃষকদের বাঁচানো মানে এ দেশের প্রাণ বাঁচানো।

খুঁজুন