একজন মেধাবী বাংলাদেশি বিদেশে গেলেই আমরা বলি—‘Brain Drain হচ্ছে’। কিন্তু একজন প্রকৌশলী প্রকৌশল পেশায় না থেকে প্রশাসনে, একজন চিকিৎসক চিকিৎসাসেবার বাইরে প্রশাসনিক দায়িত্বে, একজন আইনজীবী আইন পেশার বাইরে কিংবা একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি তাঁর অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হলে আমরা সেটিকে কী বলব?
এই প্রশ্নটি হয়তো আমাদের প্রচলিত ‘Brain Drain’ ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে।
বাংলাদেশে ‘Brain Drain’ বা মেধাপাচার শব্দটি দীর্ঘদিন ধরে একটি নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কোনো মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গেলেন, কোনো চিকিৎসক উন্নত দেশে চাকরি নিলেন, কোনো প্রকৌশলী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে যোগ দিলেন কিংবা কোনো গবেষক বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা শুরু করলেন—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় প্রায়ই বলা হয়, ‘দেশের আরেকটি মেধা বিদেশে চলে গেল।’ কথাটি আবেগের দিক থেকে বোধগম্য হলেও বিষয়টি কি বাস্তবে এতটা সরল?
আন্তর্জাতিকভাবে Brain Drain বলতে সাধারণভাবে কোনো দেশ বা নির্দিষ্ট খাত থেকে দক্ষ ও শিক্ষিত জনশক্তির বিদেশে চলে যাওয়ার ফলে সেই দেশের মানবসম্পদে ঘাটতি সৃষ্টি হওয়াকে বোঝানো হয়। অর্থাৎ একজন শিক্ষিত মানুষ বিদেশে গেলেন—শুধু এটুকুই Brain Drain-এর পূর্ণ সংজ্ঞা নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, তাঁর প্রস্থানের কারণে উৎস দেশ কী ধরনের মানবসম্পদ ক্ষতির মুখে পড়ল এবং অন্যদিকে তাঁর জ্ঞান, দক্ষতা, অর্থনৈতিক অবদান, গবেষণা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ কিংবা জ্ঞান স্থানান্তরের মাধ্যমে দেশের জন্য কী ধরনের সম্ভাবনা তৈরি হলো।
এই জায়গাতেই আমাদের প্রচলিত ধারণার সঙ্গে আধুনিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি হয়।
ধরা যাক, বাংলাদেশের একজন চিকিৎসক বিদেশে গিয়ে উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কাজ করছেন এবং একই সঙ্গে গবেষণা করছেন। তিনি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশ করছেন, নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন, বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণা করছেন কিংবা দেশের তরুণ চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। একজন প্রকৌশলী বিদেশে গিয়ে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন এবং বাংলাদেশের তরুণ প্রকৌশলীদের সঙ্গে জ্ঞান ভাগাভাগি করছেন। একজন গবেষক বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে বাংলাদেশের গবেষকদের সঙ্গে যৌথ প্রকল্প পরিচালনা করছেন। একজন তথ্যপ্রযুক্তিবিদ বিদেশে কাজ করলেও দেশে বিনিয়োগ করছেন কিংবা একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছেন।
তাঁদের সবাইকে কি শুধু ‘দেশের মেধা বিদেশে চলে গেছে’—এই একটি বাক্যে বিচার করা যথেষ্ট?
বিশ্ব এখন আগের মতো বিচ্ছিন্ন নয়। একজন মানুষের কর্মস্থল বিদেশে হলেও তাঁর জ্ঞান, গবেষণা, পেশাগত নেটওয়ার্ক, বিনিয়োগ ও অভিজ্ঞতা নিজ দেশের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। এ কারণেই অভিবাসন ও উন্নয়ন নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় ‘Brain Circulation’, ‘Brain Gain’ এবং ‘Diaspora Knowledge Transfer’-এর মতো ধারণাগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। World Bank-এর World Development Report 2023 দক্ষ অভিবাসনের সম্ভাব্য ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিক বিশ্লেষণ করেছে। সেখানে অভিবাসীদের দক্ষতা, রেমিট্যান্স, জ্ঞান স্থানান্তর এবং উৎস দেশের ওপর দক্ষ জনশক্তি হারানোর প্রভাব—সবকিছুকেই বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ বিদেশে যাওয়া মানেই যে প্রতিটি ক্ষেত্রে মেধাপাচার, তা নয়। আবার Brain Drain-এর বাস্তবতাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে কোনো দেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গবেষণা বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত খাত থেকে বিপুলসংখ্যক প্রশিক্ষিত জনশক্তি বিদেশে চলে গেলে এবং তাঁদের বিকল্প তৈরি না হলে সেটি অবশ্যই গুরুতর মানবসম্পদ সংকট তৈরি করতে পারে। তাই বিষয়টি সাদা-কালো নয়; বরং এর মধ্যে রয়েছে বহু স্তর।
কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়ই এড়িয়ে যাই—দেশে থাকা মেধার কতটা আমরা ব্যবহার করতে পারছি?
একজন তরুণ প্রকৌশলী প্রকৌশল বিষয়ে দীর্ঘ বছর পড়াশোনা করলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, ডিজাইন, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল ব্যবস্থাপনা শিখলেন। কিন্তু কর্মজীবনে গিয়ে যদি তাঁর সবচেয়ে বড় সুযোগ হয় এমন কোনো পদে কাজ করা যেখানে তাঁর প্রকৌশল দক্ষতার খুব সামান্যই প্রয়োজন, তাহলে ব্যক্তিগতভাবে তিনি হয়তো একটি সম্মানজনক চাকরি করছেন, কিন্তু জাতীয় মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—এই বিশেষায়িত দক্ষতার সর্বোচ্চ ব্যবহার কি হচ্ছে?
একই প্রশ্ন চিকিৎসকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একজন চিকিৎসক হতে একজন মানুষকে বহু বছর কঠোর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু তিনি যদি চিকিৎসাসেবা, গবেষণা, জনস্বাস্থ্য বা চিকিৎসা-শিক্ষার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদে সম্পূর্ণ প্রশাসনিক কাজে যুক্ত হন, তাহলে তাঁর দক্ষতার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলা অযৌক্তিক নয়। একইভাবে আইন বিষয়ে প্রশিক্ষিত একজন মানুষ যদি দীর্ঘমেয়াদে আইন পেশার বাইরে থাকেন, কিংবা উচ্চশিক্ষিত একজন ব্যক্তি তাঁর বিশেষায়িত জ্ঞান থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো কাজে নিয়োজিত হন, তখন আমাদের ভাবতে হবে—এটি কি শুধু ক্যারিয়ার পছন্দ, নাকি জাতীয় পর্যায়ে দক্ষতার অপব্যবহারেরও একটি উদাহরণ?
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। প্রশাসন, ব্যাংকিং, ব্যবসা, নীতি প্রণয়ন বা ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী কিংবা অন্যান্য বিশেষজ্ঞের অংশগ্রহণকে আমরা নেতিবাচক বলছি না। বরং একজন বিশেষজ্ঞের পেশাগত অভিজ্ঞতা প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনতে পারে। সমস্যাটি ব্যক্তির পেশা পরিবর্তনে নয়; সমস্যাটি তখন, যখন একটি দেশের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণব্যবস্থা এক ধরনের দক্ষতা তৈরি করছে, কিন্তু কর্মসংস্থান ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সেই দক্ষতার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারছে না।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন গবেষণায় এ ধরনের পরিস্থিতিকে ‘Brain Waste’ বলা হয়। অর্থাৎ একজন শিক্ষিত বা দক্ষ ব্যক্তি তাঁর যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণের তুলনায় কম দক্ষতার কাজে নিয়োজিত হচ্ছেন অথবা এমন একটি ক্ষেত্রে কাজ করছেন যেখানে তাঁর অর্জিত দক্ষতার যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। এর সঙ্গে ‘Brain Misallocation’-এর ধারণাটিও যুক্ত করা যায়—যেখানে দেশের মানবসম্পদ এমনভাবে বণ্টিত হয় না, যাতে সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতা ও সামাজিক উপকার নিশ্চিত করা যায়।
বাংলাদেশের জন্য এই প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন শুধু কতজন মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ল বা কতজন বিদেশে গেল—তার ওপর নির্ভর করে না। উন্নয়ন নির্ভর করে মানবসম্পদ কোথায়, কীভাবে এবং কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপর।
আমরা যদি একজন মেধাবী বাংলাদেশিকে বিদেশে যাওয়ার জন্য দোষারোপ করি, কিন্তু দেশে তাঁর গবেষণার সুযোগ না থাকে, তাঁর পেশাগত উন্নতির পথ সীমিত থাকে, তাঁর দক্ষতার মূল্যায়ন না হয় কিংবা তাঁর কাজের পরিবেশ আন্তর্জাতিক মানের না হয়—তাহলে শুধু তাঁকে দেশে থাকার আহ্বান জানিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।
বরং প্রশ্ন করতে হবে—কেন তিনি যাচ্ছেন?
এই ‘কেন’ প্রশ্নটির উত্তর খোঁজা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একজন তরুণ গবেষক যদি উন্নত গবেষণাগার, পর্যাপ্ত গবেষণা অনুদান, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও পেশাগত স্বাধীনতার জন্য বিদেশে যান, তাহলে তাঁকে শুধু ‘দেশপ্রেমহীন’ হিসেবে চিহ্নিত করা কোনো সমাধান নয়। বরং বাংলাদেশকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে তিনি দেশে থেকেও গবেষণা করতে পারেন এবং বিদেশে গেলেও দেশের সঙ্গে গবেষণা সহযোগিতা চালিয়ে যেতে পারেন।
এখানেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন।
বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠানো মানুষ নন; তাঁরা জ্ঞান, দক্ষতা, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক এবং অভিজ্ঞতারও বাহক। একজন প্রবাসী চিকিৎসক বাংলাদেশের চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিতে পারেন, একজন গবেষক যৌথ গবেষণা করতে পারেন, একজন প্রকৌশলী প্রযুক্তি স্থানান্তরে সহায়তা করতে পারেন, একজন শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা তৈরি করতে পারেন এবং একজন উদ্যোক্তা দেশে বিনিয়োগ করতে পারেন।
তাহলে তাঁদের শারীরিক অবস্থান বিদেশে হলেও তাঁদের জ্ঞান ও অবদান কি বাংলাদেশের বাইরে চলে গেছে?
অবশ্যই নয়।
এই বাস্তবতাকে কাজে লাগাতে বাংলাদেশ চাইলে একটি শক্তিশালী Diaspora Knowledge Network গড়ে তুলতে পারে। বিদেশে থাকা বাংলাদেশি বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক, শিক্ষক ও অন্যান্য পেশাজীবীদের সঙ্গে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও শিল্পখাতের প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ তৈরি করা যেতে পারে। Joint Research Programme, Visiting Faculty/Scientist Programme, Short-term Return Fellowship, Mentorship Programme এবং Technology Transfer Initiative-এর মাধ্যমে বিদেশে থাকা মেধাকে দেশের উন্নয়নের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা সম্ভব।
তবে এর পাশাপাশি দেশের ভেতরের ‘Brain Waste’ কমানোও জরুরি।
আমাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান ব্যবস্থার মধ্যে আরও ভালো সমন্বয় প্রয়োজন। একজন মানুষ কী বিষয়ে পড়েছেন, কী দক্ষতা অর্জন করেছেন এবং দেশের কোথায় সেই দক্ষতার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন—এই বিষয়গুলোকে জাতীয় মানবসম্পদ পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।
আমাদের ভাবতে হবে, একজন প্রকৌশলীকে শুধু একজন চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, বরং জাতীয় প্রযুক্তিগত সম্পদ হিসেবে কীভাবে ব্যবহার করা যায়। একজন চিকিৎসককে শুধু হাসপাতালের কর্মী হিসেবে নয়, গবেষক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক ও স্বাস্থ্য-উদ্ভাবনের অংশীদার হিসেবেও কীভাবে কাজে লাগানো যায়। একইভাবে আইনজীবী, কৃষিবিদ, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও অন্যান্য পেশাজীবীর দক্ষতাকেও জাতীয় উন্নয়নের বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
সুতরাং বাংলাদেশের Brain Drain নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন, কিন্তু আলোচনাটি শুধু ‘কে বিদেশে চলে গেল’—এখানে থেমে থাকলে চলবে না।
আমাদের প্রশ্ন করতে হবে—কে বিদেশে গিয়ে কী করছেন? কে দেশে থেকে কী করছেন? কার দক্ষতা ব্যবহার হচ্ছে? কার দক্ষতা অপচয় হচ্ছে? এবং আমরা যে মানবসম্পদ তৈরি করছি, তার সর্বোচ্চ ব্যবহার কি নিশ্চিত করতে পারছি?
একজন মেধাবী বাংলাদেশি বিদেশে গিয়ে নিজের পেশায় দক্ষতা অর্জন করছেন, গবেষণা করছেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে জ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা ও বিনিয়োগের সম্পর্ক বজায় রাখছেন—তাঁকে শুধু ‘Brain Drain’-এর পরিসংখ্যানে আটকে রাখা বাস্তবতার প্রতি সুবিচার নয়।
অন্যদিকে, দেশে থেকে একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ যদি তাঁর অর্জিত দক্ষতা ব্যবহার করার যথাযথ সুযোগ না পান, তাহলে সেটিও জাতীয়ভাবে উদ্বেগের বিষয়।
তাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত আরও বিস্তৃত—Brain Drain কমাতে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে Brain Waste বন্ধ করতে হবে; Brain Misallocation কমাতে হবে এবং Brain Circulation ও Brain Gain-এর সুযোগ বাড়াতে হবে।
কারণ মেধার মূল্য শুধু তার অবস্থানে নয়, তার ব্যবহারে।
একজন মেধাবী মানুষ ঢাকায় আছেন নাকি লন্ডনে, সিডনিতে নাকি টরন্টোতে—এটি একমাত্র প্রশ্ন হতে পারে না। আসল প্রশ্ন হলো, তাঁর জ্ঞান কোথায় কাজে লাগছে, তাঁর দক্ষতা কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং তাঁর অর্জিত জ্ঞান থেকে বাংলাদেশ কতটা উপকৃত হতে পারছে।
হয়তো সময় এসেছে ‘Brain Drain’ নিয়ে আমাদের প্রচলিত ধারণাকে একটু পেছনে রেখে আরও কঠিন একটি প্রশ্ন সামনে আনার—
বাংলাদেশের মেধা কি শুধু বিদেশে চলে যাচ্ছে, নাকি আমরা দেশের ভেতরেই সেই মেধার একটি বড় অংশকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হচ্ছি?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারলেই হয়তো বাংলাদেশের প্রকৃত মানবসম্পদ সংকটকে আমরা আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারব।
মেধা কোথায় আছে—তা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মেধা কীভাবে কাজে লাগছে—তা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক ও রিসার্চ ফেলো, ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি (এমএসইউ), মালয়েশিয়া।ভিশন সায়েন্টিস্ট ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জননীতি বিষয়ক বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নাল এবং গণমাধ্যম লেখক
বাংলাদেশের মেধা কি বিদেশে যাচ্ছে, নাকি দেশেই অপচয় হচ্ছে?
বাংলাদেশের মেধা কি বিদেশে যাচ্ছে, নাকি দেশেই অপচয় হচ্ছে?
একজন মেধাবী বাংলাদেশি বিদেশে গেলেই আমরা বলি—‘Brain Drain হচ্ছে’। কিন্তু একজন প্রকৌশলী প্রকৌশল পেশায় না থেকে প্রশাসনে, একজন চিকিৎসক চিকিৎসাসেবার বাইরে প্রশাসনিক দায়িত্বে, একজন আইনজীবী আইন পেশার বাইরে কিংবা একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি তাঁর অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হলে আমরা সেটিকে কী বলব?এই প্রশ্নটি হয়তো আমাদের প্রচলিত ‘Brain Drain’ ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে।বাংলাদেশে ‘Brain Drain’ বা মেধাপাচার শব্দটি দীর্ঘদিন ধরে একটি নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কোনো মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গেলেন, কোনো চিকিৎসক উন্নত দেশে চাকরি নিলেন, কোনো প্রকৌশলী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে যোগ দিলেন কিংবা কোনো গবেষক বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা শুরু করলেন—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় প্রায়ই বলা হয়, ‘দেশের আরেকটি মেধা বিদেশে চলে গেল।’ কথাটি আবেগের দিক থেকে বোধগম্য হলেও বিষয়টি কি বাস্তবে এতটা সরল?আন্তর্জাতিকভাবে Brain Drain বলতে সাধারণভাবে কোনো দেশ বা নির্দিষ্ট খাত থেকে দক্ষ ও শিক্ষিত জনশক্তির বিদেশে চলে যাওয়ার ফলে সেই দেশের মানবসম্পদে ঘাটতি সৃষ্টি হওয়াকে বোঝানো হয়। অর্থাৎ একজন শিক্ষিত মানুষ বিদেশে গেলেন—শুধু এটুকুই Brain Drain-এর পূর্ণ সংজ্ঞা নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, তাঁর প্রস্থানের কারণে উৎস দেশ কী ধরনের মানবসম্পদ ক্ষতির মুখে পড়ল এবং অন্যদিকে তাঁর জ্ঞান, দক্ষতা, অর্থনৈতিক অবদান, গবেষণা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ কিংবা জ্ঞান স্থানান্তরের মাধ্যমে দেশের জন্য কী ধরনের সম্ভাবনা তৈরি হলো।এই জায়গাতেই আমাদের প্রচলিত ধারণার সঙ্গে আধুনিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি হয়।ধরা যাক, বাংলাদেশের একজন চিকিৎসক বিদেশে গিয়ে উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কাজ করছেন এবং একই সঙ্গে গবেষণা করছেন। তিনি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশ করছেন, নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন, বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণা করছেন কিংবা দেশের তরুণ চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। একজন প্রকৌশলী বিদেশে গিয়ে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন এবং বাংলাদেশের তরুণ প্রকৌশলীদের সঙ্গে জ্ঞান ভাগাভাগি করছেন। একজন গবেষক বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে বাংলাদেশের গবেষকদের সঙ্গে যৌথ প্রকল্প পরিচালনা করছেন। একজন তথ্যপ্রযুক্তিবিদ বিদেশে কাজ করলেও দেশে বিনিয়োগ করছেন কিংবা একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছেন।তাঁদের সবাইকে কি শুধু ‘দেশের মেধা বিদেশে চলে গেছে’—এই একটি বাক্যে বিচার করা যথেষ্ট?বিশ্ব এখন আগের মতো বিচ্ছিন্ন নয়। একজন মানুষের কর্মস্থল বিদেশে হলেও তাঁর জ্ঞান, গবেষণা, পেশাগত নেটওয়ার্ক, বিনিয়োগ ও অভিজ্ঞতা নিজ দেশের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। এ কারণেই অভিবাসন ও উন্নয়ন নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় ‘Brain Circulation’, ‘Brain Gain’ এবং ‘Diaspora Knowledge Transfer’-এর মতো ধারণাগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। World Bank-এর World Development Report 2023 দক্ষ অভিবাসনের সম্ভাব্য ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিক বিশ্লেষণ করেছে। সেখানে অভিবাসীদের দক্ষতা, রেমিট্যান্স, জ্ঞান স্থানান্তর এবং উৎস দেশের ওপর দক্ষ জনশক্তি হারানোর প্রভাব—সবকিছুকেই বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।অর্থাৎ বিদেশে যাওয়া মানেই যে প্রতিটি ক্ষেত্রে মেধাপাচার, তা নয়। আবার Brain Drain-এর বাস্তবতাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে কোনো দেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গবেষণা বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত খাত থেকে বিপুলসংখ্যক প্রশিক্ষিত জনশক্তি বিদেশে চলে গেলে এবং তাঁদের বিকল্প তৈরি না হলে সেটি অবশ্যই গুরুতর মানবসম্পদ সংকট তৈরি করতে পারে। তাই বিষয়টি সাদা-কালো নয়; বরং এর মধ্যে রয়েছে বহু স্তর।কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়ই এড়িয়ে যাই—দেশে থাকা মেধার কতটা আমরা ব্যবহার করতে পারছি?একজন তরুণ প্রকৌশলী প্রকৌশল বিষয়ে দীর্ঘ বছর পড়াশোনা করলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি গণিত,
পদার্থবিজ্ঞান, ডিজাইন, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল ব্যবস্থাপনা শিখলেন। কিন্তু কর্মজীবনে গিয়ে যদি তাঁর সবচেয়ে বড় সুযোগ হয় এমন কোনো পদে কাজ করা যেখানে তাঁর প্রকৌশল দক্ষতার খুব সামান্যই প্রয়োজন, তাহলে ব্যক্তিগতভাবে তিনি হয়তো একটি সম্মানজনক চাকরি করছেন, কিন্তু জাতীয় মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—এই বিশেষায়িত দক্ষতার সর্বোচ্চ ব্যবহার কি হচ্ছে?একই প্রশ্ন চিকিৎসকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একজন চিকিৎসক হতে একজন মানুষকে বহু বছর কঠোর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু তিনি যদি চিকিৎসাসেবা, গবেষণা, জনস্বাস্থ্য বা চিকিৎসা-শিক্ষার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদে সম্পূর্ণ প্রশাসনিক কাজে যুক্ত হন, তাহলে তাঁর দক্ষতার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলা অযৌক্তিক নয়। একইভাবে আইন বিষয়ে প্রশিক্ষিত একজন মানুষ যদি দীর্ঘমেয়াদে আইন পেশার বাইরে থাকেন, কিংবা উচ্চশিক্ষিত একজন ব্যক্তি তাঁর বিশেষায়িত জ্ঞান থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো কাজে নিয়োজিত হন, তখন আমাদের ভাবতে হবে—এটি কি শুধু ক্যারিয়ার পছন্দ, নাকি জাতীয় পর্যায়ে দক্ষতার অপব্যবহারেরও একটি উদাহরণ?এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। প্রশাসন, ব্যাংকিং, ব্যবসা, নীতি প্রণয়ন বা ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী কিংবা অন্যান্য বিশেষজ্ঞের অংশগ্রহণকে আমরা নেতিবাচক বলছি না। বরং একজন বিশেষজ্ঞের পেশাগত অভিজ্ঞতা প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনতে পারে। সমস্যাটি ব্যক্তির পেশা পরিবর্তনে নয়; সমস্যাটি তখন, যখন একটি দেশের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণব্যবস্থা এক ধরনের দক্ষতা তৈরি করছে, কিন্তু কর্মসংস্থান ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সেই দক্ষতার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারছে না।আন্তর্জাতিক অভিবাসন গবেষণায় এ ধরনের পরিস্থিতিকে ‘Brain Waste’ বলা হয়। অর্থাৎ একজন শিক্ষিত বা দক্ষ ব্যক্তি তাঁর যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণের তুলনায় কম দক্ষতার কাজে নিয়োজিত হচ্ছেন অথবা এমন একটি ক্ষেত্রে কাজ করছেন যেখানে তাঁর অর্জিত দক্ষতার যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। এর সঙ্গে ‘Brain Misallocation’-এর ধারণাটিও যুক্ত করা যায়—যেখানে দেশের মানবসম্পদ এমনভাবে বণ্টিত হয় না, যাতে সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতা ও সামাজিক উপকার নিশ্চিত করা যায়।বাংলাদেশের জন্য এই প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন শুধু কতজন মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ল বা কতজন বিদেশে গেল—তার ওপর নির্ভর করে না। উন্নয়ন নির্ভর করে মানবসম্পদ কোথায়, কীভাবে এবং কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপর।আমরা যদি একজন মেধাবী বাংলাদেশিকে বিদেশে যাওয়ার জন্য দোষারোপ করি, কিন্তু দেশে তাঁর গবেষণার সুযোগ না থাকে, তাঁর পেশাগত উন্নতির পথ সীমিত থাকে, তাঁর দক্ষতার মূল্যায়ন না হয় কিংবা তাঁর কাজের পরিবেশ আন্তর্জাতিক মানের না হয়—তাহলে শুধু তাঁকে দেশে থাকার আহ্বান জানিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।বরং প্রশ্ন করতে হবে—কেন তিনি যাচ্ছেন?এই ‘কেন’ প্রশ্নটির উত্তর খোঁজা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।একজন তরুণ গবেষক যদি উন্নত গবেষণাগার, পর্যাপ্ত গবেষণা অনুদান, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও পেশাগত স্বাধীনতার জন্য বিদেশে যান, তাহলে তাঁকে শুধু ‘দেশপ্রেমহীন’ হিসেবে চিহ্নিত করা কোনো সমাধান নয়। বরং বাংলাদেশকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে তিনি দেশে থেকেও গবেষণা করতে পারেন এবং বিদেশে গেলেও দেশের সঙ্গে গবেষণা সহযোগিতা চালিয়ে যেতে পারেন।এখানেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন।বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠানো মানুষ নন; তাঁরা জ্ঞান, দক্ষতা, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক এবং অভিজ্ঞতারও বাহক। একজন প্রবাসী চিকিৎসক বাংলাদেশের চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিতে পারেন, একজন গবেষক যৌথ গবেষণা করতে পারেন, একজন প্রকৌশলী প্রযুক্তি স্থানান্তরে সহায়তা করতে পারেন, একজন শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা তৈরি করতে পারেন এবং একজন উদ্যোক্তা দেশে বিনিয়োগ করতে পারেন।তাহলে তাঁদের শারীরিক অবস্থান বিদেশে হলেও তাঁদের
জ্ঞান ও অবদান কি বাংলাদেশের বাইরে চলে গেছে?অবশ্যই নয়।এই বাস্তবতাকে কাজে লাগাতে বাংলাদেশ চাইলে একটি শক্তিশালী Diaspora Knowledge Network গড়ে তুলতে পারে। বিদেশে থাকা বাংলাদেশি বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক, শিক্ষক ও অন্যান্য পেশাজীবীদের সঙ্গে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও শিল্পখাতের প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ তৈরি করা যেতে পারে। Joint Research Programme, Visiting Faculty/Scientist Programme, Short-term Return Fellowship, Mentorship Programme এবং Technology Transfer Initiative-এর মাধ্যমে বিদেশে থাকা মেধাকে দেশের উন্নয়নের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা সম্ভব।তবে এর পাশাপাশি দেশের ভেতরের ‘Brain Waste’ কমানোও জরুরি।আমাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান ব্যবস্থার মধ্যে আরও ভালো সমন্বয় প্রয়োজন। একজন মানুষ কী বিষয়ে পড়েছেন, কী দক্ষতা অর্জন করেছেন এবং দেশের কোথায় সেই দক্ষতার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন—এই বিষয়গুলোকে জাতীয় মানবসম্পদ পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।আমাদের ভাবতে হবে, একজন প্রকৌশলীকে শুধু একজন চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, বরং জাতীয় প্রযুক্তিগত সম্পদ হিসেবে কীভাবে ব্যবহার করা যায়। একজন চিকিৎসককে শুধু হাসপাতালের কর্মী হিসেবে নয়, গবেষক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক ও স্বাস্থ্য-উদ্ভাবনের অংশীদার হিসেবেও কীভাবে কাজে লাগানো যায়। একইভাবে আইনজীবী, কৃষিবিদ, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও অন্যান্য পেশাজীবীর দক্ষতাকেও জাতীয় উন্নয়নের বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।সুতরাং বাংলাদেশের Brain Drain নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন, কিন্তু আলোচনাটি শুধু ‘কে বিদেশে চলে গেল’—এখানে থেমে থাকলে চলবে না।আমাদের প্রশ্ন করতে হবে—কে বিদেশে গিয়ে কী করছেন? কে দেশে থেকে কী করছেন? কার দক্ষতা ব্যবহার হচ্ছে? কার দক্ষতা অপচয় হচ্ছে? এবং আমরা যে মানবসম্পদ তৈরি করছি, তার সর্বোচ্চ ব্যবহার কি নিশ্চিত করতে পারছি?একজন মেধাবী বাংলাদেশি বিদেশে গিয়ে নিজের পেশায় দক্ষতা অর্জন করছেন, গবেষণা করছেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে জ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা ও বিনিয়োগের সম্পর্ক বজায় রাখছেন—তাঁকে শুধু ‘Brain Drain’-এর পরিসংখ্যানে আটকে রাখা বাস্তবতার প্রতি সুবিচার নয়।অন্যদিকে, দেশে থেকে একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ যদি তাঁর অর্জিত দক্ষতা ব্যবহার করার যথাযথ সুযোগ না পান, তাহলে সেটিও জাতীয়ভাবে উদ্বেগের বিষয়।তাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত আরও বিস্তৃত—Brain Drain কমাতে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে Brain Waste বন্ধ করতে হবে; Brain Misallocation কমাতে হবে এবং Brain Circulation ও Brain Gain-এর সুযোগ বাড়াতে হবে।কারণ মেধার মূল্য শুধু তার অবস্থানে নয়, তার ব্যবহারে।একজন মেধাবী মানুষ ঢাকায় আছেন নাকি লন্ডনে, সিডনিতে নাকি টরন্টোতে—এটি একমাত্র প্রশ্ন হতে পারে না। আসল প্রশ্ন হলো, তাঁর জ্ঞান কোথায় কাজে লাগছে, তাঁর দক্ষতা কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং তাঁর অর্জিত জ্ঞান থেকে বাংলাদেশ কতটা উপকৃত হতে পারছে।হয়তো সময় এসেছে ‘Brain Drain’ নিয়ে আমাদের প্রচলিত ধারণাকে একটু পেছনে রেখে আরও কঠিন একটি প্রশ্ন সামনে আনার—বাংলাদেশের মেধা কি শুধু বিদেশে চলে যাচ্ছে, নাকি আমরা দেশের ভেতরেই সেই মেধার একটি বড় অংশকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হচ্ছি?এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারলেই হয়তো বাংলাদেশের প্রকৃত মানবসম্পদ সংকটকে আমরা আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারব।মেধা কোথায় আছে—তা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মেধা কীভাবে কাজে লাগছে—তা আরও গুরুত্বপূর্ণ। ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমানসহকারী অধ্যাপক ও রিসার্চ ফেলো, ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি (এমএসইউ), মালয়েশিয়া।ভিশন সায়েন্টিস্ট ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জননীতি বিষয়ক বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নাল এবং গণমাধ্যম লেখক
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
রওশন টাওয়ার, (লিফট-৮) ১৫২/২/এ২ গ্রীণ রোড ,
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ ।
মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত