মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
সিডনিতে বর্ণাঢ্য আয়োজনে ‘ মহালয়া ও মেলা ২০২৬’, • সরকারের ভেতরের প্রশাসনিক দুর্বলতা • আপনার সন্তান কম মেধাবী, নাকি পৃথিবীটাকেই ঝাপসা দেখছে? • নারায়ণগঞ্জে অবৈধ গ্যাস সংযোগের অভিযোগ, প্রশ্নের মুখে তিতাস কর্মকর্তা ও ঠিকাদাররা • রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র : ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটে বদলে যাবে • অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে "ট-র্চা-র সেল"! • রংপুরে মোটরসাইকেল চোর চক্রের ৪ সদস্য গ্রেপ্তার, উদ্ধার - ৯টি • বিআরটিএ ঢাকা মেট্রো-৪-এ ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ, দালালদের মাধ্যমে দ্রুত সেবা পাওয়ার দাবি • বিশ্ব ডিম দিবস ২০২৬ উপলক্ষ্যে বিএলআরআইতে বর্ণাঢ্য আয়োজন • ঘুষ ছাড়া মেলে না সেবা নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএতে দালালচক্রের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ
দেশের খবর এক মুঠো চালের জন্য জেলেদের বুক ফাটা কান্না

এক মুঠো চালের জন্য জেলেদের বুক ফাটা কান্না

ভোরের সূর্য ওঠার আগেই বরগুনার আমতলি ফকিরঘাটে ভিড় জমায় সাগরের সাহসী সন্তানরা। একসময় যাদের হাতের জালে ধরা পড়তো সাগরের সোনা, আজ তাদের হাতে কিছুই নেই। চোখে শূন্যতা, মুখে হতাশা। ট্রলারগুলো নিশ্চুপ, জালগুলো ছেঁড়া—আর মানুষগুলো নীরব, অথচ বুকের ভেতর চলছে কান্নার তীব্র গর্জন।


সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের সাথে যুদ্ধ করে যারা জীবন কাটিয়েছেন, আজ সেই জীবনের সামনে শুধুই অনিশ্চয়তা। ১৫ দিন ধরে চলা মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা হাজারো জেলের ঘরে এনেছে হাহাকার, আর পাতে এনে দিয়েছে ফোঁটা ফোঁটা ক্ষুধা। প্রায় আট হাজার নিবন্ধিত সমুদ্রগামী জেলে আজ বাঁচার জন্য তাকিয়ে আছেন এক মুঠো সাহায্যের দিকে। কিন্তু এখনো তাদের ভাগ্যে জোটেনি সরকারি সহায়তার চালের এক দানাও।


ষাটোর্ধ্ব মোশাররফ হোসেন এক কোণে বসে আকাশের দিকে চেয়ে কাঁদছেন। তার কণ্ঠ রুদ্ধ, চোখের জল অবিরাম গড়িয়ে পড়ছে।


"ঝড়-তুফান, সাগরের কাঁচা ঢেউ—সবকিছুর সঙ্গে যুদ্ধ করেছি। কিন্তু আজ... আজ তো নিজেরই যুদ্ধ জীবন বাঁচানোর। সরকার যদি চাল না দেয়, আমরা না খেয়ে মরে যাবো।" তার কাঁপা কণ্ঠের এই মর্মস্পর্শী আহাজারি যেন আঘাত হানে মানবতার শেষ প্রাচীরে।


আরেক কোণে দাঁড়িয়ে শহিদুল ইসলাম, ছোট্ট মেয়ের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছেন। মেয়ের ক্ষুধার্ত চোখ যেন হাজারটা প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে তার দিকে। মাথা নিচু করে শহিদুল ফিসফিস করে বলেন, "মাছ ধরতে জীবন বাজি রাখি। আজ মেয়েটার ভাতের জন্য রাস্তায় দাঁড়াতে হচ্ছে। একজন বাবার চেয়ে বড় লজ্জা আর কী হতে পারে?" 

মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, তালতলীতে প্রায় আট হাজার নিবন্ধিত সমুদ্রগামী জেলে রয়েছেন, যাদের কেউই এখন সাগরে যেতে পারছেন না। সাগরের হাওয়ায় এখন আর মাছের ঘ্রাণ নেই—ভেসে আসছে দুর্ভিক্ষের গন্ধ। প্রতিবছর নিষেধাজ্ঞার সময় কিছু খাদ্য সহায়তা মিললেও, এবারের নিষেধাজ্ঞায় এখনো কোনো বরাদ্দ এসে পৌঁছায়নি। সাগরের গর্জন আজ আর তাদের কাছে রোমাঞ্চ নয়, বরং মৃত্যুর সুর হয়ে বাজছে।


উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন বলেন, "নীতিমালা অনুযায়ী সাগরে নিষেধাজ্ঞা থাকে। আগেরবার খাদ্য সহায়তা ছিল, এবার বিলম্ব হয়েছে। চাল আসলে দেওয়া হবে।" কিন্তু তার কথাগুলো যেন ক্ষুধার্ত পেটের গহীন আর্তনাদের সামনে একটি তুচ্ছ আশ্বাসমাত্র। চাল কবে আসবে, তা কেউ জানে না। আর ততদিন ক্ষুধা আগুন হয়ে পুড়িয়ে দেবে তাদের শরীর ও আশা।


ফকিরঘাট নয়, উপকূলের সবখানেই একই ছবি। শীর্ণকায় জেলেরা ছেঁড়া গামছা দিয়ে মুখ ঢেকে কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করছে। শিশুদের কান্না মিলিয়ে যাচ্ছে সাগরের বাতাসে। "ভাত দে মা, ক্ষুধা পেয়েছে"—শত শত শিশুর এই চিৎকার যেন আকাশকেও ভারী করে তুলেছে।

এই বাস্তবতা কেবল দারিদ্র্যের গল্প নয়—এ হলো লজ্জার গল্প। যেখানে রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা আর মানবতার ব্যর্থতা মিলেমিশে একটি জাতির বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করে। জীবনের যুদ্ধ তো তারা জিতেছে বারবার, কিন্তু আজ—তালতলীর সাগরপাড়ে বসে থাকা এই হাজারো জেলে হারছে ক্ষুধার কাছে।

খুঁজুন