ক্লাসের শেষ বেঞ্চে বসে থাকা শিশুটি বারবার চোখ কুঁচকে বোর্ডের দিকে তাকায়। শিক্ষক প্রশ্ন করলে সে উত্তর দিতে দেরি করে, খাতায় লেখা তুলতে পারে না, কখনো আবার সহপাঠীর খাতা দেখে লেখে। বাড়িতে ফিরে পড়তে বসলে বইটি মুখের খুব কাছে নিয়ে আসে। অভিভাবকের মনে হয়, সন্তান হয়তো মনোযোগ দিচ্ছে না; শিক্ষকও ভাবতে পারেন, পড়াশোনায় তার আগ্রহ কম। কিন্তু একটি সাধারণ প্রশ্ন কি আমরা করেছি—শিশুটি ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছে তো?
শিশুর শেখার পেছনে অনেক কারণ কাজ করে। সব দুর্বল ফলের জন্য চোখের সমস্যাকে দায়ী করা ভুল। তবে দৃষ্টিশক্তির সমস্যা থাকলে তা শিশুর পড়া, লেখা, শ্রেণিকক্ষে অংশগ্রহণ এবং আত্মবিশ্বাসে বাধা তৈরি করতে পারে। তাই কোনো শিশুকে ‘অমনোযোগী’ বা ‘কম মেধাবী’ বলার আগে তার চোখের স্বাস্থ্য যাচাই করার কথাও ভাবতে হবে। কখনো কখনো সমস্যাটি মেধার নয়; শেখার পরিবেশে তার প্রবেশাধিকারই অসম্পূর্ণ।
যে সমস্যা শিশু নিজেই বুঝিয়ে বলতে পারে না
বড়রা চোখে ঝাপসা দেখলে সাধারণত কাউকে জানান, চশমা খোঁজেন বা চিকিৎসকের কাছে যান। কিন্তু শিশুর ক্ষেত্রে বিষয়টি এত সহজ নয়। জন্ম থেকেই যদি সে কোনো মাত্রার ঝাপসা দৃষ্টি নিয়ে বড় হয়, তাহলে সেটিকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নিতে পারে। সে হয়তো জানেই না যে অন্য শিশুরা বোর্ডের লেখা আরও স্পষ্ট দেখতে পায়। কেউ কেউ মাথাব্যথা, চোখে চাপ, পড়ার সময় অস্বস্তি কিংবা দূরের লেখা দেখতে অসুবিধার কথা বলে; আবার অনেক শিশু কিছুই বলে না।
দূরের লেখা ঝাপসা দেখা, বই বা মোবাইল খুব কাছে ধরে রাখা, পড়ার সময় বারবার জায়গা হারিয়ে ফেলা, চোখ কুঁচকে তাকানো, এক চোখ বন্ধ করে দেখা কিংবা বোর্ডের লেখা তুলতে অসুবিধা—এসব লক্ষণ খেয়াল করা যেতে পারে। তবে লক্ষণ দেখে নিজে নিজে রোগ নির্ণয় করা ঠিক নয়। শিশুর আচরণের পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে; প্রয়োজন হলে প্রশিক্ষিত চোখের স্বাস্থ্যকর্মী বা চক্ষু বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন জরুরি।
বাংলাদেশের বাস্তবতা: পরীক্ষা হলেই দায়িত্ব শেষ নয়
বাংলাদেশে শিশুদের চোখের সমস্যা নিয়ে গবেষণা হয়েছে, যদিও একেক গবেষণার এলাকা, বয়সসীমা ও পদ্ধতি আলাদা। ২০২৫ সালে প্রকাশিত সিলেট বিভাগের স্কুলপড়ুয়া শিশুদের একটি গবেষণায় ৫–১৮ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে refractive error বা প্রতিসরণজনিত দৃষ্টিসমস্যার হার ছিল ৫.৩ শতাংশ। গবেষণাটিতে শহরাঞ্চলে হার তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়; তবে এই ফলাফলকে পুরো বাংলাদেশের সব শিশুর ওপর সরাসরি প্রয়োগ করা যাবে না [১]।
আরও বড় পরিসরে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয় ২০২৬ সালে জানায়, ২০২০ সালের জাতীয় জরিপে প্রেসবায়োপিয়া বাদ দিয়ে প্রতিসরণজনিত ত্রুটির prevalence ছিল ৪৮.৬ শতাংশ এবং চশমা ব্যবহারের coverage ছিল ২৬ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানটি সামগ্রিক জনগোষ্ঠীসংক্রান্ত, শিশুদের একক হিসাব নয়। তবু এটি দেখায় যে দৃষ্টিসমস্যা শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন পৌঁছে দেওয়ার মধ্যে ব্যবধান রয়ে গেছে [২]।
স্কুলে একবার চোখ পরীক্ষা করানো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু স্ক্রিনিং আর পূর্ণাঙ্গ চক্ষু পরীক্ষা এক জিনিস নয়। স্ক্রিনিংয়ের উদ্দেশ্য হলো সম্ভাব্য সমস্যা চিহ্নিত করা। পরীক্ষায় সমস্যা ধরা পড়লে শিশুকে উপযুক্ত সেবায় পাঠানো, প্রয়োজনমতো refraction করানো, সঠিক চশমা দেওয়া এবং পরে সেটি ব্যবহার হচ্ছে কি না খোঁজ নেওয়াও সমান জরুরি। শুধু পরীক্ষার সংখ্যা বাড়িয়ে, পরবর্তী সেবা নিশ্চিত না করলে শিশুর উপকার অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
চশমা লজ্জার নয়, শেখার সহায়ক
অনেক শিশুই চশমা পরতে চায় না—কখনো অস্বস্তির কারণে, কখনো বন্ধুদের ঠাট্টার ভয়ে। পরিবারেও কেউ কেউ মনে করেন, অল্প বয়সে চশমা পরলে চোখ আরও খারাপ হবে, অথবা চশমা মানেই শিশুটি অসুস্থ। এমন ধারণা শিশুর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে দেরি করাতে পারে। চশমা দরকার কি না, কী ধরনের চশমা প্রয়োজন এবং কত সময় পরতে হবে—এসব সিদ্ধান্ত পরীক্ষার ভিত্তিতে চোখের স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ অনুযায়ী নেওয়া উচিত।
এখানে স্কুলের ভূমিকা বড়। শিক্ষকরা শিশুকে সবার সামনে বিব্রত না করে তার অসুবিধা বুঝতে পারেন, বোর্ডের কাছাকাছি বসার সুযোগ দিতে পারেন এবং অভিভাবককে চোখ পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিতে পারেন। সহপাঠীদেরও শেখানো দরকার, চশমা নিয়ে ঠাট্টা করা গ্রহণযোগ্য নয়। চশমা শিশুর পরিচয় নয়; এটি তার দেখার সুবিধার একটি উপায়। সঠিক চশমা অনেক শিশুর কাছে বই, বোর্ড এবং শ্রেণিকক্ষকে আরও স্পষ্ট করে তুলতে পারে।
স্ক্রিনই একমাত্র দোষী নয়
শিশুর চোখের কথা উঠলেই প্রায়ই মোবাইল ফোনের প্রসঙ্গ আসে। দীর্ঘ সময় কাছের কাজে মনোযোগ দিলে চোখে ক্লান্তি, অস্বস্তি বা শুষ্কতার অনুভূতি হতে পারে; তাই স্ক্রিন ব্যবহারে বিরতি, পর্যাপ্ত আলো, বাইরে খেলাধুলা এবং বয়সোপযোগী নিয়ম গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সব দৃষ্টিসমস্যার কারণ মোবাইল—এমন সিদ্ধান্তের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। শিশুর চোখ কুঁচকে দেখা বা বোর্ডের লেখা পড়তে না পারার বিষয়টি শুধু স্ক্রিন কমিয়ে দিলেই সমাধান হবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই।
অভিভাবকের করণীয় হলো আতঙ্কিত না হয়ে লক্ষণ খেয়াল করা, পড়াশোনা ও খেলাধুলার ভারসাম্য রাখা এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার পরীক্ষা করানো। চোখে ব্যথা, হঠাৎ দৃষ্টি কমে যাওয়া, চোখে আঘাত বা আকস্মিক পরিবর্তন হলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
কী করা দরকার—পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত
প্রথমত, স্কুলভিত্তিক দৃষ্টিশক্তি স্ক্রিনিং নিয়মিত ও পরিকল্পিতভাবে করা প্রয়োজন। তবে এর সঙ্গে থাকতে হবে লিখিত ফলাফল, অভিভাবককে জানানো, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য রেফারেল এবং ফলোআপের ব্যবস্থা। দ্বিতীয়ত, দরিদ্র পরিবার, প্রত্যন্ত এলাকার শিশু এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য সাশ্রয়ী পরীক্ষা ও চশমার ব্যবস্থা জরুরি। শুধু শহরের স্কুলে কর্মসূচি চালালে যেসব শিশু সেবা থেকে দূরে, তারা বাদ পড়ে যেতে পারে।
তৃতীয়ত, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিভাগের মধ্যে সমন্বয় দরকার। প্রশিক্ষিত কর্মী, নির্ভরযোগ্য রেফারেল ব্যবস্থা, মানসম্মত চশমা এবং তথ্য সংরক্ষণ ছাড়া উদ্যোগের ফল পরিমাপ করা কঠিন। চতুর্থত, অভিভাবকদের কাছে বার্তা পৌঁছাতে হবে সহজ ভাষায়—শিশু অভিযোগ না করলেও দৃষ্টিসমস্যা থাকতে পারে; সন্দেহ হলে চোখ পরীক্ষা করান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৬ সালে বাংলাদেশে SPECS 2030 উদ্যোগের কথা জানিয়েছে, যার লক্ষ্য প্রতিসরণজনিত সমস্যার সেবা আরও সহজলভ্য, দক্ষ, সচেতনতা-সমর্থিত ও সাশ্রয়ী করা [২]। এই উদ্যোগের সুফল যেন স্কুলপড়ুয়া শিশুদের কাছেও পৌঁছায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত শিশুদের কথা ভাবলেও চলবে না। যেসব শিশু অনিয়মিত স্কুলে যায়, প্রতিবন্ধিতা নিয়ে বড় হচ্ছে, অথবা দরিদ্রতার কারণে প্রয়োজনীয় সেবা পায় না, তাদের সমস্যা সহজেই চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। স্কুলভিত্তিক কর্মসূচির পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা ও রেফারেল ব্যবস্থা থাকলে এ ধরনের শিশুর কাছেও পৌঁছানো সম্ভব। শিশুদের চোখের স্বাস্থ্যকে তাই বিচ্ছিন্ন একটি ক্যাম্পের বিষয় না ভেবে নিয়মিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
শেষ প্রশ্নটি আমাদের সবার
একটি শিশুর পরীক্ষার খাতায় কম নম্বর দেখলে আমরা তার পড়ার সময় বাড়াতে বলি, কোচিংয়ের কথা ভাবি, কখনো বকাঝকাও করি। কিন্তু সে বইয়ের অক্ষর বা বোর্ডের লেখা ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নটি কতবার করি? শিশুর ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার সমস্যার কারণ বোঝা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দৃষ্টিসমস্যা শনাক্ত হলে অনেক ক্ষেত্রে সহজ ব্যবস্থা—যেমন সঠিক চশমা—তার দৈনন্দিন কাজকে অনেক সহজ করতে পারে।
World Sight Day আমাদের মনে করিয়ে দেয়, চোখের যত্ন কেবল চিকিৎসকের চেম্বারের বিষয় নয়; এটি পরিবার, স্কুল, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং সামাজিক দায়িত্বের অংশ। কোনো শিশুকে দুর্বল শিক্ষার্থী হিসেবে চিহ্নিত করার আগে তার কথা শুনি, আচরণ লক্ষ্য করি এবং প্রয়োজন হলে চোখ পরীক্ষা করাই। হয়তো এতে সব সমস্যার সমাধান হবে না। কিন্তু একটি শিশুকে অকারণে পিছিয়ে পড়তে না দেওয়ার জন্য এটুকু পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ।
কখনো কখনো শিশুর ভবিষ্যৎ বদলাতে বড় কোনো আবিষ্কার লাগে না। লাগে সঠিক সময়ে করা একটি পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় এক জোড়া চশমা, আর একজন বড় মানুষের এই প্রশ্নটি: ‘তুমি কি ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছ?’
ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান
ভিশন সায়েন্টিস্ট ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জননীতি বিষয়ক বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নাল এবং গণমাধ্যম লেখক
আপনার সন্তান কম মেধাবী, নাকি পৃথিবীটাকেই ঝাপসা দেখছে?
আপনার সন্তান কম মেধাবী, নাকি পৃথিবীটাকেই ঝাপসা দেখছে?
ক্লাসের শেষ বেঞ্চে বসে থাকা শিশুটি বারবার চোখ কুঁচকে বোর্ডের দিকে তাকায়। শিক্ষক প্রশ্ন করলে সে উত্তর দিতে দেরি করে, খাতায় লেখা তুলতে পারে না, কখনো আবার সহপাঠীর খাতা দেখে লেখে। বাড়িতে ফিরে পড়তে বসলে বইটি মুখের খুব কাছে নিয়ে আসে। অভিভাবকের মনে হয়, সন্তান হয়তো মনোযোগ দিচ্ছে না; শিক্ষকও ভাবতে পারেন, পড়াশোনায় তার আগ্রহ কম। কিন্তু একটি সাধারণ প্রশ্ন কি আমরা করেছি—শিশুটি ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছে তো?শিশুর শেখার পেছনে অনেক কারণ কাজ করে। সব দুর্বল ফলের জন্য চোখের সমস্যাকে দায়ী করা ভুল। তবে দৃষ্টিশক্তির সমস্যা থাকলে তা শিশুর পড়া, লেখা, শ্রেণিকক্ষে অংশগ্রহণ এবং আত্মবিশ্বাসে বাধা তৈরি করতে পারে। তাই কোনো শিশুকে ‘অমনোযোগী’ বা ‘কম মেধাবী’ বলার আগে তার চোখের স্বাস্থ্য যাচাই করার কথাও ভাবতে হবে। কখনো কখনো সমস্যাটি মেধার নয়; শেখার পরিবেশে তার প্রবেশাধিকারই অসম্পূর্ণ। যে সমস্যা শিশু নিজেই বুঝিয়ে বলতে পারে নাবড়রা চোখে ঝাপসা দেখলে সাধারণত কাউকে জানান, চশমা খোঁজেন বা চিকিৎসকের কাছে যান। কিন্তু শিশুর ক্ষেত্রে বিষয়টি এত সহজ নয়। জন্ম থেকেই যদি সে কোনো মাত্রার ঝাপসা দৃষ্টি নিয়ে বড় হয়, তাহলে সেটিকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নিতে পারে। সে হয়তো জানেই না যে অন্য শিশুরা বোর্ডের লেখা আরও স্পষ্ট দেখতে পায়। কেউ কেউ মাথাব্যথা, চোখে চাপ, পড়ার সময় অস্বস্তি কিংবা দূরের লেখা দেখতে অসুবিধার কথা বলে; আবার অনেক শিশু কিছুই বলে না।দূরের লেখা ঝাপসা দেখা, বই বা মোবাইল খুব কাছে ধরে রাখা, পড়ার সময় বারবার জায়গা হারিয়ে ফেলা, চোখ কুঁচকে তাকানো, এক চোখ বন্ধ করে দেখা কিংবা বোর্ডের লেখা তুলতে অসুবিধা—এসব লক্ষণ খেয়াল করা যেতে পারে। তবে লক্ষণ দেখে নিজে নিজে রোগ নির্ণয় করা ঠিক নয়। শিশুর আচরণের পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে; প্রয়োজন হলে প্রশিক্ষিত চোখের স্বাস্থ্যকর্মী বা চক্ষু বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন জরুরি। বাংলাদেশের বাস্তবতা: পরীক্ষা হলেই দায়িত্ব শেষ নয়বাংলাদেশে শিশুদের চোখের সমস্যা নিয়ে গবেষণা হয়েছে, যদিও একেক গবেষণার এলাকা, বয়সসীমা ও পদ্ধতি আলাদা। ২০২৫ সালে প্রকাশিত সিলেট বিভাগের স্কুলপড়ুয়া শিশুদের একটি গবেষণায় ৫–১৮ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে refractive error বা প্রতিসরণজনিত দৃষ্টিসমস্যার হার ছিল ৫.৩ শতাংশ। গবেষণাটিতে শহরাঞ্চলে হার তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়; তবে এই ফলাফলকে পুরো বাংলাদেশের সব শিশুর ওপর সরাসরি প্রয়োগ করা যাবে না [১]।আরও বড় পরিসরে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয় ২০২৬ সালে জানায়, ২০২০ সালের জাতীয় জরিপে প্রেসবায়োপিয়া বাদ দিয়ে প্রতিসরণজনিত ত্রুটির prevalence ছিল ৪৮.৬ শতাংশ এবং চশমা ব্যবহারের coverage ছিল ২৬
শতাংশ। এই পরিসংখ্যানটি সামগ্রিক জনগোষ্ঠীসংক্রান্ত, শিশুদের একক হিসাব নয়। তবু এটি দেখায় যে দৃষ্টিসমস্যা শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন পৌঁছে দেওয়ার মধ্যে ব্যবধান রয়ে গেছে [২]।স্কুলে একবার চোখ পরীক্ষা করানো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু স্ক্রিনিং আর পূর্ণাঙ্গ চক্ষু পরীক্ষা এক জিনিস নয়। স্ক্রিনিংয়ের উদ্দেশ্য হলো সম্ভাব্য সমস্যা চিহ্নিত করা। পরীক্ষায় সমস্যা ধরা পড়লে শিশুকে উপযুক্ত সেবায় পাঠানো, প্রয়োজনমতো refraction করানো, সঠিক চশমা দেওয়া এবং পরে সেটি ব্যবহার হচ্ছে কি না খোঁজ নেওয়াও সমান জরুরি। শুধু পরীক্ষার সংখ্যা বাড়িয়ে, পরবর্তী সেবা নিশ্চিত না করলে শিশুর উপকার অসম্পূর্ণ থেকে যায়। চশমা লজ্জার নয়, শেখার সহায়কঅনেক শিশুই চশমা পরতে চায় না—কখনো অস্বস্তির কারণে, কখনো বন্ধুদের ঠাট্টার ভয়ে। পরিবারেও কেউ কেউ মনে করেন, অল্প বয়সে চশমা পরলে চোখ আরও খারাপ হবে, অথবা চশমা মানেই শিশুটি অসুস্থ। এমন ধারণা শিশুর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে দেরি করাতে পারে। চশমা দরকার কি না, কী ধরনের চশমা প্রয়োজন এবং কত সময় পরতে হবে—এসব সিদ্ধান্ত পরীক্ষার ভিত্তিতে চোখের স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ অনুযায়ী নেওয়া উচিত।এখানে স্কুলের ভূমিকা বড়। শিক্ষকরা শিশুকে সবার সামনে বিব্রত না করে তার অসুবিধা বুঝতে পারেন, বোর্ডের কাছাকাছি বসার সুযোগ দিতে পারেন এবং অভিভাবককে চোখ পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিতে পারেন। সহপাঠীদেরও শেখানো দরকার, চশমা নিয়ে ঠাট্টা করা গ্রহণযোগ্য নয়। চশমা শিশুর পরিচয় নয়; এটি তার দেখার সুবিধার একটি উপায়। সঠিক চশমা অনেক শিশুর কাছে বই, বোর্ড এবং শ্রেণিকক্ষকে আরও স্পষ্ট করে তুলতে পারে। স্ক্রিনই একমাত্র দোষী নয়শিশুর চোখের কথা উঠলেই প্রায়ই মোবাইল ফোনের প্রসঙ্গ আসে। দীর্ঘ সময় কাছের কাজে মনোযোগ দিলে চোখে ক্লান্তি, অস্বস্তি বা শুষ্কতার অনুভূতি হতে পারে; তাই স্ক্রিন ব্যবহারে বিরতি, পর্যাপ্ত আলো, বাইরে খেলাধুলা এবং বয়সোপযোগী নিয়ম গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সব দৃষ্টিসমস্যার কারণ মোবাইল—এমন সিদ্ধান্তের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। শিশুর চোখ কুঁচকে দেখা বা বোর্ডের লেখা পড়তে না পারার বিষয়টি শুধু স্ক্রিন কমিয়ে দিলেই সমাধান হবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই।অভিভাবকের করণীয় হলো আতঙ্কিত না হয়ে লক্ষণ খেয়াল করা, পড়াশোনা ও খেলাধুলার ভারসাম্য রাখা এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার পরীক্ষা করানো। চোখে ব্যথা, হঠাৎ দৃষ্টি কমে যাওয়া, চোখে আঘাত বা আকস্মিক পরিবর্তন হলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। কী করা দরকার—পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্তপ্রথমত, স্কুলভিত্তিক দৃষ্টিশক্তি স্ক্রিনিং নিয়মিত ও পরিকল্পিতভাবে করা প্রয়োজন। তবে এর সঙ্গে থাকতে হবে লিখিত ফলাফল, অভিভাবককে জানানো, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য রেফারেল এবং ফলোআপের ব্যবস্থা। দ্বিতীয়ত, দরিদ্র পরিবার, প্রত্যন্ত এলাকার শিশু এবং সুবিধাবঞ্চিত
জনগোষ্ঠীর জন্য সাশ্রয়ী পরীক্ষা ও চশমার ব্যবস্থা জরুরি। শুধু শহরের স্কুলে কর্মসূচি চালালে যেসব শিশু সেবা থেকে দূরে, তারা বাদ পড়ে যেতে পারে।তৃতীয়ত, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিভাগের মধ্যে সমন্বয় দরকার। প্রশিক্ষিত কর্মী, নির্ভরযোগ্য রেফারেল ব্যবস্থা, মানসম্মত চশমা এবং তথ্য সংরক্ষণ ছাড়া উদ্যোগের ফল পরিমাপ করা কঠিন। চতুর্থত, অভিভাবকদের কাছে বার্তা পৌঁছাতে হবে সহজ ভাষায়—শিশু অভিযোগ না করলেও দৃষ্টিসমস্যা থাকতে পারে; সন্দেহ হলে চোখ পরীক্ষা করান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৬ সালে বাংলাদেশে SPECS 2030 উদ্যোগের কথা জানিয়েছে, যার লক্ষ্য প্রতিসরণজনিত সমস্যার সেবা আরও সহজলভ্য, দক্ষ, সচেতনতা-সমর্থিত ও সাশ্রয়ী করা [২]। এই উদ্যোগের সুফল যেন স্কুলপড়ুয়া শিশুদের কাছেও পৌঁছায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত শিশুদের কথা ভাবলেও চলবে না। যেসব শিশু অনিয়মিত স্কুলে যায়, প্রতিবন্ধিতা নিয়ে বড় হচ্ছে, অথবা দরিদ্রতার কারণে প্রয়োজনীয় সেবা পায় না, তাদের সমস্যা সহজেই চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। স্কুলভিত্তিক কর্মসূচির পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা ও রেফারেল ব্যবস্থা থাকলে এ ধরনের শিশুর কাছেও পৌঁছানো সম্ভব। শিশুদের চোখের স্বাস্থ্যকে তাই বিচ্ছিন্ন একটি ক্যাম্পের বিষয় না ভেবে নিয়মিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। শেষ প্রশ্নটি আমাদের সবারএকটি শিশুর পরীক্ষার খাতায় কম নম্বর দেখলে আমরা তার পড়ার সময় বাড়াতে বলি, কোচিংয়ের কথা ভাবি, কখনো বকাঝকাও করি। কিন্তু সে বইয়ের অক্ষর বা বোর্ডের লেখা ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নটি কতবার করি? শিশুর ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার সমস্যার কারণ বোঝা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দৃষ্টিসমস্যা শনাক্ত হলে অনেক ক্ষেত্রে সহজ ব্যবস্থা—যেমন সঠিক চশমা—তার দৈনন্দিন কাজকে অনেক সহজ করতে পারে।World Sight Day আমাদের মনে করিয়ে দেয়, চোখের যত্ন কেবল চিকিৎসকের চেম্বারের বিষয় নয়; এটি পরিবার, স্কুল, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং সামাজিক দায়িত্বের অংশ। কোনো শিশুকে দুর্বল শিক্ষার্থী হিসেবে চিহ্নিত করার আগে তার কথা শুনি, আচরণ লক্ষ্য করি এবং প্রয়োজন হলে চোখ পরীক্ষা করাই। হয়তো এতে সব সমস্যার সমাধান হবে না। কিন্তু একটি শিশুকে অকারণে পিছিয়ে পড়তে না দেওয়ার জন্য এটুকু পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ।কখনো কখনো শিশুর ভবিষ্যৎ বদলাতে বড় কোনো আবিষ্কার লাগে না। লাগে সঠিক সময়ে করা একটি পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় এক জোড়া চশমা, আর একজন বড় মানুষের এই প্রশ্নটি: ‘তুমি কি ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছ?’ ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ভিশন সায়েন্টিস্ট ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জননীতি বিষয়ক বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নাল এবং গণমাধ্যম লেখক
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
রওশন টাওয়ার, (লিফট-৮) ১৫২/২/এ২ গ্রীণ রোড ,
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ ।
মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত