রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে "ট-র্চা-র সেল"! • রংপুরে মোটরসাইকেল চোর চক্রের ৪ সদস্য গ্রেপ্তার, উদ্ধার - ৯টি • বিআরটিএ ঢাকা মেট্রো-৪-এ ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ, দালালদের মাধ্যমে দ্রুত সেবা পাওয়ার দাবি • বিশ্ব ডিম দিবস ২০২৬ উপলক্ষ্যে বিএলআরআইতে বর্ণাঢ্য আয়োজন • ঘুষ ছাড়া মেলে না সেবা নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএতে দালালচক্রের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ • সোনাইমুড়ীর সাব-রেজিস্ট্রার সিরাজুল হকের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য ও সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগ • বিএনপি সরকারের সাত মাসে ৩২ কূপ খনন, যুক্ত হচ্ছে প্রায় ১৪৮ এমএমসিএফ গ্যাস • ঢাকার বস্তিতে যক্ষ্মা স্ক্রিনিংয়ে ১ লাখ ৪৫ হাজার ডলার দেবে জাপান • আবেগ, অশ্রুতে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে মেসির বিদায় • কমিশন বাণিজ্য ও দুর্নীতির অভিযোগ: বিআরটিসির ডিজিএম মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুদকে আবেদন
মতামত একটি জাতির আত্মমর্যাদার প্রতিচ্ছবি

একটি জাতির আত্মমর্যাদার প্রতিচ্ছবি

ছবির পেছনের আর্তনাদ: এক রিকশা শ্রমিক, একটি বাড়ি, একটি জাতির আত্মমর্যাদার প্রতিচ্ছবি

ছবি কখনো শুধুই রঙ আর আলোছায়ার খেলা নয়। কখনো কখনো একটি স্থিরচিত্র হয়ে ওঠে এক জীবন্ত ইতিহাস, এক অনুচ্চারিত চিৎকার, অথবা এক পরম আর্তনাদ। ঠিক যেমন একটি নিরলঙ্কার মুহূর্ত, ধানমন্ডির পুরনো বত্রিশ নাম্বার সড়কে, ৬৭৭ নাম্বার বাড়ির সম্মুখে ধারণকৃত এক ছবি — যেখানে এক নিঃস্ব রিকশা চালক মাটিতে পলিথিন বিছিয়ে নামাজে লিপ্ত। চারপাশে জঞ্জাল, অবহেলা, জীর্ণ দেয়াল, অথচ সে স্থির, নিবিষ্ট, অবিচল। এ ছবি শুধু একটি মজলুমের নামাজ নয়, এটি যেন বাংলার কোটি বঞ্চিত মানুষের পক্ষ থেকে এক নীরব প্রার্থনা, এক ঐতিহাসিক ফরিয়াদ।

এই বাড়ির নাম শুনলেই আমাদের হৃদয়ে ধ্বনিত হয় এক নাম — বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জাতির জনক, যিনি বাঙালি জাতিকে দিয়েছে স্বাধীনতার পরিচয়, আত্মমর্যাদার ভাষা। এই বাড়ির দেয়ালে এখনও জমে আছে সেই বিভীষিকাময় রাতের রক্তরেখা, সেই ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর প্রতিধ্বনি, যেখানে পরিবারসহ নি*র্মমভাবে হ*ত্যা করা হয়েছিল আমাদের জাতির মহানায়ককে। ঘাতকরা চেয়েছিল তাঁকে মুছে দিতে ইতিহাস থেকে। কিন্তু আজও এই বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে এক কণ্টকাকীর্ণ স্মৃতিফলক হয়ে।

তবু, ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো — এই বাড়ির পরিচর্যা, নিরাপত্তা, পবিত্রতা বারবার উপেক্ষিত থেকেছে। কখনো রাজনৈতিক চক্রান্তে, কখনো অবহেলায়, এই স্মৃতিসৌধ বারবার হয়েছে জীর্ণ, লাঞ্ছিত। সেই অবহেলিত স্মৃতিসৌধের সামনে, যখন এক রিকশা শ্রমিক হাত তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর দরবারে মোনাজাতে মগ্ন, তখন সে মুহূর্ত হয়ে ওঠে মহাকালের গর্ভে স্থায়ী হয়ে যাওয়ার মতো এক রূপকথা।

বাংলাদেশের শ্রেণিকাঠামোতে রিকশা চালক হলেন সেই নিম্নতম স্তরের কর্মজীবী, যাঁরা প্রতিদিনের অন্ন সংগ্রামে নিজস্ব অস্তিত্ব বিলিয়ে দেন। তাঁদের জীবনদর্শন, নৈতিকতা, সমাজচেতনা নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়। অথচ এই ছবিতে দেখা যায় — সেই দরিদ্র, অশিক্ষিত, নিপীড়িত মানুষটিই বঙ্গবন্ধুর ঘরের সামনে মাথা নিচু করে, দুই হাত তুলে তাঁর জন্য দোয়া করছেন। রাষ্ট্রযন্ত্র, মিডিয়া, উচ্চবিত্ত সমাজ যেখানে প্রায়শ বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি নিয়ে চমক তৈরি করে, সেখানে এই নামাজী মানুষটি যেন নিঃস্ব অথচ নিঃস্বার্থ এক স্মৃতিপালক।

সে মোনাজাত করছে শুধু শেখ মুজিবের জন্য নয়, যেন সমগ্র জাতির জন্য। তাঁর কাতর চাহনি, পলিথিনের উপর নিঃশব্দ অশ্রুপাত, সারা শরীর জুড়ে নামাজের সময়কার কম্পন — সবকিছু মিলে এক অদৃশ্য আত্মিক যুক্তির জন্ম দেয়। যে যুক্তি বলছে — “এই ইতিহাস আমার, এই ক্ষত আমার, এই জনক আমার।”

ছবির প্রকৃত সৌন্দর্য রচনার জন্য শুধু প্রযুক্তি বা আলোকছায়ার দক্ষতা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন দৃষ্টি। এই দৃষ্টি হতে হয় আত্মিক, সমাজচেতন ও ঐতিহাসিকভাবে সংবেদী। যে মানুষটি এই ছবিটি তুলেছেন, তিনি মুহূর্তটিকে অতিক্রম করে অনন্তের দ্বারে পৌঁছে গেছেন। কারণ, ক্যামেরা শুধু একবার ক্লিক করেছে, কিন্তু তা হয়ে উঠেছে সময়ের স্থির পঙক্তি।

এই ছবিটি দেখতে দেখতে প্লেটোর cave analogy মনে পড়ে — যেখানে আমরা ছায়াকে সত্য বলে জানি, কিন্তু প্রকৃত সত্য থাকে গুহার বাইরে। এই ছবি যেন সেই গুহার বাইরে এক সত্য প্রতিমা। আর রিকশা শ্রমিকটি যেন সেই মুক্ত আত্মা, যিনি জানেন কার কাছে মাথা নত করতে হয়, কার স্মৃতিকে কাঁধে নিতে হয়।

এই ছবি তুলতে তুলতে যে কম্পন, যে হিমশৈলের মত অনুভূতি শরীর বেয়ে যায়, তা নিছক নান্দনিক আবেগ নয়। এটি একধরনের রাজনৈতিক পুলক ও দায়বোধ। কারণ, আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন জাতির জনকের উত্তরাধিকার ও মূল্যবোধ বারবার চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, তাঁর ত্যাগ, তাঁর জাতির জন্য কাঁটায় ভরা পথ — তা উপেক্ষিত কিংবা বিকৃত হয়ে রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে।

এই ছবিটি সেই প্রেক্ষিতে যেন প্রতিরোধের ছবি। এটি এক গরীব মানুষের মাধ্যমে উচ্চারিত চূড়ান্ত রাজনীতি — শ্রদ্ধা, স্মৃতি ও ন্যায়বিচারের রাজনীতি। সে যেন বলছে, “যে জাতি তার জনককে ভুলে যেতে চায়, সে জাতি চিরতরে অনাথ।”

এই ছবির গভীরে যে বার্তাটি প্রবলভাবে প্রতিধ্বনিত হয়, তা হলো — জনগণ এখনো বঙ্গবন্ধুকে মনে রেখেছে। বিশেষত সেই জনগণ, যাঁরা তাঁকে সবচেয়ে বেশি অনুভব করে, কারণ তিনি ছিলেন তাঁদের পক্ষের কণ্ঠস্বর। একজন নিঃস্ব রিকশা শ্রমিক হয়ত তাঁর দুঃখ, ক্লান্তি, ক্ষুধা ও বঞ্চনার কথা কাউকে বলতে পারে না, কিন্তু সে জানে — ইতিহাসের কোনো এক বাঁকে একজন শেখ মুজিব এসেছিলেন, যিনি বলেছিলেন "এই স্বাধীনতা, এই পতাকা তোমার"।

এ কারণে তার নামাজ শুধু ধর্মীয় আচরণ নয়, তা এক সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিব্যক্তি। এতে আছে স্মৃতির প্রতি আনুগত্য, এক নিঃশব্দ প্রতিবাদ, এবং একইসাথে ভবিষ্যতের প্রতি আহ্বান।

এই ছবিটি তাই শুধু আলোকচিত্র নয় — এটি একটি কাব্যিক ঘোষণা, একটি দর্শন, একটি চেতনার ধ্বনি। একে ব্যাখ্যা করা যায় বহু ভাবে — সমাজতত্ত্ব দিয়ে, রাজনীতি দিয়ে, নন্দনতত্ত্ব দিয়ে, এমনকি আত্মিক অনুভূতি দিয়েও। কিন্তু তার অন্তর্নিহিত বাণী একটিই — আমরা যেন ভুলি না।

আমরা যেন ভুলে না যাই আমাদের ইতিহাস, আমাদের জনক, আমাদের রক্তাক্ত উত্থানের গল্প। এই রিকশা চালক যেন আমাদেরকে সেই চিরন্তন আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে বলছেন — “দেখো, এই ঘর এখনো দাঁড়িয়ে আছে। তবে তার কোল জুড়ে ধুলো, পাথর, অবহেলা। তুমি কি কিছু করবে না?”

এই ছবিটি হয়তো কোনো আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাবে না। পাবে না ফটোজার্নালিজমের উচ্চতর রেটিং। কিন্তু এটি থেকে যাবে ইতিহাসের সেই দরজায়, যেখানে মানুষ প্রশ্ন করে — কে কাকে মনে রেখেছে? কে কাকে ভোলেনি?

যিনি এই ছবিটি তুলেছেন, তিনি জানেন — মুহূর্তটিকে ধরে রাখা মানেই ইতিহাসকে শ্রদ্ধা জানানো। আর সেই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র, এক নিঃস্ব রিকশা চালক, হয়ে ওঠেন জনকের স্মৃতির জীবন্ত মুর্তি। তাঁর প্রার্থনায় মিশে যায় একটি জাতির দুঃখ, লজ্জা, ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা।

একটুখানি ক্লিক, একখণ্ড পলিথিন, একটি জীর্ণ বাড়ি আর এক দুঃস্থ নামাজি মানুষ — এই চারটি উপাদান একত্র হয়ে রচনা করেছে এক অনন্ত ইতিহাস, যার মূল্য কোনো কৃত্রিম বর্ণনায় মাপা যায় না।

লেখা ও ছবিঃ আবরার শাহরিয়ার

খুঁজুন