মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
বাগেরহাটে পশুর নদীতে কয়লাবাহী কার্গো জাহাজ ডুবি • রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত : প্রধানমন্ত্রী • গাজীপুর বিআরটিএতে দুর্নীতির অভিযোগ, অবসরের আগে এডি নুরুল হোসেনকে ঘিরে বিতর্ক • চোরাই সিএনজি বাণিজ্যে বিপুল সম্পদের অভিযোগ, মগবাজারের নান্টুকে ঘিরে নানা প্রশ্ন • বঙ্গোপসাগরে গভীর নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে, সমুদ্রবন্দরে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত • বিআরটিসির ঢাকা ট্রাক ডিপোতে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্তের দাবি • ইতালিতে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে হাজার হাজার মানুষের বিক্ষোভ • রাঙামাটি বন বিভাগে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ, কাঠগড়ায় সিএফ আবদুল আউয়াল ও ডিএফও হক মাহমুদ মোর্শেদ • আমার মায়ের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ‘নোয়াখালীর স্যার • টাইফুন চাম্পির প্রভাবে অচল তাইওয়ান, নিরাপদ আশ্রয়ে শত শত মানুষ
দেশের খবর গাজীপুর বিআরটিএতে দুর্নীতির অভিযোগ, অবসরের আগে এডি নুরুল হোসেনকে ঘিরে বিতর্ক

গাজীপুর বিআরটিএতে দুর্নীতির অভিযোগ, অবসরের আগে এডি নুরুল হোসেনকে ঘিরে বিতর্ক

গাজীপুর বিআরটিএ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) নুরুল হোসেনকে ঘিরে নতুন করে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। চাকরিজীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তাঁর বিরুদ্ধে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, দালালদের মাধ্যমে দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা এবং সরকারি সেবা পেতে ভোগান্তি সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় মাদারীপুরে আন্দোলনকারীদের ‘নাশকতাকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করা একটি তদন্ত প্রতিবেদনে তাঁর ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, আগামী ডিসেম্বরে অবসরে যাওয়ার আগে গাজীপুর বিআরটিএ কার্যালয়ে অনিয়ম ও অর্থ আদায়ের প্রবণতা বেড়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

জুলাই আন্দোলনের সময় মাদারীপুরের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন

২০২৪ সালের ২৩ ও ২৪ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে মাদারীপুরে ছাত্রলীগ, পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সময় রোমান বেপারী ও তাওহীদ সন্নামাৎ নামে দুজন নিহত হন। এ ছাড়া নাম-পরিচয় জানা যায়নি, এমন আরেক শিক্ষার্থীর লেকের পানিতে ডুবে মৃত্যুর কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার পর তৎকালীন মাদারীপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে বিআরটিএর তৎকালীন সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) নুর হোসেন, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহরিয়ার রহমান এবং এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী বাদল চন্দ্র কীর্তিনিয়া ছিলেন।

অভিযোগ রয়েছে, ২৬ জুলাই জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে আন্দোলনকারীদের ‘নাশকতাকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং সংঘর্ষের প্রকৃত পরিস্থিতি যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। এ ক্ষেত্রে নুর হোসেনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নাজমুল হাসান গণমাধ্যমের সামনে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করে দাবি করেছিলেন, দুই দিনের সহিংসতায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, ট্রাফিক পুলিশ বক্সসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় হামলার কারণে প্রায় ৪০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত নুর হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তদন্ত প্রক্রিয়া প্রভাবিত হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তদন্ত কমিটির কার্যবিবরণী, মূল প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করা জরুরি।

ফিটনেস ও লাইসেন্সের কাজে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ

গাজীপুর বিআরটিএ কার্যালয়ে ফিটনেস পরীক্ষার বিশেষ অ্যাপয়েন্টমেন্ট এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স-সংক্রান্ত বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আফজাল, রুহুল ও কমল নামে কয়েকজন বহিরাগত ব্যক্তির মাধ্যমে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে ফাইলপ্রতি ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এসব ব্যক্তি সহকারী পরিচালক নুরুল হোসেনের আস্থাভাজন হিসেবে কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করেন। তবে অভিযোগের পক্ষে আর্থিক লেনদেনের নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য কিংবা সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক প্রমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

নুরুল হোসেনের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন বিআরটিএ কার্যালয়ে কর্মরত থাকাকালে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার কথা উল্লেখ করেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, সাভার বিআরটিএতে কর্মরত থাকার সময় দালালদের কার্যালয়ে বসিয়ে দাপ্তরিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এ সময় মোটরযান পরিদর্শক হাসানের মাধ্যমে অনিয়ম চলার অভিযোগও রয়েছে।

এ ছাড়া ইকুরিয়া বিআরটিএর লাইসেন্স শাখায় দায়িত্ব পালনের সময় মোটরযান পরিদর্শক আবু জামালের সঙ্গে যোগসাজশে ঘুষ লেনদেনের একটি চক্র পরিচালনার অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে তোলা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সময়ের নথি ও প্রশাসনিক তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ।

আরও কয়েক কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ

গাজীপুর বিআরটিএ কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মচারীর বিরুদ্ধেও দাপ্তরিক অনিয়ম ও সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগ রয়েছে।

উচ্চমান সহকারী মারনুজ রহমানের বিরুদ্ধে নিয়মিত অফিসে উপস্থিত না থেকে বহিরাগত ব্যক্তিদের দিয়ে সংবেদনশীল দাপ্তরিক কাজ করানোর অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে, অফিস সহকারী স্বপন হোসেনের বিরুদ্ধে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের সরকারি ক্ষতিপূরণ-সংক্রান্ত ফাইল এগিয়ে নেওয়ার বিনিময়ে অর্থ দাবি করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এ ধরনের একটি ফাইলের জন্য তিনি ৩০ হাজার টাকা দাবি করেছিলেন।

এ ছাড়া অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মাহফুজুর রহমানের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সেবাগ্রহীতা। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়মের কথা প্রকাশ্যে এলে তিনি বিষয়টিকে কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করেন।

তবে স্বপন হোসেন ও মাহফুজুর রহমান তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে ঘটনাটিকে ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন।

ক্ষতিপূরণ পেতে ভোগান্তির অভিযোগ

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত এক ব্যক্তির স্বজনের অভিযোগ, সরকারি অনুদান ও ক্ষতিপূরণের ফাইলের বিষয়ে সহায়তা চাইতে গেলে স্বপন হোসেন তাঁদের কাছে ৩০ হাজার টাকা দাবি করেন।

ওই স্বজনের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে তাঁরা গাজীপুর কার্যালয় থেকে কাজ করানোর চেষ্টা বাদ দিয়ে ঢাকায় বিআরটিএর প্রধান কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং সেখান থেকে চেক সংগ্রহ করেন।

সড়ক দুর্ঘটনায় স্বজন হারানো পরিবারগুলোর জন্য সরকারি ক্ষতিপূরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা। তাই এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা যাচাই এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের ক্ষোভ

গাজীপুর বিআরটিএ কার্যালয়ে সেবা নিতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও।

বাসমালিক মো. মিরাজ মিয়া বলেন, “গাজীপুর বিআরটিএ অফিসে নিয়ম মেনে কাজ করাতে গেলেও নানামুখী ভোগান্তিতে পড়তে হয়। টাকা না দিলে ফাইল নড়ে না। এটি এখন ঘুষ ও অনিয়মের ঘাটিতে পরিণত হয়েছে।”

গাজীপুর সিএনজি মালিক সমিতির নেতা মো. মিলন মিয়াও কার্যালয়ের সেবাব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে সেবা নিতে গেলে মনে হয় নিঃশ্বাস ফেললেও টাকা দিতে হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ না দিলে কাজ আটকানো থাকে। আমরা এসব দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”

তাঁদের অভিযোগ, সরকারি ফি দিয়ে নিয়মমাফিক সেবা পাওয়ার পরিবর্তে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার চাপ এবং দাপ্তরিক জটিলতার কারণে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

সচিব বরাবর লিখিত অভিযোগ

গাজীপুর বিআরটিএ কার্যালয়ে কথিত অনিয়ম, দুর্নীতি এবং দালালনির্ভর সেবাব্যবস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে মো. আবুল হোসেন নামে এক সচেতন নাগরিক সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার্যক্রম তদন্ত, দালালদের প্রভাবমুক্ত সেবা নিশ্চিত করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

জুলাই আন্দোলনের সময় তদন্ত প্রতিবেদনে আন্দোলনকারীদের ‘নাশকতাকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করার অভিযোগ থেকে শুরু করে গাজীপুরে সরকারি সেবা প্রদানে কথিত ঘুষ ও অনিয়ম—সব বিষয়েই নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে।

অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র পরীক্ষা করে কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নিলে সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হতে পারে। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

খুঁজুন