গুলশানের একটি সেলুনে আমি নিয়মিত চুল কাটাই। তাদের অভ্যর্থনা সবসময় আন্তরিক—মনে হয় যেন বহুদিনের পরিচিত। হাসিমুখে কুশল বিনিময়, চা-কফির অফার—সব মিলিয়ে একটি উষ্ণ পরিবেশ।
কিন্তু আজকের দৃশ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
যে ছেলেটি নিয়মিত আমার চুল কাটে, তার মুখে কোনো হাসি নেই। পুরো সেলুন ফাঁকা, আমি একমাত্র কাস্টমার। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর সে জানাল, আগামীকাল থেকে তার এখানে আর চাকরি নেই।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, "নতুন কোথাও যোগ দিচ্ছ?"
সে বলল, "না স্যার।"
চরম সহানুভূতি ও কষ্টে বুকটা ধুক করে উঠল।
কারণ জানতে চাইলে বলল, মালিকপক্ষ পাঁচ বছরের চাকরির চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বলেছে। সে রাজি হয়নি।
সঙ্গে সঙ্গে মাথায় রাগে রক্ত উঠে গেল। এই দুষ্ট বুদ্ধির ছোকরার জন্য আমার মমতা তাৎক্ষণিকভাবে নিভে গেল। বরং মনে হলো, এই স্বার্থপর লোকের উচিত শিক্ষাই হয়েছে।
অভিজ্ঞতার আলোয় দেখেছি, প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলার পর অনেক কর্মীই ভালো সুযোগ পেলে চলে যায়।
আমিও জীবনে বহু ফ্রেশ ডিপ্লোমা ও গ্র্যাজুয়েট ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দিয়েছি। নিয়োগের পূর্বে অনেকের সুপারিশ ও তদবির ছিল। প্রশিক্ষিত হওয়ার পর কেউ কেউ ভালো সুযোগ পেয়ে তারা আমাকে বিপদে ফেলে অন্যত্র চলে গেছেন। অনুরোধ, বেতন বৃদ্ধি—কোনো কিছুতেই তাদের যাত্রা রুদ্ধ করা যায়নি।
যার কারণে অনেক পুরোনো স্টাফকে এই কায়দায় চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করানোর পরিকল্পনা আমিও নিচ্ছি। কয়েকজনকে চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করানোর সিদ্ধান্তও চূড়ান্ত করেছি।
আমি চুপ করে রইলাম। এসব স্বার্থপর, দুষ্ট বুদ্ধির লোকের সঙ্গে যত কম কথা বলা যায়, ততই ভালো।
কিছুক্ষণ পরে ছেলেটি আবার বলল,
"স্যার, আমার সদ্য বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ হয়েছে। ট্রেইনি মার্চেন্ডাইজার হিসেবে চাকরি খুঁজছি। অনুরোধ করেছিলাম, যতদিন চাকরি না পাই ততদিন যেন এই সেলুনে কাজ করতে পারি। কিন্তু তারা রাজি হননি।"
আমি বিস্মিত হয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলাম।
তার গল্প শুনে আমি নির্বাক।
অভাবের সংসার। ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে পাড়ার সেলুনে কাজ করেছে। সেই কাজ করেই এসএসসি শেষ করেছে। এরপর প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ করে ডিপ্লোমা ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং পরে প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং (Apparel) সম্পন্ন করেছে। পুরো পড়াশোনার খরচ সে নিজের শ্রমে, সেলুনে কাজ করেই জোগাড় করেছে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, "টেক্সটাইলই কেন?"
সে বলল,
"দেশের অর্থনীতির অন্যতম মেরুদণ্ড গার্মেন্টস শিল্প। সেই বিশ্বাস থেকেই এই বিষয়টি পড়েছি। কিন্তু এখন গার্মেন্টস খাতের সময় খারাপ, কোথাও চাকরি হচ্ছে না।"
তার কথা শুনে আমার আগের সব ধারণা ভেঙে গেল।
যে মানুষটিকে কিছুক্ষণ আগেও ভুল বুঝেছিলাম, তার জন্যই অন্তর থেকে দোয়া বেরিয়ে এলো।
বিদায়ের আগে আমি তার কাছে সিভি চেয়েছি। সে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দিয়েছে।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যে ছেলে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের পরিশ্রমে বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে, সুযোগ পেলে সে অবশ্যই একজন ভালো পেশাজীবী হবে।
আমার বন্ধু, শুভানুধ্যায়ী কিংবা এই লেখার পাঠকদের মধ্যে যদি কেউ কোন প্রতিষ্ঠানে ট্রেইনি মার্চেন্ডাইজার বা উপযুক্ত কোনো পদের সুযোগ করে দিতে পারেন, অনুগ্রহ করে আমাকে ইনবক্সে জানাবেন। প্রয়োজনে আমি তার সিভি পাঠিয়ে দেব।
আমি সাধারণত আমার লেখায় শেয়ার করার অনুরোধ করি না। কিন্তু আজ করছি।
হয়তো আপনার একটি শেয়ারই এই সংগ্রামী তরুণটির জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
নাপিতের কাঁচি থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার
নাপিতের কাঁচি থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার
গুলশানের একটি সেলুনে আমি নিয়মিত চুল কাটাই। তাদের অভ্যর্থনা সবসময় আন্তরিক—মনে হয় যেন বহুদিনের পরিচিত। হাসিমুখে কুশল বিনিময়, চা-কফির অফার—সব মিলিয়ে একটি উষ্ণ পরিবেশ।কিন্তু আজকের দৃশ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। যে ছেলেটি নিয়মিত আমার চুল কাটে, তার মুখে কোনো হাসি নেই। পুরো সেলুন ফাঁকা, আমি একমাত্র কাস্টমার। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর সে জানাল, আগামীকাল থেকে তার এখানে আর চাকরি নেই।আমি জিজ্ঞেস করলাম, "নতুন কোথাও যোগ দিচ্ছ?"সে বলল, "না স্যার।" চরম সহানুভূতি ও কষ্টে বুকটা ধুক করে উঠল। কারণ জানতে চাইলে বলল, মালিকপক্ষ পাঁচ বছরের চাকরির চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বলেছে। সে রাজি হয়নি।সঙ্গে সঙ্গে মাথায় রাগে রক্ত উঠে গেল। এই দুষ্ট বুদ্ধির ছোকরার জন্য আমার মমতা তাৎক্ষণিকভাবে নিভে গেল। বরং মনে হলো, এই স্বার্থপর লোকের উচিত শিক্ষাই হয়েছে। অভিজ্ঞতার আলোয় দেখেছি, প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলার পর অনেক কর্মীই ভালো সুযোগ পেলে চলে যায়। আমিও জীবনে বহু ফ্রেশ ডিপ্লোমা ও গ্র্যাজুয়েট ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দিয়েছি। নিয়োগের পূর্বে অনেকের সুপারিশ ও তদবির ছিল। প্রশিক্ষিত হওয়ার
পর কেউ কেউ ভালো সুযোগ পেয়ে তারা আমাকে বিপদে ফেলে অন্যত্র চলে গেছেন। অনুরোধ, বেতন বৃদ্ধি—কোনো কিছুতেই তাদের যাত্রা রুদ্ধ করা যায়নি। যার কারণে অনেক পুরোনো স্টাফকে এই কায়দায় চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করানোর পরিকল্পনা আমিও নিচ্ছি। কয়েকজনকে চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করানোর সিদ্ধান্তও চূড়ান্ত করেছি। আমি চুপ করে রইলাম। এসব স্বার্থপর, দুষ্ট বুদ্ধির লোকের সঙ্গে যত কম কথা বলা যায়, ততই ভালো। কিছুক্ষণ পরে ছেলেটি আবার বলল,"স্যার, আমার সদ্য বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ হয়েছে। ট্রেইনি মার্চেন্ডাইজার হিসেবে চাকরি খুঁজছি। অনুরোধ করেছিলাম, যতদিন চাকরি না পাই ততদিন যেন এই সেলুনে কাজ করতে পারি। কিন্তু তারা রাজি হননি।"আমি বিস্মিত হয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলাম।তার গল্প শুনে আমি নির্বাক। অভাবের সংসার। ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে পাড়ার সেলুনে কাজ করেছে। সেই কাজ করেই এসএসসি শেষ করেছে। এরপর প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ করে ডিপ্লোমা ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং পরে প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং (Apparel) সম্পন্ন করেছে। পুরো পড়াশোনার খরচ
সে নিজের শ্রমে, সেলুনে কাজ করেই জোগাড় করেছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, "টেক্সটাইলই কেন?"সে বলল,"দেশের অর্থনীতির অন্যতম মেরুদণ্ড গার্মেন্টস শিল্প। সেই বিশ্বাস থেকেই এই বিষয়টি পড়েছি। কিন্তু এখন গার্মেন্টস খাতের সময় খারাপ, কোথাও চাকরি হচ্ছে না।" তার কথা শুনে আমার আগের সব ধারণা ভেঙে গেল।যে মানুষটিকে কিছুক্ষণ আগেও ভুল বুঝেছিলাম, তার জন্যই অন্তর থেকে দোয়া বেরিয়ে এলো।বিদায়ের আগে আমি তার কাছে সিভি চেয়েছি। সে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দিয়েছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যে ছেলে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের পরিশ্রমে বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে, সুযোগ পেলে সে অবশ্যই একজন ভালো পেশাজীবী হবে। আমার বন্ধু, শুভানুধ্যায়ী কিংবা এই লেখার পাঠকদের মধ্যে যদি কেউ কোন প্রতিষ্ঠানে ট্রেইনি মার্চেন্ডাইজার বা উপযুক্ত কোনো পদের সুযোগ করে দিতে পারেন, অনুগ্রহ করে আমাকে ইনবক্সে জানাবেন। প্রয়োজনে আমি তার সিভি পাঠিয়ে দেব। আমি সাধারণত আমার লেখায় শেয়ার করার অনুরোধ করি না। কিন্তু আজ করছি।হয়তো আপনার একটি শেয়ারই এই সংগ্রামী তরুণটির জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
১৫২/২, এ-২ গ্রীন রোড, রওশন টাওয়ার (লিফটের-৮),
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ । মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত