মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
প্রবাস নীতি-নৈতিকতার সংকট ও আত্মসমালোচনার সময়
লন্ডনের বাংলা সাংবাদিকতা:

নীতি-নৈতিকতার সংকট ও আত্মসমালোচনার সময়

লন্ডনের বাংলা সাংবাদিকতা: 
নীতি-নৈতিকতার সংকট ও আত্মসমালোচনার সময়

সাংবাদিকতার পরিচয় নয়, যোগ্যতা ও সততাই হোক পেশাগত মর্যাদার মাপকাঠি

লন্ডনের বাংলা সাংবাদিকতার অঙ্গনে পেশাগত নীতি-নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও আত্মমর্যাদা নিয়ে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি চ্যানেল এস-এর প্রতিষ্ঠাতা মাহি ফেরদৌস জলিল ভাউ সাংবাদিকদের নীতি-নৈতিকতা নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা নিছক কোনো ব্যক্তিগত মতামত নয়; বরং প্রবাসের বাংলা সাংবাদিকতার বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে গভীরভাবে ভাবার একটি উপলক্ষ। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ একটি পেশার মর্যাদা শুধু তার পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না, প্রতিষ্ঠিত হয় সেই পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষের সততা, যোগ্যতা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, লন্ডনের বাংলা সাংবাদিকতার অঙ্গনে কিছু প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আপ্যায়ন পাওয়ার প্রবণতা, পেশাগত যোগ্যতার পরিবর্তে সামাজিক পরিচিতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং পুরস্কার ও সম্মাননা প্রদানের স্বচ্ছতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। এসব বিষয়কে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

সাংবাদিকের আর্থিক অসচ্ছলতা কোনো অপরাধ কিংবা লজ্জার বিষয় নয়। বরং সংবাদমাধ্যমের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, কর্মসংস্থানের সংকট এবং সাংবাদিকতার যথাযথ মূল্যায়নের অভাব অনেক পেশাজীবীর জীবনকে কঠিন করে তুলতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকতার পরিচয়কে যদি ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা পেশাটির আত্মমর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে। সাংবাদিকতার পরিচয় কোনো বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ভোগের অধিকারপত্র নয়। একজন সাংবাদিকের প্রধান দায়িত্ব সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় মানুষের সামনে তুলে ধরা।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সাংবাদিকতার পেশাগত যোগ্যতা ও মানদণ্ড। বর্তমানে প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে যে কেউ মোবাইল ফোন, ক্যামেরা কিংবা একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সংবাদ প্রচার করতে পারছেন। এটি গণমাধ্যমের বিকাশের একটি ইতিবাচক দিক। মোবাইল সাংবাদিকতা আধুনিক সংবাদ পরিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার আর পেশাদার সাংবাদিকতা এক বিষয় নয়।

সাংবাদিকতা করতে হলে প্রয়োজন তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা, বস্তুনিষ্ঠতা, নিরপেক্ষতা, সংবাদ পরিবেশনের অভিজ্ঞতা এবং পেশাগত নৈতিকতা। শুধু ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করলেই দায়িত্বশীল সাংবাদিক হওয়া যায় না। সংবাদ প্রকাশের আগে সত্যতা যাচাই করা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করাই একজন সাংবাদিকের মৌলিক দায়িত্ব।

একইভাবে উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা আয়োজনের স্বচ্ছতা। পুরস্কার একজন মানুষের কাজের স্বীকৃতি। এটি তাঁর দীর্ঘদিনের শ্রম, অবদান ও নিষ্ঠার মূল্যায়ন। কিন্তু পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে যদি নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হয়, কিংবা অর্থের বিনিময়ে সম্মাননা পাওয়ার অভিযোগ ওঠে, তাহলে পুরস্কারের প্রকৃত মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সম্মাননা কখনো বাণিজ্যিক লেনদেনের বিষয় হতে পারে না। যোগ্যতা ও অবদানের ভিত্তিতেই একজন মানুষকে সম্মানিত করা উচিত।

সাংবাদিকতার আরেকটি বড় সংকট হলো ব্যক্তিগত প্রচার ও পরিচিতি অর্জনের প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিতি, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তোলা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের প্রচারকে কেউ কেউ সাংবাদিকতার সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করছেন। অথচ সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য এসব নয়। একজন সাংবাদিকের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হওয়া উচিত তাঁর প্রকাশিত সংবাদ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, সত্যনিষ্ঠ অবস্থান এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে।

লন্ডনে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের নানা সমস্যা রয়েছে। অভিবাসন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, সামাজিক বৈষম্য, নতুন প্রজন্মের সংকট, কমিউনিটির অধিকার এবং বিভিন্ন সামাজিক অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার যথেষ্ট প্রয়োজন। এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সামনে আনার পরিবর্তে যদি সাংবাদিকতার বড় অংশ অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক প্রচার ও ব্যক্তিগত পরিচিতি অর্জনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হবে না।

এখানে এটিও মনে রাখা জরুরি যে, লন্ডনের সব অনলাইন সংবাদকর্মী কিংবা মোবাইল সাংবাদিককে একইভাবে বিচার করা যায় না। অনেকেই সীমিত সামর্থ্য নিয়ে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করছেন। তাঁদের অবদান প্রশংসার দাবিদার। সমালোচনার উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তিকে হেয় করা নয়; বরং সাংবাদিকতার নামে গড়ে ওঠা অনৈতিক ও অপেশাদার প্রবণতাগুলো চিহ্নিত করা এবং পেশাটিকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনা।

মাহি ফেরদৌস জলিলের বক্তব্য তাই ব্যক্তিগত বিরোধের দৃষ্টিতে না দেখে পেশাগত আত্মসমালোচনার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। সাংবাদিক সমাজের ভেতর থেকেই যদি অনিয়ম, অসংগতি ও নৈতিকতার প্রশ্নে আলোচনা শুরু হয়, তাহলে সেটি দুর্বলতা নয়; বরং একটি দায়িত্বশীল পেশার সুস্থতার লক্ষণ।

সাংবাদিকতার স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ এর জবাবদিহি। সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা ধরে রাখতে হলে সাংবাদিকদের নিজেদের আচরণেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যক্তিগত স্বার্থ, আর্থিক সুবিধা কিংবা সামাজিক পরিচিতির ঊর্ধ্বে উঠে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিক সংগঠনগুলোরও উচিত পেশাগত নীতিমালা, প্রশিক্ষণ, যোগ্যতার মূল্যায়ন এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখা।

লন্ডনের বাংলা সাংবাদিকতার রয়েছে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে অনেক সাংবাদিকের শ্রম, ত্যাগ, সততা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে। কিছু মানুষের অনৈতিক কিংবা অপেশাদার কর্মকাণ্ডের কারণে সেই অর্জিত মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হোক, তা কাম্য হতে পারে না।

এখন সময় এসেছে আত্মসমালোচনার। সাংবাদিকতার পরিচয়কে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং মানুষের অধিকার ও সত্য প্রকাশের দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পুরস্কারের মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে হবে, পেশাগত যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।

সাংবাদিকতা কোনো দাওয়াতনির্ভর পেশা নয়, অ্যাওয়ার্ড কেনাবেচার ব্যবসা নয়, কিংবা পরিচিতি অর্জনের সহজ মাধ্যমও নয়। সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল পেশা, যার মূল ভিত্তি সত্য, সততা, সাহস ও জবাবদিহি।

মাহি ফেরদৌস জলিলের বক্তব্য সেই সত্যগুলোকে নতুন করে সামনে এনেছে। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়ার পাশাপাশি আমরা মনে করি, এখন প্রয়োজন কথার চেয়ে কার্যকর উদ্যোগ। ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সাংবাদিকতার পেশাগত মর্যাদা রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

লন্ডনের বাংলা সাংবাদিকতা ফিরে পাক তার হারানো মর্যাদা, মানুষের আস্থা ও পেশাগত গৌরব। এটাই সময়ের দাবি।

খুঁজুন