ড. ফারহানা শারমিন
রোজেলী/মেস্তা (Hibiscus sabdariffa L.) এবং কেনাফ (Hibiscus cannabinus L.) মালভেসি (Malvaceae) পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য উদ্ভিদ। উভয় উদ্ভিদই দ্রুত বর্ধনশীল এবং উচ্চ ফলনশীল। সাধারণত কেনাফ আঁশ উৎপাদনের জন্য এবং রোজেলী খাদ্য, ঔষধি ও অন্যান্য বহুমুখী ব্যবহারের জন্য চাষ করা হলেও, এদের পাতা একটি সম্ভাবনাময় সবুজ খাদ্যসম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বাংলাদেশে মেস্তা ও কেনাফের আঁশ উৎপাদন নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা হলেও, পাতা- ভিত্তিক ফাংশনাল ফিড ইনগ্রিডিয়েন্ট হিসেবে পোল্ট্রি খাদ্যে ব্যবহারের বিষয়ে গবেষণা তুলনামূলকভাবে সীমিত। এসব পাতায় ক্রুড প্রোটিন, খনিজ পদার্থ, ভিটামিন, ফাইবার এবং বিভিন্ন জৈবসক্রিয় ফাইটোকেমিক্যাল বিদ্যমান থাকায় পোল্ট্রি খাদ্যে এগুলোর সম্ভাব্য ব্যবহার বৈজ্ঞানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
পোল্ট্রি খাদ্যে রোজেলী ও কেনাফ পাতার সম্ভাবনা
রোজেলী ও কেনাফ পাতায় বিদ্যমান ফেনোলিক কম্পাউন্ডস, ফ্ল্যাভোনয়েডস এবং অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ফাইটোকেমিক্যালস পোল্ট্রি পুষ্টিতে বিশেষ আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। এসব জৈবসক্রিয় যৌগ ফ্রি র্যাডিক্যাল স্ক্যাভেঞ্জিং -এর মাধ্যমে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। পোল্ট্রিতে অতিরিক্ত অক্সিডেটিভ স্ট্রেস রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস, উৎপাদন দক্ষতার অবনতি এবং মাংস ও ডিমের গুণগত মানের নেতিবাচক পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই উদ্ভিদজাত অ্যান্টিঅক্সিডেন্টকে খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা একটি সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক নিউট্রিশনাল স্ট্র্যাটেজি হতে পারে। তবে পোল্ট্রি খাদ্যে রোজেলী ও কেনাফ পাতার ব্যবহার নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু পুষ্টিমান নয়, পাতার ফাইবারের পরিমাণ, সেকেন্ডারি মেটাবোলাইটস এবং অ্যান্টি- নিউট্রিশনাল ফ্যাক্টরস- কেও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। অতিরিক্ত ডায়েটারি ফাইবার পুষ্টি উপাদানের হজম ও শোষণ কমিয়ে ফিড ইফিশিয়েন্সি- তে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সঠিক হার্ভেস্টিং স্টেজ, প্রসেসিং মেথড এবং ডায়েটারি ইনক্লুশন লেভেল নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পাতায় বিদ্যমান গুরুত্বপূর্ণ বায়োঅ্যাকটিভ ও অ্যান্টি-নিউট্রিশনাল কম্পোনেন্টস
১. ট্যানিন
ট্যানিন প্রোটিনের সঙ্গে জটিল যৌগ তৈরি করতে পারে। এর ফলে প্রোটিনের হজমযোগ্যতা এবং অ্যামাইনো অ্যাসিডের প্রাপ্যতা কমে যেতে পারে। তবে কম মাত্রার ট্যানিন সবসময় ক্ষতিকর নয়; নির্দিষ্ট মাত্রায় এটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসহ বিভিন্ন জৈবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই রোজেলী ও কেনাফ পাতায় ট্যানিনের প্রকৃত পরিমাণ এবং পোল্ট্রি খাদ্যে এর নিরাপদ ব্যবহারের মাত্রা নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ।
২. ফাইটেট বা ফাইটিক অ্যাসিড
ফাইটেট বিভিন্ন খনিজ পদার্থ, বিশেষ করে ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, আয়রন ও জিংক- এর সঙ্গে জটিল যৌগ তৈরি করতে পারে। ফলে এসব মিনারেল-এ বায়োপ্যাবাইলেবিলিটি কমে যেতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী ফাইটেজ এনজাইমের ব্যবহার অথবা উপযুক্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতির মাধ্যমে ফাইটেটের ক্ষতিকর প্রভাব কমানো সম্ভব।
৩. অক্সালেট
অক্সালেট ক্যালসিয়ামের সঙ্গে অদ্রবণীয় যৌগ তৈরি করতে পারে। এর ফলে ক্যালসিয়ামের ব্যবহারযোগ্যতা কমে যেতে পারে। তবে এর প্রকৃত পুষ্টিগত ঝুঁকি পাতায় বিদ্যমান অক্সালেটের পরিমাণ এবং পোল্ট্রি খাদ্যে ব্যবহৃত পাতার মাত্রার ওপর নির্ভর করে।
৪. স্যাপোনিন
স্যাপোনিনের বিভিন্ন বায়োলজিক্যাল কার্যকারিতা রয়েছে। নির্দিষ্ট মাত্রায় এটি কোলেস্টেরল মেটাবলিজম, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট অ্যাকটিভিটি এবং অ্যান্টি- মাইক্রোবিয়াল অ্যাকটিভিটিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে অতিরিক্ত পরিমাণে স্যাপোনিন খাদ্যের গ্রহণযোগ্যতা, হজম এবং পুষ্টি উপাদানের ব্যবহারযোগ্যতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
৫. ফেনলিক যৌগ ও ফ্ল্যাভোনয়েড
ফেনলিক যৌগ এবং ফ্ল্যাভোনয়েড গুরুত্বপূর্ণ Bioactive secondary metabolites. এগুলো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যক্রম প্রদর্শন করতে পারে এবং পোল্ট্রির অক্সিডেটিভ স্ট্রেস জনিত অবস্থা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং মাংসের গুণগত মানের ওপর সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে রোজেলী ও কেনাফ পাতাকে শুধু প্রচলিত সবুজ খাদ্য হিসেবে নয়, বরং সম্ভাব্য কার্যকরী খাদ্য উপাদান হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে।
বাংলাদেশে গবেষণা কার্যক্রম
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই)- এর ফাইবার কোয়ালিটি ইম্প্রুভমেন্ট বিভাগের পোস্ট হার্ভেস্ট প্রসেসিং শাখা, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)- এর সঙ্গে যৌথভাবে রোজেলী ও কেনাফ পাতার বায়োঅ্যাকটিভ কম্পোনেন্টস এবং পোল্ট্রি খাদ্যে এসব পাতার ব্যবহার নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করছে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে। গবেষণার আওতায় রোজেলী ও কেনাফের চাষ, পাতা উৎপাদন, নির্দিষ্ট বয়সে পাতা সংগ্রহ, শুকানো, সংরক্ষণ এবং পোল্ট্রি খাদ্যে ব্যবহারের উপযোগিতা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। গবেষণার বিভিন্ন পর্যায়ে পাতার নিউট্রিশনাল কম্পোজিশন এবং ফাইটোকেমিক্যাল প্রোফাইল বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। রোজেলী ও কেনাফের পরীক্ষামূলক চাষ করা হচ্ছে) পাটের কৃষি পরীক্ষা কেন্দ্র, মানিকগঞ্জ, পাট গবেষণা আঞ্চলিক কেন্দ্র, রংপুর এবং বিএলআরআই আঞ্চলিক কেন্দ্র, সৈয়দপুর । প্রায় ৬০ দিন বয়সে পাতা সংগ্রহ করে উপযুক্ত পদ্ধতিতে শুকানো ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে। পরবর্তীতে নির্দিষ্ট অনুপাতে পোল্ট্রি খাদ্যের সঙ্গে মিশিয়ে এর নিউট্রিশনাল ভ্যালু, ফিড ইউটিলাইজেশন এবং ফাংশনাল ইফেক্টস মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
পাতার পুষ্টিমান ও বায়োঅ্যাকটিভ প্রোফাইল নির্ণয়
খাদ্য উপাদান হিসেবে রোজেলী ও কেনাফ পাতার প্রকৃত সম্ভাবনা নির্ণয়ের জন্য নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ বিশ্লেষণ করা গুরুত্বপূর্ণ: ক্রড প্রোটিন, ক্রড ফাইবার, ইথার এক্সট্র্যাক্ট, এ্যাশ, মেটাবোলাইজেবল এনার্জি, অ্যামিনো অ্যাসিড প্রোফাইল, মিনারেল কম্পোজিশন, ফেনোলিক কম্পাউন্ডস, ফ্ল্যাভোনয়েডস এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট অ্যাক্টিভিটি। এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে পাতাগুলোর পুষ্টিমান এবং ফাংশনাল ফিড ইনগ্রিডিয়েন্ট (Functional feed ingredient) হিসেবে ব্যবহারযোগ্যতা সম্পর্কে একটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব হবে।
পোল্ট্রি গবেষণার কার্যকারিতা যাচাই
রোজেলী ও কেনাফ পাতার সম্ভাব্য কার্যকারিতা শুধু গ্রোথ পারফরম্যান্স- এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন ডায়েটারি ইনক্লুশন লেভেল-এ এসব পাতা ব্যবহারের ফলে পোল্ট্রির-
ফিড ইনটেক- বডি ওয়েট গেইন- এফ-সি-আর- নিউট্রিয়েন্ট ডাইজেস্টিবিলিটি- অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট স্ট্যাটাস- মিট কোয়ালিটি এর ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ে তা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। বিশেষ করে ব্রয়লার মুরগির ক্ষেত্রে মাংসের প্রক্সিমেট কম্পোজিশন, অ্যামিনো অ্যাসিড প্রোফাইল, ফ্যাটি অ্যাসিড প্রোফাইল, কোলেস্টেরল এবং লিপিড অক্সিডেশন বিশ্লেষণ করলে পাতায় উপস্থিত বায়োঅ্যাকটিভ কম্পাউন্ডস -এর সম্ভাব্য ফাংশনাল ইফেক্ট সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে বলে আমরা মনে করছি।
টেকসই পোল্ট্রি উৎপাদনে সম্ভাবনা
বাংলাদেশের দ্রুত সম্প্রসারিত পোল্ট্রি শিল্প প্রাণিজ প্রোটিনের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে পোল্ট্রি উৎপাদন ব্যয়ের একটি বড় অংশ ফিড- এর জন্য ব্যয় হয়। বিশেষ করে ভুট্টা ও সয়াবিন মিল- এর মতো প্রচলিত ফিড ইনগ্রিডিয়েন্টস -এর মূল্য ও সরবরাহের ওপর নির্ভরশীলতা পোল্ট্রি উৎপাদন ব্যয়কে প্রভাবিত করে। এই প্রেক্ষাপটে স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য, পুষ্টিকর, নিরাপদ এবং তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল উদ্ভিদজাত ফিড রিসোর্স অনুসন্ধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রোজেলী ও কেনাফ পাতা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হওয়ায় এগুলোকে মূল্য সংযোজনের (Value addition) মাধ্যমে পোল্ট্রি খাদ্যে ব্যবহার করা গেলে— (ক) প্রচলিত ফিড ইনগ্রিডিয়েন্টস- এর ওপর নির্ভরতা কমানো, (খ) ফিড কস্ট নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা, (গ) স্থানীয় কৃষি সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, (ঘ) অ্যাগ্রিকালচারাল বায়োমাস -এর ভ্যালু অ্যাডিশন, (ঙ) পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং (চ) কৃষি ও পোল্ট্রি খাতের মধ্যে কার্যকর সম্পদ সংযোগ তৈরি সম্ভব হতে পারে।
সার্কুলার বায়োইকোনমি-এর সঙ্গে সংযোগ
রোজেলী ও কেনাফ পাতার খাদ্যতালিকাগত ব্যবহার সার্কুলার বায়োইকোনমি ধারণার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। আঁশ উৎপাদনের পাশাপাশি পাতার মতো অবশিষ্ট বা কম ব্যবহৃত পাতাকে কে মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে ফাংশনাল ফিড ইনগ্রিডিয়েন্ট (functional feed ingredient)-এ রূপান্তর করা গেলে একই কৃষি সম্পদ থেকে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করা সম্ভব। অর্থাৎ, রোজেলী ও কেনাফ পাতা শুধু “ওয়েস্ট বায়োমাস” হিসেবে বিবেচিত না হয়ে সঠিক হার্ভেস্টিং স্টেজ, প্রসেসিং এবং ডায়েটারি ইনক্লুশন লেভেল -এর মাধ্যমে একটি মূল্যবান স্থানীয় ফিড রিসোর্স হিসেবে উন্নয়ন করা যেতে পারে।
বর্তমানে রোজেলী ও কেনাফ পাতার নিউট্রিশনাল কম্পোজিশন, ফাইটোকেমিক্যাল প্রোফাইল, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পটেনশিয়াল, ফিড ইউটিলাইজেশন এবং পোল্ট্রি পারফরম্যান্স- এর ওপর প্রভাব বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন ইনক্লুশন লেভেল- এ এসব পাতার নিরাপত্তা, পুষ্টিমান, কার্যকারিতা এবং অ্যান্টি-নিউট্রিশনাল ইফেক্টস নির্ধারণ করা গেলে বাংলাদেশে এগুলোকে স্থানীয় ও টেকসই ফাংশনাল ফিড রিসোর্স হিসেবে ব্যবহারের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব হবে। সঠিক হার্ভেস্টিং স্টেজ, প্রসেসিং টেকনোলজি এবং ডায়েটারি ইনক্লুশন লেভেল -নিশ্চিত করা গেলে রোজেলী ও কেনাফ পাতা পোল্ট্রি পুষ্টিতে একটি স্থানীয়, পুষ্টিসমৃদ্ধ, বায়োঅ্যাকটিভ এবং সাসটেইনেবল অল্টারনেটিভ ফিড রিসোর্স হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এটি পোল্ট্রি উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কৃষিজ বায়োমাসের মূল্য সংযোজন এবং পরিবেশবান্ধব সার্কুলার প্রোডাকশন সিস্টেম গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে।
লেখক : উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পোস্ট হার্ভেস্ট প্রসেসিং শাখা, ফাইবার কোয়ালিটি ইম্পুভমেন্ট বিভাগ, বিজেআরআই
পোল্ট্রি খাদ্যে রোজেলী ও কেনাফ পাতার সম্ভাবনা ও ব্যবহার
পোল্ট্রি খাদ্যে রোজেলী ও কেনাফ পাতার সম্ভাবনা ও ব্যবহার
ড. ফারহানা শারমিন রোজেলী/মেস্তা (Hibiscus sabdariffa L.) এবং কেনাফ (Hibiscus cannabinus L.) মালভেসি (Malvaceae) পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য উদ্ভিদ। উভয় উদ্ভিদই দ্রুত বর্ধনশীল এবং উচ্চ ফলনশীল। সাধারণত কেনাফ আঁশ উৎপাদনের জন্য এবং রোজেলী খাদ্য, ঔষধি ও অন্যান্য বহুমুখী ব্যবহারের জন্য চাষ করা হলেও, এদের পাতা একটি সম্ভাবনাময় সবুজ খাদ্যসম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।বাংলাদেশে মেস্তা ও কেনাফের আঁশ উৎপাদন নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা হলেও, পাতা- ভিত্তিক ফাংশনাল ফিড ইনগ্রিডিয়েন্ট হিসেবে পোল্ট্রি খাদ্যে ব্যবহারের বিষয়ে গবেষণা তুলনামূলকভাবে সীমিত। এসব পাতায় ক্রুড প্রোটিন, খনিজ পদার্থ, ভিটামিন, ফাইবার এবং বিভিন্ন জৈবসক্রিয় ফাইটোকেমিক্যাল বিদ্যমান থাকায় পোল্ট্রি খাদ্যে এগুলোর সম্ভাব্য ব্যবহার বৈজ্ঞানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পোল্ট্রি খাদ্যে রোজেলী ও কেনাফ পাতার সম্ভাবনারোজেলী ও কেনাফ পাতায় বিদ্যমান ফেনোলিক কম্পাউন্ডস, ফ্ল্যাভোনয়েডস এবং অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ফাইটোকেমিক্যালস পোল্ট্রি পুষ্টিতে বিশেষ আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। এসব জৈবসক্রিয় যৌগ ফ্রি র্যাডিক্যাল স্ক্যাভেঞ্জিং -এর মাধ্যমে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। পোল্ট্রিতে অতিরিক্ত অক্সিডেটিভ স্ট্রেস রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস, উৎপাদন দক্ষতার অবনতি এবং মাংস ও ডিমের গুণগত মানের নেতিবাচক পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই উদ্ভিদজাত অ্যান্টিঅক্সিডেন্টকে খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা একটি সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক নিউট্রিশনাল স্ট্র্যাটেজি হতে পারে। তবে পোল্ট্রি খাদ্যে রোজেলী ও কেনাফ পাতার ব্যবহার নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু পুষ্টিমান নয়, পাতার ফাইবারের পরিমাণ, সেকেন্ডারি মেটাবোলাইটস এবং অ্যান্টি- নিউট্রিশনাল ফ্যাক্টরস- কেও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। অতিরিক্ত ডায়েটারি ফাইবার পুষ্টি উপাদানের হজম ও শোষণ কমিয়ে ফিড ইফিশিয়েন্সি- তে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সঠিক হার্ভেস্টিং স্টেজ, প্রসেসিং মেথড এবং ডায়েটারি ইনক্লুশন লেভেল নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাতায় বিদ্যমান গুরুত্বপূর্ণ বায়োঅ্যাকটিভ ও অ্যান্টি-নিউট্রিশনাল কম্পোনেন্টস ১. ট্যানিনট্যানিন প্রোটিনের সঙ্গে জটিল যৌগ তৈরি করতে পারে। এর ফলে প্রোটিনের হজমযোগ্যতা এবং অ্যামাইনো অ্যাসিডের প্রাপ্যতা কমে যেতে পারে। তবে কম মাত্রার ট্যানিন সবসময় ক্ষতিকর নয়; নির্দিষ্ট মাত্রায় এটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসহ বিভিন্ন জৈবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই রোজেলী ও কেনাফ পাতায় ট্যানিনের প্রকৃত পরিমাণ এবং পোল্ট্রি খাদ্যে এর নিরাপদ ব্যবহারের মাত্রা নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ। ২. ফাইটেট বা ফাইটিক অ্যাসিডফাইটেট বিভিন্ন খনিজ পদার্থ, বিশেষ করে ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, আয়রন ও জিংক- এর সঙ্গে জটিল যৌগ তৈরি করতে পারে। ফলে এসব মিনারেল-এ বায়োপ্যাবাইলেবিলিটি কমে যেতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী ফাইটেজ এনজাইমের ব্যবহার অথবা উপযুক্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতির মাধ্যমে ফাইটেটের ক্ষতিকর প্রভাব কমানো সম্ভব। ৩. অক্সালেটঅক্সালেট ক্যালসিয়ামের সঙ্গে অদ্রবণীয় যৌগ তৈরি করতে পারে। এর ফলে ক্যালসিয়ামের ব্যবহারযোগ্যতা কমে যেতে পারে। তবে এর প্রকৃত পুষ্টিগত ঝুঁকি পাতায় বিদ্যমান অক্সালেটের পরিমাণ এবং পোল্ট্রি খাদ্যে ব্যবহৃত পাতার মাত্রার ওপর নির্ভর
করে। ৪. স্যাপোনিনস্যাপোনিনের বিভিন্ন বায়োলজিক্যাল কার্যকারিতা রয়েছে। নির্দিষ্ট মাত্রায় এটি কোলেস্টেরল মেটাবলিজম, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট অ্যাকটিভিটি এবং অ্যান্টি- মাইক্রোবিয়াল অ্যাকটিভিটিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে অতিরিক্ত পরিমাণে স্যাপোনিন খাদ্যের গ্রহণযোগ্যতা, হজম এবং পুষ্টি উপাদানের ব্যবহারযোগ্যতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ৫. ফেনলিক যৌগ ও ফ্ল্যাভোনয়েডফেনলিক যৌগ এবং ফ্ল্যাভোনয়েড গুরুত্বপূর্ণ Bioactive secondary metabolites. এগুলো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যক্রম প্রদর্শন করতে পারে এবং পোল্ট্রির অক্সিডেটিভ স্ট্রেস জনিত অবস্থা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং মাংসের গুণগত মানের ওপর সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে রোজেলী ও কেনাফ পাতাকে শুধু প্রচলিত সবুজ খাদ্য হিসেবে নয়, বরং সম্ভাব্য কার্যকরী খাদ্য উপাদান হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে। বাংলাদেশে গবেষণা কার্যক্রমবাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই)- এর ফাইবার কোয়ালিটি ইম্প্রুভমেন্ট বিভাগের পোস্ট হার্ভেস্ট প্রসেসিং শাখা, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)- এর সঙ্গে যৌথভাবে রোজেলী ও কেনাফ পাতার বায়োঅ্যাকটিভ কম্পোনেন্টস এবং পোল্ট্রি খাদ্যে এসব পাতার ব্যবহার নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করছে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে। গবেষণার আওতায় রোজেলী ও কেনাফের চাষ, পাতা উৎপাদন, নির্দিষ্ট বয়সে পাতা সংগ্রহ, শুকানো, সংরক্ষণ এবং পোল্ট্রি খাদ্যে ব্যবহারের উপযোগিতা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। গবেষণার বিভিন্ন পর্যায়ে পাতার নিউট্রিশনাল কম্পোজিশন এবং ফাইটোকেমিক্যাল প্রোফাইল বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। রোজেলী ও কেনাফের পরীক্ষামূলক চাষ করা হচ্ছে) পাটের কৃষি পরীক্ষা কেন্দ্র, মানিকগঞ্জ, পাট গবেষণা আঞ্চলিক কেন্দ্র, রংপুর এবং বিএলআরআই আঞ্চলিক কেন্দ্র, সৈয়দপুর । প্রায় ৬০ দিন বয়সে পাতা সংগ্রহ করে উপযুক্ত পদ্ধতিতে শুকানো ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে। পরবর্তীতে নির্দিষ্ট অনুপাতে পোল্ট্রি খাদ্যের সঙ্গে মিশিয়ে এর নিউট্রিশনাল ভ্যালু, ফিড ইউটিলাইজেশন এবং ফাংশনাল ইফেক্টস মূল্যায়ন করা হচ্ছে। পাতার পুষ্টিমান ও বায়োঅ্যাকটিভ প্রোফাইল নির্ণয়খাদ্য উপাদান হিসেবে রোজেলী ও কেনাফ পাতার প্রকৃত সম্ভাবনা নির্ণয়ের জন্য নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ বিশ্লেষণ করা গুরুত্বপূর্ণ: ক্রড প্রোটিন, ক্রড ফাইবার, ইথার এক্সট্র্যাক্ট, এ্যাশ, মেটাবোলাইজেবল এনার্জি, অ্যামিনো অ্যাসিড প্রোফাইল, মিনারেল কম্পোজিশন, ফেনোলিক কম্পাউন্ডস, ফ্ল্যাভোনয়েডস এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট অ্যাক্টিভিটি। এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে পাতাগুলোর পুষ্টিমান এবং ফাংশনাল ফিড ইনগ্রিডিয়েন্ট (Functional feed ingredient) হিসেবে ব্যবহারযোগ্যতা সম্পর্কে একটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব হবে। পোল্ট্রি গবেষণার কার্যকারিতা যাচাইরোজেলী ও কেনাফ পাতার সম্ভাব্য কার্যকারিতা শুধু গ্রোথ পারফরম্যান্স- এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন ডায়েটারি ইনক্লুশন লেভেল-এ এসব পাতা ব্যবহারের ফলে পোল্ট্রির-ফিড ইনটেক- বডি ওয়েট গেইন- এফ-সি-আর- নিউট্রিয়েন্ট ডাইজেস্টিবিলিটি- অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট স্ট্যাটাস- মিট কোয়ালিটি এর ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ে তা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। বিশেষ করে ব্রয়লার মুরগির ক্ষেত্রে মাংসের প্রক্সিমেট কম্পোজিশন, অ্যামিনো অ্যাসিড প্রোফাইল, ফ্যাটি অ্যাসিড প্রোফাইল, কোলেস্টেরল এবং লিপিড অক্সিডেশন বিশ্লেষণ করলে পাতায় উপস্থিত বায়োঅ্যাকটিভ কম্পাউন্ডস
-এর সম্ভাব্য ফাংশনাল ইফেক্ট সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে বলে আমরা মনে করছি। টেকসই পোল্ট্রি উৎপাদনে সম্ভাবনাবাংলাদেশের দ্রুত সম্প্রসারিত পোল্ট্রি শিল্প প্রাণিজ প্রোটিনের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে পোল্ট্রি উৎপাদন ব্যয়ের একটি বড় অংশ ফিড- এর জন্য ব্যয় হয়। বিশেষ করে ভুট্টা ও সয়াবিন মিল- এর মতো প্রচলিত ফিড ইনগ্রিডিয়েন্টস -এর মূল্য ও সরবরাহের ওপর নির্ভরশীলতা পোল্ট্রি উৎপাদন ব্যয়কে প্রভাবিত করে। এই প্রেক্ষাপটে স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য, পুষ্টিকর, নিরাপদ এবং তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল উদ্ভিদজাত ফিড রিসোর্স অনুসন্ধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।রোজেলী ও কেনাফ পাতা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হওয়ায় এগুলোকে মূল্য সংযোজনের (Value addition) মাধ্যমে পোল্ট্রি খাদ্যে ব্যবহার করা গেলে— (ক) প্রচলিত ফিড ইনগ্রিডিয়েন্টস- এর ওপর নির্ভরতা কমানো, (খ) ফিড কস্ট নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা, (গ) স্থানীয় কৃষি সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, (ঘ) অ্যাগ্রিকালচারাল বায়োমাস -এর ভ্যালু অ্যাডিশন, (ঙ) পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং (চ) কৃষি ও পোল্ট্রি খাতের মধ্যে কার্যকর সম্পদ সংযোগ তৈরি সম্ভব হতে পারে। সার্কুলার বায়োইকোনমি-এর সঙ্গে সংযোগরোজেলী ও কেনাফ পাতার খাদ্যতালিকাগত ব্যবহার সার্কুলার বায়োইকোনমি ধারণার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। আঁশ উৎপাদনের পাশাপাশি পাতার মতো অবশিষ্ট বা কম ব্যবহৃত পাতাকে কে মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে ফাংশনাল ফিড ইনগ্রিডিয়েন্ট (functional feed ingredient)-এ রূপান্তর করা গেলে একই কৃষি সম্পদ থেকে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করা সম্ভব। অর্থাৎ, রোজেলী ও কেনাফ পাতা শুধু “ওয়েস্ট বায়োমাস” হিসেবে বিবেচিত না হয়ে সঠিক হার্ভেস্টিং স্টেজ, প্রসেসিং এবং ডায়েটারি ইনক্লুশন লেভেল -এর মাধ্যমে একটি মূল্যবান স্থানীয় ফিড রিসোর্স হিসেবে উন্নয়ন করা যেতে পারে।বর্তমানে রোজেলী ও কেনাফ পাতার নিউট্রিশনাল কম্পোজিশন, ফাইটোকেমিক্যাল প্রোফাইল, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পটেনশিয়াল, ফিড ইউটিলাইজেশন এবং পোল্ট্রি পারফরম্যান্স- এর ওপর প্রভাব বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন ইনক্লুশন লেভেল- এ এসব পাতার নিরাপত্তা, পুষ্টিমান, কার্যকারিতা এবং অ্যান্টি-নিউট্রিশনাল ইফেক্টস নির্ধারণ করা গেলে বাংলাদেশে এগুলোকে স্থানীয় ও টেকসই ফাংশনাল ফিড রিসোর্স হিসেবে ব্যবহারের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব হবে। সঠিক হার্ভেস্টিং স্টেজ, প্রসেসিং টেকনোলজি এবং ডায়েটারি ইনক্লুশন লেভেল -নিশ্চিত করা গেলে রোজেলী ও কেনাফ পাতা পোল্ট্রি পুষ্টিতে একটি স্থানীয়, পুষ্টিসমৃদ্ধ, বায়োঅ্যাকটিভ এবং সাসটেইনেবল অল্টারনেটিভ ফিড রিসোর্স হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এটি পোল্ট্রি উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কৃষিজ বায়োমাসের মূল্য সংযোজন এবং পরিবেশবান্ধব সার্কুলার প্রোডাকশন সিস্টেম গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে। লেখক : উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পোস্ট হার্ভেস্ট প্রসেসিং শাখা, ফাইবার কোয়ালিটি ইম্পুভমেন্ট বিভাগ, বিজেআরআই
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
রওশন টাওয়ার, (লিফট-৮) ১৫২/২/এ২ গ্রীণ রোড ,
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ ।
মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত