শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত শেকড়ের টানে জন্মভূমিতে: ডা. মোঃ জাকির সরকার

শেকড়ের টানে জন্মভূমিতে: ডা. মোঃ জাকির সরকার

শহরে প্রতিষ্ঠিত হওয়া কঠিন। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও নিজের শেকড়, জন্মভূমি ও গ্রামের মানুষকে মনে রাখা—এটি আরও বড় মানবিকতার পরিচয়।

ডা. মোঃ জাকির সরকার সেই মানুষদের একজন, যিনি পেশাগত জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েও নিজের জন্মভূমি ছোট রায়পাড়াকে ভুলে যাননি।

তিনি বক্ষব্যাধি হাসপাতালের সাবেক রেসপিরেটরি মেডিসিনের অধ্যাপক। বর্তমানে ল্যাবএইড, বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতাল ও ইউনিভার্সেল  হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

আশির দশকে নদীভাঙনে তাঁর বাপ-দাদার ভিটেমাটিসহ ছোট রায়পাড়া গ্রামের প্রায় পুরোটাই বিলীন হয়ে যায়। বাবা-মা আজ বেঁচে নেই, ভাইবোনেরাও সবাই শহরে প্রতিষ্ঠিত। তবুও অবসরে যাওয়ার আগেই নতুন করে গড়ে ওঠা গ্রামের মাঝামাঝি স্থানে তিনি নিজের বাসভবন তৈরি করেছেন।

সেখানে তিনি প্রায় প্রতি শুক্রবার যান। গ্রামের অসুস্থ মানুষের কথা মমতায় শোনেন, রোগী দেখেন এবং চিকিৎসা পরামর্শ দেন। তাঁর পেশাসংশ্লিষ্ট চিকিৎসক সংগঠনের নেতৃত্ব দেওয়ার সুবাদে বছরে একাধিকবার শত শত চিকিৎসকও এই গ্রামে আসেন।

আজ তাঁর নিজ বাসভবনে চিকিৎসক, মেডিকেল শিক্ষার্থী ও নার্সসহ দুই শতাধিক মানুষের অংশগ্রহণে বিশ্ব ফুসফুস দিবস ২০২৬ উদযাপিত হয়েছে। এ উপলক্ষে ‘Pulmonary Interventions in Bangladesh’ শীর্ষক একটি বৈজ্ঞানিক সেমিনারের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ ইন্টারভেনশনাল পালমোনোলজি, ক্রিটিক্যাল কেয়ার অ্যান্ড স্লিপ সোসাইটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডা. জাকির সরকার সেমিনারে চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন।

গ্রামের মাদ্রাসার সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। গত বছর বার্ষিক মাহফিলে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

এলাকার অনেকেই ঢাকায় তাঁর চেম্বারে যান। তাঁদের অনেককে তিনি রোগী হিসেবে নয়, আপনজনের মতো গ্রহণ করেন; অনেকের কাছ থেকে পরামর্শ ফিও নেন না।

সম্পর্কে তিনি আমার মামা।

২০২০ সালে কোভিডে আক্রান্ত হয়ে আমি এক মাসেরও বেশি সময় হাসপাতালে তাঁর তত্ত্বাবধানে ছিলাম। সে সময় তাঁর চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি মানবকল্যাণ নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনাও কাছ থেকে দেখেছি। আনন্দের বিষয়, সেসব ভাবনার অনেকগুলোরই বাস্তবায়ন এখন হচ্ছে।

গত জুলাই মাসে তাঁর চেম্বারে গিয়ে দরজার পাশে একটি বইয়ের প্রচ্ছদ দেখে থমকে গেলাম—‘কাশ্মীরি মেয়ে’।
এত ব্যস্ত চিকিৎসাজীবনের মধ্যেও তিনি বই লিখেছেন!
মামা আমাকে একটি কপি উপহার দিলেন। চেম্বার থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠেই ‘কাশ্মীরি মেয়ে’ গল্পটি দিয়ে পড়া শুরু করলাম। গল্প শেষ হওয়ার আগেই কখন যে চোখের কোণে নোনা জল জমে গেল, টের পাইনি।

সবকটি গল্প একনাগাড়ে পড়ে শেষ করলাম। গল্পগুলো এতটাই হৃদয়স্পর্শী যে মনে হচ্ছিল, চরিত্রগুলো যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠছে। বইটির ১৮৮ কবিতার মধ্য থেকেও বেশ কিছু পড়লাম।

তাঁর গল্প ও কবিতায় আছে ভালোবাসা, চিকিৎসকজীবনের অভিজ্ঞতা, মানুষের সুখ-দুঃখ এবং গ্রামের প্রতি গভীর মমতা।

আমরা যারা শহরে কিংবা বিদেশে প্রতিষ্ঠিত, আমাদের অধিকাংশেরই শিকড় কোনো না কোনো গ্রামের মাটিতে। কিন্তু জীবনের ব্যস্ততায় অনেকেই সেই শেকড় ভুলে যাই।
ডা. জাকির মামা তা ভুলে যাননি।

তাঁর গ্রামে ফিরে আসা, মানুষের পাশে দাঁড়ানো, চিকিৎসাসেবা দেওয়া এবং শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা—সব মিলিয়ে ছোট রায়পাড়া ও আশপাশের মানুষ তাঁর এই সম্পৃক্ততায় উপকৃত হচ্ছেন।

তাঁকে আন্তরিক অভিনন্দন। মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি—মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও সেবার উত্তম প্রতিদান যেন তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে লাভ করেন।

আমাদের প্রতিও একটি ছোট্ট আহ্বান—
আমরা যারা শহরে কিংবা বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি, তারা যেন নিজের গ্রাম ও গ্রামের মানুষকে ভুলে না যাই। বড় কিছু না পারলেও নিজের সামর্থ্য, অভিজ্ঞতা ও সামান্য সময় জন্মভূমির মানুষের জন্য ব্যয় করতে পারি।

শহরে আমাদের ঠিকানা হতে পারে, কিন্তু শেকড়ের ঠিকানা থেকে যায় গ্রামের মাটিতেই।

খুঁজুন