৭ নভেম্বর। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই তারিখটা অনেকের কাছেই বিতর্কের, আবার অনেকের কাছে শোকের। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকা সেনানিবাসে যাঁরা প্রাণ হারান, তাঁদের একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু তাহের মোহাম্মদ হায়দার। সবাই তাঁকে চেনেন এ টি এম হায়দার নামে। একাত্তরে তিনি ছিলেন ২ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার। যুদ্ধের পর পেয়েছিলেন বীর উত্তম খেতাব।
হায়দারের জন্ম ১৯৪২ সালের ১২ জানুয়ারি, কলকাতার ভবানীপুরে। পৈতৃক নিবাস কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের কান্দাইল গ্রামে। বাড়িতে সবাই ডাকত মুকতু নামে। পাবনার বীণাপানি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর পড়াশোনা শুরু। পরে কিশোরগঞ্জের রামানন্দ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৫৮ সালে এসএসসি পাস করেন।
এরপর তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সাধারণ পদাতিক অফিসার হিসেবে নয়, তিনি ছিলেন স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপের (এসএসজি) প্রশিক্ষিত কমান্ডো ও প্যারাট্রুপার। ১৯৭০ সালের শেষ দিকে বা তার কিছু আগে তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসের ৩ কমান্ডো ব্যাটালিয়নে ক্যাপ্টেন হিসেবে কাজ করছিলেন।
এই প্রশিক্ষণের কথাটা মনে রাখা দরকার। কারণ একাত্তরে গেরিলাযুদ্ধে তাঁর দক্ষতার বড় একটা ভিত্তি ছিল এই কমান্ডো প্রশিক্ষণ।
১৯৭১ সালের মার্চে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হচ্ছিল। হায়দার তখন ঢাকায়। সুযোগ পেয়ে ২০ মার্চ তিনি ঢাকা সেনানিবাস থেকে কুমিল্লা সেনানিবাসে চলে যান। কুমিল্লায় তখন ৪ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর খালেদ মোশাররফ বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ২৬-২৭ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসের পতন হলে হায়দার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বেরিয়ে আসেন। মতিনগর হয়ে ভারতের আগরতলায় পৌঁছান।
সীমান্ত পেরোনোর আগে বা পরে তিনি বসে থাকেননি। জানা যায়, নিজের হাতে বিস্ফোরক দিয়ে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের একটি সেতু এবং মুসল্লি সেতু উড়িয়ে দেন। উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানি সেনাদের চলাচল আটকে দেওয়া। একজন অফিসার নিজে বিস্ফোরক নিয়ে সেতু ওড়াচ্ছেন, এটা তখনকার পরিস্থিতির একটা ছবি। কাগজে-কলমে কোনো কাঠামো তৈরি হওয়ার আগেই যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল, আর অফিসারদের অনেক কাজ নিজের হাতেই করতে হচ্ছিল।
এপ্রিলের শুরুতে তেলিয়াপাড়ায় কর্নেল এম এ জি ওসমানীর নেতৃত্বে এক বৈঠকে পূর্বাঞ্চলকে কয়েকটি সেক্টরে ভাগ করা হয়। ২ নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব পান খালেদ মোশাররফ। এর আওতায় ছিল কুমিল্লা, ঢাকা, ফরিদপুর ও নোয়াখালীর একাংশ। সেক্টরের সদর দপ্তর বসে ত্রিপুরার মেলাঘরে।
হায়দার সেখানে খালেদ মোশাররফের সহ-অধিনায়ক হিসেবে যোগ দেন। সেক্টরে তখন দুই ধরনের লোক এসে জড়ো হচ্ছিল। একদিকে ছিল বাঙালি সেনা ও ইপিআরের সদস্যরা। অন্যদিকে ছিল হাজার হাজার ছাত্র-যুবক, যাদের সামরিক প্রশিক্ষণ বলতে প্রায় কিছুই ছিল না। হায়দার প্রথমে একটি স্টুডেন্ট কোম্পানি গঠন করেন। তাঁর ইউনিটের বড় অংশই ছিল ছাত্র, আর এদের তিনি গেরিলাযুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিতেন।
১৯৭১ সালের জুনে খালেদ মোশাররফ ও হায়দার মিলে গড়ে তোলেন ক্র্যাক প্ল্যাটুন, একটি বিশেষ কমান্ডো দল। এর কাজ ছিল ঢাকা ও তার আশপাশে এমন অপারেশন চালানো, যাতে পাকিস্তানি বাহিনী সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, টঙ্গী, কুমিল্লা, এই এলাকাগুলোয় গেরিলাদের আক্রমণের পরিকল্পনায় হায়দারের ভূমিকা ছিল।
খালেদ মোশাররফ যুদ্ধে আহত হলেন। অক্টোবরে তাঁর নেতৃত্বে কে ফোর্স গঠিত হলে হায়দার ২ নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব নেন। তারিখ নিয়ে সূত্রে সামান্য ভিন্নতা আছে। কোথাও লেখা ২২ সেপ্টেম্বর, কোথাও ৭ অক্টোবর। তবে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনিই ছিলেন সেক্টর কমান্ডার, এ নিয়ে মতভেদ নেই।
এখানে একটা বিষয় খেয়াল করার মতো। একজন সেক্টর কমান্ডারের কাজ শুধু সামনে থেকে লড়াই করা নয়। তাঁকে রসদ, প্রশিক্ষণ, গেরিলাদের ঢাকায় ঢোকানো, তথ্য সংগ্রহ, সবকিছু সামলাতে হয়। ২ নম্বর সেক্টরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ঢাকার কাছাকাছি থাকা। রাজধানী ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর মূল ঘাঁটি। সেখানে গেরিলা অপারেশন মানে ঝুঁকিও বেশি, আবার রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও বেশি। কয়েকটা ছোট আক্রমণও ঢাকার মানুষকে বুঝিয়ে দিত, যুদ্ধ চলছে এবং পাকিস্তানি বাহিনী পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেই।
ডিসেম্বরে যুদ্ধের চরিত্র বদলে যায়। গেরিলাযুদ্ধ থেকে সামনের দিকে সম্মুখযুদ্ধের পর্যায়ে ঢুকে পড়ে। এই বদলের সময়ে হায়দারের মতো একজন অফিসার, যিনি কমান্ডো হিসেবে গেরিলা কৌশলও জানতেন, আবার নিয়মিত সেনা কাঠামোও বুঝতেন, সেক্টরের জন্য বেশ কাজের ছিলেন।
বিজয়ের দিনে হায়দারের নামটা ইতিহাসে ঢুকে গেছে আরেকটা কারণে। সেদিন রেসকোর্স ময়দানে (এখনকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বাহিনীর উপপ্রধান এ কে খন্দকারের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন মাত্র একজন সেক্টর কমান্ডার, মেজর এ টি এম হায়দার। ওই দিন তিনি ঢাকা বেতার ও টেলিভিশন থেকে একটি কথিকাও পাঠ করেন। শুরুটা ছিল এরকম: "আমি মেজর হায়দার বলছি, মুক্তিবাহিনীর প্রতি নির্দেশ…"।
আত্মসমর্পণের সময় পাকিস্তানি জেনারেলদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও তাঁর ভূমিকা ছিল বলে জানা যায়। যাঁরা মাসের পর মাস এই বাহিনীর সঙ্গে লড়েছেন, তাঁদের পক্ষে এই দায়িত্ব সহজ ছিল না। এখানে একজন সৈনিকের পেশাদার শৃঙ্খলার একটা দিক চোখে পড়ে।
যুদ্ধের পর ১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর সরকার তাঁকে বীর উত্তম খেতাব দেয়। তিনি সেনাবাহিনীতেই থেকে যান। কুমিল্লা সেনানিবাসে ১৩ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৪ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে উন্নীত হয়ে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ৮ম বেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসার হন।
নতুন দেশের সেনাবাহিনী তখনো গড়ে উঠছিল। মুক্তিযুদ্ধ-ফেরত অফিসার, পাকিস্তান-প্রত্যাগত অফিসার, আর নতুন ব্যাচ, সবাইকে নিয়ে এক কাঠামো দাঁড়াতে সময় লাগছিল। এই টানাপোড়েনের কথা মাথায় না রাখলে ১৯৭৫-এর ঘটনা বোঝা কঠিন।
১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীর ভেতরে অস্থিরতা বাড়তে থাকে। ৩ নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ একটি অভ্যুত্থান ঘটান। হায়দার তখন ঢাকায় ছিলেন পারিবারিক কারণে, সঙ্গে ছিলেন তাঁর ব্যাটম্যান নায়েক শামসুল হক। জানা যায়, তাঁর বোন সিতারা বেগম বীর প্রতীকের বক্তব্য অনুযায়ী, জেনারেল ওসমানী আগে হায়দারকে বলেছিলেন খালেদ মোশাররফের সঙ্গে মিলে জেনারেল জিয়ার কাছে যেতে। কিন্তু ঘটনার গতি অন্যদিকে মোড় নেয়।
৬ নভেম্বর রাত থেকে ৭ নভেম্বরের ভোরের মধ্যে পাল্টা অভ্যুত্থান শুরু হয়। এর নেতৃত্বে ছিলেন কর্নেল আবু তাহের ও তাঁর বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা। সেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে কয়েকজন সেনা সদস্যের হাতে খালেদ মোশাররফ, কর্নেল নাজমুল হুদা ও এ টি এম হায়দার নিহত হন। হায়দারের বয়স তখন ৩৩। তাঁকে কিশোরগঞ্জে নিজের গ্রামে দাফন করা হয়।
একাত্তরে যে মানুষটাকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী স্পর্শ করতে পারেনি, স্বাধীন দেশের সৈনিকদের হাতেই তাঁর প্রাণ গেল। এটা শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়। এটা বলে দেয়, স্বাধীনতার চার বছর না যেতেই সেনাবাহিনীর ভেতরে রাজনীতির প্রভাব কতটা গভীরে ঢুকে গিয়েছিল।
এখানে হায়দারের ভূমিকা নিয়ে সাবধানে বলা দরকার। তিনি ৩ নভেম্বরের উদ্যোগে খালেদ মোশাররফের পাশে ছিলেন, এটা সূত্রে পাওয়া যায়। তবে ওই সময়ের ঘটনাগুলো নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে, কে কী উদ্দেশ্যে কী করেছিলেন তা নিয়ে ব্যাখ্যাও ভিন্ন। আরেকটা ছোট অসঙ্গতিও আছে। কোনো কোনো লেখায় বলা হয়েছে ৬ নভেম্বর রাতে তাঁকে হত্যা করা হয়, আবার বেশির ভাগ সূত্রে ৭ নভেম্বরের ভোর। ঘটনার রাতটাই যে বিশৃঙ্খলায় ভরা ছিল, এই ভিন্নতা তারই ছাপ।
২০২৩ সালের মে মাসে খালেদ মোশাররফ, নাজমুল হুদা ও হায়দারের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছিল বলেও জানা যায়।
এ টি এম হায়দারকে মনে রাখার কারণ শুধু খেতাব নয়। তিনি ছিলেন সেই প্রজন্মের সৈনিক, যাঁরা এক রাতে বুঝে ফেলেছিলেন, নিজের বাহিনীর বিরুদ্ধেই দাঁড়াতে হবে। তাঁরা সেটা করেছিলেন ছাত্র, কৃষক, শ্রমিকদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে, নিজেরা প্রশিক্ষক হয়ে। ২ নম্বর সেক্টরের গেরিলারা ঢাকার ভেতরে যে চাপ তৈরি করেছিল, তার পেছনে তাঁর পরিকল্পনা ছিল।
তাঁর জীবনের দুটো প্রান্ত পাশাপাশি রাখলে একটা প্রশ্ন ওঠে। একাত্তরে যে সামরিক শৃঙ্খলা একটা দেশ স্বাধীন করতে সাহায্য করেছিল, স্বাধীনতার পর সেই শৃঙ্খলা কেন ভেঙে পড়ল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে এ টি এম হায়দারের মতো মানুষদের জীবনই ভালো সুত্র।
কর্নেল আবু তাহের ইতিহাসের মহানায়ক
কর্নেল আবু তাহের ইতিহাসের মহানায়ক
৭ নভেম্বর। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই তারিখটা অনেকের কাছেই বিতর্কের, আবার অনেকের কাছে শোকের। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকা সেনানিবাসে যাঁরা প্রাণ হারান, তাঁদের একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু তাহের মোহাম্মদ হায়দার। সবাই তাঁকে চেনেন এ টি এম হায়দার নামে। একাত্তরে তিনি ছিলেন ২ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার। যুদ্ধের পর পেয়েছিলেন বীর উত্তম খেতাব। হায়দারের জন্ম ১৯৪২ সালের ১২ জানুয়ারি, কলকাতার ভবানীপুরে। পৈতৃক নিবাস কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের কান্দাইল গ্রামে। বাড়িতে সবাই ডাকত মুকতু নামে। পাবনার বীণাপানি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর পড়াশোনা শুরু। পরে কিশোরগঞ্জের রামানন্দ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৫৮ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সাধারণ পদাতিক অফিসার হিসেবে নয়, তিনি ছিলেন স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপের (এসএসজি) প্রশিক্ষিত কমান্ডো ও প্যারাট্রুপার। ১৯৭০ সালের শেষ দিকে বা তার কিছু আগে তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসের ৩ কমান্ডো ব্যাটালিয়নে ক্যাপ্টেন হিসেবে কাজ করছিলেন। এই প্রশিক্ষণের কথাটা মনে রাখা দরকার। কারণ একাত্তরে গেরিলাযুদ্ধে তাঁর দক্ষতার বড় একটা ভিত্তি ছিল এই কমান্ডো প্রশিক্ষণ। ১৯৭১ সালের মার্চে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হচ্ছিল। হায়দার তখন ঢাকায়। সুযোগ পেয়ে ২০ মার্চ তিনি ঢাকা সেনানিবাস থেকে কুমিল্লা সেনানিবাসে চলে যান। কুমিল্লায় তখন ৪ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর খালেদ মোশাররফ বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ২৬-২৭ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসের পতন হলে হায়দার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বেরিয়ে আসেন। মতিনগর হয়ে ভারতের আগরতলায় পৌঁছান। সীমান্ত পেরোনোর আগে বা পরে তিনি বসে থাকেননি। জানা যায়, নিজের হাতে বিস্ফোরক দিয়ে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের একটি সেতু এবং মুসল্লি সেতু উড়িয়ে দেন। উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানি সেনাদের চলাচল আটকে দেওয়া। একজন অফিসার নিজে বিস্ফোরক নিয়ে সেতু ওড়াচ্ছেন, এটা তখনকার পরিস্থিতির একটা ছবি। কাগজে-কলমে কোনো কাঠামো তৈরি হওয়ার আগেই যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল, আর অফিসারদের অনেক কাজ নিজের হাতেই করতে হচ্ছিল। এপ্রিলের শুরুতে তেলিয়াপাড়ায় কর্নেল এম এ জি ওসমানীর নেতৃত্বে এক বৈঠকে পূর্বাঞ্চলকে কয়েকটি সেক্টরে ভাগ করা হয়। ২ নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব পান খালেদ মোশাররফ। এর আওতায় ছিল কুমিল্লা, ঢাকা, ফরিদপুর ও নোয়াখালীর একাংশ। সেক্টরের সদর দপ্তর বসে ত্রিপুরার মেলাঘরে। হায়দার সেখানে খালেদ মোশাররফের সহ-অধিনায়ক হিসেবে যোগ দেন। সেক্টরে তখন দুই ধরনের লোক এসে জড়ো হচ্ছিল। একদিকে ছিল বাঙালি সেনা ও ইপিআরের সদস্যরা। অন্যদিকে ছিল হাজার হাজার ছাত্র-যুবক, যাদের সামরিক প্রশিক্ষণ বলতে প্রায় কিছুই ছিল না। হায়দার প্রথমে একটি স্টুডেন্ট কোম্পানি গঠন করেন। তাঁর ইউনিটের বড় অংশই ছিল ছাত্র, আর এদের তিনি গেরিলাযুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিতেন। ১৯৭১ সালের
জুনে খালেদ মোশাররফ ও হায়দার মিলে গড়ে তোলেন ক্র্যাক প্ল্যাটুন, একটি বিশেষ কমান্ডো দল। এর কাজ ছিল ঢাকা ও তার আশপাশে এমন অপারেশন চালানো, যাতে পাকিস্তানি বাহিনী সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, টঙ্গী, কুমিল্লা, এই এলাকাগুলোয় গেরিলাদের আক্রমণের পরিকল্পনায় হায়দারের ভূমিকা ছিল। খালেদ মোশাররফ যুদ্ধে আহত হলেন। অক্টোবরে তাঁর নেতৃত্বে কে ফোর্স গঠিত হলে হায়দার ২ নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব নেন। তারিখ নিয়ে সূত্রে সামান্য ভিন্নতা আছে। কোথাও লেখা ২২ সেপ্টেম্বর, কোথাও ৭ অক্টোবর। তবে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনিই ছিলেন সেক্টর কমান্ডার, এ নিয়ে মতভেদ নেই। এখানে একটা বিষয় খেয়াল করার মতো। একজন সেক্টর কমান্ডারের কাজ শুধু সামনে থেকে লড়াই করা নয়। তাঁকে রসদ, প্রশিক্ষণ, গেরিলাদের ঢাকায় ঢোকানো, তথ্য সংগ্রহ, সবকিছু সামলাতে হয়। ২ নম্বর সেক্টরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ঢাকার কাছাকাছি থাকা। রাজধানী ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর মূল ঘাঁটি। সেখানে গেরিলা অপারেশন মানে ঝুঁকিও বেশি, আবার রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও বেশি। কয়েকটা ছোট আক্রমণও ঢাকার মানুষকে বুঝিয়ে দিত, যুদ্ধ চলছে এবং পাকিস্তানি বাহিনী পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেই। ডিসেম্বরে যুদ্ধের চরিত্র বদলে যায়। গেরিলাযুদ্ধ থেকে সামনের দিকে সম্মুখযুদ্ধের পর্যায়ে ঢুকে পড়ে। এই বদলের সময়ে হায়দারের মতো একজন অফিসার, যিনি কমান্ডো হিসেবে গেরিলা কৌশলও জানতেন, আবার নিয়মিত সেনা কাঠামোও বুঝতেন, সেক্টরের জন্য বেশ কাজের ছিলেন। বিজয়ের দিনে হায়দারের নামটা ইতিহাসে ঢুকে গেছে আরেকটা কারণে। সেদিন রেসকোর্স ময়দানে (এখনকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বাহিনীর উপপ্রধান এ কে খন্দকারের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন মাত্র একজন সেক্টর কমান্ডার, মেজর এ টি এম হায়দার। ওই দিন তিনি ঢাকা বেতার ও টেলিভিশন থেকে একটি কথিকাও পাঠ করেন। শুরুটা ছিল এরকম: "আমি মেজর হায়দার বলছি, মুক্তিবাহিনীর প্রতি নির্দেশ…"। আত্মসমর্পণের সময় পাকিস্তানি জেনারেলদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও তাঁর ভূমিকা ছিল বলে জানা যায়। যাঁরা মাসের পর মাস এই বাহিনীর সঙ্গে লড়েছেন, তাঁদের পক্ষে এই দায়িত্ব সহজ ছিল না। এখানে একজন সৈনিকের পেশাদার শৃঙ্খলার একটা দিক চোখে পড়ে। যুদ্ধের পর ১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর সরকার তাঁকে বীর উত্তম খেতাব দেয়। তিনি সেনাবাহিনীতেই থেকে যান। কুমিল্লা সেনানিবাসে ১৩ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৪ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে উন্নীত হয়ে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ৮ম বেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসার হন। নতুন দেশের সেনাবাহিনী তখনো গড়ে উঠছিল। মুক্তিযুদ্ধ-ফেরত অফিসার, পাকিস্তান-প্রত্যাগত অফিসার, আর নতুন ব্যাচ, সবাইকে নিয়ে এক কাঠামো দাঁড়াতে সময় লাগছিল। এই টানাপোড়েনের কথা মাথায় না রাখলে ১৯৭৫-এর ঘটনা
বোঝা কঠিন। ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীর ভেতরে অস্থিরতা বাড়তে থাকে। ৩ নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ একটি অভ্যুত্থান ঘটান। হায়দার তখন ঢাকায় ছিলেন পারিবারিক কারণে, সঙ্গে ছিলেন তাঁর ব্যাটম্যান নায়েক শামসুল হক। জানা যায়, তাঁর বোন সিতারা বেগম বীর প্রতীকের বক্তব্য অনুযায়ী, জেনারেল ওসমানী আগে হায়দারকে বলেছিলেন খালেদ মোশাররফের সঙ্গে মিলে জেনারেল জিয়ার কাছে যেতে। কিন্তু ঘটনার গতি অন্যদিকে মোড় নেয়। ৬ নভেম্বর রাত থেকে ৭ নভেম্বরের ভোরের মধ্যে পাল্টা অভ্যুত্থান শুরু হয়। এর নেতৃত্বে ছিলেন কর্নেল আবু তাহের ও তাঁর বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা। সেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে কয়েকজন সেনা সদস্যের হাতে খালেদ মোশাররফ, কর্নেল নাজমুল হুদা ও এ টি এম হায়দার নিহত হন। হায়দারের বয়স তখন ৩৩। তাঁকে কিশোরগঞ্জে নিজের গ্রামে দাফন করা হয়। একাত্তরে যে মানুষটাকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী স্পর্শ করতে পারেনি, স্বাধীন দেশের সৈনিকদের হাতেই তাঁর প্রাণ গেল। এটা শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়। এটা বলে দেয়, স্বাধীনতার চার বছর না যেতেই সেনাবাহিনীর ভেতরে রাজনীতির প্রভাব কতটা গভীরে ঢুকে গিয়েছিল। এখানে হায়দারের ভূমিকা নিয়ে সাবধানে বলা দরকার। তিনি ৩ নভেম্বরের উদ্যোগে খালেদ মোশাররফের পাশে ছিলেন, এটা সূত্রে পাওয়া যায়। তবে ওই সময়ের ঘটনাগুলো নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে, কে কী উদ্দেশ্যে কী করেছিলেন তা নিয়ে ব্যাখ্যাও ভিন্ন। আরেকটা ছোট অসঙ্গতিও আছে। কোনো কোনো লেখায় বলা হয়েছে ৬ নভেম্বর রাতে তাঁকে হত্যা করা হয়, আবার বেশির ভাগ সূত্রে ৭ নভেম্বরের ভোর। ঘটনার রাতটাই যে বিশৃঙ্খলায় ভরা ছিল, এই ভিন্নতা তারই ছাপ। ২০২৩ সালের মে মাসে খালেদ মোশাররফ, নাজমুল হুদা ও হায়দারের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছিল বলেও জানা যায়। এ টি এম হায়দারকে মনে রাখার কারণ শুধু খেতাব নয়। তিনি ছিলেন সেই প্রজন্মের সৈনিক, যাঁরা এক রাতে বুঝে ফেলেছিলেন, নিজের বাহিনীর বিরুদ্ধেই দাঁড়াতে হবে। তাঁরা সেটা করেছিলেন ছাত্র, কৃষক, শ্রমিকদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে, নিজেরা প্রশিক্ষক হয়ে। ২ নম্বর সেক্টরের গেরিলারা ঢাকার ভেতরে যে চাপ তৈরি করেছিল, তার পেছনে তাঁর পরিকল্পনা ছিল। তাঁর জীবনের দুটো প্রান্ত পাশাপাশি রাখলে একটা প্রশ্ন ওঠে। একাত্তরে যে সামরিক শৃঙ্খলা একটা দেশ স্বাধীন করতে সাহায্য করেছিল, স্বাধীনতার পর সেই শৃঙ্খলা কেন ভেঙে পড়ল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে এ টি এম হায়দারের মতো মানুষদের জীবনই ভালো সুত্র।
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
রওশন টাওয়ার, (লিফট-৮) ১৫২/২/এ২ গ্রীণ রোড ,
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ ।
মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত