১৯৮৫ সালে আমার বয়স ছিল আট নয় বছর। সে সময় গ্রামের মানুষ অসুখ-বিসুখে প্রধানত কবিরাজের শরণাপন্ন হতো। কবিরাজেরা আশপাশের প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করা নানা ধরনের লতাপাতা ও গাছগাছালির মাধ্যমে চিকিৎসা করতেন।
যেমন—চোখ উঠলে কচ্চুইল্লা পাতার রস চোখে দেওয়া হতো। পেটে কৃমি হয়েছে বলে সন্দেহ হলে সকালে শুকনো পাটশাক পানিতে ভিজিয়ে সেই পানি খাওয়ানো হতো। জন্ডিস হলে হাত ধুয়ে মালা পরানোসহ প্রায় সব রোগের জন্যই তাঁদের কোনো না কোনো ওষুধ বা চিকিৎসাপদ্ধতি ছিল।
কবিরাজদের এই বিদ্যা কেউ কারও কাছ থেকে শিখতেন, আবার কেউ কেউ দাবি করতেন—তাঁরা স্বপ্নের মাধ্যমে এই চিকিৎসাবিদ্যা পেয়েছেন।
কবিরাজি চিকিৎসার তুলনায় এক ধাপ উন্নত চিকিৎসা দিতেন ছোট রায় পাড়া গ্রামের প্রভাসনী নামের একজন বয়স্ক হিন্দু নারী। তিনি একটি ব্যাগ হাতে নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরতেন। কারও অসুখ হলে ব্যাগ থেকে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ বের করে দিতেন। আমাদের মাঝেমধ্যে চকলেট জাতীয় কিছু দিতেন।
এর চেয়ে আরেক ধাপ উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল স্থানীয় বাজারে। সেখানে সে সময়ের ম্যাট্রিক পাস কিংবা নন-ম্যাট্রিক ডিগ্রিধারী চিকিৎসকেরা ফার্মেসিতে বসে রোগী দেখতেন।
একবার অসাবধানতাবশত আমার হাতের কবজির পুরো অংশ ভাত রান্নার টগবগে গরম হাঁড়ির পানিতে ডুবে গিয়েছিল। প্রথমে একজন স্থানীয় কবিরাজ আমার পোড়া হাতে ব্যবহৃত মবিল লাগিয়ে দেন। পরে স্থানীয় মেঘনাঘাট বাজারে আমার নানা, ডাক্তার চান মিয়া সাহেবের চিকিৎসায় আমি আরোগ্য লাভ করি। তবে পোড়া মবিলের কারণে সৃষ্ট কালো দাগটি এখনো আমার হাতে রয়ে গেছে।
নানার চেম্বারে মায়ের সাথে কিংবা রোগী হয়ে যখনি যেতাম, সিভিট দিতেন, চকলেটের মতো খেতাম। শৈশবে ভিটামিন সি ও চকলেটের পার্থক্য বুঝতাম না।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম ছেড়ে রাজধানী ঢাকায় বসবাস শুরু করি। ১৯৯৫–৯৬ সালের দিকে গ্রাম থেকে নিয়ে আসা একজন মুমূর্ষু আত্মীয়কে ভর্তি করানোর জন্য তাঁর সঙ্গে একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাই।
হাসপাতালে পৌঁছানোর পর প্রায় এক ঘণ্টা চেষ্টা করেও তাঁর চিকিৎসা শুরু করাতে পারিনি। কারণ, তখন শিফট পরিবর্তনের সময় হয়ে গিয়েছিল। চলমান শিফটের চিকিৎসকেরা বললেন, তাঁরা রোগী দেখবেন না; পরবর্তী শিফটের চিকিৎসকেরা এসে চিকিৎসা শুরু করবেন।
রোগীর তখন জ্ঞান ছিল না। তবে তাঁর মুখ থেকে 'গো গো' ধরনের কষ্টের শব্দ বের হচ্ছিল। রোগীর যন্ত্রণার সেই আওয়াজে একজন চিকিৎসক কর্কশ কণ্ঠে চরম বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর সেই নির্মম প্রকাশভঙ্গি আজও সময়ে সময়ে আমাকে পীড়া দেয়।
শেষ পর্যন্ত রোগীর আর চিকিৎসার প্রয়োজন হয়নি। কারণ, চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
১৯৯৪ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত নিজের এবং অন্যদের চিকিৎসার প্রয়োজনে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগে অনেকবার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। কোথাও কোথাও রোগীদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। একজন রোগী গড়ে মাত্র দুই থেকে তিন মিনিট চিকিৎসকের সময় পেতেন। মাঝেমধ্যে রোগীকে যথাযথভাবে পরীক্ষা না করেই চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বারের ভিজিটিং কার্ড ধরিয়ে দেওয়া হতো।
আমার বন্ধু কামরুল কে একজন নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ নিজের প্রাইভেট চেম্বারের ভিজিটিং কার্ড দিয়ে বলেছিলেন, এক-দুই দিনের মধ্যে কানের অপারেশন না করলে তাঁর কান ফেটে যেতে পারে, এমনকি তিনি মারাও যেতে পারেন। অথচ আমার সেই বন্ধু অপারেশন না করেই দুই যুগের বেশি সময় ধরে দিব্যি ভালো আছেন।
১৯৯৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের দেখতে অসংখ্যবার সরকারি হাসপাতালে যেতে হয়েছে। রোগীর তুলনায় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীর সংখ্যা ও বাজেট পর্যাপ্ত না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
সরকারি হাসপাতালগুলোর কোনো কোনো স্থানের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অবস্থা দেখলে মনে হয়—হাসপাতালের যদি প্রাণ থাকত, তবে হাসপাতাল নিজেই অসুস্থ হয়ে মারা যেত!
এখন সরকারের বড় বাজেটে জনকল্যাণে অনেকগুলো দৃষ্টিনন্দন আধুনিক বহুতল ভবনের হাসপাতাল হয়েছে। এগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে অনেক বাজেটের প্রয়োজন নেই, শুধুমাত্র প্রবল দায়িত্ববোধ, ব্যবস্থাপনা ও পর্যবেক্ষণই অনেকাংশে তা সফল করতে পারে।
২০২৫ সালের শেষ দিকে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিদপ্তরের প্রধানের ব্যক্তিগত সফরসঙ্গী হিসেবে ময়মনসিংহ বিভাগের একটি শহরে যাওয়ার সুযোগ হয়। সেখানে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে স্থানীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁর অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে আমিও সঙ্গে ছিলাম।
তাঁকে দেখতে হাসপাতালের পরিচালকসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক ও অধ্যাপক এসেছিলেন। তিনি সুস্থ হয়ে ওঠার পর তাঁদের সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টা হাসপাতালের অবকাঠামো, জনবল ও চিকিৎসাব্যবস্থার নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে জানতে পারি, হাসপাতালটিতে কখনো কখনো ধারণক্ষমতার পাঁচ গুণেরও বেশি রোগী ভর্তি থাকেন, অথচ প্রয়োজনীয় জনবল রয়েছে তার পাঁচ ভাগের এক ভাগেরও কম।
তাঁদের এই সীমাবদ্ধতার কথা শুনে সরকারি হাসপাতাল নিয়ে আমার চার দশকের বিরক্তি অনেকটাই কমে যায়। তবে হাসপাতালের অপরিচ্ছন্নতার বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারিনি।
আশার কথা, তাঁদের কাছ থেকেই জানতে পারি—বাংলাদেশের আটটি বিভাগীয় শহরে ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল নির্মাণের প্রকল্প চলমান, যা শিগগিরই উদ্বোধনের অপেক্ষায়। প্রতিটির জন্য তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের পনেরো তলাবিশিষ্ট আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন ভবন।
২০০৯ সালে রোগী হিসেবে স্কয়ার হাসপাতালে তিন রাত অবস্থান করেছিলাম। সেখানকার সুন্দর পরিবেশ এবং চিকিৎসক, নার্স ও কর্মীদের আন্তরিক আচরণ ও সেবায় বেশ আত্মতৃপ্তি অনুভব করি। মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বাসায় ফিরেছিলাম।
এরপর থেকে আজ পর্যন্ত রোগী ও দর্শনার্থী হিসেবে স্কয়ার, এভারকেয়ার—সাবেক অ্যাপোলো, ইউনাইটেড হাসপাতাল, ল্যাবএইড, পপুলার, আজগর আলী হাসপাতাল, বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালসহ অনেক বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে।
এসব হাসপাতালের সুন্দর পরিবেশ, আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও উন্নত চিকিৎসাসেবা দেখে মুগ্ধ হয়ে মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি। মনে হয়, আমরাও ধীরে ধীরে উন্নত স্বাস্থ্যসেবার যুগে প্রবেশ করছি। যদিও এসব প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসাব্যয় সাধারণ মানুষের জন্য তুলনামূলক অনেক বেশি, কিন্তু বিদেশ থেকে অনেক কম।
সেই ক্ষেত্রে সরকারি উৎসাহ, উদ্দীপনা ও পৃষ্ঠপোষকতায় মানসম্মত অলাভজনক বেসরকারি হাসপাতাল স্থাপনায় উৎসাহিত করা যেতে পারে, যাতে বিদেশি চিকিৎসায় মানুষের কষ্ট কমে ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়।
নিজের চিকিৎসা এবং আত্মীয় রোগীর দর্শনার্থী হিসেবেও ভারত, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের কয়েকটি নামকরা হাসপাতালে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। সেসব হাসপাতালের পরিবেশ অত্যন্ত উন্নত। চিকিৎসাব্যবস্থা আধুনিক এবং সেবাদানকারী চিকিৎসক ও নার্সদের পেশাদারত্বও প্রশংসনীয়।
তবে কখনো কখনো তাঁদের আচরণ এতটাই নিয়মতান্ত্রিক ও যান্ত্রিক মনে হয়েছে যে, চিকিৎসক ও নার্সদের যেন রোবট বলে মনে হতো। সেখানে আধুনিকতা ও দক্ষতা ছিল, কিন্তু সব সময় হৃদয়ের উষ্ণতা অনুভব করা যেত না। তবে বিষয়টা অনেকটা আমাদের ভাষাজ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণেও হতে পারে।
অন্যদিকে, ছোটবেলার মেঘনা ঘাট বাজারের ফার্মেসির চিকিৎসক কিংবা গ্রামের কবিরাজের চিকিৎসা হয়তো আধুনিক ছিল না; তাঁদের চিকিৎসাব্যবস্থায় অনেক ভুল, সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকিও ছিল। তারপরও রোগীর প্রতি তাঁদের যে মমতা, ভালোবাসা ও আন্তরিকতা দেখেছি, তা আজও আমার হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
আমাদের দেশে দেশীয় ও বিদেশি উন্নত হাসপাতালের আদলে আরও বেশি আধুনিক হাসপাতাল প্রয়োজন। তবে কেবল সুন্দর ভবন, উন্নত যন্ত্রপাতি ও আধুনিক প্রযুক্তিই যথেষ্ট নয়।
আমাদের প্রয়োজন এমন চিকিৎসক, যাঁদের মধ্যে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি ছোটবেলায় দেখা সেই মমতা, আন্তরিকতা ও মানবিকতাও থাকবে। যাঁকে দেখলে রোগীর মনে আস্থা জন্মাবে, তাঁর কথায় সাহস বাড়বে এবং তাঁর আন্তরিক ব্যবহারে অসুস্থতার মধ্যেও ভালো লাগা ও ভালোবাসার অনুভূতি সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশ অনেক প্যারামিটারে উন্নতির দিকে এগোচ্ছে। প্রত্যাশা ও প্রার্থনা করি, আধুনিক চিকিৎসাজ্ঞান, উন্নত প্রযুক্তি এবং মানবিক মমতার সমন্বয়ে যেন আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভারত-থাইল্যান্ডের মান ছাড়িয়ে সিঙ্গাপুরের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
আমার দেখা স্বাস্থ্যসেবার একাল–সেকাল
আমার দেখা স্বাস্থ্যসেবার একাল–সেকাল
১৯৮৫ সালে আমার বয়স ছিল আট নয় বছর। সে সময় গ্রামের মানুষ অসুখ-বিসুখে প্রধানত কবিরাজের শরণাপন্ন হতো। কবিরাজেরা আশপাশের প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করা নানা ধরনের লতাপাতা ও গাছগাছালির মাধ্যমে চিকিৎসা করতেন। যেমন—চোখ উঠলে কচ্চুইল্লা পাতার রস চোখে দেওয়া হতো। পেটে কৃমি হয়েছে বলে সন্দেহ হলে সকালে শুকনো পাটশাক পানিতে ভিজিয়ে সেই পানি খাওয়ানো হতো। জন্ডিস হলে হাত ধুয়ে মালা পরানোসহ প্রায় সব রোগের জন্যই তাঁদের কোনো না কোনো ওষুধ বা চিকিৎসাপদ্ধতি ছিল। কবিরাজদের এই বিদ্যা কেউ কারও কাছ থেকে শিখতেন, আবার কেউ কেউ দাবি করতেন—তাঁরা স্বপ্নের মাধ্যমে এই চিকিৎসাবিদ্যা পেয়েছেন। কবিরাজি চিকিৎসার তুলনায় এক ধাপ উন্নত চিকিৎসা দিতেন ছোট রায় পাড়া গ্রামের প্রভাসনী নামের একজন বয়স্ক হিন্দু নারী। তিনি একটি ব্যাগ হাতে নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরতেন। কারও অসুখ হলে ব্যাগ থেকে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ বের করে দিতেন। আমাদের মাঝেমধ্যে চকলেট জাতীয় কিছু দিতেন। এর চেয়ে আরেক ধাপ উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল স্থানীয় বাজারে। সেখানে সে সময়ের ম্যাট্রিক পাস কিংবা নন-ম্যাট্রিক ডিগ্রিধারী চিকিৎসকেরা ফার্মেসিতে বসে রোগী দেখতেন। একবার অসাবধানতাবশত আমার হাতের কবজির পুরো অংশ ভাত রান্নার টগবগে গরম হাঁড়ির পানিতে ডুবে গিয়েছিল। প্রথমে একজন স্থানীয় কবিরাজ আমার পোড়া হাতে ব্যবহৃত মবিল লাগিয়ে দেন। পরে স্থানীয় মেঘনাঘাট বাজারে আমার নানা, ডাক্তার চান মিয়া সাহেবের চিকিৎসায় আমি আরোগ্য লাভ করি। তবে পোড়া মবিলের কারণে সৃষ্ট কালো দাগটি এখনো আমার হাতে রয়ে গেছে। নানার চেম্বারে মায়ের সাথে কিংবা রোগী হয়ে যখনি যেতাম, সিভিট দিতেন, চকলেটের মতো খেতাম। শৈশবে ভিটামিন সি ও চকলেটের পার্থক্য বুঝতাম না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম ছেড়ে রাজধানী ঢাকায় বসবাস শুরু করি। ১৯৯৫–৯৬ সালের দিকে গ্রাম থেকে নিয়ে আসা একজন মুমূর্ষু আত্মীয়কে ভর্তি করানোর জন্য তাঁর সঙ্গে একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাই। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর প্রায় এক ঘণ্টা চেষ্টা করেও তাঁর চিকিৎসা শুরু করাতে পারিনি। কারণ, তখন শিফট পরিবর্তনের সময় হয়ে গিয়েছিল। চলমান শিফটের চিকিৎসকেরা বললেন, তাঁরা রোগী দেখবেন না; পরবর্তী শিফটের চিকিৎসকেরা এসে চিকিৎসা শুরু করবেন। রোগীর তখন জ্ঞান ছিল না। তবে তাঁর মুখ থেকে 'গো গো' ধরনের কষ্টের শব্দ বের হচ্ছিল। রোগীর যন্ত্রণার সেই আওয়াজে একজন চিকিৎসক কর্কশ কণ্ঠে চরম বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর সেই নির্মম প্রকাশভঙ্গি আজও সময়ে সময়ে আমাকে পীড়া দেয়। শেষ পর্যন্ত রোগীর আর চিকিৎসার প্রয়োজন হয়নি। কারণ, চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগেই তিনি
মৃত্যুবরণ করেছিলেন। ১৯৯৪ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত নিজের এবং অন্যদের চিকিৎসার প্রয়োজনে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগে অনেকবার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। কোথাও কোথাও রোগীদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। একজন রোগী গড়ে মাত্র দুই থেকে তিন মিনিট চিকিৎসকের সময় পেতেন। মাঝেমধ্যে রোগীকে যথাযথভাবে পরীক্ষা না করেই চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বারের ভিজিটিং কার্ড ধরিয়ে দেওয়া হতো। আমার বন্ধু কামরুল কে একজন নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ নিজের প্রাইভেট চেম্বারের ভিজিটিং কার্ড দিয়ে বলেছিলেন, এক-দুই দিনের মধ্যে কানের অপারেশন না করলে তাঁর কান ফেটে যেতে পারে, এমনকি তিনি মারাও যেতে পারেন। অথচ আমার সেই বন্ধু অপারেশন না করেই দুই যুগের বেশি সময় ধরে দিব্যি ভালো আছেন। ১৯৯৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের দেখতে অসংখ্যবার সরকারি হাসপাতালে যেতে হয়েছে। রোগীর তুলনায় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীর সংখ্যা ও বাজেট পর্যাপ্ত না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি হাসপাতালগুলোর কোনো কোনো স্থানের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অবস্থা দেখলে মনে হয়—হাসপাতালের যদি প্রাণ থাকত, তবে হাসপাতাল নিজেই অসুস্থ হয়ে মারা যেত! এখন সরকারের বড় বাজেটে জনকল্যাণে অনেকগুলো দৃষ্টিনন্দন আধুনিক বহুতল ভবনের হাসপাতাল হয়েছে। এগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে অনেক বাজেটের প্রয়োজন নেই, শুধুমাত্র প্রবল দায়িত্ববোধ, ব্যবস্থাপনা ও পর্যবেক্ষণই অনেকাংশে তা সফল করতে পারে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিদপ্তরের প্রধানের ব্যক্তিগত সফরসঙ্গী হিসেবে ময়মনসিংহ বিভাগের একটি শহরে যাওয়ার সুযোগ হয়। সেখানে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে স্থানীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁর অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে আমিও সঙ্গে ছিলাম। তাঁকে দেখতে হাসপাতালের পরিচালকসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক ও অধ্যাপক এসেছিলেন। তিনি সুস্থ হয়ে ওঠার পর তাঁদের সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টা হাসপাতালের অবকাঠামো, জনবল ও চিকিৎসাব্যবস্থার নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে জানতে পারি, হাসপাতালটিতে কখনো কখনো ধারণক্ষমতার পাঁচ গুণেরও বেশি রোগী ভর্তি থাকেন, অথচ প্রয়োজনীয় জনবল রয়েছে তার পাঁচ ভাগের এক ভাগেরও কম। তাঁদের এই সীমাবদ্ধতার কথা শুনে সরকারি হাসপাতাল নিয়ে আমার চার দশকের বিরক্তি অনেকটাই কমে যায়। তবে হাসপাতালের অপরিচ্ছন্নতার বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারিনি। আশার কথা, তাঁদের কাছ থেকেই জানতে পারি—বাংলাদেশের আটটি বিভাগীয় শহরে ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল নির্মাণের প্রকল্প চলমান, যা শিগগিরই উদ্বোধনের অপেক্ষায়। প্রতিটির জন্য তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের পনেরো তলাবিশিষ্ট আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন ভবন। ২০০৯ সালে রোগী হিসেবে স্কয়ার হাসপাতালে তিন রাত অবস্থান
করেছিলাম। সেখানকার সুন্দর পরিবেশ এবং চিকিৎসক, নার্স ও কর্মীদের আন্তরিক আচরণ ও সেবায় বেশ আত্মতৃপ্তি অনুভব করি। মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বাসায় ফিরেছিলাম। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত রোগী ও দর্শনার্থী হিসেবে স্কয়ার, এভারকেয়ার—সাবেক অ্যাপোলো, ইউনাইটেড হাসপাতাল, ল্যাবএইড, পপুলার, আজগর আলী হাসপাতাল, বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালসহ অনেক বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। এসব হাসপাতালের সুন্দর পরিবেশ, আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও উন্নত চিকিৎসাসেবা দেখে মুগ্ধ হয়ে মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি। মনে হয়, আমরাও ধীরে ধীরে উন্নত স্বাস্থ্যসেবার যুগে প্রবেশ করছি। যদিও এসব প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসাব্যয় সাধারণ মানুষের জন্য তুলনামূলক অনেক বেশি, কিন্তু বিদেশ থেকে অনেক কম। সেই ক্ষেত্রে সরকারি উৎসাহ, উদ্দীপনা ও পৃষ্ঠপোষকতায় মানসম্মত অলাভজনক বেসরকারি হাসপাতাল স্থাপনায় উৎসাহিত করা যেতে পারে, যাতে বিদেশি চিকিৎসায় মানুষের কষ্ট কমে ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়। নিজের চিকিৎসা এবং আত্মীয় রোগীর দর্শনার্থী হিসেবেও ভারত, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের কয়েকটি নামকরা হাসপাতালে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। সেসব হাসপাতালের পরিবেশ অত্যন্ত উন্নত। চিকিৎসাব্যবস্থা আধুনিক এবং সেবাদানকারী চিকিৎসক ও নার্সদের পেশাদারত্বও প্রশংসনীয়। তবে কখনো কখনো তাঁদের আচরণ এতটাই নিয়মতান্ত্রিক ও যান্ত্রিক মনে হয়েছে যে, চিকিৎসক ও নার্সদের যেন রোবট বলে মনে হতো। সেখানে আধুনিকতা ও দক্ষতা ছিল, কিন্তু সব সময় হৃদয়ের উষ্ণতা অনুভব করা যেত না। তবে বিষয়টা অনেকটা আমাদের ভাষাজ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণেও হতে পারে। অন্যদিকে, ছোটবেলার মেঘনা ঘাট বাজারের ফার্মেসির চিকিৎসক কিংবা গ্রামের কবিরাজের চিকিৎসা হয়তো আধুনিক ছিল না; তাঁদের চিকিৎসাব্যবস্থায় অনেক ভুল, সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকিও ছিল। তারপরও রোগীর প্রতি তাঁদের যে মমতা, ভালোবাসা ও আন্তরিকতা দেখেছি, তা আজও আমার হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দেয়। আমাদের দেশে দেশীয় ও বিদেশি উন্নত হাসপাতালের আদলে আরও বেশি আধুনিক হাসপাতাল প্রয়োজন। তবে কেবল সুন্দর ভবন, উন্নত যন্ত্রপাতি ও আধুনিক প্রযুক্তিই যথেষ্ট নয়। আমাদের প্রয়োজন এমন চিকিৎসক, যাঁদের মধ্যে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি ছোটবেলায় দেখা সেই মমতা, আন্তরিকতা ও মানবিকতাও থাকবে। যাঁকে দেখলে রোগীর মনে আস্থা জন্মাবে, তাঁর কথায় সাহস বাড়বে এবং তাঁর আন্তরিক ব্যবহারে অসুস্থতার মধ্যেও ভালো লাগা ও ভালোবাসার অনুভূতি সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশ অনেক প্যারামিটারে উন্নতির দিকে এগোচ্ছে। প্রত্যাশা ও প্রার্থনা করি, আধুনিক চিকিৎসাজ্ঞান, উন্নত প্রযুক্তি এবং মানবিক মমতার সমন্বয়ে যেন আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভারত-থাইল্যান্ডের মান ছাড়িয়ে সিঙ্গাপুরের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
রওশন টাওয়ার, (লিফট-৮) ১৫২/২/এ২ গ্রীণ রোড ,
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ ।
মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত