আওয়ামী লীগের উপর নিষেধাজ্ঞা নতুন নয়। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ূব খান এবং এরপর জেনারেল ইয়াহযিয়া খান আওয়ামী লীগের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন এবং দলের সমর্থকদের ওপর জেল, জুলুম, নির্যাতন, মিথ্যা হামলা মামলা দায়ের করেন। তারপর ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক সরকার আওয়ামীলীগের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তবে সকল নিষেধাজ্ঞা এবং অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করে আওয়ামী লীগ সবসময়ই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কারণ “আওয়ামী” লীগ যার অর্থ হচ্ছে “আম জনতা” বা জনতার দল তার অন্তনিহিত শক্তি হচ্ছে জনগণ জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, চাওয়া-পাওয়া, তাদের স্বাধিকার এবং প্রত্যশ্যা। যতদিন মানুষের প্রত্যশ্যা থাকবে, আশা-আকাংখা থাকবে, অধিকার আদায়ের সংগ্রাম থাকবে, আওয়ামী লীগ ঠিকে থাকবে এবং কাল্পনিক ফিনিক্স পাখির মতো অদম্য শক্তিতে বার বার বলীয়ান হয়ে জেগে উঠবে। আওয়ামী লীগ কারো হুকুমে ধ্বংস হবে না যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, মানুষের সুখ দুঃখের, আশা-আকাঙ্ক্ষার সংকট ও সংগ্রাম থাকবে, ততদিন আওয়ামী লীগ জনগণের অধিকার আদায়ের হাতিয়ার বা দল হিসাবে অবশ্যই টিকে থাকবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আওয়ামী লীগ হচ্ছে জনগণের অনুভূতি, জীবনের স্পন্দন এবং অধিকার আদায়ের হাতিয়ার।
২০২৪শের সুনামি শুধু আওয়ামী লীগের উপরই নয়, জাতির ভিত্তির উপর
তবে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের উপর যে সুনামি বা আঘাত এসেছে তা থেকে মুক্তির জন্য আওয়ামী লীগ দলকে ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত করতে হবে।এবারের সুনামি শুধু আওয়ামী লীগের ওপরই নয় বরং বাংলাদেশ জাতির ভিত্তি বা জাতিসত্তা ধ্বংসের সুনামি। জাতিকে মৌলবাদী বা পাকিস্তানি ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ করতে বা শক্তিতে রূপান্তরিত করার ষড়যন্ত্র।
দলকে সুসংগঠিত করতে হবে ?
এক নাগাড়ে ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকায় ফলে দলের মধ্যে বহু আগাছা জন্ম নিয়েছে, দলের মধ্যে বহু দ্বিধা বিভক্তি দেখা দিয়েছে। এসব আগাছা পরিষ্কার করে, দলের মধ্যে একতা বজায় রাখা এখন সময়ের দাবি। সুখের বিষয় যে, দলের ত্যগী ও অন্যন্য নেতা শেখ হাসিনা এখনো জীবিত আছেন। সুতরাং তাঁর নেতৃত্বে প্রথমত দলকে শক্ত ভিতের উপর সুসংগঠিত করতে হবে। দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাদের মধ্যে বিভাজন রয়েছে, অনেকে দুই দশক বা তার উর্ধ্বে থেকে দলের নেতৃত্বে রয়েছেন এবং তাঁরা নতুন ও প্রবীণদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করেছেন। এসব দূরত্ব ঘোচিয়ে দলকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলার বিকল্প নেই ।
আওয়ামী লীগের শক্তি জনগণ
যেহেতু আওয়ামী লীগ জনগণের দল, জনগণই এর মূল শক্তি ও ভিত্তি, সুতরাং জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষা কিভাবে বাস্তবায়ন ও চরিতার্থ করা সম্ভব তা নিয়ে ভাবতে হবে। ষাট বা আশি দশকের চিন্তাভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে জনগণকে কিভাবে ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত করা যায়, কিভাবে তাদের সমর্থন আদায় করা সম্ভব তা নিয়ে আলোচনা, এবং চিন্তা ভাবনার সময় এসেছে।
২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজয় ও দিন বদলের অনবদ্য সনদ সৃষ্টি
২০০১ সালে আওয়ামীলীগের পরাজয়ের পর আওয়ামী লীগনেত্রী শেখ হাসিনা দীর্ঘ অনেক বছর, ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত— আওয়ামী লীগ যদি ভবিষ্যতে কোনো দিন ক্ষমতায় আসতে পারে তাহলে আওয়ামী লীগ সরকার কি কি উন্নয়ন কাজ করবে তা নিয়ে বিশদ চিন্তা ভাবনা করেন। সেই সব চিন্তাভাবনার ফসল হচ্ছে “দিন বদলের সনদ” যা জাতিকে নতুন নতুন স্বপ্ন দেখায় এবং তাদের আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণে সক্ষম হয়। মাননীয় দেশনেত্রী শেখ হাসিনা ঐসময়ে আমার বড়ভাই আবুল মাল আব্দুল মুহিতকে নিয়ে “দিন বদলের সনদ” তৈরির জন্য কাজ করেন। মুহিতভাইয়ের কারণে এবং শাকিলের জন্য আমি সময় সময় তাদের কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পাই। শাকিলের অকাল মৃত্যু দলের জন্য দুঃখজনক।
মুহিত ভাইয়ের পরিকল্পনা এবং শেখ হাসিনার মানবিকতা: এক অপূর্ব সমন্বয়
যে জিনিসটি আমি লক্ষ্য করি তা হচ্ছে, মুহিতভাই তাঁর বিরাট পান্ডিত্য এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দেশের উন্নয়ন কিভাবে তড়িৎ গতিতে অর্জন করা যায় তার রুপরেখা তৈরি করেন আর মাননীয় নেত্রী শেখ হাসিনা যিনি সবসময়ই জনমনপণ, গরীব মানুষের উন্নয়ন কিভাবে সম্ভব, জনগণের মঙ্গল কি করলে হবে, অর্থাৎ মানবিক দিকটা নিয়ে তিনি সবসময়ই সচেতন — এদুয়ের সম্বনয়ে তাঁরা যা তৈরি করলেন তা জাতিকে যেমন দিয়েছে উন্নত জীবনের আস্বাদন, বিশ্বকে তাক লাগিয়ে বাংলাদেশ হয়ে উঠে “উন্নয়নের রোল মডেল” এবং দক্ষিণের দেশগুলোর ঈস্পিত আদর্শ। সম্মিলিত জাতিসঙ্ঘ একে “উন্নয়নের রোল মডেল” হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং মার্কিন প্রভাবশালী প্রত্রিকা “ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট জার্নাল” একে “a standard bearer of the South” বলে আখ্যায়িত করে ।
দারিদ্র্য ক্লিস্ট বাংলাদেশ সঠিক নেতৃত্ব এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যে অনন্য অবদান রাখতে পারে বিশ্ববাসীকে তা স্মরণ করিয়ে দেয়। যেখানে ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ — এই দীর্ঘ ১৫ বছরে বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.২% শতাংশ তা শেখ হাসিনার শাসনামলে দ্বিগুণের বেশি অর্থাৎ ৬.৮% শতাংশের অধিক বৃদ্ধি পায়। আপনাদের মনে আছে ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ বাংলাদেশ শাসিত হয়, সামরিক, আধাসামরিক, সামরিক-বেসামরিক ও টেকনেক্রেট নেতৃত্বের দারা। তাদের অর্জন শেখ হাসিনার অর্জন থেকে অনেক অনেক কম।
হাসিনা-ইকোনোমিক্স ও তার অর্জন
বস্তুত শেখ হাসিনার সরকারে বা Hasina-economics যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে (১) দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়ানো যাতে ২০৪১ সালে মধ্যে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন “সোনার বাংলা” অর্জিত হয় এবং দ্বিতীয়ত (২) দারিদ্র্য বিমোচন— এদুটি ক্ষেত্রেই শেখ হাসিনার অর্জন অভাবনীয়।
পৃথিবীর বড় বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ “best performing economy” বা সবচেয়ে বেশি ভালো অর্থনীতির উন্নয়নের দেশগুলোর মধ্যে ত্বীতিয় স্থান অর্জন করতে সক্ষম হয়। শুধু জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়েনি একি সময়ে দারিদ্র্য সীমা ৪২% শতাংশ থেকে কমে গিয়ে ১৮% শতাংশে নেমে আসে যা পৃথিবীর মধ্যে সর্বাধিক।
টীম ওয়ার্ক কাজে লাগে
তাঁর কাজটি করার জন্য তিনি নিজ উদ্যোগে আরো কয়েকজন সহযোগী নিয়োগ দেন যারা তাঁর সাথে জীবনের কোনো এক সময় চাকরি করেছেন এবং তাঁরা হচ্ছেন সর্বজনাব ড. মসিউর রহমান, ড. এস, এ সামাদ, সাবের হোসেন চৌধুরী, আসাদুজ্জামান নূর প্রমুখ। সবার কথা আমার ঠিক এখন মনে পড়ছে না।
মুহিত ভাই খসড়া তৈরি করে শাকিলের মাধ্যমে সময় সময় তা আমাকে পাঠাতেন। আমি তখন জাতিসংঘের এম-ডি-জি (Millennium Development Goals, MDGs) নিয়ে কাজ করছিলাম। সূতরাং আমি “দিন বদলের সনদে” অনেকগুলো এমডিজির লক্ষমাত্রা ঢুকিয়ে দেই যেমন দারিদ্র্য বিমোচন, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা, সবার জন্য পানীয় জল, ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ, পরিবেশ বান্ধব নগরায়ন, ইত্যদি ইত্যাদি। আমার যুক্তি ছিল যে যেহেতু জাতিসংঘ এগুলো অর্জন করতে চায় এবং সব সদস্য রাষ্ট্রসমুহ এগুলি অর্জন করুক তা তারা দেখতে চায়, সুতরাং আমরা যদি এগুলো আমাদের লক্ষ্যমাত্রায় সংযুক্ত করি তাহলে এগুলো বাস্তবায়নের জন্য আমরা জাতিসংঘের কাছ থেকে সহায়তা চাইতে পারি।
সুদা সদনে গবেষণার অফিস
দেশনেত্রী শেখ হাসিনা এসব কাজ করার জন্য তিনি তাঁর “সুদাসদনে” জায়গা করে দেন এবং কয়েকটি কম্পিউটারের ব্যবস্থা করেন। পরবর্তীতে তা থেকে জন্ম নেয় সি-আর-আই (CRI: Center for Research and Information).
বর্তমানে কি করণীয়?
আমাদের দেশে যেই সরকার গঠন করে— নির্বাচিত বা অনির্বাচিত সবাই একনায়কত্ব কায়েম করে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রয়োজন সরকারের ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। ক্ষমতাকে জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়া যেটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে।
বঙ্গবন্ধুর জেলায় জেলায় জেলা গবর্ণর পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন
বঙ্গবন্ধু জেলায় জেলায় “জেলা গভর্নর ” পদ্ধতি চালু করেছিলেন। সময়ের স্বল্পতার কারণে “নির্বাচিত গভর্নর ” নিয়োগ দিতে পারেননি। তবে তাঁকে হত্যা এবং উৎখাত করার পর পরই সরকারি আমলারা তড়িৎ বেগে সবচেয়ে প্রথম জেলা গভর্নর পদ্ধতি বাতিল করেন এবং তা করে দেশকে বহু বছর পিছনে ফেলে দেন।
জেলা গভর্নর পদ্ধতি চালু করার জন্য ব্যাপক প্রচারণা ও গবেষণা প্রয়োজন
জেলায় জেলায় নির্বাচিত জেলা গবর্ণর পদ্ধতি চালু করার আগে এ সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করতে হবে। বর্তমানে দেশে ৬৪ টি জেলা আছে। প্রত্যক জেলায় একজন জেলা গবর্ণর জনগণের ডাইরেক্ট ভোটে নির্বাচিত হবেন। প্রত্যক জেলায় একটি জন প্রতিনিধি পরিষদ নির্বাচিত হবে এবং এই পরিষদ তার জেলার আয়-ব্যয় ও সম্পদ বিবেচনায় নিয়ে গবর্ণর এবং জেলার অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বেতন ও সুযোগ সুবিধা নির্ধারণ করবেন। যে জেলার আয় বেশি তারা তাদের কর্মচারীদের বেশি সুযোগ সুবিধা ও বেশি বেতন ভাতা দিবেন। বর্তমানে যে জেলা প্রশাসক রয়েছেন সে পদটি বিলুপ্ত হবে। প্রত্যক জেলায় তাদের গণপরিষদ তাদের জেলায় কি কি ডিপার্টমেন্ট বা মন্ত্রণালয় দরকার তা তারা নির্ধারণ করবেন। মনে করেন সিলেট এলাকায় পর্যটন শিল্প গড়ে উঠার সম্ভাবনা আছে। সুতরাং সিলেট জেলায় পর্যটন বিভাগ চালু হবে। তবে যেহেতু সিলেটে পাঠ উৎপাদন হয় না, সুতরাং পাঠের কোনো দপ্তরের প্রয়োজন নেই। বরং ময়মনসিংহ বা ফরিদপুরে যেখানে পাঠ শিল্প রয়েছে সেখানে পাঠ বিভাগ করা যেতে পারে। যে জেলায় এর সম্ভাবনা নেই, সেখানে পর্যটন বিভাগ থাকবে না। লক্ষ্যণীয় হচ্ছে স্থানীয় বিবেচনায় দপ্তর বা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ব্যবস্থা
এমন ব্যাবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে। আমেরিকায় ৫০ টি অঙ্গ রাজ্য রয়েছে এবং প্রত্যকটি অঙ্গ রাজ্য স্বাধীন। আমাদের দেশের মতো প্রত্যকটি অঙ্গ রাজ্যের সরকারি কর্মচারীদের বা নির্বাচিত জন প্রতিনিধিদের সুযোগ সুবিধা বা বেতন ভাতা সমান নয়। নব্বই দশকে ম্যাসাচুচেস্ট অ্ঙ্গ রাজ্যের গবর্ণর ছিলেন আমার ঘনিষ্ঠজন মাইকেল ডুকাকিস। তিনি ১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী নির্বাচিত হন। তাঁর মতো সৎ, উদার এবং ভদ্রলোক রাজনীতিবিদ আমি খুব কম দেখেছি। তিনি প্রেসিডেন্ট বুশ সিনিয়ারের কাছে পরাজিত হন। তিনি ১২ বছর গবর্ণর ছিলেন। তখন তার বেতন ছিল ১১০,০০০ হাজার ডলার। একি সময়ে বিল ক্লিনটন যিনি পরবর্তীতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হন তার বেতন ছিল ৩৫,০০০ হাজার ডলার। আরকানসাস যেহেতু দরিদ্র অঙ্গরাজ্য সেজন্য তাদের বেতন ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদির কম ছিল। তবে ধনী অঙ্গরাজ্য নিউ ইয়র্কের গবরণর কোমোর বেতন ছিল ১৮৯,০০০ হাজার ডলার। ম্যাসাসেস্ট অঙ্গরাজ্যে সবচেয়ে বেশী বেতন পান ঐ রাজ্যের স্কুল সুপারিনটেনডেন্ট । কারণ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা শিক্ষার উপর অধিকার ঘুগুত্ব দেন। এই অঙ্গরাজ্যে বিশ্বের বহু নামীদামী ১১৭ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা পিএইচডি ডিগ্রি দেয়। হার্ভাড, এম-আই-টি, ট্রাফট, নর্থ ইস্টার্ন, ব্রেনডাইজ, বা বস্টন ইউনিভার্সিটি বা বস্টন কলেজ, স্মিথ কলেজ, ওয়েলেসলি কলেজ ইত্যাদি বহু নামীদামী প্রতিষ্ঠান এই রাজ্যে অবস্থিত। এই রাজ্যের বার্ষিক রাজস্বের আয়ের এক তৃতীয়াংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অর্জিত হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক শহরের পুলিশ কমিশনার বা অন্যবিদ সরকারি কর্মচারীদের নিয়োগ দেন রাজ্যের গবর্ণর বা মেয়র সাহেব। এদেশে এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে বদলির কোনো নিয়ম নেই। যদি কেউ অন্য অঙ্গ রাজ্যে চাকরি করতে চান, তাহলে তাঁকে এই রাজ্যের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অন্য রাজ্যে চাকরি নিতে হয়। আমাদের দেশে ভালো বা আকর্ষণীয় পদে বদলির জন্য যে হাজার হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয় এদেশে তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। তবে যদি কোনো সরকারি কর্মচারী তার সৃজনী শক্তি বা কর্ম দক্ষতা দিয়ে ভালো কাজ করেন তবে অন্যন্য অঙ্গ রাজ্য তাকে তাদের রাজ্যে অধিকতর বেতন ভাতা বা সুযোগ সুবিধা দিয়ে তাকে তাদের রাজ্যে নিয়ে যাওয়ার অনেক অনেক উদাহরণ রয়েছে ।
উল্লেখ্য যে, মনে করেন কেন্দ্রীয় সরকার আপনার অঙ্গ রাজ্যকে প্রাইমারি শিক্ষা বাবদ ১০০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিলো এই শর্তে যে আপনি ১০০% ভাগ স্কুল এনরোলমেন্ট করবেন। যদি ৬০% ভাগ এনরোলমেন্ট হয় তাহলে ৬০ মিলিয়ন পাবেন। অর্থাৎ পুরো টাকাটা পেলেন না। যে স্কুল সুপার বা যিনি বিভিন্ন নব নব উদ্বারনী পদ্ধতির মাধ্যমে তার রাজ্যের এনরোলমেন্ট ১০০% বা শতভাগ করতে সক্ষম হবেন তাকে অন্যন্য রাজ্যের লোকেরা বেশি বেতন দিয়ে তাদের রাজ্যে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করবেন। সুতরাং আপনার কর্মস্পীহা এবং উদ্ভাবনী শক্তির মূল্যায়ন করা হয়।
আমেরিকাতে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা পররাষ্ট্র, জাতীয় নিরাপত্তা, ফেডারেল রাজস্ব আদায় এবং কেন্দ্রীয় বিচার বিভাগের মধ্যে সীমিত। ৭/৮ টার বেশি মন্ত্রণালয় বা দফতর কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে নেই। বাকি সব কাজ কর্ম স্থানীয় সরকারের অধীনে হয়ে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোনো কাজের জন্য এদের কাউকেই রাজধানী ওয়াশিংটনে ধর্ণা দিতে হয় না। তাদের এই বিকেন্দ্রীকরণ ব্যবস্থা জনগণের কল্যাণে নিয়োজিত। আজ প্রায় ২৫০ বছর থেকে তাদের এ শাসনব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত এবং তাদের এই প্রশাসনিক কাঠামো পরীক্ষিত সাফল্যের হাতিয়ার।
জেলায় জেলায় জেলা সরকার অঙ্গ রাজ্যের অনুকরণ
আমার “জেলায় জেলায় জেলা সরকার পদ্ধতি” এরই বিশেষ সংস্করণ। এ প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও কার্যক্রম যেহেতু সফলভাবে কাজ করছে, সুতরাং এই ব্যবস্থা চালু রাখতে আপত্তি কেন?
আমাদের দেশে দূরনিতী, মানুষের হয়রানি, এবং যিনিই সরকারে যান তিনিই একনায়ক হয়ে পড়েন এই প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকৃত পদ্ধতি চালু হলে একনায়কতন্ত্র বা স্বৈরাচারী হওয়ার সম্ভাবনা তিরোহিত হবে বলে আমার বিশ্বাস ।
দ্বিতীয়ত দুর্নীতি ব্যাপক হারে কমবে।
পুলিশের বড় সাহেব বা পুলিশ কমিশনার যদি স্থানীয় জনগণের নির্বাচিত মেয়রের মাধ্যমে নিয়োগ পান তাহলে তার জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। তিনি এক জেলার বরাদ্দকৃত অর্থ অন্য জেলায় নিয়ে যেতে পারবেন না এবং যদি তিনি দুর্নীতির মাধ্যমে আয়ের চেয়ে বেশি সম্পদ উপার্জন করেন, তাহলে তা তিনি জনগণের চোখ এড়িয়ে যেতে পারবেন না । তাতে দূরনিতী যেমন কমবে যথেচ্ছাচারিতাও কমবে। তবে এই পদ্ধতি চালু করার পর পরই সব অর্জন সম্ভব নয় ।
মোদ্দা কথা হচ্ছে, বর্তমানে আওয়ামীলীগের দূর্দিন। আওয়ামী লীগের শক্তি দেশের জনগণ। সুতরাং জনগণের মঙ্গলের জন্য এবং তাদেরে সরকারে সম্পৃক্ত করার জন্য আমাদের “নির্বাচিত জেলা গবর্ণর পদ্ধতি” চালু করার জন্য ব্যপাক প্রচারণা দরকার। এরফলে তৃণমূলের লক্ষকোটি জনগণের সরকারের স্বাদ ও সেবা গ্রহণ করতে সক্ষম হবে।
আমেরিকায় রাজ্যে রাজ্যে প্রতিযোগিতা চলছে
এই ব্যবস্থা চালু থাকায় আমেরিকার অঙ্গ রাজ্য সমুহের মধ্যে সার্বক্ষনিক প্রতিযোগিতা চলছে। কোনো এক অঙ্গরাজ্যে যদি জীবন যাত্রার খরচ বেড়ে যায় তখন অন্য কোনো অঙ্গ রাজ্য বড় বড় ব্যবসা প্রতিস্টানকে তার রাজ্যে তাদের ব্যবসা স্থানান্তর করার জন্য বিভিন্ন ধরনের আয়কর বা অন্যবিধ সুযোগ সুবিধা প্রদান করে। তাতে দেশের সৃজনী শক্তি কাজে লাগে।প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রকল্প চালু হচ্ছে বা উদ্বোধন হচ্ছে ।
এই ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য কিনা তার জন্য জরিপ করা প্রয়োজন
বর্তমানে বিভিন্ন জেলা উপজেলার তৃণমূলের নেতৃত্বের সাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখছেন। ভার্চুয়ালি আলাপ আলোচনা করছেন। তিনি তাদের বিভিন্ন নির্দেশনা দিচ্ছেন। আমার প্রস্তাব হবে তিনি এবিষযটি সম্পর্কে তাদের মতামত নিতে পারেন এবং এধরনের প্রশাসনিক ও শাসনতান্তিক ব্যবস্থা চালু করতে পারলে জনগণের হয়রানি যেমন কমবে, ঘুষ-দূরনীতি কমবে, সরকারি দপ্তরের যথেচ্ছাচারিতা কমবে, একনায়কতন্ত্র কমবে, খয়রখা বা তোষামুদি কমবে এবং স্বেচ্ছাচারিতা ও কমবে। কদিন পর পর সরকারকে উৎখাত করতে হবে না ।
আওয়ামী লীগের এখন করনীয়
আওয়ামী লীগের এখন করনীয়
আওয়ামী লীগের উপর নিষেধাজ্ঞা নতুন নয়। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ূব খান এবং এরপর জেনারেল ইয়াহযিয়া খান আওয়ামী লীগের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন এবং দলের সমর্থকদের ওপর জেল, জুলুম, নির্যাতন, মিথ্যা হামলা মামলা দায়ের করেন। তারপর ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক সরকার আওয়ামীলীগের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তবে সকল নিষেধাজ্ঞা এবং অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করে আওয়ামী লীগ সবসময়ই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কারণ “আওয়ামী” লীগ যার অর্থ হচ্ছে “আম জনতা” বা জনতার দল তার অন্তনিহিত শক্তি হচ্ছে জনগণ জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, চাওয়া-পাওয়া, তাদের স্বাধিকার এবং প্রত্যশ্যা। যতদিন মানুষের প্রত্যশ্যা থাকবে, আশা-আকাংখা থাকবে, অধিকার আদায়ের সংগ্রাম থাকবে, আওয়ামী লীগ ঠিকে থাকবে এবং কাল্পনিক ফিনিক্স পাখির মতো অদম্য শক্তিতে বার বার বলীয়ান হয়ে জেগে উঠবে। আওয়ামী লীগ কারো হুকুমে ধ্বংস হবে না যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, মানুষের সুখ দুঃখের, আশা-আকাঙ্ক্ষার সংকট ও সংগ্রাম থাকবে, ততদিন আওয়ামী লীগ জনগণের অধিকার আদায়ের হাতিয়ার বা দল হিসাবে অবশ্যই টিকে থাকবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আওয়ামী লীগ হচ্ছে জনগণের অনুভূতি, জীবনের স্পন্দন এবং অধিকার আদায়ের হাতিয়ার। ২০২৪শের সুনামি শুধু আওয়ামী লীগের উপরই নয়, জাতির ভিত্তির উপর তবে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের উপর যে সুনামি বা আঘাত এসেছে তা থেকে মুক্তির জন্য আওয়ামী লীগ দলকে ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত করতে হবে।এবারের সুনামি শুধু আওয়ামী লীগের ওপরই নয় বরং বাংলাদেশ জাতির ভিত্তি বা জাতিসত্তা ধ্বংসের সুনামি। জাতিকে মৌলবাদী বা পাকিস্তানি ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ করতে বা শক্তিতে রূপান্তরিত করার ষড়যন্ত্র। দলকে সুসংগঠিত করতে হবে ? এক নাগাড়ে ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকায় ফলে দলের মধ্যে বহু আগাছা জন্ম নিয়েছে, দলের মধ্যে বহু দ্বিধা বিভক্তি দেখা দিয়েছে। এসব আগাছা পরিষ্কার করে, দলের মধ্যে একতা বজায় রাখা এখন সময়ের দাবি। সুখের বিষয় যে, দলের ত্যগী ও অন্যন্য নেতা শেখ হাসিনা এখনো জীবিত আছেন। সুতরাং তাঁর নেতৃত্বে প্রথমত দলকে শক্ত ভিতের উপর সুসংগঠিত করতে হবে। দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাদের মধ্যে বিভাজন রয়েছে, অনেকে দুই দশক বা তার উর্ধ্বে থেকে দলের নেতৃত্বে রয়েছেন এবং তাঁরা নতুন ও প্রবীণদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করেছেন। এসব দূরত্ব ঘোচিয়ে দলকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলার বিকল্প নেই । আওয়ামী লীগের শক্তি জনগণ যেহেতু আওয়ামী লীগ জনগণের দল, জনগণই এর মূল শক্তি ও ভিত্তি, সুতরাং জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষা কিভাবে বাস্তবায়ন ও চরিতার্থ করা সম্ভব তা নিয়ে ভাবতে হবে। ষাট বা আশি দশকের চিন্তাভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে জনগণকে কিভাবে ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত করা যায়, কিভাবে তাদের সমর্থন আদায় করা সম্ভব তা নিয়ে আলোচনা, এবং চিন্তা ভাবনার সময় এসেছে। ২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজয় ও দিন বদলের অনবদ্য সনদ সৃষ্টি ২০০১ সালে আওয়ামীলীগের পরাজয়ের পর আওয়ামী লীগনেত্রী শেখ হাসিনা দীর্ঘ অনেক বছর, ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত— আওয়ামী লীগ যদি ভবিষ্যতে কোনো দিন ক্ষমতায় আসতে পারে তাহলে আওয়ামী লীগ সরকার কি কি উন্নয়ন কাজ করবে তা নিয়ে বিশদ চিন্তা ভাবনা করেন। সেই সব চিন্তাভাবনার ফসল হচ্ছে “দিন বদলের সনদ” যা জাতিকে নতুন নতুন স্বপ্ন দেখায় এবং তাদের আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণে সক্ষম হয়। মাননীয় দেশনেত্রী শেখ হাসিনা ঐসময়ে আমার বড়ভাই আবুল মাল আব্দুল মুহিতকে নিয়ে “দিন বদলের সনদ” তৈরির জন্য কাজ করেন। মুহিতভাইয়ের কারণে এবং শাকিলের জন্য আমি সময় সময় তাদের কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পাই। শাকিলের অকাল মৃত্যু দলের জন্য দুঃখজনক। মুহিত ভাইয়ের পরিকল্পনা এবং শেখ হাসিনার মানবিকতা: এক অপূর্ব সমন্বয় যে জিনিসটি আমি লক্ষ্য করি তা হচ্ছে, মুহিতভাই তাঁর বিরাট পান্ডিত্য এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দেশের উন্নয়ন কিভাবে তড়িৎ গতিতে অর্জন করা যায় তার রুপরেখা তৈরি করেন আর মাননীয় নেত্রী শেখ হাসিনা যিনি সবসময়ই জনমনপণ, গরীব মানুষের উন্নয়ন কিভাবে সম্ভব, জনগণের মঙ্গল কি করলে হবে, অর্থাৎ মানবিক দিকটা নিয়ে তিনি সবসময়ই সচেতন — এদুয়ের সম্বনয়ে তাঁরা যা তৈরি করলেন তা জাতিকে যেমন দিয়েছে উন্নত জীবনের আস্বাদন, বিশ্বকে তাক লাগিয়ে বাংলাদেশ হয়ে উঠে “উন্নয়নের রোল মডেল” এবং দক্ষিণের দেশগুলোর ঈস্পিত আদর্শ। সম্মিলিত জাতিসঙ্ঘ একে “উন্নয়নের রোল মডেল” হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং মার্কিন প্রভাবশালী প্রত্রিকা “ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট জার্নাল” একে “a standard bearer of the South” বলে আখ্যায়িত করে । দারিদ্র্য ক্লিস্ট বাংলাদেশ সঠিক নেতৃত্ব এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যে অনন্য অবদান রাখতে পারে বিশ্ববাসীকে তা স্মরণ করিয়ে দেয়। যেখানে ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ — এই দীর্ঘ ১৫ বছরে বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.২% শতাংশ তা শেখ হাসিনার শাসনামলে দ্বিগুণের বেশি অর্থাৎ ৬.৮% শতাংশের অধিক বৃদ্ধি পায়। আপনাদের মনে আছে ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ বাংলাদেশ শাসিত হয়, সামরিক, আধাসামরিক, সামরিক-বেসামরিক ও টেকনেক্রেট নেতৃত্বের দারা। তাদের অর্জন শেখ হাসিনার অর্জন থেকে অনেক অনেক কম। হাসিনা-ইকোনোমিক্স ও তার অর্জন বস্তুত
শেখ হাসিনার সরকারে বা Hasina-economics যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে (১) দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়ানো যাতে ২০৪১ সালে মধ্যে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন “সোনার বাংলা” অর্জিত হয় এবং দ্বিতীয়ত (২) দারিদ্র্য বিমোচন— এদুটি ক্ষেত্রেই শেখ হাসিনার অর্জন অভাবনীয়। পৃথিবীর বড় বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ “best performing economy” বা সবচেয়ে বেশি ভালো অর্থনীতির উন্নয়নের দেশগুলোর মধ্যে ত্বীতিয় স্থান অর্জন করতে সক্ষম হয়। শুধু জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়েনি একি সময়ে দারিদ্র্য সীমা ৪২% শতাংশ থেকে কমে গিয়ে ১৮% শতাংশে নেমে আসে যা পৃথিবীর মধ্যে সর্বাধিক। টীম ওয়ার্ক কাজে লাগে তাঁর কাজটি করার জন্য তিনি নিজ উদ্যোগে আরো কয়েকজন সহযোগী নিয়োগ দেন যারা তাঁর সাথে জীবনের কোনো এক সময় চাকরি করেছেন এবং তাঁরা হচ্ছেন সর্বজনাব ড. মসিউর রহমান, ড. এস, এ সামাদ, সাবের হোসেন চৌধুরী, আসাদুজ্জামান নূর প্রমুখ। সবার কথা আমার ঠিক এখন মনে পড়ছে না। মুহিত ভাই খসড়া তৈরি করে শাকিলের মাধ্যমে সময় সময় তা আমাকে পাঠাতেন। আমি তখন জাতিসংঘের এম-ডি-জি (Millennium Development Goals, MDGs) নিয়ে কাজ করছিলাম। সূতরাং আমি “দিন বদলের সনদে” অনেকগুলো এমডিজির লক্ষমাত্রা ঢুকিয়ে দেই যেমন দারিদ্র্য বিমোচন, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা, সবার জন্য পানীয় জল, ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ, পরিবেশ বান্ধব নগরায়ন, ইত্যদি ইত্যাদি। আমার যুক্তি ছিল যে যেহেতু জাতিসংঘ এগুলো অর্জন করতে চায় এবং সব সদস্য রাষ্ট্রসমুহ এগুলি অর্জন করুক তা তারা দেখতে চায়, সুতরাং আমরা যদি এগুলো আমাদের লক্ষ্যমাত্রায় সংযুক্ত করি তাহলে এগুলো বাস্তবায়নের জন্য আমরা জাতিসংঘের কাছ থেকে সহায়তা চাইতে পারি। সুদা সদনে গবেষণার অফিস দেশনেত্রী শেখ হাসিনা এসব কাজ করার জন্য তিনি তাঁর “সুদাসদনে” জায়গা করে দেন এবং কয়েকটি কম্পিউটারের ব্যবস্থা করেন। পরবর্তীতে তা থেকে জন্ম নেয় সি-আর-আই (CRI: Center for Research and Information). বর্তমানে কি করণীয়? আমাদের দেশে যেই সরকার গঠন করে— নির্বাচিত বা অনির্বাচিত সবাই একনায়কত্ব কায়েম করে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রয়োজন সরকারের ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। ক্ষমতাকে জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়া যেটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জেলায় জেলায় জেলা গবর্ণর পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন বঙ্গবন্ধু জেলায় জেলায় “জেলা গভর্নর ” পদ্ধতি চালু করেছিলেন। সময়ের স্বল্পতার কারণে “নির্বাচিত গভর্নর ” নিয়োগ দিতে পারেননি। তবে তাঁকে হত্যা এবং উৎখাত করার পর পরই সরকারি আমলারা তড়িৎ বেগে সবচেয়ে প্রথম জেলা গভর্নর পদ্ধতি বাতিল করেন এবং তা করে দেশকে বহু বছর পিছনে ফেলে দেন। জেলা গভর্নর পদ্ধতি চালু করার জন্য ব্যাপক প্রচারণা ও গবেষণা প্রয়োজন জেলায় জেলায় নির্বাচিত জেলা গবর্ণর পদ্ধতি চালু করার আগে এ সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করতে হবে। বর্তমানে দেশে ৬৪ টি জেলা আছে। প্রত্যক জেলায় একজন জেলা গবর্ণর জনগণের ডাইরেক্ট ভোটে নির্বাচিত হবেন। প্রত্যক জেলায় একটি জন প্রতিনিধি পরিষদ নির্বাচিত হবে এবং এই পরিষদ তার জেলার আয়-ব্যয় ও সম্পদ বিবেচনায় নিয়ে গবর্ণর এবং জেলার অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বেতন ও সুযোগ সুবিধা নির্ধারণ করবেন। যে জেলার আয় বেশি তারা তাদের কর্মচারীদের বেশি সুযোগ সুবিধা ও বেশি বেতন ভাতা দিবেন। বর্তমানে যে জেলা প্রশাসক রয়েছেন সে পদটি বিলুপ্ত হবে। প্রত্যক জেলায় তাদের গণপরিষদ তাদের জেলায় কি কি ডিপার্টমেন্ট বা মন্ত্রণালয় দরকার তা তারা নির্ধারণ করবেন। মনে করেন সিলেট এলাকায় পর্যটন শিল্প গড়ে উঠার সম্ভাবনা আছে। সুতরাং সিলেট জেলায় পর্যটন বিভাগ চালু হবে। তবে যেহেতু সিলেটে পাঠ উৎপাদন হয় না, সুতরাং পাঠের কোনো দপ্তরের প্রয়োজন নেই। বরং ময়মনসিংহ বা ফরিদপুরে যেখানে পাঠ শিল্প রয়েছে সেখানে পাঠ বিভাগ করা যেতে পারে। যে জেলায় এর সম্ভাবনা নেই, সেখানে পর্যটন বিভাগ থাকবে না। লক্ষ্যণীয় হচ্ছে স্থানীয় বিবেচনায় দপ্তর বা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ব্যবস্থা এমন ব্যাবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে। আমেরিকায় ৫০ টি অঙ্গ রাজ্য রয়েছে এবং প্রত্যকটি অঙ্গ রাজ্য স্বাধীন। আমাদের দেশের মতো প্রত্যকটি অঙ্গ রাজ্যের সরকারি কর্মচারীদের বা নির্বাচিত জন প্রতিনিধিদের সুযোগ সুবিধা বা বেতন ভাতা সমান নয়। নব্বই দশকে ম্যাসাচুচেস্ট অ্ঙ্গ রাজ্যের গবর্ণর ছিলেন আমার ঘনিষ্ঠজন মাইকেল ডুকাকিস। তিনি ১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী নির্বাচিত হন। তাঁর মতো সৎ, উদার এবং ভদ্রলোক রাজনীতিবিদ আমি খুব কম দেখেছি। তিনি প্রেসিডেন্ট বুশ সিনিয়ারের কাছে পরাজিত হন। তিনি ১২ বছর গবর্ণর ছিলেন। তখন তার বেতন ছিল ১১০,০০০ হাজার ডলার। একি সময়ে বিল ক্লিনটন যিনি পরবর্তীতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হন তার বেতন ছিল ৩৫,০০০ হাজার ডলার। আরকানসাস যেহেতু দরিদ্র অঙ্গরাজ্য সেজন্য তাদের বেতন ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদির কম ছিল। তবে ধনী অঙ্গরাজ্য নিউ ইয়র্কের গবরণর কোমোর বেতন ছিল ১৮৯,০০০ হাজার ডলার। ম্যাসাসেস্ট অঙ্গরাজ্যে সবচেয়ে বেশী বেতন পান ঐ রাজ্যের স্কুল সুপারিনটেনডেন্ট । কারণ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা শিক্ষার উপর অধিকার ঘুগুত্ব দেন। এই অঙ্গরাজ্যে বিশ্বের বহু নামীদামী ১১৭ টি
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা পিএইচডি ডিগ্রি দেয়। হার্ভাড, এম-আই-টি, ট্রাফট, নর্থ ইস্টার্ন, ব্রেনডাইজ, বা বস্টন ইউনিভার্সিটি বা বস্টন কলেজ, স্মিথ কলেজ, ওয়েলেসলি কলেজ ইত্যাদি বহু নামীদামী প্রতিষ্ঠান এই রাজ্যে অবস্থিত। এই রাজ্যের বার্ষিক রাজস্বের আয়ের এক তৃতীয়াংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অর্জিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক শহরের পুলিশ কমিশনার বা অন্যবিদ সরকারি কর্মচারীদের নিয়োগ দেন রাজ্যের গবর্ণর বা মেয়র সাহেব। এদেশে এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে বদলির কোনো নিয়ম নেই। যদি কেউ অন্য অঙ্গ রাজ্যে চাকরি করতে চান, তাহলে তাঁকে এই রাজ্যের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অন্য রাজ্যে চাকরি নিতে হয়। আমাদের দেশে ভালো বা আকর্ষণীয় পদে বদলির জন্য যে হাজার হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয় এদেশে তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। তবে যদি কোনো সরকারি কর্মচারী তার সৃজনী শক্তি বা কর্ম দক্ষতা দিয়ে ভালো কাজ করেন তবে অন্যন্য অঙ্গ রাজ্য তাকে তাদের রাজ্যে অধিকতর বেতন ভাতা বা সুযোগ সুবিধা দিয়ে তাকে তাদের রাজ্যে নিয়ে যাওয়ার অনেক অনেক উদাহরণ রয়েছে । উল্লেখ্য যে, মনে করেন কেন্দ্রীয় সরকার আপনার অঙ্গ রাজ্যকে প্রাইমারি শিক্ষা বাবদ ১০০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিলো এই শর্তে যে আপনি ১০০% ভাগ স্কুল এনরোলমেন্ট করবেন। যদি ৬০% ভাগ এনরোলমেন্ট হয় তাহলে ৬০ মিলিয়ন পাবেন। অর্থাৎ পুরো টাকাটা পেলেন না। যে স্কুল সুপার বা যিনি বিভিন্ন নব নব উদ্বারনী পদ্ধতির মাধ্যমে তার রাজ্যের এনরোলমেন্ট ১০০% বা শতভাগ করতে সক্ষম হবেন তাকে অন্যন্য রাজ্যের লোকেরা বেশি বেতন দিয়ে তাদের রাজ্যে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করবেন। সুতরাং আপনার কর্মস্পীহা এবং উদ্ভাবনী শক্তির মূল্যায়ন করা হয়। আমেরিকাতে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা পররাষ্ট্র, জাতীয় নিরাপত্তা, ফেডারেল রাজস্ব আদায় এবং কেন্দ্রীয় বিচার বিভাগের মধ্যে সীমিত। ৭/৮ টার বেশি মন্ত্রণালয় বা দফতর কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে নেই। বাকি সব কাজ কর্ম স্থানীয় সরকারের অধীনে হয়ে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোনো কাজের জন্য এদের কাউকেই রাজধানী ওয়াশিংটনে ধর্ণা দিতে হয় না। তাদের এই বিকেন্দ্রীকরণ ব্যবস্থা জনগণের কল্যাণে নিয়োজিত। আজ প্রায় ২৫০ বছর থেকে তাদের এ শাসনব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত এবং তাদের এই প্রশাসনিক কাঠামো পরীক্ষিত সাফল্যের হাতিয়ার। জেলায় জেলায় জেলা সরকার অঙ্গ রাজ্যের অনুকরণ আমার “জেলায় জেলায় জেলা সরকার পদ্ধতি” এরই বিশেষ সংস্করণ। এ প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও কার্যক্রম যেহেতু সফলভাবে কাজ করছে, সুতরাং এই ব্যবস্থা চালু রাখতে আপত্তি কেন? আমাদের দেশে দূরনিতী, মানুষের হয়রানি, এবং যিনিই সরকারে যান তিনিই একনায়ক হয়ে পড়েন এই প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকৃত পদ্ধতি চালু হলে একনায়কতন্ত্র বা স্বৈরাচারী হওয়ার সম্ভাবনা তিরোহিত হবে বলে আমার বিশ্বাস । দ্বিতীয়ত দুর্নীতি ব্যাপক হারে কমবে। পুলিশের বড় সাহেব বা পুলিশ কমিশনার যদি স্থানীয় জনগণের নির্বাচিত মেয়রের মাধ্যমে নিয়োগ পান তাহলে তার জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। তিনি এক জেলার বরাদ্দকৃত অর্থ অন্য জেলায় নিয়ে যেতে পারবেন না এবং যদি তিনি দুর্নীতির মাধ্যমে আয়ের চেয়ে বেশি সম্পদ উপার্জন করেন, তাহলে তা তিনি জনগণের চোখ এড়িয়ে যেতে পারবেন না । তাতে দূরনিতী যেমন কমবে যথেচ্ছাচারিতাও কমবে। তবে এই পদ্ধতি চালু করার পর পরই সব অর্জন সম্ভব নয় । মোদ্দা কথা হচ্ছে, বর্তমানে আওয়ামীলীগের দূর্দিন। আওয়ামী লীগের শক্তি দেশের জনগণ। সুতরাং জনগণের মঙ্গলের জন্য এবং তাদেরে সরকারে সম্পৃক্ত করার জন্য আমাদের “নির্বাচিত জেলা গবর্ণর পদ্ধতি” চালু করার জন্য ব্যপাক প্রচারণা দরকার। এরফলে তৃণমূলের লক্ষকোটি জনগণের সরকারের স্বাদ ও সেবা গ্রহণ করতে সক্ষম হবে। আমেরিকায় রাজ্যে রাজ্যে প্রতিযোগিতা চলছে এই ব্যবস্থা চালু থাকায় আমেরিকার অঙ্গ রাজ্য সমুহের মধ্যে সার্বক্ষনিক প্রতিযোগিতা চলছে। কোনো এক অঙ্গরাজ্যে যদি জীবন যাত্রার খরচ বেড়ে যায় তখন অন্য কোনো অঙ্গ রাজ্য বড় বড় ব্যবসা প্রতিস্টানকে তার রাজ্যে তাদের ব্যবসা স্থানান্তর করার জন্য বিভিন্ন ধরনের আয়কর বা অন্যবিধ সুযোগ সুবিধা প্রদান করে। তাতে দেশের সৃজনী শক্তি কাজে লাগে।প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রকল্প চালু হচ্ছে বা উদ্বোধন হচ্ছে । এই ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য কিনা তার জন্য জরিপ করা প্রয়োজন বর্তমানে বিভিন্ন জেলা উপজেলার তৃণমূলের নেতৃত্বের সাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখছেন। ভার্চুয়ালি আলাপ আলোচনা করছেন। তিনি তাদের বিভিন্ন নির্দেশনা দিচ্ছেন। আমার প্রস্তাব হবে তিনি এবিষযটি সম্পর্কে তাদের মতামত নিতে পারেন এবং এধরনের প্রশাসনিক ও শাসনতান্তিক ব্যবস্থা চালু করতে পারলে জনগণের হয়রানি যেমন কমবে, ঘুষ-দূরনীতি কমবে, সরকারি দপ্তরের যথেচ্ছাচারিতা কমবে, একনায়কতন্ত্র কমবে, খয়রখা বা তোষামুদি কমবে এবং স্বেচ্ছাচারিতা ও কমবে। কদিন পর পর সরকারকে উৎখাত করতে হবে না ।
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
রওশন টাওয়ার, (লিফট-৮) ১৫২/২/এ২ গ্রীণ রোড ,
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ ।
মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত