সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বাংলাদেশে অপটোমেট্রি পেশার আইনগত স্বীকৃতি কেন বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে?

বাংলাদেশে অপটোমেট্রি পেশার আইনগত স্বীকৃতি কেন বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে?

বাংলাদেশে চক্ষুস্বাস্থ্য খাতে নীরব বিপ্লব ঘটানোর সক্ষমতা রয়েছে অপটোমেট্রি পেশার। বিশ্বজুড়ে অপটোমেট্রিস্টরা প্রাথমিক চোখের পরীক্ষা, দৃষ্টিজনিত সমস্যার নির্ণয়, চশমা কনট্যাক্ট লেন্সের প্রেসক্রিপশন প্রদান, দৃষ্টিশক্তি পুনর্বাসন এবং চোখের বিভিন্ন রোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। উন্নত বিশ্বের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় তারা প্রাথমিক চক্ষুসেবার অন্যতম নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে স্বীকৃত।

কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে অপটোমেট্রি পেশা পূর্ণাঙ্গ আইনগত স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত ছিল। যদিও সম্প্রতি বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিলের আওতায় অপটোমেট্রি পেশাজীবীদের নিবন্ধনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা অনেকের কাছে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, তারপরও বিষয়টি ঘিরে বিতর্ক নানা ধরনের অপতৎপরতা থেমে নেই। অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাবশালী মহল বিভিন্নভাবে এই নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে, যাতে এর পরিধি আর সম্প্রসারিত না হয় এবং এটি একটি কার্যকর সর্বজনগ্রহণযোগ্য নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থায় পরিণত হতে না পারে।

প্রশ্ন হলোকারা এবং কেন অপটোমেট্রি পেশার আইনগত স্বীকৃতির পথকে জটিল করে তুলছে?

প্রথমত, অপটোমেট্রিস্টদের কাজের পরিধি সম্পর্কে এখনো সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকে মনে করেন, অপটোমেট্রিস্ট মানেই চশমার দোকানে বসে পাওয়ার মাপার ব্যক্তি। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একজন প্রশিক্ষিত অপটোমেট্রিস্ট একজন স্বতন্ত্র প্রাথমিক চক্ষুস্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী পেশাজীবী। অপটোমেট্রিস্ট, অপথালমোলজিস্ট এবং অপটিশিয়ানের কাজের ক্ষেত্র ভিন্ন হলেও আমাদের দেশে বিষয়ে পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব রয়েছে। ফলে নীতিনির্ধারকদের কাছেও বিভ্রান্তিকর তথ্য পৌঁছে যায় এবং আইনগত স্বীকৃতির যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

দ্বিতীয়ত, একটি স্বচ্ছ নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু হলে শিক্ষাগত যোগ্যতা পেশাগত মানদণ্ডের কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মুখে পড়তে হবে। বর্তমানে বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ, অননুমোদিত কোর্স কিংবা অস্পষ্ট একাডেমিক পটভূমি নিয়ে অনেকেই নিজেদের অপটোমেট্রিস্ট হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। নিবন্ধনভিত্তিক ব্যবস্থা চালু হলে কে প্রকৃত অর্থে নিবন্ধনের যোগ্য, তা নির্ধারিত হবে। ফলে যাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তারা স্বাভাবিকভাবেই এই প্রক্রিয়ার বিরোধিতায় সক্রিয় হতে পারেন।

তৃতীয়ত, দেশে এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছেন যারা অপটোমেট্রিস্ট পরিচয় ব্যবহার করলেও তাদের প্রকৃত শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তারা হয়তো অপটিক্যাল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু স্বীকৃত অপটোমেট্রি শিক্ষা গ্রহণ করেননি। এই পরিচয়ের অপব্যবহার জনগণকে বিভ্রান্ত করে এবং প্রকৃত অপটোমেট্রিস্টদের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে। নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু হলে এসব পরিচয়ের সত্যতা যাচাই সম্ভব হবে।

চতুর্থত, "ছদ্ম অপটোমেট্রিস্ট" বা সিউডো অপটোমেট্রিস্টদের দৌরাত্ম্যও একটি বড় সমস্যা। কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বা দক্ষতা ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে চোখের পরীক্ষা, পাওয়ার নির্ধারণ এবং বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে আসছেন এমন ব্যক্তির সংখ্যা কম নয়। বিশেষ করে গ্রামীণ শহরতলির এলাকায় এদের উপস্থিতি বেশি। জনগণের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে তারা একটি অনিয়ন্ত্রিত বাজার গড়ে তুলেছেন। আইনগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই বিরোধিতার জন্ম হতে পারে।

পঞ্চমত, বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে দেশে ফিরে আসা অনেক দক্ষ অপটোমেট্রিস্ট পেশাগত দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হন। ভারত, নেপাল, বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি অর্জনকারী পেশাজীবীরা দেশে ফিরে আধুনিক বৈজ্ঞানিক চর্চা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিদ্যমান অগোছালো ব্যবস্থার সঙ্গে তাদের মতপার্থক্য দেখা দেয়। মানসম্মত শিক্ষা, নৈতিকতা আন্তর্জাতিক প্রোটোকল অনুসরণের দাবি অনেকের কাছে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যা পেশার ভেতরেই বিভাজন সৃষ্টি করে।

ষষ্ঠত, কিছু অপটোমেট্রিস্ট ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক স্বার্থে নিজেদের পেশাগত স্বাতন্ত্র্যকে দুর্বল করে ফেলেন। যদিও অধিকাংশ চক্ষু বিশেষজ্ঞ অপটোমেট্রিস্ট পারস্পরিক শ্রদ্ধা সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করতে আগ্রহী, তবুও কিছু ক্ষেত্রে নির্ভরশীলতার সংস্কৃতি বজায় রাখার প্রবণতা দেখা যায়। এতে অপটোমেট্রিস্টদের স্বাধীন পেশাগত পরিচয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা আড়ালে পড়ে যায়।

সপ্তমত, ডিগ্রিবিহীন ব্যক্তিদের অপটোমেট্রিস্ট পরিচয় ব্যবহারের কারণে পেশাটিতে এক ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে। কেউ কয়েক মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে, আবার কেউ শুধুমাত্র অভিজ্ঞতার দাবি করে নিজেদের বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন। এর ফলে সাধারণ মানুষ প্রকৃত যোগ্য পেশাজীবীকে চিহ্নিত করতে পারছেন না। একই সঙ্গে ভুল পরামর্শ, দৃষ্টিজনিত জটিলতা এবং রোগ নির্ণয়ে বিলম্বের ঝুঁকিও বাড়ছে।

সবশেষে, অপটোমেট্রি পেশার অভ্যন্তরীণ ঐক্যের অভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বিভিন্ন সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পেশাজীবীদের মধ্যে মতপার্থক্য অনেক সময় বৃহত্তর স্বার্থকে পিছিয়ে দেয়। কে নেতৃত্ব দেবে, কোন ডিগ্রি গ্রহণযোগ্য হবে কিংবা কার প্রতিনিধিত্ব কতটুকু থাকবেএসব প্রশ্নে বিভক্তি তৈরি হয়। অথচ আইনগত স্বীকৃতি অর্জনের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ অবস্থান সুস্পষ্ট রোডম্যাপ।

বাংলাদেশে চক্ষুস্বাস্থ্যসেবার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখনো প্রাথমিক দৃষ্টিসেবা থেকে বঞ্চিত। ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি, গ্লুকোমা, শিশুদের রিফ্র্যাকটিভ এরর, নিম্নদৃষ্টি পুনর্বাসনসহ নানা ক্ষেত্রে দক্ষ অপটোমেট্রিস্টদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও প্রাথমিক চক্ষুস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় দক্ষ মানবসম্পদ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।

বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিলের অধীনে নিবন্ধন প্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছ, বৈজ্ঞানিক অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি শুধু অপটোমেট্রি পেশার মর্যাদাই প্রতিষ্ঠা করবে না; বরং জনগণকে নিরাপদ মানসম্মত চক্ষুসেবা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু হলে কে প্রকৃত অর্থে প্রশিক্ষিত যোগ্য অপটোমেট্রিস্ট এবং কে ননতা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। এতে ভুয়া পরিচয়ে সেবা প্রদান, পেশাগত নৈরাজ্য এবং রোগীদের বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ অনেকাংশে কমে আসবে।

অতএব, অপটোমেট্রি পেশার আইনগত স্বীকৃতি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন। একটি স্বচ্ছ গ্রহণযোগ্য নিয়ন্ত্রক কাঠামো, শিক্ষাগত মান নির্ধারণ, নিবন্ধন প্রক্রিয়ার সম্প্রসারণ এবং পেশাগত নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে দেশের চক্ষুস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।

সময় এসেছে ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার। অপটোমেট্রিস্টদের যথাযথ আইনগত স্বীকৃতি শুধু একটি পেশার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করবে না; বরং বাংলাদেশের লাখো মানুষের দৃষ্টিস্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ সুস্থ দৃষ্টি কেবল ব্যক্তির জীবনমানই উন্নত করে না, এটি একটি উৎপাদনশীল, সচেতন মানবিক সমাজ গঠনেরও পূর্বশর্ত।

 

লেখক: ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক গবেষণা ফেলো
ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি, মালয়েশিয়া
প্রধান উপদেষ্টা, বাংলাদেশ অপটোমেট্রিক সোসাইটি (BOS)

খুঁজুন