সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত একের পর এক ছিনতাই আতঙ্কে নগরবাসী

একের পর এক ছিনতাই আতঙ্কে নগরবাসী

রাজধানীতে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে ছিনতাই। শুধু রাতে নয়, দিন-দুপুরেও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। সড়কে অপরাধীদের মহড়া, কুপিয়ে জখম ও ধারালো অস্ত্র ঠেকিয়ে সর্বস্ব লুটে নেওয়ার বিভিন্ন ঘটনার ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ পাওয়ার পর জনমনে আরো বেশি আতঙ্ক তৈরি করছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। দিন-রাতের ব্যবধান না রেখে ব্যস্ত সড়ক, অলিগলি, ফুটপাত, হাসপাতাল এলাকা এবং গণপরিবহনকেন্দ্রিক বিভিন্ন স্থানে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ছিনতাইকারী চক্র। কয়েকদিন আগে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে ছিনতাইকারীদের হামলায় এক নারীর মৃত্যুর ঘটনায় জনমনে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিনই মোবাইল ফোন, টাকা, স্বর্ণালংকার ও ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত চার মাসে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১১৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে ২৫টি, মার্চে ২৯টি, এপ্রিলে ২৬টি এবং মে মাসে ৩৬টি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। তবে, সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা এর কয়েক গুণ বেশি। কারণ ছিনতাইয়ের শিকার অনেকেই থানায় মামলা করতে আগ্রহী হন না। অন্যদিকে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন থানায় দস্যুতার ১৩৬টি মামলা হয়েছে।

পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রগুলো আগের চেয়ে আরও পরিকল্পিতভাবে অপরাধ সংঘটিত করছে। তারা মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, রিকশা কিংবা সাধারণ পথচারীর ছদ্মবেশে টার্গেটের কাছাকাছি গিয়ে মুহূর্তের মধ্যে হামলা চালিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। কোথাও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে, কোথাও ব্যাগের স্ট্র্যাপ কেটে মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করা হচ্ছে। বাধা পেলে ছুরি বা ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করতেও দ্বিধা করছে না তারা।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছিনতাইয়ের বেশ কয়েকটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে দুর্বৃত্তরা। অনেক ক্ষেত্রে আশপাশের মানুষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করছে তারা।

এসকেএফ ওষুধ কোম্পানির মেডিক্যাল সার্ভিস অফিসার সোহেলি ইসলাম গত রবিবার সকালে একমাত্র মেয়েকে নিয়ে রিকশায় করে বাসায় ফিরছিলেন। সকাল ৬টার দিকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে একটি মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারী তার হাতে প্যাঁচানো ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে তিনি চলন্ত রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন। চার দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর শেষ পর্যন্ত মারা যান এই কর্মজীবী নারী। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাকারী দুই ছিনতাইকারীর মাথায় হেলমেট ছিল। ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও শনিবার পর্যন্ত তাদের কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

সোহেলির মৃত্যু রাজধানীর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাতেও যদি এমন ঘটনা ঘটে, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত- সে প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে।

পুলিশের ওপরও হামলা : ছিনতাইকারীরা এখন এতটাই বেপরোয়া যে পুলিশের ওপর হামলা করতেও পিছপা হচ্ছে না। গত বৃহস্পতিবার রাত ১টার দিকে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যান এলাকায় ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে আহত হন দুই পুলিশ সদস্য।

শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুল ইসলাম জানান, ছিনতাইয়ের প্রস্তুতির খবর পেয়ে টহল পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ছিনতাইকারীরা একটি অটোরিকশায় পালানোর চেষ্টা করে। মোটরসাইকেলে থাকা টহল পুলিশ সদস্যরা তাদের ধাওয়া করলে একপর্যায়ে ছিনতাইকারীরা উপপরিদর্শক (এসআই) সামসুজ্জোহার বাঁ কাঁধে এবং কনস্টেবল হৃদয় বড়ুয়ার বাঁ বগলের নিচে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় দুইজনকে আটক করেছে পুলিশ।

দিনদুপুরে গুলি করে ছিনতাই : গত রবিবার বিকাল ৩টার দিকে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর এলাকায় জনতা ব্যাংকের সামনে এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ছিনতাইকারীদের গুলিতে আহত হন মুদ্রা বিনিময় ব্যবসায়ী মো. লোকমান। তাকে রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে, শনিবার পর্যন্ত এ ঘটনায় জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

কোথায় বেশি ঝুঁকি : অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাতের বেলায় তুলনামূলক নির্জন সড়ক, ফ্লাইওভারের নিচের অংশ, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন এবং হাসপাতালসংলগ্ন এলাকাগুলোতে ছিনতাইয়ের ঝুঁকি বেশি। রাজধানীবাসীর অনেকেই বলছেন, সন্ধ্যার পর প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হতে ভয় লাগে। মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে হাঁটা, রিকশায় বসে কথা বলা কিংবা বাসা থেকে নামার সময়ও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। বিশেষ করে নারী, শিক্ষার্থী ও বয়স্করা নিজেদের বেশি ঝুঁকিতে মনে করছেন।

পুলিশের উদ্যোগ : ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, ছিনতাই প্রতিরোধে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে টহল জোরদার করা হয়েছে। সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন, মোটরসাইকেল টহল বৃদ্ধি এবং সিসি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণ বাড়ানো হয়েছে। অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযানও অব্যাহত রয়েছে।

সাবেক আইজিপি মো. আশরাফুল হুদা বলেন, শুধু অভিযান চালালেই হবে না, পুলিশের টহল ও সিনিয়র কর্মকর্তাদের তদারকিও বাড়াতে হবে। অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার, নিয়মিত পুলিশি উপস্থিতি এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে কমিউনিটি নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া ছিনতাইকারীদের দ্রুত বিচার ও কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কোথাও দায়িত্ব পালনে পুলিশের অবহেলা থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

তালিকাভুক্ত ১,৩৮৭ ছিনতাইকারী : ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মহানগরীর আট বিভাগে তালিকাভুক্ত ১ হাজার ৩৮৭ জন ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে রমনা বিভাগে ১৫২, লালবাগে ১৫৯, ওয়ারীতে ৩০৮, মতিঝিলে ১৬৮, তেজগাঁওয়ে ২৪০, মিরপুরে ৫৩, গুলশানে ৬৭ এবং উত্তরায় ২৪০ জন রয়েছে।

পুলিশ বলছে, এদের প্রায় ৮০ শতাংশই এক থেকে সাতটি মামলার আসামি। অনেকেই একাধিকবার গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। গত ছয় মাসে ডিএমপি ১৬৫ জন দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারীর বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে আটকাদেশের প্রস্তাব দেয়। পরে তাদের আটকাদেশ কার্যকর হলেও মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অনেকেই উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে আবারও ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তিন ধরনের ছিনতাইকারী : আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীতে মূলত তিন ধরনের অপরাধী ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত। প্রথমত, পেশাদার সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্র। চার থেকে পাঁচ সদস্যের এসব দল নির্দিষ্ট এলাকায় অবস্থান করে ছিনতাই চালায়। অনেক সময় সিএনজি অটোরিকশা বা প্রাইভেট কার ব্যবহার করে রাতভর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে অপরাধ সংঘটিত করে।

দ্বিতীয়ত, মাদকের অর্থ জোগাড় করতে ছিনতাইয়ে জড়িত অপরাধীরা। এদের অধিকাংশই ভাসমান বা বস্তিবাসী। তারা রাস্তাঘাটে ওত পেতে থেকে যাত্রী ও পথচারীদের মোবাইল ফোন, কানের দুল, ভ্যানিটি ব্যাগসহ বিভিন্ন জিনিস ছিনিয়ে নেয়।

তৃতীয়ত, তথাকথিত ‘শৌখিন’ ছিনতাইকারী। এদের মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বখে যাওয়া শিক্ষার্থীও রয়েছে। দামি মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়ানো এসব অপরাধী সুযোগ বুঝে ল্যাপটপ, স্মার্টফোনসহ মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।

ক্রমবর্ধমান ছিনতাইয়ের ঘটনায় রাজধানীবাসীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকলেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

খুঁজুন